somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এক জোড়া জুতা এবং .........

১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৪ রাত ২:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছেলেটি প্রায় প্রতিদিনই মাঠে আসে । সূর্যি মামা যখন প্রায় হেলে পড়বে বলে ইশারার অপেক্ষায় থাকে মানে বিকেল বেলায় ঠিক এই পার্কেই প্রতিদিন এই ছেলেকে দেখা যায় । ছেঁড়া একটি গ্যাঞ্জি আর ময়লা একটি হাফ জিনসের প্যান্ট পড়া অবস্থায় । ছেলেটার বয়স আন্দাজ করলে বার কিংবা তের হবে । স্পষ্টই বুঝা যায় ছেলেটির মধ্যে এক আশ্চর্য মায়া কাজ করে । সহসা এই মায়া যেন কাছে টানে । ছেলেটির চোখ সবসময় একদিকেই বদ্ধ থাকে । আর এই জিনিসটাই অস্বাভাবিক । এলাকার ছেলে-ছোকরারা এই পার্কের মাঠে এসে ফুটবল খেলে বিকেল বেলাতে । ছেলেটা সবসময় দাড়িয়ে দাড়িয়ে সেই ফুটবল খেলা দেখে । ভালো করে খেয়াল করলে দেখা যাবে খেলা দেখতে দেখতে ছেলেটার মুখ অবয়বে অনেকগুলা সূক্ষ্ম অনুভূতি ফুটে উঠেছে । এই কিছুক্ষণের খেলাতেও যেন প্রাণ ফিরিয়ে আনে ছেলেটা । কোন দল যখন গোল করে তখন আনন্দে লাফিয়ে উঠে সে । আবার কেউ গোল মিস করলে তার মুখে হতাশা আর আফসোস দুটোই দেখা যায় । আবার কেউ ফুটবলটিতে ভালো একটি শট দিলে তার মুখে চওড়া হাসি দেখা যায় । ছেলেটা যেন এলাকার এই সামান্য ফুটবল খেলার মাঝেই নিজস্ব ভুবন তৈরি করে ফেলেছে ।

রফিক সাহেব প্রতিদিন এই ছেলেটিকে খেয়াল করেন । প্রায় তিনমাস আগেই হঠাৎ করেই তার ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে । আসলেই খুব কম বয়সেই এই রোগে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি । কতই বা বয়স হবে তার । ৪২ কিংবা ৪৪, এর বেশি নয় । আসলে হয়তো রোগটি ধরাই পড়তো না । তিনি গিয়েছিলেন তার ডাক্তার বন্ধু সেলিম সাহেবের সাথে দেখা করতে সেলিম সাহেবের চেম্বারেই । সেইদিনই আবার সেলিম সাহেবের সাথে রফিক সাহেবের প্রায় দশ বছর দেখা । কারণ রফিক সাহেব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রাজুয়েট করেই জার্মানী পাড়ি জমান । দেশ থেকে বাইরে যাওয়ার পর আর যোগাযোগ হয়নি দুই বন্ধুর মধ্যে । অবশ্য রফিক সাহেব তিন বছর পরেই দেশে ফিরে আসেন । দেশে আসার বছরেই চাকরী নেন একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির জুনিয়র এক্সিকিউটিভ হিসেবে । তার পরের বছরে বিয়ে করেন তার এক বন্ধুর ছোট বোন শিলাকে । তাদের ঘরে এখন এক সন্তানই । রাফসান । কিন্তু আফসোস, রাফসান ছোটবেলা থেকেই পঙ্গু । এখন রাফসানের বয়স দশ বছর । হুইল চেয়ার ছাড়া সে চলাচল করতে পারে না । এই কারণেই রফিক সাহেব সবসময় অত্যাধিক টেনশনে থাকেন । আর এই টেনশনের কারণেই বন্ধুর সাথে চেম্বারে দেখা করতে যান তিনি । সেদিনই সেলিম সাহেব কথায় কথায় তার ডায়াবেটিস পরীক্ষা করেন । সেই পরীক্ষাতেই রফিক সাহেবের ডায়াবেটিস ধরা পড়ে । তার পরদিন থেকেই সেলিম সাহেবের পরামর্শেই দৈনিক দুইবেলা করে এই পার্কেই হাঁটেন তিনি । সকালে এবং বিকেলে । এই পার্কটি তার বাসার পাশেই অবস্থিত । মাঝে মাঝেই রফিক সাহেব রাফসানকে নিয়ে আসেন হাঁটার সঙ্গী হিসেবে । রাফসান তো আর হাঁটতে পারেনা । রফিক সাহেব রাফসানের হুইল চেয়ার ঠেলেন আর রাফসানকে নিয়ে হাঁটতে থাকেন ।

তিনি এই ছেলেটিকে খেয়াল করছেন আজ প্রায় পনেরদিন হল । রোজ ভাবেন ছেলেকে ডেকে কথা বলবেন কিন্তু এরপরেই আবার ভুলে যান । তাছাড়া ছেলেটিও বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নামলেই গায়েব হয়ে যায় । তখন তাকে আর এই পার্কে পাওয়া যায়না । ছেলেটা কে, কোথা থেকে আসে প্রতিদিন বিস্তারিত শুনা দরকার ভাবলেন রফিক সাহেব । কিন্তু আবার ভাবলেন ছেলেটি সম্পর্কে এত জানতে আগ্রহী কেন তিনি । তাই আজও কথা না বলে তিনি রাফসানকে নিয়ে হাঁটতে লাগলেন । যথারীতি প্রায় সন্ধ্যার দিকে ঐ জায়গাটিতে এসে তিনি আর ঐ ছেলেটিকে খুজে পেলেন না । রাতে তিনি ছেলেটির কথা বললেন শিলা আর রাফসানকে । তিনি জানালেন ছেলেটার প্রতি কেন জানি তার অনেক অনেক মায়া কাজ করে । তিনি ছেলেটির জন্য কিছু করতে চান । শিলা জানে তার স্বামী আর রাফসান জানে তার বাবা অনেক অনেক ভালো মানুষ । এই দুনিয়াতে এমন ভালো মানুষ খুজতে গেলে খুব কমই পাওয়া যাবে । তাই তারাও রফিক সাহেবের কথায় তাকে সমর্থন দিল । রাফসান এতদিন জানতো না তার বাবা পার্কে এমন একটি ছেলেকে রোজ খেয়াল করেন । এখন সে যখন ছেলেটি সম্পর্কে জানতে পারল তখন সে ছেলেটিকে দেখার ইচ্ছাপোষণ করলো । তাই রাফসানকে নিয়েই পরেরদিন রফিক সাহেব পার্কে হাঁটতে গেলেন । তিনি পার্কে গিয়েই প্রথম রাফসানকে নিয়ে ঐ জায়গাটিতে গেলেন যেখানে ছেলেটি রোজ দাড়িয়ে ফুটবলখেলা দেখে । আজ ছেলেটি সেখানে নেই । মাঠেও ফুটবল খেলা হচ্ছে না । রফিক সাহেব বুঝলেন না কেন আজ খেলা হচ্ছে না, আবার কেনইবা ছেলেটি আজ নেই । এই ষোল দিনের মধ্যে আজ প্রথম তিনি বিকেল বেলাতে ছেলেটিকে পার্কে দেখতে পেলেন না । রফিক সাহেব চিন্তা করতে করতে হাঁটতে লাগলেন । রাফসান রফিক সাহেবকে খেয়াল করল এবং ব্যাপারটা বুঝতে পারল । তাই সে রফিক সাহেবকে কিছুই জিজ্ঞেস করলো না । আবার পরেরদিন রফিক সাহেব ছেলেটিকে পের্কে দেখতে পেলেন । আজও তিনি রাফসানকে নিয়ে পার্কে হাঁটতে এসেছেন । রফিক সাহেব ছেলেটিকে শেষ পর্যন্ত ডাকলেন । ছেলেটি রফিক সাহেবকে খেয়াল করলো এবং তার ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এল ।

"নাম কি তোমার ?"
জী, ছামছু ।
"কি করো ?"
জী, পাশেই একটি খাওয়ার হোটেলে কাজ করি ।
"বাড়িতে কেউ নেই ?"
বাপ-মা মইরা গেছে । বড় ভাইটা না বইলা বাড়ি থেকে ভাগছে আর বড় আপা এক মাস্তানের লগে পলাইছে । কেউই আর ফিরে আসেনি ।
"থাকো কোথায় ?"
হোটেলেই ঘুমাই ।
"এইখানে কি করো প্রতিদিন ?"
ফুটবল খেলা দেখি ।
"কেন ?"
এই ফুটবল খেলা আমার খুব ভাল্লাগে । আমার বড় ভাই আমারে শিখাইছিল । জানেন, আমি খুব ভালো খেলতে পারি । গোল দিতে পারি । আমার খেলা দেইখা আমাগো এলাকার বারেক ভাই আমারে তার খেলার স্কুলে ডাকছিল । কিন্তু আমি যাওয়ার পর আমারে তাড়ায়ে দিছে ।
"কেন ?"
বারেক ভাই আমারে জুতা কিন্না আনতে কইছিল । আমার তো টাকা নাই । তাই আমি কিনতে পারি নাই । এর লাইজ্ঞা আমারে তাড়ায়ে দিছে ।
"তুমি কি এক জোড়া জুতা পেলে আবার ফুটবল খেলা শুরু করতে চাও ?"
"আমাগো হোটেলের মালিক খুব ভালা লোক । সে আমারে কইছে আমি খেলতে চাইলে সে আমারে মানা করবো না । কিন্তু আমি জুতা পামু কই । তাই আমি ভাবছি আমি কোনদিন আর ফুটবল খেলুম না । তয় দেখুম । দেখতে তো আর কিছু কিনা লাগবো না আর টাকাও খরচ হইবো না ।
"যদি আমি তোমারে কিনে দেই, তোমার চলবে ?"
আপনে কেন কিইন্না দিবেন ? আমি আপনের কি হই ?
"দেবো । আমি তোমাকে জুতা কিনে দেব । তুমি সেই জুতা পড়ে ফুটবল খেলবে । অনেক সুন্দর খেলবে । আমি তো কোনদিন আমার ছেলের জন্য জুতা কিনতে পারিনি । কিন্তু আজ আমি তোমাকে জুতা কিনে দেব ।"

রফিক সাহেবের চোখে পানি । রফিক সাহেব খেয়াল করলেন হুইল চেয়ারে বসে রাফসানও কাঁদছে । ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে । ছামছু বুঝতে পারেনা এত বড় ভালো মানুষটা কেন কাঁদছে । আর হুইল চেয়ারে বসা তার মত বয়সী ছেলেটাই বা কেন কাঁদছে । তার কাছে এসব আশ্চর্যই ঠেকে ।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৪ রাত ৩:০৪
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আত্মীয়তা বজায় রাখা ইসলামে ফরজ

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৬:১৪

ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা (সিলাতুর রাহিম) একটি মৌলিক নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। এটি কেবল সামাজিক শিষ্টাচার নয়; বরং আল্লাহর নির্দেশিত ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কুরআন ও হাদীসে বারবার আত্মীয়তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ ইলিশ

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ ভোর ৬:২৬


ইলিশ!ইলিশ!! রূপালী ইলিশ, কোথায় তোমার দেশ? 
ভোজন রসিকের রসনায় তুমি তৃপ্তি অনিঃশেষ। 

সরষে- ইলিশ, ইলিশ-বেগুন আরও নানান পদ
যেমন তেমন রান্না তবুও খেতে দারুণ সোয়াদ

রূপে তুমি অনন্য ঝলমলে ও চকচকে।
যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শেখ হাসিনার অবদান।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:০৯

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শেখ হাসিনার অবদান।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে গত এক দশকে ব্যাপক উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

অদৃশ্য ছায়া: সমুদ্রের সাক্ষী

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪৬



ঢাকার বনানীর সেই ক্যাফেতে বৃষ্টির শব্দ এখন আরও তীব্র। আরিয়ান তার কফির মগে আঙুল বোলাচ্ছিল, তার চোখ দুটো ক্লান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ। সাঈদের দিকে তাকিয়ে সে নিচু গলায় বলতে শুরু করল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

শুধু দ্বিতীয় রিফাইনারি (ERL-2) টা করে দেখান , সবার মুখ বন্ধ হয়ে যাবে !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১২:৫০


গতকাল নাটকীয়তায় ভরা একটা দিন আমরা পার করলাম । রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্বোধনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন ঝড় বয়ে গেল। পুরো সোশ্যাল মিডিয়া যেন দুই ভাগে ভাগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×