somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নতুন নকিব
নিজেকে লেখক বলে পরিচয় দিতে সংকোচ হয়; লেখালেখি ইবাদতসদৃশ সাধনা বলেই লিখি। নিজেকে জানা, বিশ্বকে অনুধাবন করা এবং সর্বোপরি মহান স্রষ্টার পরিচয় অন্বেষণই আমার নীরব যাত্রার পাথেয়। দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়-সৃষ্টিকূলকে ভালোবাসায় আগলে রাখার শিক্ষাই ইসলামের মূল বাণী।

আমার দেখা অবরুদ্ধ আল আকসা মসজিদ - অস্ট্রেলিয়ার বিশিষ্ট দায়ী মুহাম্মদ হাবলোস

২১ শে মে, ২০২১ বিকাল ৩:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ছবিঃ অন্তর্জাল।

আমার দেখা অবরুদ্ধ আল আকসা মসজিদ - অস্ট্রেলিয়ার বিশিষ্ট দায়ী মুহাম্মদ হাবলোস

ফিলিস্তিনে যাওয়ার উদ্দেশ্যে আমরা জর্ডান যাই। সেখান থেকে বাসে করে আমরা সামনে যেতে শুরু করি। সীমান্তের কাছাকাছি গেলেই ইসরাইলের পতাকা দেখতে পাবেন। অনেক উঁচুতে উড়ছে। এটা দেখেই আপনার হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাবে। তখন এক অদ্ভুত অনুভূতি টের পাবেন। কিছুটা ভয়, কিছুটা ক্ষোভ, কিছুটা হতাশা। যেহেতু আমি অস্ট্রেলিয়ান, তাই আমার অস্ট্রেলিয়ান পাসপোর্ট লাগবে। যখন আপনি প্রথমবারের মতো ইসরাইলিদের দেখবেন, হৃদয় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাবে। মনে হবে শরীরে যেন বিষক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। তাদের কাছে গেলে তারা হাসিমুখে আপনাকে স্বাগত জানাবে না। নিজেকে একজন নির্বাসিত ব্যক্তি ভাবতে ওরা আপনাকে বাধ্য করবে।

বর্ডারে পৌঁছলে ওরা আপনাকে বাস থেকে নামিয়ে দিবে এবং ভেতরে গিয়ে আপনাকে এক জায়গায় বসে থাকতে হবে। ৩ ঘণ্টা, ৪ ঘণ্টা, ৫, ৬, ৭, ৮ ঘণ্টা। এত সময় পরও আপনাকে প্রশ্ন করা হবে না। আপনি ফিলিস্তিনে যাওয়া অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক, কিন্তু আপনাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রাখবে।

বসে থাকার সময় দেখবেন একজন ফিলিস্তিন নাগরিক যাকে আমরা চাচা বা হাজী বলে সম্বোধন করি, ৭০-৭৫ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ মানুষ। আর ১৭-১৮ বছর হবে এমন বয়সী ইসরাইলি নারী সেনা সেই বৃদ্ধ লোকটির সাথে কথা বলছে। এমনভাবে অর্ডার দিচ্ছে মনে হচ্ছে বৃদ্ধ লোকটি কোনো জন্তু জানোয়ার। মনে হয় লোকটি কোনো মানুষই নয়, যেন কোনো পশু। সেই ইসরাইলি নারীটি কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করে বৃদ্ধ লোকটিকে অর্ডার দিচ্ছে।

আর আপনি কষ্টটা অনুভব করতে পারবেন। আর সেখানে দাঁতে দাঁত চেপে আপনাকে এটা সহ্য করতে হবে। এই লোকটি ফিলিস্তিনের অধিবাসী। এই ফিলিস্তিনি লোকটি যেখানে সম্মান পাওয়ার কথা সেখানে ১৮ বছরের একটি মেয়ে অর্ডার দিচ্ছে।

যাহোক, সেখানে বসে থাকার পর আপনাকে ডাকা হবে। সেখানে নারীর উপস্থিতি কাকতালীয় নয়, সে আপনাকে ডাকলে আপনি তার সাথে ভেতরে গিয়ে অন্য রুমে বসতে হবে। আপনাকে জিজ্ঞেস করবে তুমি কে? কেন ইসরাইলে এসেছ? তোমার এখানে কাজ কি? হজ শেষে বাড়ি না গিয়ে কেন এখানে এসেছ? এভাবে প্রশ্ন করতেই থাকবে আধা ঘণ্টা ধরে। আবার চলে যাবে। দুই তিন ঘণ্টা পর আবার এসে আবার প্রশ্ন করবে। এরপর আপনাকে আরেক জায়গায় পাঠাবে। সেখানে ১-২ ঘণ্টা বসে থাকার পর আবার আপনাকে একই প্রশ্ন করবে। এভাবে চলতে থাকবে। এরপর আপনার ফিলিস্তিনে যাওয়ার ইচ্ছে মরে যাবে। এবার তারা যেতে দিবে।

আপনি ইসরাইলে প্রবেশ করলেই তাদের শোষণ টের পাবেন। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে মাইলের পর মাইল কংক্রিটের উঁচু দেয়াল দেখতে পাবেন। মাইলের পর মাইল কংক্রিটের দেয়ালগুলো ফিলিস্তিনিদের আলাদা করে রেখেছে। শহরের ভেতরের দেয়ালগুলোতে এমনভাবে গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে যেন সব নরমাল মনে হয়।

এরপর যখন আপনি মাসজিদুল আকসায় প্রবেশ করতে যাবেন, দেখবেন ইসরাইলি সেনারা চার দিক ঘিরে আছে। তাদের কাছে আপনার পাসপোর্ট আইডি সব দেখাতে হবে। এক ইসরাইলি সেনা যার কাছে অটোমেটিক অস্ত্র রয়েছে তাকে বলতে হবে আমি কেন আল্লাহর ঘরে প্রবেশ করতে চাই।

যাহোক এগুলোর পর মসজিদে প্রবেশ করবেন। ভেতরে গিয়ে মনে হবে মসজিদের দেয়ালগুলো যেন কাঁদছে। সেখানে কোনো যুবক নেই। কারণ সেখানে তাদের প্রবেশাধিকার নেই। ভেতরে আপনি গ্লাসের তৈরি স্ট্রান্ড দেখতে পাবেন। যেখানে বোমা, গোলাবারুদ ইত্যাদি রাখা আছে। যেগুলো বিভিন্ন সময়ে এই মসজিদে নিক্ষেপ করা হয়েছে। বোমার গায়ে লেখা ‘মেড ইন ইউএসএ’।

এশার নামাজের পর ভাববেন যে আরো একটু ইবাদত করি। কিন্তু তা অসম্ভব, কারণ তারা মসজিদে তালা লাগিয়ে দেবে। রাত সাড়ে নয়টার মধ্যে আপনাকে বের হয়ে যেতে হবে। ইসরাইলিরাই সবশেষে মসজিদ পরিদর্শন করবে।

তারা কি মসজিদকে সম্মান করে খালি পায়ে প্রবেশ করবে? না মোটেই না। আর সবকিছু আপনার সামনে ঘটলেও আপনি কিছু বলতে পারবেন না। ফিলিস্তিনিদের যদি আপনি প্রশ্ন করেন মুসলিমরা কোথায়? এখানে এত কম মুসলিম কেন? তারা বলবে, মসজিদে আসতে গেলে কমপক্ষে ৫ বার আইডি কার্ড আর পাসপোর্ট দেখাতে হয়। একজন স্থানীয় লোকের মসজিদে প্রবেশ করতে ৫ বার আইডি, পাসপোর্ট দেখাতে হয়। আর যদি সে পাসপোর্ট আনতে ভুলে যায় তার ক্ষতি হতে পারে। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে।

৭ কি.মি যেতে তাদের দুইবার থামতে হয়। গাড়ি থেকে নেমে দুইবার আইডি দেখাতে হয়। স্ত্রী সাথে থাকলে তাকেও নামতে হয়। পুরো গাড়ি সার্চ করে তারা। প্রতিদিন এটা চলতে থাকে। আর কাউকে যদি সেই পথে ২-৪ বার চলতে হয় তাকেও সেই একই পরিচিত গার্ড আগের মতো চেক করে। এমন সময় আপনার কেমন লাগবে? এত বাজে ব্যাপার।

তো আমরা হাইওয়ে দিয়ে চলতে চলতে ফিলিস্তিনের পবিত্র ভ‚মি দেখছিলাম। আর হঠাৎ এমন কিছু অদ্ভুত জিনিস দেখছিলাম যেগুলো সেখানে থাকার কথা ছিল না। দেখলাম ঝোপের মাঝে একটা কন্টেইনার পড়ে আছে। জানেন সেগুলো কেন আছে? ফিলিস্তিনের জমিতে কোনো এক ইসরাইলি তার কন্টেইনার রেখে দিয়েছে।

সে এসে এখানে বসে থাকে। কিছু করে না। এভাবে মাস, বছর দেখে আপনি অভ্যস্ত হয়ে যাবেন। যখন কোনো ফিলিস্তিনি আর প্রশ্ন করে না এই কন্টেইনার সম্পর্কে, তখন সেই ইসরাইলি এখানে বাড়ি তৈরি করে। সে জমি তার হয়ে গেল! সব যায়গায় এমন ছোট ছোট কন্টেইনার দেখতে পাবেন।

সময় শেষ। আরো কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করি, যখন আমরা মসজিদে খলিলে প্রবেশ করি যেখানে ইবরাহিম (আ.)-কে কবরস্থ করা হয়। আমি বাড়িয়ে বলছি না। ইতিহাস ঘেটে দেখেন মসজিদে খলিল মুসলিমদের অধিকারে ছিল। ১৯৯৪ সালে যখন মুসলিমরা এখানে ফজরের সালাত আদায় করছিল এক ইহুদি ডাক্তার সেখানে গিয়ে সিজদারত মুসলিমদের গুলিবর্ষণ করে। ৩০ জনকে হত্যা করে ১২৫ জনকে আহত করে।

এরপর কি হয়েছিল জানেন? ইসরাইলিরা মসজিদটি বন্ধ করে দেয় এবং তদন্ত শুরু করে দেয়। সেই তদন্ত শেষে তারা মসজিদের অর্ধেক দখলে নিয়ে ইহুদি উপাসনাগার বানায়। আর সেই অমানুষ (ডাক্তার) তাকে কি বলব আমি জানি না, তার কবরটি মন্দিরে পরিণত হয় এবং কট্টর ইহুদিরা সেখানে গিয়ে তার কবরের কাছে প্রার্থনা করে। তাকে হিরো বলে।

শপথ আল্লাহর, আপনি ফিলিস্তিনে গিয়ে দেখবেন যা টিভিতে দেখেন তার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। আল্লাহর কসম সেখানকার অত্যাচার একজন মুসলমি এর চোখের দিকে তাকালে দেখতে পারবেন। তাদের চোখ দেখলে বুঝতে পারবেন তারা অন্য মুসলিম ভাইদের আশা করে আছে। সময় কম তাই আরো অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারলাম না।

ইসরাইলিরা চায় আপনি ফিলস্তিনকে ভুলে যান। এটাই সত্যি। তারা টাকা, ট্যুরিজম কিছুই চায় নাঅ। তারা চায় আপনি (মুসলিম) আর ফিলিস্তিনিরা যাতে ধ্বংস হয়ে যায়। যখন সেই জায়গার নাম মুসলিমদের হৃদয় থেকে মুছে যাবে তখন তারা সার্থক।

কখনো ভেবে দেখেছেন আমরা ফিলিস্তিন সম্পর্কে এত কম জানি কেন? মসজিদ আল কুদসের ইমামের একটা অনুরোধ পেশ করে শেষ করছি। তিনি আমাকে বলেন, ‘দয়া করে ফিরে যান। আর মুসলিম যুবকদের বলেন তারা যেন এখানে আসে। এবং তারা বুঝতে পারবে ফিলিস্তিনে যা ঘটছে তা পুরোপুরি বাস্তব।’ -অস্ট্রেলিয়ার বিশিষ্ট দায়ী এবং অনলাইন প্লাটফর্ম OnePath Network এর প্রতিষ্ঠাতা Malaz Majanni Kamal Saleh Mohammad Hoblos সংক্ষেপে মুহাম্মাদ হাবলোসের ইংরেজি লেকচার থেকে অনূদিত।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মে, ২০২১ বিকাল ৩:১৯
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ১৯৩

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৮ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫০



আর্জেন্টিনা দুই গোল খেয়ে গেছে!
মেসি পেনাল্টি মিস করেছে। এদিকে খেলা অর্ধেক শেষ। তখনও আমি বলেছি, আর্জেন্টিনা জিতবে। কোনো চিন্তা নাই। প্যারা নাই। চিল। হ্যা আমার কথাই সত্য হয়েছে। আর্জেন্টিনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

এদেরকে না রুখলে চড়া মূল্য দিতে হবে

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৮ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬



মাহবুব আজিজ, আনিস আলমগীর, সোমা ইসলাম, শাওন, মঞ্জুরুল পান্না, শম্পা রেজা, কালচারাল ফ্যাসিস্ট ফরিদুর রেজা শাইখ সিরাজ এদেরকে এখনই বন্ধ করতে হবে না হলে বাংলাদেশকে চড়া মূল্য দিতে হবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

কত ভেবেছি, আমাদের একদিন দেখা হবেই

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ০৮ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৯

কত ভেবেছি,
আমাদের একদিন দেখা হবেই।
হয়তো হঠাৎ সামনে এসে
আমাকে চমকে দেবে।
হায়,
ওরা কেন জানালো,
পৃথিবীতে
তুমি আর বেঁচে নেই!

কত ভেবেছি,
চলতে চলতে পথে
সামনে একটা রিকশা থেমে যাবে।
কী মোহন ভঙ্গিমায়
রাজাসনে বসে আছো তুমি,
রোদে ভেজা মুখ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পি ভি নরসিমা রাও - ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কারের জনক

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৯ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৪৩



পি ভি নরসিমা রাও ১৯৯১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তৎকালীন ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় যে ঐতিহাসিক সংস্কারনীতি গ্রহণ করেন, তা "এলপিজি সংস্কার" (LPG Reforms - Liberalisation,... ...বাকিটুকু পড়ুন

সব দোষ গাজী সাহেবের!

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৯ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ২:৫৩



ধরেন, এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে। শেখ হাসিনা সংসদ ভবনের সামনে ভারতের স্বাধীনতা দিবস জাঁকজমক করে পালন করলেন। ভারতের শীর্ষ নেতা এলেন, ভারতের পতাকা উড়ল...

এখন চুপ করে থাকা পাকিস্থানপন্থীরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×