
শীতকাল শুরু হয়ে গেছে। গাছের পাতায় পাতায় শিশির জমে, কুয়াশার হালকা চাদর প্রকৃতি জুড়ে। ঠিক এমনই এক কালীসন্ধ্যায় রেজাউল কোত্থেকে এসে রুমে ঢুকে বলল- এই মেসে আর থাকা যাবেনা। বই থেকে চোখ ফিরিয়ে ভ্রু কুচকে মাহিন জানতে চাইল-কেন ?
জানুয়ারী থেকে মালিক ভাড়া বাড়িয়েছে। তাও জন প্রতি ৫০০/- টাকা করে। ওমা ! বল কি ? আমিতো জানিনা।
রেজাউল মুখে কৃত্রিম ভাব এনে বলল- তুমি জানবে কেন ? তুমি শুধু পড়া নিয়ে থাক। আমি জেনেছি এই ঢের।
তারপর থেকে দু’বন্ধতে সময় করে মেস খোঁজা শুরু হলো। বেশ কিছুদিন রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে অবিরাম খুজে চলল। অবশেষে পেয়ে গেল তাদের নতুন গন্তব্য। পুরাতন বিল্ডিং। দোতালায় মালিক থাকেন আর নীচতলার ৫টি রুম সব ফাঁকা। সেই ৫টি রুমের একটি ভাড়া নিল দুই বন্ধু। কুমিল্লা শহরের এপাশটায় আগে আসেনি মাহিন।
নতুন মেসে উঠার পর তার মনে হলো এখানে আসা ঠিক হয়নি। একেতো নির্জন তার উপরে সামনেই একটা মরা-পঁচা খাল। সবসময় দুর্গন্ধ লেগেই আছে। আর সারাক্ষণ মশা বন্ বন্ করছে।
প্রথম রাতে নিজেরা রান্না করে খেল। রেজাউল আবার রান্নায় পারদর্শী। যত দিন বুয়া পাওয়া যাবেনা ততদিন আমাকে রান্নায় সাহায্য করতে হবে মাহিন, কোন অজুহাত দেখাতে পারবেনা। কথাটা বলে রেজাউল মাহিনের উত্তরের অপেক্ষা না কের পড়ায় মনোযোগ দিল।
এখানে এত মশা না জানি কবে ডেঙ্গু হয়ে যায়। মাহিনের বিরক্তির শেষ নেই।
আরে ভায়া শীতকালে মশা কামরায়না। শুধু গুন গুন করে গান গায়। আসার পর একটাও মশা কামড় দিয়েছে । সত্যি করে বল ?
না তা কামড়ায়নি কিন্তু কামড়াতে কতক্ষণ।
দেখ মাহিন এর চেয়ে সস্তায় ভাল আর কোন মেছ পাবেনা শহরে। কিছু সমস্যাতো মেনে নিতেই হবে।
কিছু সমস্যা মনে নিয়েই দু’বন্ধু বেশ কিছুদিন কাটিয়ে দিল। একদিন হুট করে রেজাউলের বোন জানাল বাড়িতে বাবা অসুস্থ, জলদি বাড়ি যেতে হবে। খবর শোনা মাত্রই তড়িঘড়ি করে রেজাউল বাড়ি চলে গেল। রেজাউলের কাছে নতুন মোবাইল ছিল তার দুলাভাইয়ের বিদেশ থেকে পাঠানো, সেটা দিয়েই রাত-বিরাতে টর্চের কাজ চলতো।
মাহিন একা হয়ে পড়ল। নতুন মেসে আজ রাতে সে একা। বিদ্যুৎ চলে গেছে এর মধ্যে কয়েকবার। সে অন্ধারে নতুন কবিতার লাইন ঠিক করতে করতে কাটিয়ে দিয়েছে। ঘড়ি দেখল ১১।০০টা বাজে। দোয়া-দরুদ পড়ে শুয়ে পড়ল।
হঠাৎ খট খট শব্দে তার ঘুম ভাংল। ঘড়িতে চোখ রেখে দেখে ০১।০০টা বাজে। সে লাইট জ্বালাতেই শব্দটা বন্ধ।
সেই লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ল, অমনি আবার জড়জায় শব্দ শুরু। আবারও লাইট জ্বালালো, আবারও শব্দ বন্ধ।
কিছুক্ষণ পর আবার শুরু হলো এবার মনে হচ্ছে নখ দিয়ে কেউ দড়জা আঁচরাচ্ছে। মাহিন- কে, কে ওখানে বলে চিৎকার করে উঠল। শব্দ থেমে গেল। কিছুক্ষন বসে থেকে সে আবার ঘুমাতে চেষ্টা করল। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে কোন প্রাণী ধারালো নখে দড়জা ছিদ্র করার চেষ্টা করছে।
এবার কিছুটা ভয় জেকে ধরল মাহিনকে। তবু সে দমে যাবার পাত্র নয়। গলাটা শুকিয়ে কাট হয়ে গেছে। একঢোক পানি গিলে টর্চটা হাতে নিয়ে আস্তে আস্তে দড়জার কাছে গিয়ে ছিটকানীতে হাত রাখল।
খুলবে কি খুলবেনা ভাবনায় পড়ে গেল। মনে মধ্যে কত ধরণের ভাবনা এল। কিন্তু সাহস করে এক ঝটকায় দড়জা খুলে ফেলে টর্চের আলো দিয়ে দেখলো কেউ নেই, কিছু নেই। সে স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে রইল।
হঠাৎ ভূতের কথা মনে উদয় হতেই দড়াম করে দড়জা বন্ধ করে লাইট জ্বালিয়ে শুয়ে পড়ল। চোখটা লেগে এসেছে আবার শুরু হলো সেউ বিৎঘুটে শব্দ। এবার সে নির্বিকারভাবে শুয়েই রইল। আধো ঘুম আধো জাগড়নে তার ভয়াল রাত শেষ হলো।
রেজাউল ফিরলে তাকে সব খুলে বলল। শুনে সে বলল-বাহ! তুমিতো দেখি বেশ সাহসী। আমি হলেতো ভয়েই শেষ হয়ে যেতাম।
মাহিন মনে মনে বলল-তোমাকেও আমি একা ফেলে একদিন হুট করে চলে যাব। তার পর মজা বুঝবে।
ছবি : নিজের তোলা, মোবাইল থেকে নেওয়া।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ সকাল ১১:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



