২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১১। সুমেরুবৃত্ত বন্দী ফিনল্যান্ডের শহর রোভানিয়েমিতে হাঁড়কাপানো শীত পরেছে। সাত সকালেই শহরটির সেন্ট্রাল পুলিশ স্টেশনে খবর এলো, উইলসন রাজ পেরুমাল নামে সিঙ্গাপুরের এক নাগরিক এই মুহুর্তে জাল পাসপোর্ট নিয়ে রোভানিয়েমিতে অবস্থান করছেন। পেরুমাল সম্পর্কে তথ্যদাতা ব্যক্তিটির কাছ থেকে এর থেকে বেশি কিছু আদায় করে করতে পারেনি পুলিশ কর্মকর্তারা। দেশটিতে তার অতীত কর্মকান্ডেরও কোন রেকর্ড ছিল না। এ কারণে পেরুমাল সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য পুলিশ খুব গোপনে তাকে সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় নিয়ে আসে।
তিনদিন পর স্থানীয় ফুটবল ক্লাব রোভানিয়েমি প্যালোসুয়েরার পার্শ্ববর্তী একটি ফরাসি রেঁস্তোরায় পেরুমালকে ওই ক্লাবেরই তিনজন ফুটবলারের সঙ্গে উত্তেজিত ভঙ্গিতে কথা বলতে দেখা যায়। তিনজন ফুটবলারই ভয়ে কুঁকড়ে ছিল। ১-১ ব্যবধানে ড্র ম্যাচের বিরতির সুযোগে তারা পেরুমালের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। রোভানিয়েমি পুলিশ যা বোঝার বুঝে নেয়। পরের দিন ভুয়া পাসপোর্টের জন্য গ্রেফতার হন পেরুমাল। প্রাথমিক সন্দেহ অনুযায়ী খবরটা ফিনল্যান্ড ফুটবল ফেডারেশন হয়ে ফিফার সদর দপ্তর পর্যন্ত পৌঁছে দেয় রোভানিয়েমি পুলিশ। এক সপ্তাহ পর শহরটিতে পা রাখেন ফিফার নিরাপত্তা প্রধান ক্রিস ইটন। পেরুমালকে তিনি ছয় মাস ধরে গোটা বিশ্ব তন্ন তন্ন করে খুঁজছিলেন। ফিনিশীয় গোয়েন্দাদের ইটন জানান, যে ব্যক্তিটিকে তারা গ্রেফতার করেছেন, সে বিশ্বের ভয়ংকরতম ফুটবল ম্যাচ জুয়াড়িদের একজন!
পাঁচটি মহাদেশজুড়ে পেরুমাল কর্তৃক গড়াপেটা করা ম্যাচের সংখ্যা একশোরও বেশি। সেখান থেকে লুটে নেয়া মুনাফার অঙ্ক প্রায় ৬.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালে এশিয়ান ফুটবলের ভিত নড়িয়ে দেয়া ‘এশিয়াগেট’ কেলেঙ্কারির পাশাপাশি ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবল, এমনকি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ গড়াপেটার সঙ্গেও পেরুমালের জড়িত থাকার প্রমাণ খুঁজে পেয়েছে পুলিশ। ফিনল্যান্ডে জেলবাস করাকালীন তার লেখা আত্মজীবনীমূলক বই ‘কেলন কিংস’-এর একটি লাইন তুলে দিলাম— ‘২০১০ বিশ্বকাপের মূলপর্বে নাইজেরিয়ার নাম লেখানোর নেপথ্য নায়ক আমি। আমার পরিকল্পনা কাজ করেছে! হুন্ডুরাস এবং নাইজেরিয়াকে বিশ্বকাপে খেলানোটা আমার ব্যক্তিগত সাফল্য হয়ে থাকবে!’ ফুটবলবিশ্বে তাই পেরুমালের অপর নাম-‘গডফাদার অব ম্যাচ ফিক্সিং’।
সিঙ্গাপুরের এক দরিদ্র পরিবার থেকে স্থানীয় লিগ, তারপর ফুটবলের আন্তর্জাতিক মঞ্চ- সবখানেই দাপিয়ে ম্যাচ গড়াপেটা করেছেন পেরুমাল। বর্তমানে হাঙ্গেরি পুলিশের তত্ত্বাবধানে থাকা ৪৯ বছর বয়সী এ ব্যক্তিটির প্রথম টিভি সাক্ষাত্কার নেয় সিএনএন। সেখানে পেরুমাল যা যা বলেছেন, তা শোনার জন্য ফুটবলমোদীদের কর্ণকুহর কোনোভাবেই প্রস্তুত নয়! ‘কতগুলো ম্যাচ গড়াপেটা করেছি তা কখনোই হিসেব করিনি। সংখ্যাটা হতে পারে ৮০ থেকে ১০০।’ শুধু তাই নয়। ‘এমনও ঘটেছে আমি খেলোয়াড়দের বেঞ্চে বসে ম্যাচের গতি-প্রকৃতি বুঝে তাদের বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছি। ব্যাপারটা এতটাই সোজা ছিল যে স্বয়ং কোচ পর্যন্ত আমার কথা শুনতে বাধ্য হয়েছেন’—বলেন তিনি।
ফুটবল ম্যাচ গড়াপেটা সন্দেহে মোট চারবার গ্রেফতার হয়েছেন পেরুমাল। সর্বশেষ ফিনিশীয় পুলিশের মুঠোবন্দী হওয়ার পর তার সুমতি ফিরে আসে। রাজসাক্ষী হয়ে পেরুমাল এখন তার স্যাঙ্গাত্ এবং গডফাদারকে ধরতে পুলিশকে সাহায্য করছেন। ‘শৈশবে স্বপ্ন দেখতাম একদিন সৈনিক হবো। কিন্তু স্কুলে পড়াকালীন নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। সেখান থেকে আর বেরিয়ে আসা হয়নি। ম্যাচ পাতানো চক্রের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাত্ ঘটে উনিশ বছর বয়সে’—নিজের বইয়ে জানান পেরুমাল।
১৯৯৮ সালে জিম্বাবুয়ে-বসনিয়া প্রীতি ম্যাচ পাতানোর চেষ্টা দিয়ে পেরুমালের গড়াপেটা ক্যারিয়ার শুরু। ২০০৯ সালে ‘এশিয়াগেট’ কেলেঙ্কারিতে জিম্বাবুয়ের ফুটবলার এবং অফিসিয়ালদের কব্জা করে নেন পেরুমাল। এরপরই তার নামটা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। সিএনএনের কাছে তার দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী, গড়াপেটাকৃত ম্যাচে সাফল্যের হার ৭০%-৮০%। আসরের নামগুলোও চমকে দেয়ার মতো—অলিম্পিক, বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব, নারী বিশ্বকাপ, কনকাকাফ গোল্ড কাপ এবং আফ্রিকান নেশন্স কাপ।
ফিনিশীয় পুলিশ পেরুমালকে গ্রেফতার করার পর জানতে পারে, তার গডফাদারের নাম ট্যান সিট ইং, যিনি ইতালিয়ান পুলিশের ‘মোস্ট ওয়ানটেড’ তালিকার অন্তর্ভুক্ত এবং এই মুহুর্তে সিঙ্গাপুর পুলিশের নজরবন্দী আছেন। পেরুমালকে গ্রেফতার করার পর তার ব্যক্তিগত মোবাইলে ৩৮ টি দেশের ফুটবলার এবং কর্মকর্তার নম্বর খুঁজে পায় পুলিশ। ইন্টারপোলের তথ্য অনুযায়ী, খেলাধুলায় গড়াপেটা এখন ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের শিল্প, যার ৭০ ভাগ অর্থেরই যোগান দেয় ফুটবল! এজন্য ফিফার কর্মপন্থাকেই দায়ী করলেন পেরুমাল, ‘ফিফা বর্ণবাদ থামাতে এত কিছু করছে কিন্তু ম্যাচ পাতানোর বিপক্ষে তেমন সরব ভুমিকা পালন করছে না। থলের বিড়াল বেরিয়ে আসলে সম্ভবত লজ্জায় তাদেরই মাথা কাটা যাবে।’ সিএনএন, ইনভিজিবল ডগ, টেলিগ্রাফ।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৪ রাত ৯:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



