
-‘আপনার জন্য বলিউডি গানের সুব্যবস্থা আছে।’
-‘ওসব হামেশাই শোনা হয়। আমার পশতুও চলে’
-‘তা হয় কিভাবে ? আপনি আমাদের মেহমান। এদেশকে যেন নিজের ঘর মনে করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব -’ সাইদ রহমান আহমেদজাইয়ের কণ্ঠে প্রতিবাদের স্বর। ইএসপিএন ক্রিকইনফোর সহ-সম্পাদক সিদ্ধার্থ মঙ্গা তার অতিথি। কাবুল থেকে গাড়ীতে জালালাবাদ যাচ্ছেন তারা। পাকিস্তানের সীমান্ত তখনো কুড়ি কিলোমিটারের দুরত্ব। ওপারে পেশোয়ার, এপারে জালালাবাদ। আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলে দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এখান দিয়ে দিয়ে অবাধে প্রবেশ করে পাকিস্তানের সকল শিল্প ও কৃষিজাত পণ্য। তারপর ছড়িয়ে পড়ে গোটা আফগানিস্তানে। জালালাবাদ তাই আফগানদের সকল সামাজিক এবং ব্যবসায়িক কর্মকান্ডের হৃৎকোরক।
পাকিস্তানের সঙ্গে ভৌগলিক নৈকট্যই যে তার নেপথ্য কারণ-তা আর কারো অজানা নেই। কিন্তু, যে কথাটা কেউ জানেনা, তা হলো-জালালাবাদ আফগানিস্তান ক্রিকেটের রাজধানী। এর নেপথ্য অনুঘটকও ডুরান্ড লাইন, যেখান দিয়ে দুই দেশের ক্রিকেটারদের অবাধ ভাব বিনিময়ের পাশাপাশি, সন্ত্রাসীদের যাতায়তও একেবারে খোলা বইয়ের পাতার মতো ! এ অঞ্চলে বিদেশীদের সঙ্গ দেয়া মানে, পিতৃপ্রদত্ত প্রাণটা হাতে নিয়ে ঘোরা। আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড একাডেমির কোচ এবং গ্রাউন্ড ইন চার্জ সাইদ রহমান রাজি হওয়ার আগে, ঠিক এ কারণে আরও দুইজনকে জালালাবাদ যাওয়ার অনুরোধ করেও প্রত্যাখাত হন সিদ্ধার্থ মঙ্গা।
কাবুল, ভারত এবং পাকিস্তানের প্রাচীন শহরগুলোর মতোই জনবহুল। সড়কগুলো ভীষন ব্যস্ত। মার্কেট থেকে ফুটপাত পর্যন্ত বর্ণিল পণ্যের সমারোহ। বেশকিছু শপিং মলও গড়ে উঠেছে। টয়োটার আধিক্য চোখে পড়ার মতো। কিন্তু এমন ব্যস্ত জনজীবনে বোমা ফাটার আওয়াজ শুনে এখন আর কেউ চমকে ওঠেনা। হোটেলগুলোতে প্রতি সপ্তাহে রুটিনমাফিক তল্লাশী চলে। রাস্তায় সশস্ত্র প্রহরীর কড়া চোখ। কিন্তু তারপরও বোমা ফাটছে। খৈয়ের মতো ! কাবুলের দৈনন্দিন জনজীবনে ‘তালেবান আতঙ্ক’ এখনো জীবিত। গত বছরের জুন থেকে আফগানিস্তানে কোচের দায়িত্ব নেয়া সাবেক কিউই অ্যান্ডি মোলসের অভিজ্ঞতাটা এরকম,‘-কোচিংয়ের মাঝে আশে পাশে কোথাও বোমার ফাটার আওয়াজ সবার কানে সয়ে গেছে। ব্লাক হক হেলিকপ্টারগুলো মাঠের ওপর দিয়ে উড়ে যায়। মিশন শেষ করে ফিরে আসে। এসব দেখে মাঝেমধ্যে নিজেকে মনে হয়, যুদ্ধ নিয়ে সিনেমা বানানোর কোচিং করছি ! ব্যাপারগুলো একেবারেই গা সওয়া হয়ে গেছে। এ কারণে রাস্তায় বের হলে এখন আর ভয় লাগেনা।’
সিদ্ধার্থ মঙ্গার মানসিক অনুভূতিটাই মোলসের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। জালালাবাদ রওনা হওয়ার আগে মুফতে কিছু উপদেশ পান সিদ্ধার্থ- বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরো কারণ তোমার গাড়ীতে বর্ম নেই, গাড়ী থেকে ভুলেও নেমোনা,.. ইত্যাদি। কিন্তু মোলস প্রতিদিন রাস্তায় যেভাবে বেরিয়ে থাকেন, সেরকম করেই বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট এবং বর্মযুক্ত গাড়ীতে চড়ে বসা থেকে বিরত থাকেন সিদ্ধার্থ। তার মন সায় দেয়নি। অথচ, জালালাবাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বিদেশী পর্যটকরা রসিকতা করে বলে থাকেন,‘এখানে বোমার থেকেও ড্রাইভিং বেশি বিপদজ্জনক’ ! তাদের বহনকারি গাড়ীটির ড্রাইভারও বেশ রসিক মানুষ। কাবুল থেকে বের হওয়ার পথে তার উক্তি,‘এখানে ড্রাইভিং, আর ‘বুজকাশি’র মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।’ পোলো খেলা দেখে থাকলে আফগানদের ‘বুজকাশি’র মর্ম উদ্ধার সম্ভব। একটি গোলাকার আকৃতির বল দিয়ে পোলা খেলা হয়। বাকি সব ঠিকঠাক, শুধু বলের জায়গায় একটা মৃত ছাগল ! তাই খেলাটির নাম ‘বুজকাশি’ ! ঘোড়ায় চড়ে মৃত ছাগল দখলের এ লড়াই আফগানদের জাতীয় খেলা।


('বুজকাশি'তে মত্ত আফগানরা। প্রাণ সঁপিয়া দিয়াও ছাগলের নিস্তার নাই..। ছবি ঃ দ্য ক্রিকেট মান্থলি)
ড্রাইভারের রসিকতা, আফগান মরুভূমির বিরান সৌন্দর্য্য এবং পথের দুই ধারে অগণিত ভেড়ার পাল দেখার ক্লান্তিতে ক্ষিদে পায় সিদ্ধার্থের। সম্বল বলতে আফগান নান রুটি এবং ঘি। অন্যকিছুর প্রয়োজন নেই। খাবারটা দীর্ঘ সময় পেটে মজুদ থাকে, বিধায় আফগানদের ভীষন প্রিয়। একেকটি প্রমান সাইজের নানরুটি দোকানগুলোতে জামা-কাপড়ের মতো ঝুলিয়ে রাখা হয়। একাডেমি দল নিয়ে লক্ষৌর স্কুল দলের মুখোমুখি হওয়াকালিন দিল্লি পর্যন্ত খাবার-দাবারের ঝামেলাটুকু নান রুটি দিয়ে সেরে নিতেন সাইদ রহমান। আফগান ডালিমগুলোও আকৃতিতে বেশ বড় বড়। ভেতরে রসের প্রাচুর্য থাকায় ‘খাওয়ার সময় পোশাক সাবধান’-আগেই সতর্কবার্তা পেয়েছে সিদ্ধার্থ। আফগানরা তাদের দৈনন্দিন কর্মকান্ডে সবসময় একটি জিনিষ সঙ্গে রাখে-‘সেঞ্চা’। সবুজ চায়ের মতো পানীয়টি খেতে ভালই লাগে সিদ্ধার্থের। সে খাবার নিয়ে মত্ত থাকার সুযোগে সাইদ রহমান নিলর্জ্জের মতো দায়িত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে, পশতু গানের বদলে চালিয়ে দেয় বলিউডের কিছু চটুল গান। সিদ্ধার্থের মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে নিতে সে টোপ ফেলে-‘আপনার জন্য দুধপট্টির (দুধ-চা) ব্যবস্থা করতে হবে। অতিথি বলে কথা’ !
-না, আমি চায়ে দুধ কিংবা চিনি পছন্দ করিনা।
-আপনি খাঁটি ভারতীয় তো ! -সাইদ রহমানের কণ্ঠে সন্দেহ।

(কাবুল নদীর পাশে শহর। আফগান নান রুটির দোকান। গরম ধূমায়িত 'সেঞ্চা' ঃ ছবি- দ্য ক্রিকেট মান্থলি)
********************
পশতু সঙ্গীত এবং বলিউডি গানের মল্লযুদ্ধ চলতেই থাকে। কোনপক্ষই হার মানতে রাজি নয়। একজন, সৌজন্যতাবোধ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর, আরেকজন তার অতিথিসেবা প্রমানে মরিয়া। শেষ পর্যন্ত জয়ী অন্যকেউ। গুলাম আলী ! পাকিস্তানের কিংবদন্তি গজল শিল্পি। সিদ্ধার্থ এবং সাইদ, দুজনেই ভাল উর্দু জানায় পেনড্রাইভে নিয়ে আসা গুলাম আলীই মল্লযুদ্ধ থামিয়ে দেয়। সাইদের শৈশব কেটেছে পাকিস্তানের শরণার্থী শিবিরে। গুলাম আলীকে দ্বৈরথে ঠেলে দিয়ে সে বলে,‘পাকিস্তান সঙ্গীতশিল্পি এবং কৌতুকভিনেতারা ভারতীয়দের থেকে অনেক ভাল।’ সিদ্ধার্থ গানের ভলিউম বাড়িয়ে দেয়। স্পিকারে দরাজ কণ্ঠে গেয়ে চলেন গুলাম আলী-‘আওয়ার্গি’ (ভ্রমনক্ষুধা)। একেবারে খাপে খাপ !
গুলাম আলী প্রশ্ন করেন -‘ইস দ্যশত ম্যেইন এক শেহের থা, ও ক্যায়া হুয়া আওয়ার্গি’ ? সাইদ রহমানের দৃষ্টি সামনের উষর মরুভুমিতে। ‘দ্যশত’-পারস্য ভাষার শব্দ, যার অর্থ-মরুভূমি। শেহের, মানে নগর। অর্থাত্-‘একসময় এ মরুভূমিতে প্রাণ ছিল। তার কি হলো ’ ? সিদ্ধার্থের মনে হলো, হাজার বছর ধরে জবুথবু হয়ে বসে থাকা পাহাড়গুলোর কাছে এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাওয়া যাবে। ওরাই তো সবকিছুর নীরব সাক্ষী ? যুদ্ধ-বিগ্রহ, গোঁড়ামি, জাতিগত বৈষম্য, রাশিয়ান, আমেরিকান, জিহাদি-এসবকিছুর সাক্ষী ওই পাহাড়গুলো, ভাবতে ভাবতে সিদ্ধার্থদের গাড়ী মাহিপুর পেরিয়ে যায়। মাহি অর্থ-মাছ, ‘পার’ অর্থ-উড়ন্ত। বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে কাবুল নদী মাছে গিজগিজ করে। তখন লাফ দিয়ে পানির ওপরে ওঠা মাছগুলোকে উড়ন্ত বলেই মনে হয় ! জালালাবাদ যত নিকটবর্তী হচ্ছে, গুলাম আলীর প্রশ্নের সত্য ততই বিবসনা হয়ে পড়ছে সিদ্ধার্থের সামনে । তার চোখের সামনে চারপাশ ঘেরা সুবিশাল বিরান প্রান্তরটি একসময় গোটা এশিয়ার মধ্যে সেরা জলপাই প্রসব করতো। উর্বর কাদামাটি এবং শীতকালে তুষারপাত হয়না, যে কারণে জলপাই আবাদের জন্য জায়গাটা ছিল আদর্শ। বছরের পর বছর ধরে চলমান যুদ্ধ-বিগ্রহে জলপাইবাগানগুলোর কবর রচিত হয়েছে সেই একই মাটিতে ! একসময়ের সবুজভূমি, তাই এখন বিরান মরুভূমি।



(জালালাবাদ মরুভূমি। কাবুল থেকে জালালাবাদ যাওয়ার সড়ক। কাবুল নদী : ছবি ঃ নিউ ইয়র্ক টাইমস)
সিদ্ধার্থ একেবারে হঠাত্ করেই আবিষ্কার করলো, এ উষর কোথাও বন্ধুর, কোথাও বা সমতল- তার বুকে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে সম্কুর্ণ ভিন্ন এক শহর ! এ শহরে তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে তুলকালাম হয়না। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের জন্য কিছুই লাগেনা, যে কোন উচ্চতার সামান্য তিনটে পাথর পাশাপাশি দাঁড় করালেই চলবে। উইকেট ! ছাল-চামড়া হারানো টেনিসবলগুলোর আব্রু রক্ষা করছে প্যাঁচানো টেপ। কারো হাতে বল, কারো হাতে ব্যাট। কিন্তু বেশিরভাগের পায়েই স্পঞ্জের স্যান্ডেল। অসংখ্য ক্ষুদের মনোরঞ্জনে ব্যস্ত ক্রিকেট ! সিদ্ধার্থ খেয়াল করে-ব্যাটসম্যানদের বেশিরভাগই অপরিণামদর্শী, কিন্তু বোলারদের অ্যাকশন নিখুঁত এবং দ্রুতগতিসম্কন্ন।
সিদ্ধার্থের কাছে আফগান ক্রিকেট মানেই মোহাম্মদ নবীর গল্প। পেশোয়ারের শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা এ ক্রিকেটার ২০০২ সালে তার জন্মভূমিতে ফিরে আসেন। ক্ষুদেদের নতুন সভ্যতার গোড়াপত্তন ঘটার আগে নবী সত্যিকারের মরুভূমিটা দেখেছেন- ধংস্বপ্রায় বাড়ি-ঘর, রাস্তার আনাচে-কানাচে অবিষ্ফোরিত শেল, দেয়ালে অসংখ্য বুলেটের ক্ষতচিহূ ! গত এক যুগে মাথা তুলে দাঁড়ানোর জন্য কঠোর পরিশ্রমের ফলাফলই আজকের আফগানিস্তান। এ সময়ের মাঝে তারা অংশ নিয়েছে তিনটি টি২০ বিশ্বকাপে। তাদের উঠে আসার এ গল্পটা এখন ক্রিকেটের রুপকথা....(চলবে)
তথ্যসুত্র ঃ 'দ্য ক্রিকেট মান্থলি' ম্যাগাজিনে সিদ্ধার্থ মঙ্গার প্রতিবেদন অবলম্বনে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


