একটি মানসম্মত ও কার্যকরী টিকার জন্য বিশ্ববাসী অধীর আগ্রহে চেয়ে আছে বিজ্ঞানীদের দিকে। এর মধ্যে ভারত ও বাংলাদেশ ঘোষণা দিয়ে দিয়েছে তারা টিকা আবিষ্কার করেছে এবং শিঘ্রই তা বাজারে আসবে।ভারততো ঘোষণা দিয়েছে আগামী ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের দিনই তারা টিকা দেয়া শুরু করবে। বাংলাদেশও বেছে নিতে পারে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের দিন। কেন ১৫ আগস্ট? ভারতে এখন করোনা শনাক্তে বিশ্বে তৃতীয় মৃত্যুও প্রায় ২০ হাজার। ভারতে রয়েছে পরীক্ষার বাইরে কোটি কোটি মানুষ। করোনা উপসর্গে মৃত্যুও অনেক। মোদীকে সীমাহীন ব্যর্থতার গ্লানী থেকে বাঁচতে হলে এখন আবারো জাতীয়তাবাদ ব্যবহার করতেই হবে। মিছামিছি হলেও জয় শ্রীরাম বলে সবার আগে টিকা বাজারে আনতে হবে।অথচ তারা কোন ধাপই সম্পন্ন করেনি।

টিকা বাজারে আনার আগে অনেক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। সবার আগে আসে গিনিপিগ, ইঁদুর, বানর ইত্যাদি প্রাণির উপর প্রতিষেধক প্রয়োগ করে প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করা। সেখানে সফল হলেই আসে মানুষের উপর প্রয়োগের প্রথম ধাপ। টিকার মূল কাজ এন্টিবডি তৈরি করা। সেটা হচ্ছে কিনা সেটা দেখার জন্য অল্প সংখ্যক মানুষের শরীরে প্রয়োগ করে পরীক্ষা করতেই হবে।যদি এন্টিবডি তৈরি না হয় তবে বুঝতে হবে টিকা সফল হয়নি। এটার কোন ক্ষতিকর প্রভাব আছে কি না তাও বুঝতে হবে। এজন্য অন্তত তিন মাস সময় লাগে অর্থাৎ মোদীর ১৫ আগস্ট পার হয়ে যাবে প্রথম ধাপ পার হওয়ার আগেই।
দ্বিতীয় ধাপে এন্টিজেনকে নিষ্ক্রিয় করার সক্ষমতা যাচাই করার জন্য এক্সপ্যান্ডেড ট্রায়ল করতে হয়। প্রতিষেধক কতটা নিরাপদ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সৃষ্টিতে সক্ষম কিনা তা দেখতে অন্তত ১শ মানুষের উপর টিকা প্রয়োগ করতে হবে। যদি সক্ষম হয় তবুও এই প্রক্রিয়ায় অন্তত ৩ মাস লাগবে। আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হচ্ছে কি না। পাশ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কিনা। যদি টিকায় সমস্যা থাকে তবে তা আপগ্রেড করে কিন্তু আবারও শুরু করতে হবে। তৃতীয় ধাপে কার্যক্ষমতা যাচাই করা হয়। এজন্য অন্তত ১ হাজার মানুষের উপর প্রয়োগ করতে হয়। এ কাজটিও করতে অন্তত তিন মাস লাগবে। প্রতিক্ষেত্রেই সমস্যা আসতে পারে। সময় বহুগুণ লেগে যেতে পারে। এই তিনটি ধাপ অতিক্রম করতে পারলেই অনুমোদন দেয়া হয়। পৃথিবীতে করোনাভাইরাস প্রতিরোধের জন্য মাত্র ৩টি কোম্পানীর টিকা ৩টি ধাপই অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে।

তাহলে ভারত আর মাত্র ৩৯ দিনের মধ্যে কিভাবে ৫টি ধাপ (প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল ও অনুমোদনসহ) অতিক্রম করবে? তবুও তারা করবে অসম্ভব ও অবিশ্বাস্যভাবে। মোদীভক্ত অন্ধ মৌলবাদীগোষ্ঠী ঢাক বাজাচ্ছে, নৃত্য করছে। এর আগেও ভারত দাবী করেছিল তারা এইডস এর টিকা আবিষ্কার করেছে। একজন চিকিৎসক নিজের শরীরেই তা প্রয়োগ করে দেখিয়েছিল। কিন্তু হায় তার কোন কার্যকারীতা ছিল না। বাংলাদেশেও একজন কৃষিবিজ্ঞানী হঠাৎ করে জানান দিল তিনি করোনা প্রতিরোধে কার্যকরী পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। ইথানল বাষ্প সেবন করলেই করোনা থাকবে না। ইথানথ বাষ্প মাদকসেবীরা দীর্ঘদিন ধরে গ্রহণ করে আসছে। সেনিটাইজারে ডুবালে করোনা মারা যায়, সাবানে করোনাভাইরাস গলে যায়। তাই বলে কি ফুসফুস সাবান দিয়ে ধোয়া যাবে, বা সেনিটাইজার দিয়ে পরিষ্কার করা যাবে? এটা করতে গেলে আরো আগেই মরতে হবে। ওই কৃষিবিজ্ঞানীকে গ্রেফতারও করা হয়নি। ভারত বায়োটেক সম্ভবত মোদীর নির্দেশনা মোতাবেকই ঘোষণা দিবে কোন কোন ধাপ তারা অতিক্রম করেছে। শর্টকার্ট পদ্ধতিতে বিজ্ঞান চর্চা করে রাজনীতি করা যায়, মানুষ বাঁচানো যায় না।

এসব অবৈজ্ঞানিক পথে হেঁটে অপবিজ্ঞান দিয়ে ধাপ্পাবাজি করে হয়তো নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া যাবে। ভারত দাবী করে তারাই পৃথিবীর প্রথম শল্য চিকিৎসা করেছে (মহাকাব্যে গণেশের মাথা লাগানো) ও ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে (রামায়ন মহাকাব্যে রাবনের অগ্নিসেল, ব্রহ্মাস্ত্র নিক্ষেপ)। এসব হাস্যকর বয়ানে তারা লজ্জিত হয় না। মূর্খ সমর্থকরাই লাফালাফি করে।আমাদের রুপকথার গল্পেও রাজপুত্রের চোখ থেকে সূঁচ বের করার কথা রয়েছে। আমরা কি চক্ষু অপারেশনে পৃথিবীতে প্রথম দাবি করে বসবো! ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড করোনা টিকা আবিষ্কারের দাবি করেছে। স্কয়ার, বেক্সিমকো, একমি, অপসোনিন, ইনসেপটা, এসিআই, ওরিয়ন, রেনাটা, এসকায়েফ ইত্যাদি জানা কোম্পানীর মতো নাম নয় গ্লোব বায়োটেক। এমনকি বাংলাদেশের শীর্ষ ২০টি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকাতেও এর নাম নেই। একটি টিকা বা প্রতিষেধক সফলভাবে বের করে আনা বেশ জটিল কাজ। সাধারণত এর জন্য অনেক সময় ও অর্থ দরকার হয়। বৈশ্বিক ভ্যাকসিন বাজার চলতি বছরে ছয় হাজার কোটি ডলারে দাঁড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশের একটি অখ্যাত কোম্পানী টিকা বাজারে আনতে পারার সক্ষমতা রাখে কি?
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জুলাই, ২০২০ বিকাল ৩:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



