
ভল্টারেন একদা খুবই জনপ্রিয় ব্যথার ওষুধ ছিল। ব্যথা একটি রোগের উপসর্গ হিসাবে ধরা হয়। বাতের ব্যথা, কোমরে ব্যথা, মাথা ব্যথা, গিটেগিটে ব্যথা- সব ব্যথাই অনুভূত হয় মস্তিষ্কে। এই অনুভূতি বয়ে নিয়ে যায় স্নায়ুতন্ত্র। হাড় ক্ষয়, রক্ত নালির সমস্যা, স্নায়ুবিক সমস্যার কারণে স্থায়ী ব্যথা অনুভূত হয়।জিনেটিক বা মানসিক কারণেও ব্যথার সমস্যা তৈরি হয়।একটা ভল্টারেনের দাম ছিল ৫ টাকা। তীব্র যে কোন ব্যথা হলেই মানুষ ভল্টারেন খেত ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়াই। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে ৫১টি ওষুধ নিষিদ্ধ করা হয়। যদিও ওগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে আগেই নিষিদ্ধ হয়েছিল। এর কারণ- ওই ওষুধগুলোর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ছিল মারাত্মক।ওখানে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধও ছিল। ২০০৯ সালের জুলাই মাসে ‘রিড ফার্মা’ নামের একটি ঔষধ কোম্পানীর প্যারাসিটামল সিরাপ খেয়ে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ২৭টি শিশু মারা গিয়েছিল বাংলাদেশেই। হয়তো মৃত্যু আরো অনেক বেশিই ছিল। ডাক্তারগণ বলেন, আপনার যদি নন-স্টেরয়েডাল অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি ড্রাগস এর অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া থাকে তবে আপনার ভল্টারেন ব্যবহার করা উচিত নয়। ভোল্টারেন আপনার মারাত্মক হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে । গর্ভাবস্থার শেষ ৩ মাস ভোল্টেরেন গ্রহণ অনাগত সন্তানের ক্ষতি করতে পারে। এখন আর ভল্টারেনের সেই জনপ্রিয়তা নেই।
থ্যালিডোমাইড নামের ভয়ঙ্কর এক ওষুধের কথা অনেকেই জানেন। ১৯৫৪ সালে আবিষ্কারের পরে ব্যথানাশক ওষুধ হিসেবে খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ ঘুম হয় না কিংবা দুশ্চিন্তায় ভুগছে- এমন রোগীদেরকেও এই ওষুধ দিতে শুরু করে। প্রসূতি মায়েদের মর্নিং সিকনেস এবং বিভিন্ন ব্যথার জন্য জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ৬৫টি ব্র্যান্ড বা কোম্পানির হাত ধরে ৪৬টা দেশে ঝড়ের গতিতে প্রসারিত হয় এই ওষুধ। এরপরেই আসতে থাকে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার খবর। এই ওষুধ যেসকল মায়েরা খেয়েছে তাদের বিকলাঙ্গ সন্তান জন্ম হতে থাকে। প্রভাবশালী ওষুধ কোম্পানী এসব রিপোর্টকে ধামাচায় দিতে থাকে। সরকারি অনুসন্ধানে দেখা যায় ১০ হাজার বিকলাঙ্ক শিশু জন্মগ্রহণ করেছে আর ১ লক্ষ ২৩ হাজার শিশু জন্মের আগেই মারা গিয়েছে। বাস্তবে এই সংখ্যা ছিল আরো অনেক বেশি। একটা ওষুধ কোম্পানীর লোভে কি ভয়াবহ বিপর্যয়ই না নিয়ে এসেছিল পৃথিবীতে।
ধরুন একটি দুর্বল কোম্পানী ঠিকমতো পরীক্ষা নিরীক্ষা না করেই করোনাভাইরাসের ওষুধ বাজারে ছেড়ে দিল। যদি সেই ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় পুরুষের শুক্রাণু উৎপাদন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায় তবে কি হতে পারে। আপনার হাসি পেতেই পারে। বাস্তবতা হল- বাংলাদেশ বিরান হয়ে যাবে ৫০-৬০ বছরের মধ্যেই। ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় কিডনি, চোখ, হার্ট ইত্যাদি বিকল হয়ে যেতে পারে। শ্রীনগরের একজন প্রধান শিক্ষক মু. জাহাঙ্গীর খান সেবন করা একটি ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা জানতে পারেন বাধ্য হয়ে দেশের বাইরে চিকিৎসা করাতে গিয়ে।
এতো পরীক্ষা করতে হয় কেন? মানুষের সাইকোলজি সহজ নয়। আমাদের বিক্রমপুরে চন্দনদুল এলাকায় এক ভণ্ডপীর কিছু পরিকল্পিত অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শন করে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। প্রতিদিন ২০/৩০ হাজার লোকও জড়ো হতো। শেষে মাইকে ফু দেয়া শুরু করেন। তিনি শুধু আগতদের কাছ থেকে প্রাপ্ত মোমবাতি ও আগরবাতি বিক্রি করেই ঢাকায় বাড়ি করে ফেলেন। আমার এক সহকর্মীর মায়ের ৩০ বছরের গ্যাস্ট্রিক ব্যথা। তার মা মাইকে ফু দেয়া পানি পড়া খেয়ে ঘোষণা দিলেন তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ। মাস খানেক পরে খবর নিয়ে জানলাম আবারো তার গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা ফিরে এসেছে। যদি সহকর্মীর মায়ের উপরই পরীক্ষা করে দ্রুত ওষুধের ছাড়পত্র দেয়া হতো তাহলে কিন্তু চন্দনদুলের পীরের পানি পড়াই হতো গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা নিরসরেনর ওষুধ। এজন্যই পরীক্ষার সময় যাদের উপর ওষুধ প্রয়োগ করা হয় তাদের জানানো হয় না কাদের উপর নির্ভেজাল পানি আর কাদের উপর কি পরিমাণ ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছে।
চোখের ডাক্তার দেখাতে গিয়ে আমার দুই বন্ধুর দুটি সমস্যার আজব সমাধান পেলাম। এক বন্ধুর চোখের পাওয়ারে কোন সমস্যা নেই, ছানি নেই কিন্তু তার দেখতে সমস্যা হচ্ছে। ডাক্তার সাইকোলজিক্যাল সমস্যার কথাই বললেন। পাওয়ার ছাড়া চশমা পড়েই আমার বন্ধুটি উপকৃত হয়েছেন। আরেক বন্ধুর ক্ষেত্রে- ডাক্তার বললেন, আপনার পারিবারিক অশান্তি রয়েছে। সেটা দূর করুন এ সমস্যা থাকবে না। আমার দ্বিতীয় বন্ধুও পেরেছেন। আমার পরিবারের একজনের ব্যথা ছিল। একজন বিখ্যাত চিকিৎসক জানিয়েছিলেন এই ব্যথাটা মানসিক! আমাদের ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল- তিনি ওষুধ কম দেন। আমার স্ত্রীর বড় ভাই ডা. আশরাফুল আলম আইইডিসিআর এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ওষুধ খাওয়াকে খুবই নিরুৎসাহিত করেন। শরীরের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেই বেশি গুরুত্ব দেন। কারণ কিন্তু ওই ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। ঘুম হয় না- ব্যায়াম করো/ দ্রুত হাঁটো ৪০ মিনিট/ কায়িক পরিশ্রম করো ও দুঃশ্চিন্তা দূর করো- ঘুম আসবে? তিনি ভাল একটি প্রশ্ন করেন- ঘুম না আসলে কি করো? অবশ্যই কিছু ভাব তা কি?
ডা. কদম আলী (ডিগ্রি নাই) এর কথা মনে আছে আমাদের। একটি বাংলাদেশের সিনেমায় এটিএম শামসুজজামান অভিনয় করেছিলেন। তিনি বলতেন, ‘আমার ওষুধে কেউ ভালও হয় না কেউ খারাপও হয় না মাঝখান থেকে আমার সংসার চলে যায়’। কোন উপাদান ছিল না বলেই অন্তত ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতো না।কিন্তু প্রকৃত ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে। সেই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মাত্রা কমিয়ে আনতে হয় আবার ওষুধকে সর্বোচ্চ কার্যকরীও করতে হয়। এজন্যই দীর্ঘ সময় দরকার। দীর্ঘসময়টাই কল্যাণকর। আবার যখন বিপুল সংখ্যক রোগী মারা যেতে থাকে তখন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াকে কি হিসেবে না আনা উচিৎ? এইডস এর ক্ষেত্রে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে থাকা রোগীকে এমন ওষুধ প্রয়োগের ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু করোনার ক্ষেত্রে রোগীর বেঁচে উঠার সম্ভাবনা সবসময়ই থাকে।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০২০ বিকাল ৫:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



