somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এনহেদুয়ানা—ইতিহাসের প্রথম কবি

০৮ ই অক্টোবর, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দজলা-ফোরাতের অববাহিকায় গড়ে উঠা মেসোপটেমিয়ার বিস্ময়কর প্রাচীন পৃথিবী, হাজার হাজার বছর ধরে অদম্য কৌতূহল জাগিয়ে যায় আমাদের—কী বলে গেছে অতীতের মানুষেরা? রাজা-রাণীদের রোমাঞ্চকর সমরগাঁথা, গ্রহ-নক্ষত্রে বিচরণকারী দেব-দেবীদের সভাকার্য, মৃত্যু-দরিয়া অতিক্রমের গল্প, নাকি সাধারণ মানুষের আনন্দ-দুঃখ, হাসি-কান্না, বঞ্চনা-দ্রোহের কথা?

কিন্তু সুমের, আক্কাদ আর ব্যাবিলনের এসব মানুষেরা বলে গেছে তাদের কথা কীলকলিখন (cuneiform) লিপিতে, রহস্যময় এক ভাষা, চিত্র যেখানে কাজ করে ধ্বনির। ধীরে ধীরে একদিন হারিয়েও যায় তারা, মাটির নীচে চাপা পড়ে তাদের ভাষা।

না, একেবারে হারিয়ে যায় না! বাইবেলে বর্ণিত খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের বিখ্যাত সম্রাট প্রথম দারিয়ুস, অধীনস্থ করেন হিব্রুভাষীসহ বহু জনগোষ্ঠিকে। নিজের বংশলতিকা ও বিজয়াভিযান কীলকলিখন ভাষায় উৎকীর্ণ করে রাখেন পারস্যরাজ, পশ্চিম পারস্যের বেহিস্তুনে জাগরোজ পর্বতমালার শৈলচূড়ায়। আর কেউ যাতে কোনোদিন তার কীর্তিকে বিনাশ করতে না পারে, তাই পাহাড়ের ধারগুলো কেটে দেন তিনি। আড়াই হাজার বছর ধরে মানুষ দূর থেকে অবলোকন করে গেছে এ লিপি, কিন্তু জানতে পারেনি কী লিখে গেছেন পারস্যরাজ পাহাড় চূড়ায়।

প্রাচীন পার্সি, এলুমাইট এবং কিউনিফর্মের ব্যাবিলনীয় রূপে বেহিস্তুন শিলালিপি

১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে স্যার হেনরী রলিনসন নামে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির একজন সেনাকর্মকর্তা পারস্যে শাহের সেনাবাহিনীকে সাহায্য করতে গিয়ে খুঁজে পান রহস্যময় এ শিলালিপি। পরবর্তী চার বছর, পাহাড়ের সঙ্কীর্ণ অরক্ষিত কিনারায় দাঁড়িয়ে জীবনের উপর হুমকি নিয়ে, শিলালিপিগুলো নকল করেন তিনি। সম্পূর্ণ নকলকাজ শেষ হবার পর, যা লিখা ছিল প্রাচীন পার্সি, এলুমাইট এবং ব্যাবিলনীয় ভাষায়, রলিনসন প্রথমে পার্সি লিপির পাঠোদ্ধার করেন যেহেতু তার জানা ভাষার সাথে এর ছিল সবচেয়ে বেশি মিল। পরে আরো কিছু ভাষাবিদের সহায়তায় এলুমাইট এবং ব্যাবিলনীয় কিউনিফর্ম ভাষারও পাঠোদ্ধার হয়, যদিও তুলনামূলকভাবে অনেক দুরূহ ছিল সেগুলো।

পরবর্তী বছরগুলোতে আমাদের চোখের সামনে একের পর এক উদ্ভাসিত হতে থাকে গৌরবময় এক সভ্যতা, যা আমাদের দান করেছে পৃথিবীর প্রাচীনতম লিখনপদ্ধতি, সভ্যতাকে বেগবানকারী যন্ত্র চাকা, নগররাষ্ট্র ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা, সংখ্যাতত্ত্বে শূন্যের ব্যবহার।

এবং ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে, প্রাচীন উর নগরীর ধ্বংসস্তুপে, মর্মরসদৃশ নরম কালো পাথরের এক চাকতিতে, আমরা জানতে পারি রাজকীয় এক নারীর কথা—এন-হেদু-আনা, যার অর্থ আন-এর রমণীয় অলঙ্কার বা আন-এর উচ্চ যাজকীয় অলঙ্কার; আন সুমের-ব্যাবিলনীয় পুরাণের আকাশদেব। এনহেদুয়ানা অবশ্য নারীটির আসল কিংবা জন্ম নাম নয়, একটি উপাধি, আর আসল নামটি হারিয়ে গেছে, কিংবা হয়তো লুকিয়ে আছে ইতিহাসের গর্ভে। পাথরের চাকতিটিতে কীলকলিখনে তার পরিচয় দেয়া হয়েছে: নান্নার স্ত্রী এবং পৃথিবীর রাজা সারগনের কন্যা

এনহেদুয়ানার চিত্রখচিত চাকতি; সবচেয়ে দীর্ঘাঙ্গী নারীটি তিনি

২৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে কীশ নগরীর রাজপ্রাসাদের সামান্য পেয়ালাবাহক থেকে ধীরে ধীরে পরাক্রমশালী এক সম্রাট হয়ে উঠেন আক্কাদের সারগন (Sargon of Akkad), ধীরে ধীরে দখল করে নেন দক্ষিণে অবস্থিত সুমেরের নগর রাষ্ট্রসমূহ, উরুক, উর, লাগাশ, উম্মা, এবং একসময় পৌঁছে যান নিম্ন সাগরের (Persian Gulf) কাছে, পানিতে তরবারি নিমজ্জিত করে উত্তোলন করেন মাথার উপর—সুমেরের বিজয় সম্পন্ন হলো।

আক্কাদের রাজা প্রথম সারগন (সম্ভবত)

সারগন এবার দৃষ্টি প্রসারিত করেন উত্তর ও পূর্বে উচ্চ সাগরের (Mediterranean Sea) দিকে, আর তখন জটিল এক সমস্যা এসে পথ রোধ করে তার: আক্কাদ ও সূমের, ভিন্ন দুই জাতি, ভিন্ন তাদের ভাষা, অগ্নিস্ফূলিঙ্গের মতো মুখোমুখি দাঁড়িয়ে—কার তত্ত্বাবধানে রেখে যাবেন বিশাল বিবদমান এ সাম্রাজ্য।

এগিয়ে আসেন সারগনের তরুণী কন্যা এনহেদুয়ানা, জানেন তিনি রঙ-বর্ণ-ভাষা ভিন্ন হলেও আত্মিক বন্ধন মানুষকে নিয়ে আসে কাছাকাছি, শত্রুকে করে বন্ধু। আক্কাদের দেবী ইশতার, সুমেরের দেবী ইনান্নাকে একীভূত করেন তিনি, দায়িত্ব নেন উর নগরীতে ইনান্নার পিতা চন্দ্রদেব নান্নার মন্দিরে উচ্চ যাজিকা'র (High Priestess)। পরবর্তী ৫০০ বছর মেসোপটেমিয়ার মানচিত্রে, সম্রাটদের রাজনীতিতে, এবং গণমানুষের জীবনাচরণে বিশাল প্রভাব রাখে এনহেদুয়ানা ও তার উত্তরসূরী এসব উচ্চ যাজিকাগণ।

এবং এনহেদুয়ানা, বেঁচেছিলেন যিনি শেক্সপিয়ারের জন্মের প্রায় ৪০০০ বছর পূর্বে, গ্রিক গীতিকবি স্যাফো'র ১৭০০ বছর এবং চারণকবি হোমারের ১৫০০ বছর পূর্বে, রচনা করে গেছেন অনন্য ভাষা শৈলী ও শব্দচয়নে চমৎকার অনেক কবিতা, ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত, যুগ যুগ ধরে মেসোপটেমীয়ার বিদ্যালয় (edubba) ও উপাসনালয়গুলিতে লেখকরা যা পাঠ করে যেত গভীর ভক্তিতে, এবং এখনও বিস্ময় জাগিয়ে যায় আমাদের।

এনহেদুয়ানা—এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত ইতিহাসে, বিশ্বের প্রথম কবি, যাকে চেনা যায় নাম ধরে, উত্তম পুরুষে প্রথম কবিতা লেখার কৃতিত্বও যার।

এনহেদুয়ানার কবিতা
১। নিন-মে-সার-রা (ইনান্নার পরমানন্দ)
২। ইন-নিন-সা-গুর-রা (দৃঢ় আত্মার নারী)
৩। ইন-নিন-মে-হুস-আ (ইনান্না ও এবি)
৪। এ-উ-নির (মন্দির গীতি)
৫। এ-উ-গিম-এ-আ (নান্না গীতি)
৬। এনহেদুয়ানার প্রশংসা গাঁথা


সারগনের বংশ ধারা

তথ্যসূত্রঃ
Click This Link
http://en.wikipedia.org/wiki/Enheduanna
http://www.angelfire.com/mi/enheduanna/
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই অক্টোবর, ২০১০ সকাল ৭:০৪
৩৯টি মন্তব্য ৩৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রঙ বদলের খেলা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২০ সকাল ৯:৪৮


কাশ ফুটেছে নরম রোদের আলোয়।
ঘাসের উপর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শিশিরকণা।

ঝরা শিউলির অবাক চাহনি,
মিষ্টি রোদে প্রজাপতির মেলা।

মেঘের ওপারে নীলের অসীম দেয়াল।
তার ওপারে কে জানে কে থাকে?

কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

শ্রদ্ধেয় ব্লগার সাজি’পুর স্বামী শ্রদ্ধেয় মিঠু মোহাম্মদ আর নেই

লিখেছেন বিদ্রোহী ভৃগু, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২০ সকাল ১০:৩৮

সকালে ফেসবুক খুলতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল।
ব্লগার জুলভার্ন ভাইয়ের পেইজে মৃত্যু সংবাদটি দেখে -

একটি শোক সংবাদ!
সামহোয়্যারইন ব্লগে সুপরিচিত কানাডা প্রবাসী ব্লগার, আমাদের দীর্ঘ দিনের সহযোগী বিশিষ্ট কবি সুলতানা শিরিন সাজিi... ...বাকিটুকু পড়ুন

এখন আমি কি করব!

লিখেছেন মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২০ বিকাল ৩:১৯

মাত্র অল্প কিছুদিন হল আমি ফরাসি ভাষা শিক্ষা শুরু করেছিলাম।



এখন আমি ফরাসি ভাষা অল্প অল্প বুঝতে পারি। হয়তো আগামী দিনগুলিতে আরেকটু বেশি বুঝতে পারব।

ফ্রান্স একটি সুন্দর দেশ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

=স্মৃতিগুলো ফিরে আসে বারবার=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২০ বিকাল ৪:০৮



©কাজী ফাতেমা ছবি
=স্মৃতিগুলো ফিরে আসে বারবার=

উঠোনের কোণেই ছিল গন্ধরাজের গাছ আর তার পাশে রঙ্গন
তার আশেপাশে কত রকম জবা, ঝুমকো, গোলাপী আর লাল জবা,
আর এক টুকরা আলো এসে পড়তো প্রতিদিন চোখের... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহারা

লিখেছেন মা.হাসান, ২৫ শে অক্টোবর, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৩৩




আমাবস্যা না । চাঁদ তারা সবই হয়তো আকাশে আছে। কিন্তু বিকেল থেকেই আকাশ ঘোর অন্ধকার। কাজেই রাত মাত্র নটার মতো হলেও নিকষ অন্ধকারে চারিদিক ডুবে আছে।

গায়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×