
মেছে আমরা তিন জন থাকতাম। অপর দুজনই হিন্দু সম্প্রদায়ের এবং ধর্মান্ধ। তাদের মধ্যে সদ্ভাব একেবারেই ছিল না। একজন বরিশালের, তিনি কোন আধ্যাত্মিক বাবার অনুসারী। তার নির্দেশে বোতলে রেখে পানি পড়া খান। পানি কমে আসলে আবার বোতল ভরে রাখেন। দ্বিতীয় জন বিক্রমপুরের। একদিন তিনি ভরা বোতলের সব পানি ফেলে দিয়ে কিছুটা হিসু করে আরো পানি দিয়ে ভরে দেন। বরিশালের লোকটি সেই হিসু করা পানিই খাচ্ছে। একদিন জানতে চাইলাম দাদা এই পড়াপানি খেলে কি হয়? তিনি বললেন, ‘খুব জোর পাই, মনে হয় বাবা সাথে আছেন’। ওনি টিউশনী করতেন আর দীর্ঘদিন চেষ্টা করছিলেন বি.এ পাশ করতে। তার পরিবারে ছিল বিভিন্ন রকম সমস্যা, ওনার নিজেরও সমস্যা পিছু ছাড়ে না; কিন্তু হিসুকরা পড়া পানি খাওয়া ছাড়েন নি। কেন এমন অন্ধ বিশ্বাস তৈরি হয়?
পিঁপড়াদের দুটি ঘটনা পড়েছিলাম-
১। পিঁপড়ারা যখন কোন বড় কিছু দলবদ্ধভাবে টেনে নেয় তখন তারা সব একদিকে টানে না। ধরা যাক একটি বস্তুকে ২৫টি পিঁপড়া টানছে। পশ্চিম দিকে টানছে ৫ টি, দক্ষিনে ৫ টি, উত্তরে ৫টি আর পূর্ব দিকে ১০ টি। এই টানাটানির মধ্যেও বস্তুটি পূর্বদিকে ধীরে ধীরে চলতে থাকবে। অনেক সময় আমরা দেখি- কোন পিঁপড়া বস্তুকে কামড়ে ধরে এর উপরে উঠে গেছে। অন্যটি ওই কামড়ে থাকা পিঁপড়াসহই টেনে নিয়ে যায়। সব পিঁপড়ার মধ্যেই একটা বিশ্বাস থাকে বস্তুটি তার দিকেই যাচ্ছে।

২। পিঁপড়ারা বাসায় ফেরার জন্য যাওয়ার পথে একরকম তরল নির্গত করে যায়। যা শুকে তারা কলোনীতে ফিরে আসে। কোন কারণে যদি এই গন্ধ নষ্ট হয়ে যায় তারা আর পথ খুঁজে পায় না। তখন এক প্রজাতির পিঁপড়া বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে। তারা ভাবে এভাবেই তারা পৌঁছে যাবে তাদের কলোনীতে। কিন্তু হায় তারা কখনোই তাদের কলোনীতে পৌঁছতে পারে না এবং অনাহারে ও অন্যান্য কারণে মরে যেতে থাকে।
অন্ধ বিশ্বাস এমনই ভয়ঙ্কর হয়। একজন লেখকের সাথে পরিচয় হয়েছে। তিনি ৫০ টির মতো বই লিখেছেন। লেখার মান খুবই দুর্বল। তিনি অহঙ্কার নিয়েই বললেন, ‘তিনি কোন বই পড়েন না। তার বিশ্বাস অন্যের লেখা বই পড়লে তার স্বকীয়তা নষ্ট হয়ে যাবে’। তার মধ্যেও একটি অন্ধ বিশ্বাস কাজ করে যে, তিনি খুবই গুরুত্বপূর্ণ লেখক এবং বহু মানুষই তার অনুরাগী। বাস্তবিক মানুষ তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। এমন মানুষ অনেকই আছে যারা কোন বই পড়তে চান না এই ভয়ে যে, এতে তাদের বিশ্বাস দুর্বল হয়ে যেতে পারে। উচ্চ শিক্ষা নেয়ার পরেও এ কারণে তারা পাঠ্য-চাকরির জন্য পড়া ছাড়া একটি বইও সারা জীবনে পড়েন না। কিছু বোকা মেয়ে আছে যারা কোন ছেলেকে এতোটাই অন্ধভাবে বিশ্বাস করে যে, তাদের সম্পর্কে কোন খোঁজই নিতে চান না। সেই অন্ধবিশ্বাসও অবশ্য ভাঙ্গে যখন চোখ খুলে সব দেখতে পায় মেয়েটি। দাড় কাকদের একটি গল্প শুনেছিলাম- তারা নাকি চোখ বন্ধ করে খাবার লুকিয়ে রাখে এই ধারণায় যে, তাতে অন্যরাও দেখবে না। পরে দাড় কাক নিজেরাও আর ওই খাবার খুঁজে পায় না অনেক সময়।

একবার জোর করে যদি চোখ খুলে দেয়া যায় তাদের। চাকরি থাকবে না ভয় দেখিয়ে যদি ৫০ টি বই পড়িয়ে দেয়া যায়। কিংবা যদি প্রতি ক্লাসে সৃজনশীল ১০ টি করে বই পড়া বাধ্যতামূলক করে দেয়া হয়। কি হবে? মানুষ কি বদলাবে? পরিবার ও সমাজ থেকে প্রাপ্ত ভাবাদর্শ কি বদলাবে? অবশ্যই বদলাবে এবং তার ভিতরে থাকা অন্ধকার দূর হয়ে আলো প্রবেশ করবে এবং অন্ধ বিশ্বাস দূরে ঠেলে তিনিও আলোকিত হয়ে উঠবেন।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুলাই, ২০২০ রাত ৮:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



