
প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! মুমিন হৃদয়ের আশা-আকাঙ্খা-শ্রদ্ধা-ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু! তাঁর প্রতিটি বিষয়ে এই উম্মতের আগ্রহ! পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম যে মহামানবের জন্য প্রতিটি হৃদয়ে ভালোবাসার বহ্ণিধারা প্রজ্জ্বলিত, পৃথিবীর তাবত মানুষের পথপ্রাপ্তির জন্য তাঁর রেখে যাওয়া অনুপম আদর্শ যেমন সকলের কন্ঠমালা, তেমনি তাঁর সকল কাজের প্রতি, সকল দিকের প্রতি অদম্য আগ্রহ থাকাই তো স্বাভাবিক। আজ কোটি কোটি মানব হৃদয় জানতে চায়- কেমন ছিলেন অনুপম আদর্শের অনন্য প্রতীক রাসূলে আরাবি প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম? কেমন ছিল তাঁর বরকতময় শারীরিক অবয়ব? কেমন ছিল তাঁর আলোকময় দীপ্তিমান চেহারা মোবারক? কেমন ছিল তাঁর বরকতপূর্ণ চাহনি? কেমন ছিল তাঁর গাত্রবর্ণ? কেমন ছিল তাঁর হাটা চলা? তিনি কেমন ছিলেন?
প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে কত স্বপ্নই না লুকিয়ে থাকে বিশ্বাসীদের অন্তরে! বিশ্বাসী অন্তরের ঐকান্তিক বাসনা, সকল কিছুর বদলায় হলেও প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একনজর দেখতে পেতাম যদি জীবনে! স্বপ্নে তাঁর দেখা পাওয়ার কি ব্যাকুল প্রত্যাশা! প্রত্যাশা থাকবে না কেন? বিশ্বাসী ব্যক্তি মাত্রই জানেন- 'প্রিয়তম নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে (ঈমানের চোখে) একবার যিনি দেখবেন তাকে জাহান্নামের আগুণ স্পর্শ করবে না।' (তিরমিজি শরিফ)
প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পবিত্র শরীর মোবারকের আকার-আকৃতির বর্ণনায় এসেছে অনেক হাদিস। অনেক সাহাবি থেকে বর্ণিত হয়েছে এসব হাদিস। হজরত আলী রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দেহ মোবারকের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, 'প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যধিক লম্বাও ছিলেন না এবং একেবারে বেঁটেও ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন লোকদের মধ্যে মধ্যম আকৃতির। তাঁর মাথা মোবারকে চুল একেবারে কোঁকড়ানো ছিল না এবং সম্পূর্ণ সোজাও ছিল না; বরং মধ্যম ধরনের কোঁকড়ানো ছিল। তিনি অতি স্থূলদেহী ছিলেন না এবং তাঁর চেহারা মোবারক একেবারে গোল ছিল না; বরং লম্বাটে গোল ছিল। গায়ের রং ছিল লাল-সাদা সংমিশ্রিত। চোখ মোবারকের বর্ণ ছিল কালো এবং পলক ছিল লম্বা ও চিকন। হাড়ের জোড়াগুলো ছিল মোটা। পুরো দেহ মোবারক ছিল পশমহীন, অবশ্য পশমের চিকন একটি রেখা বুক মোবারক থেকে নাভি মোবারক পর্যন্ত প্রলম্বিত ছিল। দুই হাত এবং দুই পা মোবারকের তালু মোবারক ছিল গোস্ত দ্বারা পরিপূর্ণ। যখন তিনি হাঁটতেন তখন পা মোবারক পূর্ণভাবে উঠিয়ে মাটিতে রাখতেন, যেন তিনি কোনো উঁচু জায়গা থেকে নিচের দিকে নামছেন। যখন তিনি কোনো দিকে তাকাতেন তখন ঘাড় মোবারক পুরোপুরি ঘুরিয়ে তাকাতেন। তাঁর উভয় কাঁধ মোবারকের মাঝখানে ছিল মোহরে নবুওয়াত বা নবী হওয়ার অলৌকিক নিদর্শন। তিনি হলেন সর্বশেষ নবী। তিনি ছিলেন মানুষের মধ্যে অধিক দানশীল, সবচেয়ে বেশি সত্যভাষী। তিনি ছিলেন সবচেয়ে কোমল স্বভাবের এবং বংশের দিক থেকে সম্ভ্রান্ত এবং মর্যাদার অধিকারী। যে ব্যক্তি তাঁকে হঠাৎ দেখতো, সে ভয় পেত (গুরুগম্ভীরতার কারণে)। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি পরিচিত হয়ে তাঁর সঙ্গে মিশতো, সে তাঁকে অনেক ভালোবেসে ফেলতো।' প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর গুণাবলী বর্ণনাকারী এ কথা বলতে বাধ্য হন যে, 'আমি তাঁর আগে ও পরে তাঁর মতো কাউকে কখনো দেখতে পাইনি।' (শামায়েলে তিরমিজি।)
হজরত হাসান বিন আলী বলেন, আমার মামা হিন্দ বিন আবু হালা রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহুকে প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পবিত্র অবয়ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করি। তিনি প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পুরো দেহ মোবারকের বর্ণনা দেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, 'প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কপাল মোবারক ছিল বেশ উন্নত। ভ্রু ছিলো সরু ও ঘন পাপড়ি বিশিষ্ট। দুই ভ্রু মোবারক আলাদা ছিল। মাঝখানে একটি রগ ছিলো। প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন রাগ হতেন, তখন তা ভেসে উঠতো। নাক মোবারক খাড়া ছিলো। ভালোভাবে না দেখলে মনে হত তিনি প্রকান্ড নাক বিশিষ্ট। নাক থেকে এক ধরণের নূর চমকাতো।' (শামায়েলে তিরমিজি।)
প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পেট মোবারক সম্পর্কে হিন্দ বিন আবু হালা বলেন, 'আল বাতনে ওয়াসসাদরি আরিদুন', অর্থাত, 'পেট ও বুক সমান ছিলো।' (শামায়েলে তিরমিজি)
প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর আকৃতি সম্পর্কে হজরত জাবের ইবনে সামুরা রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু বলেন, 'একবার আমি চাঁদনি রাতে প্রিয় নবীজী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখলাম। অতঃপর একবার রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর দিকে তাকালাম আর একবার চাঁদের দিকে তাকালাম। তখন তিনি লাল বর্ণের পোশাক পরিহিত অবস্থায় ছিলেন। তাঁকে আমার কাছে চাঁদের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর মনে হলো।' (তিরমিজি ও দারেমি)
হজরত কা’ব ইবনে মালেক রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু বলেন, 'রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোনো ব্যাপারে আনন্দিত হতেন তখন তাঁর চেহারা মোবারক উজ্জ্বল হয়ে উঠতো। মনে হতো যেন তাঁর মুখমন্ডল চাঁদের টুকরা। (বুখারি ও মুসলিম)
হজরত ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু বলেন, 'রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সম্মুখের দাঁত দু'টির মাঝে কিছুটা ফাঁকা ছিল। যখন তিনি কথাবার্তা বলতেন, তখন মনে হতো উক্ত দাঁত দু'টির মধ্য দিয়ে যেন নূর বিচ্ছুরিত হচ্ছে।' (দারেমি)
হজরত আবু হুরাইরা রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু বলেন, 'রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর চেয়ে বেশি সুন্দর কাউকে আমি কখনো দেখিনি। মনে হতো যেন সূর্য তাঁর মুখমন্ডলে ভাসছে। আর রাসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপেক্ষা চলার মধ্যে দ্রুত গতিসম্পন্ন কাউকে দেখিনি। তাঁর চলার সময় মনে হতো মাটি যেন তাঁর জন্য সংকুচিত হয়ে এসেছে। আমরা তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে চলতাম। অথচ তিনি স্বাভাবিক নিয়মে চলতেন।' (তিরমিজি)
আমরা রাসূলে আরাবি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর হায়াতে ত্বইয়্যিবায় পাইনি। তাঁর পবিত্র জীবনে, তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর দর্শনলাভ আমাদের কিসমতে হয়নি। কারণ, আরবের মরু বিয়াবানে। পবিত্র মক্কা নগরীর উষর ধূষর প্রান্তরে। তিনি এসেছিলেন আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে। আমাদের সময়কালের বহু পূর্বে। তাকে পাইনি কিন্তু তিনি আছেন হৃদয়ের গভীরে। জীবনের প্রতিটি দিন কাটে তাঁরই স্মরণে। তাকে ভালোবেসে। শ্রদ্ধায়-হৃদ্যতায়-প্রাণময়তায়-প্রাণপ্রাচুর্য্যতায়। তাকে দেখতে পাগলপাড়া অন্তর। একনজর তাকে না দেখে অস্থির বেকারার আশিক হৃদয়। স্বপ্নে হলেও তাকে দেখে হৃদয়ের তৃপ্তি-পরিতৃপ্তি। তাই মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআ'লার দরবারে বিনীত ফরিয়াদ, তিনি যেন আমাদের সবাইকে দিদারে রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বপ্নে হলেও নসিব করেন। তাঁর মসজিদ, মসজিদে নববির পানে বারবার যাওয়ার তাওফিক দান করেন। মদিনার সাথে গড়ে দেন অমর প্রেমের বিমলিন জজবা। মজবুত করে দেন মদিনাওয়ালার সাথে হৃদয়ের-আত্মার-প্রাণের সম্পর্ককে। যিয়ারাতে বাইতুল্লাহকে অামাদের জন্য সহজ করে দেন। বারবার আমাদের কিসমতে দান করেন হারামাইন শরীফাইন যিয়ারাতের সুবর্ণ সুযোগ। আমিন।

ছবি: অন্তর্জাল।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে জুন, ২০১৯ দুপুর ১২:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



