মধ্যবিত্তের মানুষের মুখে প্রায়শই শুনি, উচ্চবিত্ত আর বিত্তহীনরাই ভাল আছে, কষ্টে আছে কেবল মধ্যবিত্ত। উচ্চ বিত্তরা ভাল থাকবে স্বাভাবিক কিন্তু বিত্তহীনদের নিয়ে এতো ঈর্ষা কেন? তাদের বাঁচার খরচ কম বলে? মার্কেটের সামনে একটি ছেঁড়া কাথা গায়ে দিয়ে এই শীতে শুয়ে ঘুম দিতে পারে বলে?
বিত্তহীনদের সমস্যাটা একবার দেখুন-
* তারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত
* তারা চিকিৎসা নিতে পারে না
* তাদের গড় আয়ু কম
* বর্ষা-গ্রীষ্ম-শীতে-বন্যা-ঝড়ে তারা কষ্টই করে
* সন্তানসহ নিজেরা পুষ্টিহীনতায় ভূগে
* তাদের সংসারের প্রতি তাদের টানও কম
* যৌনতা ও ধর্ম নিয়ে তাদের অত মাথাব্যথা থাকে না।
আরো কত সমস্যা। বিপরীতে উচ্চবিত্তদের দেখুন-
* সবসময় থাকে চেকআপে। অসুখবিসুখ ধারে কাছে আসে না,
* উচ্চ শিক্ষার জন্য ছুটে বেড়ায় সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে
* শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা-বন্যা-ঝড়-ভূমিকম্প তাদের ছুঁতে পারে না।
* বিনোদনের জন্য আজ পাতায়া তো কাল মায়ামি বীচের ধারে কোন দুনিয়া কাঁপানো সুন্দরীকে বাহুলগ্না করে উপভোগ করছে।
* ধর্ম ও যৌনতা নিয়ে তাদের অত মাথাব্যথা থাকে না।
শুধু শেষ দুটির মিল দেখে আঁতকে উঠবেন না। ওর ভিতরেও রয়েছে রাজ্যের পার্থক্য। ওদের রয়েছে আরো বহু রকমের সুখ।

মধ্যবিত্ত কারা?
যাদের ৪/৫ সদস্যের ছোট পরিবারের মাসিক পারিবারিক আয় অন্তত ২৫,০০০/- টাকা (দৈনিক ১০ ডলার হিসাবে) থেকে ২৫০,০০০/- টাকা (দৈনিক ১০০ ডলার হিসাবে)। আমরা মধ্যবিত্তকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করে থাকি-
১। নিম্ন মধ্যবিত্ত
২। টেকসই মধ্যবিত্ত
৩। উচ্চ মধ্যবিত্ত
নিম্ন মধ্যবিত্তের মানুষেরা অসুখ-বিসুখে পড়ে, চাকরি হারিয়ে এক ধাক্কায় নেমে যেতে পারে বিত্তহীনে। আবার উচ্চ মধ্যবিত্তের কোন আমলা বা রাজনীতিবীদ ঘুষ-দুর্নীতি করে কয়েক বছরেই চলে যেতে পারেন ধনিক শ্রেণিতে। বিত্তহীনদের মধ্যবিত্তে যাওয়া কঠিনই আবার উচ্চ বিত্তের মানুষেরা সাধারণত নিচে নামে না। কারণ টাকা, টাকা আনে। যারা অন্তত ৪০,০০০/- থেকে ৫০,০০০/- টাকা পর্যন্ত মাসিক আয় করেন তারাই থাকেন টেকসই মধ্যবিত্তে। সামান্য ধাক্কা তারা কাটিয়ে উঠতে পারেন।

বাংলাদেশে ২০১৫ সালের একটি জরিপ বলেছিল দেশে সাড়ে তিন কোটি মানুষ মধ্যবিত্ত। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০%। একই সময়ে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত একটি জড়িপে বলেছিল বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত প্রকৃতপক্ষে ৭%। সে হিসেবে সোয়া কোটি মানুষ মধ্যবিত্ত। বাংলাদেশের জরিপকে সত্যি ধরেই বলতে পারি দেশে এখন হয়তো ২৫% মধ্যবিত্ত এবং এভাবে চললে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের তিনভাগের এক ভাগ মানুষ মধ্যবিত্ত হয়ে উঠবে। মধ্যবিত্ত হল একটি রাষ্ট্রের শক্তি। চীনের অর্থনীতি শক্তিশালী কারণ তাদের মধ্যবিত্ত অনেক শক্তিশালী। চীনের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষই মধ্যবিত্ত। মধ্যবিত্তের সমস্যা কোথায়?
* মধ্যবিত্ত পরিবার হাত পাততে পারে না বিধায় না খেয়ে থাকে,
* দাওয়াত না পেলে অপমান বোধ করে, পেলে উপহার দিতে মন টাটায়,
এই মানুষগুলো আসলে মধ্যবিত্তেও নেই অথবা ছিল না। অথবা তারা নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে একধাপ নিচে নেমে গেছে। প্রকৃত মধ্যবিত্তের না খেয়ে থাকতে হয় না।
মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো অবশ্যই বিত্তহীনদের চেয়ে অনেক ভাল থাকে। তাদের কিছু সমস্যাও রয়েছে-
* তারা সবসময় পিছুটান বোধ করে,
* আন্দোলন সংগ্রাম থেকে নিজেদের নিরাপদে রাখে,
* সুবিধাবাদী আচরণ করে
* ধর্মবিশ্বাস প্রকট থাকে
* পারিবারিক জীবন যাপন করতে চায়
মধ্যবিত্তরা আছে মধ্যম অবস্থাতেই। তাদের শিক্ষিত অংশটা নিজেদের সুশীল মনে করে। দাঙ্গা-হাঙ্গামায় জড়ায় না। মাদক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ড থেকেও দূরে থাকে। তারা বিত্তহীনদের চেয়ে খারাপ আছে এই ভাবনাটাই মধ্যবিত্তর বোধ, উচ্চবিত্তের চেয়ে খারাপ আছে এই ভাবনাটা তাদের লক্ষ্য। মধ্যবিত্তদের জন্য বড় বিনোদক ছিলেন, হুমায়ূন আহমেদ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন মধ্যবিত্তর মন। তাই গিলিয়েছেন তার প্রাঞ্জল-উদ্ভট উপন্যাস। মধবিত্ত বেরিয়ে আসতে চায় সমস্যা থেকে। সেটাই হুমায়ূন নিশ্চিত করতেন।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ রাত ৮:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


