
রাম যেকোন মহাকাব্য বা উপন্যাসের হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তিনি যোদ্ধা, স্বয়ম্বরা সভা থেকে বিজয়ী হয়েই সীতাকে জয় করে আনেন। সৎমায়ের ষড়যন্ত্রে পিতা যখন বনবাসে পাঠায় তখনও পিত্রাজ্ঞাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। রাবন যখন বোনের অসম্মান আর ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ নিতে কৌশলে সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে যায় সেখানেও তিনি সীতাকে উদ্ধার করে বীরত্ব দেখান। দক্ষিণি সিনেমার চেয়েও শক্তিশালী, কৌশলী। তবে দেবতা হিসেবে তিনি কি ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে ছিলেন? না মানবিক ভুলকেই বাল্মীকি গুরুত্ব দিয়েছিলেন? সত্য ও দ্বাপর যুগের পরে আসে ত্রেতা যুগ। ত্রেতা যুগে রাম ১১ হাজার বছর রাজত্ব করেন! রাম রাজত্বে রামকে আমরা তার কর্মেই খুঁজে দেখবো।

১। রামের প্রতিনিধি হিসেবে ভরত তখন রামের পাদুকা সিংহাসনে রেখে রাজ্য শাসন করছেন। রাম তখনও বনবাসে। সীতাকে অপহরণ করেছে রাবন। রাম সুগ্রীবের সাথে চুক্তি করলেন- বালীকে বধ করে সুগ্রীবকে কিস্কিন্ধ্যার রাজা করবেন আর সুগ্রীবের স্ত্রীকেও ফিরিয়ে এনে দিবেন। বিনিময়ে বানর সৈন্য দিয়ে সীতাকে উদ্ধারে সুগ্রীব সহযোগিতা করবেন। রাম কৌশলে সুগ্রীবকে বালীর সংগে মল্লযুদ্ধে লাগিয়ে দিলেন। বালীর বর ছিল সামনা থেকে কেউ তাকে হত্যা করতে পারবে না। রাম পেছন থেকে বালীকে হত্যা করলেন। মৃত্যুশয্যায় বালী রামকে দুরাত্মা, অধার্মিক, ক্ষত্রিয়ধর্ম বিরোধী এবং পাপী বলে গালি দিলেন। প্রতিউত্তরে রাম বললেন, ‘ভরত পৃথিবীর রাজা। আমরা তার আদেশে ধর্মবৃদ্ধির অভিলাষে সমগ্র ভূমণ্ডল পর্যটন করছি এবং তোমার মতো অধার্মিককে দণ্ড করছি।
ব্যাখ্যা: বালীর সাথে রামের কোন দ্বন্দ্ব ছিল না। বালীকে অন্যায়ভাবেই হত্যা করা হয়েছে। আমার তিনি ভরতের আদেশেও হত্যা করেননি অথচ সেটাই দাবী করছেন।

২। রাম বনবাসের আগে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তিনি ফলমূল খেয়েই জীবন ধারন করবেন। বনে তারা কুটির নির্মাণ করে থাকতেন। বিভিন্ন পশু শিকার করে ক্ষুধা নিবারণ করতেন। সীতার সতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তাকে অগ্নিপরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। সীতা অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে রাম অগ্নির কাছে প্রতিজ্ঞা করেন, কীর্তি যেমন মানুষের অত্যাজ্য তেমনি সীতাও আমার অপরিত্যাজ্য। অযোধ্যায় ফিরে আসার পরে সীতার গর্ভলক্ষণ দেখে এক সভাসদের কাছে জানতে চায়, সীতার সতিত্ব নিয়ে প্রজারা কি বলে? প্রজাদের একাংশ সীতার বিরুদ্ধে বললে তিনি সীতাকে পরিত্যাগ করে। লক্ষণকে দিয়ে তপোবনে সীতাকে ছেড়ে দিয়ে আসে। রাম তার আর খোঁজ নেননি। বহু বছর পরে যখন জানলেন সীতা বাল্মীকির আশ্রমে জীবিত আছেন। সীতাকে আবারো পরীক্ষার আহ্বান জানালে সীতা ধরণীকে বিদীর্ণ হতে বলেন এবং নিজে পাতালে প্রবেশ করেন।
ব্যাখ্যা: মাংস না খাওয়ার প্রতিজ্ঞা তিনি রক্ষা করতে পারেন নি। সীতার সতিত্ব নিশ্চিত জেনেও তাকে অসম্মান করেছেন আবার পরিত্যাগ না করার প্রতিজ্ঞা করেও পরিত্যাগ করেছেন।
৩। বিশ্বামিত্র তাড়কাবধের জন্য দশরথের কাছ থেকে কিশোর রাম ও লক্ষণকে নিয়ে গেলেন। তখন আর্য সমাজে স্ত্রীবধ রীতি বিরুদ্ধ ছিল। তাড়কা তপোবনে ব্রাহ্মণদের যাগযজ্ঞে নানা প্রকার বিঘ্ন সৃষ্টি করতো বলে তাকে হত্যা করলেন। রাম দুষ্কর্ম দমনের জন্য পুষ্পক রথে চড়ে অন্বেষণ করতে করতে দেখলেন, এক তাপস বৃক্ষে লম্বমান হয়ে অতি কঠোর তপস্যা করছে। রাম তাকে জ্ঞিাসা করলেন তুমি ব্রাহ্মণ না ক্ষত্রিয়, বৈশ্য না শূদ্র? সত্যবাদী তাপস শম্বুক উত্তর দিলেন, তিনি শূদ্রযোনিতে জন্মেছেন এবং সশরীরে দেবত্ব লাভের ইচ্ছায় কঠোর তপস্যা করছেন। শূদ্রের পক্ষে তপস্যা করা গুরুতর অপরাধ। তাই রাম শম্বুকের শিরচ্ছেদ করলেন।
ব্যাখ্যা: নারী ও শূদ্রকে হত্যা করা হয়েছে যারা রামের কোন ক্ষতি করেনি। তাড়কাকে রাক্ষসী বলা হয়েছে। তবুও নারীকে হত্যা ও শূদ্রকে তপস্যা করার অপরাধে হত্যা করা মানানসই নয়।
ইলিয়াড ও ওডেসির অলৌকতা ও দেবতাদের কুটিলতা দেখে আমরা মিলিয়ে নিতে পারি। বাল্মিকী রামায়ণে যে রামকে সৃষ্টি করেছেন তার মধ্যে যেমন সাধুতা রয়েছে তেমনি ভুলত্রুটিও রয়েছে। মহাকাব্য বলেই মানুষের ভিতরের ভাল ও মন্দকে তুলে আনতে পেরেছেন। এমনটা অন্য চরিত্রগুলো সম্পর্কেও বলা সম্ভব।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই আগস্ট, ২০২০ রাত ১০:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



