কিন্তু মাঝে মাঝে নিজেকে সিলেটি ভাবতে লজ্জা লাগে।যদিও সিলেটে সারাজীবনই শিক্ষার হার কম ছিল তবুও বিশ্বের বিভিন্ন উচ্চ পদস্থ স্থানগুলো দখল করে আছে আমাদের সিলেটিরা। অর্থাৎ যারা করেছে তারা ভালো কিছুই করেছে।এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যারা আজও শিক্ষা দীক্ষায় পিছিয়ে আছে তাদের কথা বাদই দিলাম ; তবে যারা এগিয়ে আছে তারা মানসিক দিক দিয়ে পিছিয়ে পরা লোকেদের চেয়ে হাজার গুণে পিছিয়ে আছে। বলা-বাহুল্য এরা যত বড় মর্যাদাই পাক না কেনো এই মানসিকতার হয়তো পরিবর্তন হবে না।
প্রসঙ্গ হলো সম্পর্কবাচক শব্দ "কাকা-কাকী" নিয়ে। সিলেট বিভাগের ৪ টি জেলা ছাড়া জানামতে বাকী ৬০ টি জেলাতেই চাচা-চাচী সম্পর্ককে কাকা-কাকী ডাকা হয়।আমরা সিলেটি হওয়া স্বত্তেও সঙ্গত কারণেই আমরাও কাকা-কাকী ডাকি। ছোটবেলা আত্মীয়,পাড়া,প্রতিবেশী অনেকের মুখ থেকেই শুনতে হতো "কাকা-কাকী" তো হিন্দুদের ডাক তোমরা ডাকো কেন।গুনাহ হবে তো!! কবীরা গুনাহ ।ছোট ছিলাম নিজেও,যারা বলতো তারাও আমার মতোই ছোট ;ওরা এসবের কী বুঝে ! তাছাড়া আমার নানাভাই ঢাকা "সরকারী আলিয়া মাদ্রাসার"র একজন মুহাদ্দীস ছিলেন অতএব নিশ্চয় যে শব্দ বললে গুনাহ হবে এমন শব্দ তাঁর ছেলেমেয়েদের শেখাননি। অর্থাৎ আম্মা,মামা,খালারা "কাকা-কাকী" ডাকেন সেই সুবাদে আমরাও। যাইহোক ছোটবেলা বিষয়টাকে ততোটা পাত্তা দেইনি।
বড়বেলা নিজে যখন বাংলা ব্যকরণ পড়েছি তখন জানতে পারলাম আমরা বেশীর ভাগই বিদেশী শব্দ ব্যবহার করি।যেগুলি না আরবী না বাংলা।খাঁটি বাংলার ব্যবহার খুবই কম আমাদের বাংলা ভাষাতে। সিলেটি ভাষাকেও যদি ধরা হয় সেক্ষেত্রেও দেখা যাবে খাঁটি বাংলার ব্যবহার অতি নগণ্য।
কিন্তু এখনো এই অত্যাধুনিক যুগে এসে শিক্ষিত,বাংলায় পারদর্শী, কবি,লেখক,সিলেটি মানুষগুলো যখন বলে তোমরা "কাকা-কাকী" ডাকো কেনো? সেটাতো হিন্দুরা ডাকে। মানে হিন্দুদের ভাষা এটা। তাদেরকে তবে বলতে হয় আপনারা যদি এতো খাটি মুসলমান হয়ে থাকেন তবে সারাদিন মুখে তালাবদ্ধ করে বসে থাকেন। আশাকরি আপনারা আমার মতো হিন্দুদের ভাষা ব্যবহার করবেননা।সবচেয়ে সহজ শব্দ দিয়ে বুঝালাম আপনি যে মামা-মামী ডাকেন সেটা কোথা থেকে আগত? কবি সেখানে নিরব!
হ্যাঁ, আমাদের উচিত আমাদের এলাকার প্রচলিত প্রথা,সংস্কৃতিকে আগে গুরুত্ব দেয়া। কারণ সমাজের চোখে অন্য এলাকার প্রথাগুলো একটু অস্বাভাবিক দেখায় কিংবা শুনায়। যে যেটাতে অভ্যস্ত তার কাছে সেটাকেই সঠিক মনে হবে। কারণ সবাই ভিন্নধরণের কথা শুনে অভ্যস্ত না। তাই একটু খটকা লাগতে পারে।
তবে যারা কমপক্ষে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়াশুনা করেছে তারা অবশ্য এখন আর এটা নিয়ে প্রশ্ন করেনা। তবে ঐ তথাকথিত কিছু মুসলমান রয়েই গেছে এ প্রশ্নটি করার জন্য। অনেকেই আছে,প্রায়ই প্রশ্ন করে! যেহেতু তুমি জানোনা; সেক্ষেত্রে প্রশ্নটা এমন হতে পারতোনা ' আমরা সবাই চাচা-চাচীর ক্ষেত্রে এক শব্দ ব্যবহার করি তোমরা কেনো অন্যটা ব্যবহার করছো'? তা না করে সরাসরি বলেই ফেলে এটাতো হিন্দুরা ডাকে,হিন্দুরীতি; এই শব্দ গুলো কেমন যেন বিশ্রী শুনায় । অদ্ভুত!!!
♣ তবে চলুন একটু জেনে আসি ; আপনি আমি রোজ কতোগুলো বিদেশী শব্দ ব্যবহার করি যা কীনা হিন্দু,বৌদ্ধ,খৃষ্টানদের ভাষা থেকে আগত।না বাংলা শব্দ না আরবী শব্দ।
♦ কাকা-কাকী শব্দ গুলো প্রমিত বাংলায় ব্যবহৃত সাঁওতালি শব্দ। পশ্চিমবঙ্গের অধ্যাপক ক্ষুদিরাম দাস "সাঁওতালি-বাংলা সমশব্দ অভিধান" নামে যে বইটি লিখেছিলেন সেখানে কাকা-কাকীর পাশাপাশি হাজারও শব্দ রয়েছে যা বাংলা এবং সাঁওতালি উভয় ভাষাতেই ব্যবহৃত হয়। এর বেশীর ভাগই মূলত সাঁওতালি শব্দ।
মূলগতভাবে সাঁওতালি কিছু শব্দ আমরা নিয়মিতই বাংলা ভাষায় ব্যবহার করি এমন কিছু শব্দ উল্লেখ করলাম : আটা,আমড়া,আম,ঝিঙা, ডাল,ডিম,চাল,তাল,তিল,মরিচ,পুদিনা,ব্যঙ,ইন্দুর,বাঁদুড়,ভ্যাড়া,ট্যংরা,খইলসা, মামা-মামী,খালা-খালু,গোড়ালী,ঠ্যাঙ, মুচ,ঘাড়,গলা,পেট।এমন হাজারও সাঁওতালি শব্দ রয়েছে যা কীনা আমরা প্রতিটা বাক্যে ব্যবহার করে থাকি।
এগুলি তো শুধু সাঁওতালি শব্দের ব্যবহার ; এরকম হাজারো বিদেশী শব্দ রয়েছে যেগুলি আরবী না। কোনো ইসলামিক ভাষা না। সবকিছুতে হিন্দু,বৌদ্ধ,খৃষ্টান জড়ায়ে নিজেকে অতীব ধার্মিক মনে করা থেকে বিরত থাকুন। হুটহাট কাউকে দোষারোপ না করে জানুন,শিখুন। অন্যকে শেখান।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুন, ২০১৬ রাত ১০:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



