আমি দ্বিতীয় শ্রেণিতে অধ্যায়নের সময়েই কোরআন পড়া শিখি। এরপর অসংখ্য বার কোরআন খতম করেছি। এসএসসি পর্যন্ত প্রতি রমজানে দুবার খতম দিতাম। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজই মসজিতে পড়ার চেষ্টা করতাম। এসএসসি পাশ করে নটরডেমে ভর্তি হয়েছি। একলোক (এখন দেখি না অনেক দিন, সম্ভবত মরেছে) ডেকে বলল, তুই ইহুদী নাসারাগো কলেজে পড়স, তুইতো নাস্তিক!
সেই শুরু। গতকাল রোজা রেখে জুন্মর নামাজ পড়ে বের হয়ে শুনি পাশের গ্রামের একজন বক্তৃতা দিয়েছে- মুজিব রহমান নামে একজন মহানাস্তিক রয়েছে। আমার মতো হাজির বিরুদ্ধে উল্টাপাল্টা লিখে। তার উদ্দেশ্য হয়তো উগ্রপন্থীদের উষ্কানি দিয়ে আমাকে হত্যা করানো। ১৯৯৪ সালে আমার ও সাইফুলের সাথে ড. হুমায়ুন আজাদের ঘনিষ্ঠতা হয়। তখন আমি আমার হোস্টেলে ইমামতি করি, নিয়মিত নামাজ পড়ি। এলাকায় আমাকে আর সাইফুলকে উগ্রপন্থীরা নাস্তিক ঘোষণা দিয়ে দিল।
এ খেতাব আরো আগেও পেয়েছি। যখনই কারো অপরাধের প্রতিবাদ করি, তারা এ অস্ত্র দিয়ে আঘাত করতে চায়। সেই লালসালু উপন্যাসের মজিদের মতো- মিয়া তোমার মুখে দাঁড়ি কই?
আমাদের বাজারে একবার এক পতিতার চুল কেটে দেয়া হয়, বাড়ি থেকে ধরে এনে। আমি তখন ছোট। কিন্তু বিষয়টা আমাকে কষ্ট দিয়েছিল। অনেক পরে একবার পতিতার চুল কাটার বিরোধীতা করায়- নাস্তিক আখ্যা পাই। আবার পতিতাবৃত্তি খারাপ, মাদক বিক্রি খারাপ বলার কারণেও ওই পতিতার স্বজন, মাদক বিক্রেতা আমাকে নাস্তিক আখ্যা দেয়। আমি কারণটা বুঝি। মাদক ব্যবসার ও পতিতাবৃত্তির অনেক টাকাই ধর্মের পেছনে ব্যয় করে ওরা, ফলে অনেকে ওদের সমর্থন করে।
জমিদারগণ ও উচ্চ শিক্ষিত হিন্দুরা চলে যাওয়ার পরে আমাদের গ্রামে উচ্চ শিক্ষিত লোক ছিল না বললেই চলে। মুসলমানদের মধ্যে আমাদের গ্রামে প্রথম আমি নটরডেম কলেজে পড়ি। এর বহু বছর পরে আমার ভায়রার ছেলে ইঞ্জিনিয়ার সুমিত জামান পড়েছিল। আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল অসীম। ওকেও দেখতাম কিছুলোক নাস্তিক বলতো। ও ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করে এখন প্রবাসী। আমাদের কেন নাস্তিক বলে? এই প্রশ্ন বহুকালই আমার মধ্যে ছিল? এর একটাই কারণ আমরা তিনজনই উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে গ্রামের সাথে নিবিড় সম্পর্ক রেখে, অন্যায়-অপরাধের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতাম। ধর্মান্ধতা, কুসংস্কারাচ্ছন্নতা, উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতাম। শুধু অসীমের সাথে সুসম্পর্ক রাখার কারণে একজন মোয়াজ্জিন আমাকে ডেকে অসীমের সামনে বলেছিল, তুই একটা মালাউনের সাথে চলিস, আখেরাতে কি জবাব দিবি?
গতকালও একজন বললেন, সাইফুল শিক্ষার গৌরব করে।
আমি বলি, এটা ওর ক্ষেত্রে একেবারেই সত্য নয়। আমাদের মধ্যে ও-ই দরিদ্র কৃষক শ্রমিকের সাথে নিবিড় সম্পর্ক রাখে। ওর বিরুদ্ধে উল্টো অভিযোগ করা যেতো, ও শিক্ষিত-সচেতন মানুষের চেয়ে শ্রমজীবী মানুষের সাথে বেশি চলে। ও শিক্ষিত মানুষ সেটা বুঝতে দেয় না।
অপরাধী, প্রতারক, ধর্মান্ধ-উগ্রমৌলবাদীদের একটি ভয়ানক অস্ত্র ‘নাস্তিক’ উপাধি দিয়ে কাবু করার চেষ্টা করা। যাতে কেউ ওইসব প্রতারকদের বিরুদ্ধে না দাঁড়ায়। ওরা উচ্চ শিক্ষিত-সচেতন ও বিজ্ঞানমনষ্ক সবাইকেই যদি নাস্তিক আখ্যা দিয়ে বসে তখন কি হবে?
সেই লালসালু, সেই মজিদদের উত্থান দেখি। তাদের বাম্পার ফলন হয়েছে। এটাই হয়তো মজিদদের পতনের শুরু।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


