
একজন ইতালি প্রবাসী অব্যবস্থাপনায় চরম ক্ষুব্ধ হয়ে নিজ দেশকেই গালি দিয়েছিল, ‘ফ*ক ইউর কান্ট্রি সিস্টেম’। অথচ এই করোনা কালেও তিনি দেশে ফিরেছিলেন দেশের প্রতি গভীর ভালবাসা নিয়েই। প্রত্যেক প্রবাসীর হৃদয়েই গভীরভাবে থাকে বাংলাদেশ। সেই ইতালিই আবারো ১৬৭ জন বাংলাদেশিকে ঢুকতে দেয়নি এবং বাংলাদেশিদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ৩ মাসের জন্য। অনেকেই ইতালি প্রবাসিদের গালি দিচ্ছেন। বাস্তবিক দায়টা কার? কেন নিষেধাজ্ঞা জারি করলো? কার জঘণ্যতম অপরাধে তারা ঢুকতে পারলো না? এখন যদি আবারো কোন ইতালি প্রবাসী গালি দেয় তবে তাকে কিভাবে কাঠগড়ায় তুলবো?
জেকেজির আরিফ চৌধুরী, রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক মোহাম্মদ সহিদ ও ঢাকা সেন্ট্রাল ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের চেয়ারম্যান ও লেক্সিকোন মার্চেন্ডাইজ ও টেকনোক্র্যাট লিমিটেডের মালিক মো. মোতাজ্জেরুল ইসলাম মিঠু যা করেছে তা কি শুধুই বিচ্ছিন্ন ঘটনা? তারা কি গোপনে এসব করেছেন? তাদের সাথে কি রাঘব বোয়ালরা জড়িয়ে নেই? এগুলো যে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় তা হলফ করেই বলা যায়। এদের সাথে শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিবিদ, প্রশাসনের লোক ও সাংবাদিকরাও জড়িত রয়েছেন। এক মিঠুই দীর্ঘদিন ধরে হাজার হাজার কোটি টাকার অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও যন্ত্র সরবরাহ করেছে হাসপাতালগুলোতে। তার পাঠানো যন্ত্রগুলো বহু হাসপাতালই খুলেও দেখেনি। বহু বাক্সেই কিছু পাওয়া যায়নি। বহু বাক্সেও বাতিল ও অচল যন্ত্রাংশ ছিল। এগুলো পাঠাতে ভূতপ্রেতরা ওয়ার্ক অর্ডার দেয়নি, বিল পরিশোধ এমনিতেই হয়নি। এর নেপথ্যে থাকা কারো বিরুদ্ধে কি কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? এখন প্রবাসীদের কে বিপদে ফেললো? তাঁর সাধের দেশইতো! আরিফ চৌধুরী ও মোহাম্মদ সহিদ কি করেছে? করোনাভাইরাস সংক্রমিণের আশঙ্কায় যারা পরীক্ষা করাতে এসেছে তাদের কাছ থেকে নমুনা নিয়ে তারা ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে। রিপোর্টের বিপরীতে টাকা নিয়েছে আবার সরকারের কাছেও দাবি করেছে। ইচ্ছামতো রিপোর্ট দেয়াতে যে প্রকৃত আক্রান্ত সে আক্রান্ত নয় ভেবে ঘুরে বেড়িয়েছে মনের সুখে আর যে আক্রান্ত নয় সে মনের কষ্টে গৃহে কাটিয়েছে আইসোলেশনে। এখনো আরিফের স্ত্রী ও সহিদকে গ্রেফতার করা যায়নি। তাদের দিয়ে যারা কাজ করিয়েছে তাদেরও কিছু হয়নি, হবেও না। আরিফ ও সহিদের কারণেই ইতালির পত্রিকায় টাকা বিনিময়ে ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ইতালির সরকার পরীক্ষা করে দেখেছে বাংলাদেশ থেকে করোনা না থাকার সনদ নিয়ে যাওয়াদের করোনা রয়েছে। ফলে তারা বাংলাদেশিদের জন্য প্রবেশ বন্ধ করে দিয়েছে। একজন প্রবাসী যদি বলে ফ*ক ইউর কান্ট্রি সিস্টেম! সেটা বড় অপরাধ হয়ে যায় আর মিঠু-আরিফ-সহিদদের পৃষ্ঠপোষকরা থেকে যায় বহাল তবিয়তে সেটা?

যুব নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের কথা ভুলে গেছি। যাদের ছত্রছায়ায় সে জুয়ার আসর জমিয়ে বসেছিল তাদের কেউ কি গ্রেফতার হয়েছেন? তার সাঙ্গ-পাঙ্গরাই শত শত কোটি টাকার মালিক বনে গেছে। এনু-রুপন দুই ভাই-ই ১২০টি বাড়ির মালিক, বাড়িতে নগদই পাওয়া গেছে ২৭ কোটি টাকা! বিভিন্ন ব্যাংকে আরো অনেক। তিনি যাদের ভাগ দিতেন তাদের মধ্যে কে গ্রেফতার হয়েছেন? মাঝখান থেকে ক্লাবগুলোকে শেষ করে দিয়েছেন। ওখানে ফুটবল-ক্রিকেটের পরিবর্তে জাকিয়ে বসেছিল জুয়া খেলা।
নরসিংদীর মহিলা নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া ওরফে পিউর কথাও ভুলে গেছি। ওয়েস্টিন হোটেলে তিনি গড়ে তুলেছিলেন রঙমহল। হোটেল বিল দিতেন কোটি টাকা। সেখানে সমাজের বহু দেবতারা গিয়ে উর্বশীদের নিয়ে ফূর্তিফার্তি করে আসতেন। পিউ শুধু বাংলাদেশি সুন্দরীই নয়, রাশিয়ার ভদকার সাথে ডজনখানেক সুন্দরীও নিয়ে আসতেন রংমহলে। আমরা ভুলে গেছি যে, পিউর পৃষ্ঠপোষক কাউকেই জবাবদিহি করতে হয়নি। উল্টো কয়েকজন সাংবাদিক কিছু বিষয় প্রকাশ করায় জেল খাটছেন।

কয়েকটি ব্যাংককাণ্ডও আমরা ভুলে গেছি। ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যানসিয়াল সার্ভিসেস নামটি দেখুন নতুনই লাগছে। প্রশান্ত হালদারের কথা মনে আছে? তিনি একাই সরিয়েছেন দেড় হাজার কোটির টাকারও বেশি! হলমার্ক এর কথা তুললে কেউ বলবেন, রাবিশ! বোগাস! অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্ট ও থারমেক্স গ্রুপ এর ১১ হাজার কোটি টাকার কথা, বেসিক ব্যাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকার কথা, বিসমিল্লাহ গ্রুপ, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, ফারমার্স ব্যাংক …।
সাংবাদিক দম্পত্তি সাগর-রুণি, নারায়ণগঞ্জের কিশোর তানভীর মোহাম্মদ ত্বকী, কুমিল্লার সোহাগী জাহান তনু- মন খারাপ করা নামগুলো উঠিয়ে আনতে হয়। দেশের বাইরে থাকা লোকগুলো বলতে পারে ফ*ক, ফ*ক, ফ*ক! পিরোজপুরের একটি মামলার রায় কিভাবে উল্টে গেল?!আগে শুনতাম- হাকিম নড়ে তবু হুকুম নড়ে না। সেখানে দেখলাম হুকুমের সাথে হাকিম নিজেও নড়ে গেল। ভুলে গেছি সবাই! ওই যে- বিচারক নেতাকে জামিন দিলেন না। সাথে সাথেই সড়ক অবরোধ, বিচারকের বদলি এবং নতুন দায়িত্ব নিয়েই জামিন মঞ্জুর! ভুয়া টেন্ডারের নায়ক জি কে শামীমও গোপনে জামিন পেয়ে গিয়েছিলেন। আরো মামলা থাকায় রক্ষা। এতো ঘটনা কি মনে থাকে! কতো আর মনে রাখা যায়! তার উপরে বালিশ কেলেঙ্কারির মতো তুচ্ছ ঘটনা কে মনে রাখে? মনে রাখলেই মহা বিপদ! কে কি পোস্ট দিয়ে বসবো, কার অনুভূতিতে কিভাবে আঘাত লাগবে আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে জামিন না পেয়ে জেলে কাটাবেন তা বলা মুশকিল। তাই কম জানাই ভাল ও নিরাপদ। যত বেশি জানে/তত কম মানে!

আবারো জানার কথা চলে আসলো। অধিকাংশ র্যাং কিং এ বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থাকে না। এশিয়ার একটি তালিকায় ৪১৭ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চীনের ৭২টি, ভারতের ৪৯টি, তাইওয়ানের ৩২টি, পাকিস্তানের ৯টি, হংকংয়ের ৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আছে তালিকায়। নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার বিশ্ববিদ্যালয় সেরার তালিকায় স্থান পেলেও, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কেনো স্থান পায়নি। পৃথিবীর হিসেবে একটি র্যাং কিং এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটকে ৮০১-১০০০ এর মধ্যে রয়েছে। অধিক বিষয় নিয়ে জরিপ করাদের তালিকার ৫ হাজারের মধ্যেও বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। শিক্ষার মান নিয়ে কথা বলা ঝুঁকিপূর্ণ। কার অনুভূতিতে আঘাত লাগবে আর কে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করে দিবে বলা মুশকিল।
এসব মিলিয়ে যখন ক্ষোভে-দুঃখে একজন প্রবাসী, বিদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক সুবিধার কথা তুলনা করে গালি দিয়েই ফেলে তাতে তাকে দোষ দেয়া যায় না। I F*CK YOUR COUNTRY SYSTEM বলে বুকভরা ব্যথা ও যন্ত্রণা নিয়ে ক্ষোভে গালি দেয়াই দেশপ্রেম। যারা এসব অরাজকতা মেনে নিয়ে, এই সিস্টেমে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়িয়ে নিয়েছেন তার পক্ষে এমন গালি দেয়া সম্ভব নয়। ওই গালির অর্থ হল- আমরা এমন সিস্টেম চাই না, এমন সিস্টেমমুক্ত সোনার বাংলাদেশ দেখতে চাই। বিদেশে গিয়ে গর্বের সাথে বলতে চায়, আমি বাংলাদেশি!
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জুলাই, ২০২০ সকাল ১০:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



