
গত শতকের ষাটের দশকে মৌলবাদী দল ও সংগঠনগুলো সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুরু করেছিল। প্রকৃত পক্ষে হিন্দুদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ এবং মহাকাব্যগুলিতে গোহত্যা কিংবা গোমাংস খাবার বিরুদ্ধে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। প্রকৃত ঘটনা প্রাচীন বৈদিক যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত গরুর মাংস খাওয়া ভারতবর্ষে বহুল প্রচলিত ছিল।
হিন্দু শাস্ত্রের কিছু উদাহরণ তুলে দেই জয়ন্তানুজ বন্দোপাধ্যায়ের ‘মহাকাব্য ও মৌলবাদ’ গ্রন্থের ১৬৪ ও ১৬৫ পৃষ্ঠা থেকে-
ঋগ্বেদ সংহিতায় অগ্নি কাছে প্রার্থনায় ‘গাভীদের খণ্ড খণ্ড করে ছেদন’ করবার উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যত্র ইন্দ্রের কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে, ‘তুমি আমার জন্যে পনের-কুড়িটি বৃষ রান্না করে দাও, আমি তা খেয়ে আমার উদরের দুদিক পূর্ণ করি, আমার আমার শরীর স্থূল করি।’ইন্দ্রের কাছেই প্রার্থনায় আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘গোহত্যাস্থানে যেমন গরুরা হত হয়, আমাদের শত্রু রাক্ষসেরা তেমনি যেন তোমার অস্ত্রের দ্বারা নিহত হয়ে পৃথিবীতে শয়ন করে।’ অগ্নির কাছে প্রার্থনায় বলদ, ষাঁড় এবং দুগ্ধহীনা গাভী বলিদানের উল্লেখ আছে। ঋগ্বেদ সংহিতার সুপ্রসিদ্ধ বিবাহসূক্তে কন্যার বিবাহ উপলক্ষে সমাগত অতিথি-অভ্যাগতদের গোমাংস পরিবেশনের জন্য একাধিক গরু বলি দেবার বিধান আছে।

অর্থববেদ সংহিতায় একই বিধান আছে। তাছাড়া ঘোড়ার মাংস এবং মোষের মাংস খাবার উদাহরণ ঋগ্বেদে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে।
শতপথ ব্রাহ্মণে ঋষি যাজ্ঞবল্ক্যের অনুশাসন উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে গরুর মাংস যদি নরম হয় তবে তা খাওয়া যেতে পারে।
তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে শুধু যে গোহত্যার নির্দেশ দেয়া হয়েছে তাই নয়, কোন দেবতার কাছে কি ধরনের গরু বলি দিতে হবে তাও বিধিবদ্ধ করা হয়েছে। বিষ্ণুর জন্য ছোট ষাঁড়, ইন্দ্রের জন্যে বাঁকা শিংযুক্ত বলদ, পূষনের জন্য কালো গরু এবং রুদ্রের জন্য লাল গরু বলি দেবার বিধান দেয়া হয়েছে।
বৃহদারণ্যক উপনিষদের একটি শ্লোক: কোন ব্যক্তি যদি এমন পুত্র লাভে উচ্ছুক হন, যে পুত্র হবে প্রসিদ্ধ পণ্ডিত, সভাসমিতিতে আদৃত, যার বক্তব্য শ্রুতিসুখকর, যে সর্ববেদে পারদর্শী এবং দীর্ঘায়ু, তবে তিনি যেন বাছুর অথবা বড় বৃষের মাংসের সংগে ঘি দিয়ে ভাত রান্ন করে নিজের স্ত্রীর সংগে আহার করেন। বৃষমাংস বিরিয়ানীর মতো রান্না করে রখেতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বৈদিক সাহিত্যের অন্তর্গত গৃহ্যসূত্রগুলিতেও গরুবলি এবং গোমাংস ভক্ষণের সুস্পষ্ট নির্দেশ আছে। অধিকাংশ গৃহ্যসূত্রে ব্রাহ্মণ, আচার্য, জামাতা, রাজা, স্নাতক, গৃহসে'র প্রিয় অতিথি অথবা যে কোন অতিথির জন্যেই মধুপর্ক অনুষ্ঠানের বিধান আছে। আর সেই অনুষ্ঠানে গোমাংস পরিবেশন করাই ছিল সাধারণ বিধান ও রীতি। এই লোকাচার এমন ব্যাপক ও বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্রের বিধান অনুযায়ী বাড়িতে অতিথি এলে গরুদের বাঁচাবার জন্য ছেড়ে দেয়া হতো যাতে অতিথিরা মনে করে যে, বাড়িতে গরু নেই। রুদ্রের উদ্দেশ্যে বৃষ বলি দেবার এবং সে বলির মাংস ভক্ষণ করবার সুস্পষ্ট এবং বিস্তারিত বিধান দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে যে, এভাবে বৃষমাংস ভক্ষণ করলে নানাভাবে ভাগ্যেদয় হবে। বিত্ত, জমি, পবিত্রতা, পুত্র, গবাদি পশু, দীর্ঘ আয়ু এবং ঐশ্বর্য লাভ হবে। একই রকম বিধান আছে, আপস্তম্ভ গৃহ্যসূত্র, পারস্কর গৃহ্যসূত্র এবং হিরণ্যকেশী গৃহ্যসূত্রতে। হিরণ্যকেশী গৃহ্যসূত্রে গরু বলি দিয়ে সে মাংস রোস্ট করে ঘি এবং ভাতের সংগে মিশিয়ে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের উৎসর্গ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
আরো অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।
তাহলে ভারতের নাগরিকগণ গরু খাওয়া বাদ দিলো কেনো?
স্পষ্ট কারণ রয়েছে। অতিরিক্ত গরু ভক্ষণের ফলে ভারতে গরু অতিমাত্রায় কমে যায়। এতে দুধ উৎপাদন ও কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যহত হয়। এ থেকে নিষ্কৃতিলাভের জন্যই গোহত্যা নিষিদ্ধ করে সেটাকে ধর্মীয় বিধান হিসাবে চালিয়ে দেয়া হয়। মানুষ হয়তো সাধারণ নির্দেশ মানতো না কিন্তু ধর্মীয় নির্দেশ মনে করে তারা মেনে নেয়।
বি.দ্র.: জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম জীবনে আইএস অফিসার ছিলেন। আমেরিকান ইউনিভার্সিটি, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আজীবন এমেরিটাস অধ্যাপক। তাঁর কোন বই বাংলাদেশে বা ভারতে নিষিদ্ধ নয়।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই আগস্ট, ২০২০ রাত ৮:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



