ডিবির হাজত খানা। চারপাঁচজন মিলে বেধরক পেটাচ্ছে এক যুবককে । কেউ লাঠি দিয়ে, কেউ শটগান দিয়ে, কেউ আবার লাথি কিংবা কিল-ঘুষি মারছে। যেন কেউ মানুষ নির্যাতন করার এমন সুবর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে চাচ্ছে না । মারতে মারতে তারা নিজেরাই হাঁপিয়ে উঠেছিল। যুবকটির গগনবিদারী চিৎকারে পরিবেশটা কেমন ভীতিকর হয়ে উঠল। হাজতখানায় আটক দাগী আসামিরাও এমন উন্মত্ত আচরণে কুঁকড়ে যাচ্ছিল। কেউ কেউ কেঁদে উঠছিল! নির্যাতনকারী এই দলটির নেতৃত্বে অাছে ডিবির অফিসার এসি অাকরাম৷
এক পর্যায়ে যুবকটিকে মেঝের ওপর ফেলে তার হাত পা চেপে ধরা হল। একজন যুবকটির বুকের ওপর উঠে লাফাতে শুরু করল। শ্বাস বন্ধ হওয়ার অবস্থা যুবকটির। কেবল গোঙানীর শব্দ আসছে। নির্যাতক এই দলটির চীফ এসি আকরামের নির্দেশে ঐ অবস্থায়ই টেনে হিঁচড়ে তাকে নেওয়া হয় পানির একটা চৌবাচ্চার সামনে। সেখানে তার ওপর চলে পানি থেরাপি।
খুবই জঘণ্য ধরনের এবং ভয়ঙ্কর একটা ব্যাপার এই পানি থেরাপি। গামছা দিয়ে নাকমুখ বেঁধে পানি ঢালা হয় অনবরত। এক পর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে যুবকটি। গলগল করে রক্ত বেরুতে থাকে নাক মুখ দিয়ে। কিছুক্ষণ এ ভাবে চলার পর হঠাৎ সাড়াশব্দ বন্ধ । নড়াচড়া নেই । শ্বাস-প্রশ্বাসও নেই । তার মানে বন্ধ হয়ে গেছে যুবকের দেহঘরি।
একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মাত্র তেইশ বছরের টগবগে তরুণ শামিম রেজা রুবেল মৃত্যুর আগে জেনে যেতে পারল না, কেন তার ওপর এই বর্বরতা চালানো হলো, কেন তাকে মেরে ফেলা হলো! বাসার সামনে থেকে পেটাতে পেটাতে তুলে নিয়ে গিয়ে আইনের লোকেরাই কেন তাকে চার পাঁচ ঘন্টা নির্যাতন করে মেরে ফেলল!
যাদের কথা ছিল আইনের রক্ষক হবার তাদেরই বেআইনী কার্যকলাপের বলি হল আজ একজন। কয়েকজন অফিসারের লোভ কেড়ে নিল টগবগে একটি প্রাণ৷ এদের কারো কারো লোভ বাড়তে বাড়তে মানসিক রোগের পর্যায়ে চলে যায় । কোটি কোটি টাকার হাতছানি এদেরকে উন্মাদ পশু বানিয়ে দেয়। লোভের কারণে মানুষ চলে যায় হিংস্র হায়েনার পর্যায়ে। মানুষকে ধরে ধরে নির্যাতন করে টাকা আদায় চলতে থাকে। অসহ্য শারীরিক যন্ত্রণাক্লীষ্ট একেকটা মানুষ দেখে তাদের অসুস্থ হিংস্রতা আরও বেড়ে যায়। পৃথিবীর তাবৎ ভাষায় মানবতা শব্দের প্রতিশব্দগলো মুখ লুকানোর জায়গা খুঁজে সেই ভয়ঙ্কর নির্যাতন দেখে।
২
অদ্ভূৎ একটা অসুখ ডিপ্লোপিয়া। বাংলায় বললে বলা যায় দৈত দৃষ্টি রোগ। এই অসুখটা কারও হলে সে একটা জিনিসকে দুইটা দেখতে পায়। আকরাম এ্যাপারেলস্ লিমিটেডের এমডি আকরাম হোছাইন চৌধুরী স্পষ্টই বুঝতে পারছেন তিনি ডিপ্লোপিয়ায় আক্রান্ত। এই মুহূর্তে তিনি অফিসে। তারঁ সামনে ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে আছে তার পার্সোনাল সেক্রেটারি শানিলা মেহজাবিন। তিনি নিজেই ডেকে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সমস্যা হল তিনি দেখতে পাচ্ছেন দুইজন শানিলা ফাইল হাতে তারঁ সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি খুবই বিব্রত বোধ করছেন।
মাস দুয়েক হয় এই সমস্যাটা শুরু হয়েছে। প্রথম দিকে সমস্যটা শুরু হলে বেশিক্ষণ স্থায়ী হত না। কিছুক্ষণের মধ্যে আবার স্বাভাবিক হয়ে আসত দৃষ্টি । ডাক্তার প্রথমে একটা আশঙ্কার কথা বলেছিলেন। অপটিকেল নার্ভ বা এর খুব কছে যদি টিউমার হয় তাহলে দৃষ্টিশক্তির এমন পরিবর্তণ লক্ষ্যকরা যায়। কিন্তু দেশে পরীক্ষায় কিছু ধরা পড়ে নি। সিঙ্গাপুরে গিয়ে পরীক্ষা করিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে কোনো টিউমার নেই। তারপরও কেন এমন হচ্ছে সেই কারণটা অবশ্য এখনও ধরতে পারে নি কোনো ডাক্তার।
তার নিজের ধারণা, হতে পারে ঘুম না হওয়ার কারণে এমন সমস্যা দেখা দিয়েছে। আজকাল ঘুমাতেই পারেন না তিনি। ঘুমালেই ভয়ঙ্কর একটা স্বপ্ন দেখেন। ভর দুপুর। মাথার উপর তপ্ত সূর্য যেন আগুন ছড়াচ্ছে। একটি বিশাল মাঠে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। মাঠটির এক পাশে একটা নদী। নদীতে একটি যুবক জলকেলি করছে। মাঠে ঝাঁকে ঝাঁকে নানা রকম জীবজন্তু। তাকে দেখেই তাড়া করে এক পাল কিম্ভূৎ জীবজন্তু। তিনি দৌড়ে গিয়ে নদীতে পড়েন। তখন ঐ ছেলেটি এগিয়ে আসে। কাছ থেকে ছেলেটিকে দেখে চমকে উঠেন তিনি। খুবই চেনা চেনা লাগছে। কিন্তু কোথায় দেখেছেন মনে করতে পারেন না।
অনেক গরম তাই না? পানি খাবেন? নেন পানি খান। পানিথেরাপি নিলে গরম কমে যাবে। একথা বলেই ছেলেটি তাঁর গর্দান ধরে তাঁকে পানির নিচে চেপে ধরে। তাঁর দম বন্ধ হয়ে আসে। বাতাসে রজন্য, শ্বাস নেওয়ার জন্য তিনি ছটফট করতে থাকেন। এপর্যায়ে ঘুম ভেঙ্গে যায় তাঁর। তার পল্লবীর চারতলা বাড়ি হোসাইন ভিলাতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের আধুনিক সব ব্যবস্থা করা আছে । তারপরও তিনি ঘামতে থাকেন দর দর করে।
৩
চোখের সম্যাটা নিয়ে দেশে বিদেশে কতো ডাক্তার দেখালেন। কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। তার উপর আবার নানা রকম দুঃস্বপ্ন! আকরাম হোসাইন চৌধুরী বুঝে উঠতে পারেন না কী করবেন! আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুবান্ধবরা পরামর্শ দেয়, তোমার সমস্যা ডাক্তাদের দ্বারা সমাধান করা সম্ভব না। আওলিয়াদের দোয়া নাও। কোনো পীর-আওলিয়া বা সিদ্ধপুরুষই পারবে তোমার সমস্যার সমাধান দিতে। শেষপর্যন্ত আকরাম হোসাইন চৌধুরী ঠিক করেছেন কুতুববাগ দরবার শরীফে যাবেন।
কোন পীরের কাছে যাবেন সেটাও ঠিক করতে পাছিলেন না। শেষে তার ব্যাসায়ী বন্ধু এবং বিজিএমই এর সাবেক নেতা বর্তমানে রাজনীতিবিদ সানাউল হক তাকে এই পীর সাহেবের সন্ধান দেন।
'আকরাম ভাই, যার তার কাছে গেলে তো কোনো লাভ হবে না। আজকাল বেশির ভাগই ভন্ড। তার কাছেই যেতে হবে যিনি একজন প্রকৃত সিদ্ধপুরুষ। হযরত খাজা সৈয়দ নকশবন্দী কুতুববাগী কেবলাজান তেমনই একজন সিদ্ধপুরুষ, কামেল পীর। তাঁর কাছে যান কাজ হবে। আমি নিজে তাঁর দোয়া আর অনুমতি ছাড়া কোনো কাজ করি না। আজকে আমার গোপন রহস্যটা বলে দিলাম আপনাকে।' বলেছিলেন সানাউল হক।
বংশগত সৈয়দ না হলেও এই পীর সৈয়দ উপাধিধারী । ভারতের মুর্শিদাবাদের আজানবৃক্ষীর জিন্দাপীর, শাহান শাহ নকশবন্দি, সৈয়দ বহরমপুরি নিজে এসে একটি মেবারক অনুষ্ঠান করে রুহানী ফায়েজের মাধ্যমে তাঁকে সৈয়দ উপাধী দান করে গেছেন। উক্ত পীর সাহেব সম্পর্কে এরকম আরও কিছু তথ্য দিলেন সানাউল হক।
প্রথম দিন পীর সাহেবের নুরানী চেহারা দেখেই তিনি বুঝতে পারেন আসেলই ইনি খাঁটি পীর। কামেল লোক, একজন সিদ্ধপুরুষ ছাড়া এমন আলোকিত চেহারা আর কারোর হতেই পারে না। তিনি সালাম করতেই পীর হুজুর অনেক সুন্দর করে সালামের উত্তর দিলেন । সুন্দর একটি আসনে বসাছিলেন পীর হুজুর। এগিয়ে গিয়ে কদমবুসি করলেন আকরাম হোসেন চৌধুরী। পীর সাহেব কেবলাজান তখন তার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, বাবা সব চিন্তা দূর হয়ে যাবে আল্লাহর রহমতে।
কেবলাজান হুজুরের কাছ থেকে এই কথা শুনতেই কীহল, হু হু করে কেঁদে ফেললেন আকরাম হোসাইন চৌধুরী। বললেন, কেবলাজান হুজুর! জীবনে জ্ঞানত কোনো পাপ করিনি। বুঝ হওয়ার পর কোনোদিন নামাজ কাজা করিনি, রোজা ছড়িনি। তারপরও কেন আমার এমন শাস্তি। দয়ালের এ কেমন বিচার হুজুর!
'বিপদ আপদ এসব আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা হিসেবে আসে। ধৈর্যহারা হবেন না। তাঁর ওপর বিশ্বাস রাখুন । তিনি সব ঠিক করে দিবেন।’হুজুর কেবলাজান সান্ত্বনা দেন তাকে।
‘আমাকে সব সময় পাশেই পাবেন, আপনার অন্তরেই পাবেন ’আশ্বস্ত করেন তিনি আকরাম চৌধুরীকে।
সত্যি আকরাম সাহেব যখনই অন্তর দিয়ে কেবলাজান বাবাকে স্মরণ করেন তখনই উপলব্ধি করেন তিনি তাঁর অন্তরেই আছেন। এখন তার অাশা মুরশিদ কেবলাজানের উসিলায় সৃষ্টিকর্তার এই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবেন! এজন্য প্রথম দিনই অবশ্য হুজুর কেবলাজানের দরবারে বড় অঙ্কের একটা মান্নত করে এসেছেন তিনি।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ১১:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



