
ভারত ভাগের কারণ কি?
কোটি কোটি মানুষকে কেন বাস্তুভিটা ছাড়তে হল?
কেন দাঙ্গায় হাজার হাজার মানুষ খুন হয়?
সকল প্রশ্নের উত্তর একটিই- ‘ধর্মীয় বিদ্বেষ, হিংষা ও ঘৃণা’।
এই ঘৃণা, হিংষা, বিদ্বেষের উৎস কি? উত্তর কি হবে? ধর্মীয় গ্রন্থ!
মহাভারত ও রামায়ণের মহাকাব্যিক কল্পকাহিনীতে থাকা যুদ্ধ, হিংষা, বিদ্বেষ এর কি দায় আছে? গবেষকগণ যতই বলুক- এগুলো মহাকাব্য, কল্পকাহিনী। কিন্তু তাতে মৌলবাদী শক্তি থামেনি। তারা এগুলোকে ঐতিহাসিক সত্য বলেই মনে করে আসছে। সেই হিংষা, বিদ্বেষকেই শক্তি হিসেবে নিয়ে তার প্রয়োগ ঘটাচ্ছে। বিশেষ করে রামায়ণের চরিত্র ও স্থানগুলোকে সত্য ধরেই ভারতের ধর্মান্ধ মানুষ রামরাজ্য প্রতিষ্ঠায় দীর্ঘদিন ধরেই তৎপর রয়েছে। অযোধ্যায় রাম জন্মগ্রহণ করেছিলেন তাই সেখানকার বাবরি মসজিদকে ধ্বংস করে রাম মন্দির নির্মাণ করতেই হবে। ভারতের আদালতও রায় দিল- আগে মন্দির ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়নি তবে মসজিদ সরিয়ে মন্দির নির্মাণ করতে হবে। ভারতের ইতিহাসে তালগাছবাদী তত্ত্বের চূড়ান্ত ব্যবহারিক প্রয়োগ দেখলাম।

মহাভারতের কৃষ্ণ জন্ম নিয়েছেন মথুরায়। সেখানে কৃষ্ণের জন্মস্থান চিহ্নিত করার সুযোগ না থাকলেও, মৌলবাদীরা ধরে নিয়েছে। যে কক্ষে কৃষ্ণের প্রকৃত পিতা ও মাতা কারারুদ্ধ ছিলেন তারও কক্ষ চিহ্নিত করে নিয়েছে ধর্মান্ধরা। তারা দাবী করছে কৃষ্ণের জন্ম ৭ হাজার বছর আগের। কোনরূপ প্রত্নপ্রমাণ ছাড়াই শুধু মহাভারতের কল্পকাহিনীর উপর ভিত্তি করেই তারা ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটাচ্ছেন। সাম্প্রতিক একটি দাবি দেখছি মথুরার একটি মসজিদকেও মন্দির বানানোর। বিজেপির আগামী অস্ত্র হতে পারে মথুরার মসজিদটিও।
তাহলে অযোধ্যার এই দীর্ঘ হানাহানি, মসজিদ ভেঙ্গে মন্দির বানানো, গোধরার মুসলিম হত্যা এর কারণ অবশ্যই রামায়ণ। আর মধুরার মসজিদ ভাঙ্গার যে দাবী উঠছে তার কারণ মহাভারত। রামায়ণ ও মহাভারত মহাকাব্যদুটি ধর্মগ্রন্থের মর্যাদা দেয়ায় এর ভিতর থেকে রস আস্বাদনের পরিবর্তে আস্বাদিত হচ্ছে হিংষা-বিদ্বেষ ও ঘৃণা। ভালবাসার ও ত্যাগের নজির থাকলেও গৃহিত হয়েছে হত্যা ও ধর্ষণ। দক্ষিণ এশিয়ায় যেখানে যে ধর্মের মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ সেখানেই তারা দানবের আচরণ করেছে, সংখ্যালঘুদের তাড়িয়ে তাদের জমি/ব্যবসা দখলে নিয়েছে, নারীদের ধর্ষণ করেছে, শিশু-নারী-বৃদ্ধসহ যাকে পেয়েছে তাকেই হত্যা করেছে বা ভয় দেখিয়েছে, নিপীড়ন করেছে।
পশ্চিম পাকিস্তানে ১৯৫১ সালেই হিন্দুদের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১.৬% আর পূর্ব পাকিস্তানে ২২%। ১৯৩১ সালে পূর্ববাংলায় হিন্দু ছিল ২৮% ভারত ভাগের আগের এক দাঙ্গাতেই হিন্দু কমে যায় ৬%। এরপর গত শতাব্দী ধরেই হিন্দুরা বাংলাদেশ ছেড়েছে ধারাবাহিক ভাবে। এই শতাব্দিতে এসেই আমরা দেখি হিন্দুদের দেশত্যাগ কমেছে। ১৯৯২ সালের অযোধ্যার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঢেউ লাগে বাংলাদেশে। ধর্মান্ধ জিহাদীদের দৌরাত্মা বেড়ে যায়। বাংলাদেশে ওই সময়ে হিন্দুদের উপর অধিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটে, দেশ ছাড়ার গতি বেড়ে যায়। যদি ভারতে আবারও মথুরার মসজিদ বা অন্যকোন ইস্যুতে মুসলিমদের ব্যাপক নিপীড়ন করা হয় তার ঢেউ আবারো আছড়ে পরতে পারে বাংলাদেশেও। মানুষকে বিজ্ঞানমনস্ক করতে না পারলে দক্ষিণ এশিয়ার আকাশ থেকে অন্ধকার মেঘ কাটবে না। ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তানের সুশিক্ষিত সচেতন ও অগ্রসর চিন্তার মানুষ কম নয়। তারা দেশ ছাড়ে কিন্তু দেশের মানুষকে এগিয়ে নিয়ে ধর্মান্ধতা ছাড়াতে ভূমিকা রাখে না। আজকের পৃথিবীতে চলতে হলে, টিকতে হলে বিজ্ঞানমনষ্ক হওয়া ছাড়া কোন বিকল্প নেই।
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে আগস্ট, ২০২০ দুপুর ২:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



