
আরবের সাহিত্যের স্বর্ণযুগে, যখন কবিতা ছিল জাতির প্রাণশক্তি এবং ওকাজের মেলায় কাব্য প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ কবিতা সোনার কালিতে লিখে কাবার দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখা হতো, ঠিক সেই সময় আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রিয় নবীজি হজরত মুহাম্মদ ﷺ -কে পাঠিয়েছিলেন। সাহিত্যপ্রিয় আরব জাতির প্রতি এক পারস্য মনীষীর বিস্ময়মিশ্রিত মন্তব্য ছিল, “আরবদের শিরায় রক্ত প্রবাহিত হয় না, বরং কবিতার স্রোত বয়ে যায়।” এমন এক সাহিত্যপাগল সমাজে নবীজি ﷺ -এর আগমন ছিল স্বয়ং এক মোজেজা। পবিত্র কুরআন তো ছিল চ্যালেঞ্জস্বরূপ জীবন্ত মোজেজা, আর তাঁর মুখনিঃসৃত বাণী ছিল কুরআনময় সারসমৃদ্ধতায় ভরপুর।
নবীজি ﷺ নিজেই ঘোষণা করেছেন যে তিনি প্রেরিত হয়েছেন সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপকার্থক সারগর্ভ বাক্যের সঙ্গে। তাঁর প্রতিটি কথায় উপমার অপূর্ব ব্যবহার ছিল এমন যে, অপরিচিত বিষয়কে চোখের সামনে জীবন্ত করে তুলত। সাধারণ মানুষের জন্য জটিল ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা উপমার মাধ্যমে সহজবোধ্য করে তুলতেন তিনি। প্রকৃতি, প্রাণী ও মানবজীবনের সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্য থেকে উদ্ভূত এই উপমাগুলো আজও আমাদের মুগ্ধ করে, নতুন করে নবীপ্রেম জাগিয়ে তোলে।
নবী কারিম ﷺ বলেছেন,
بُعِثْتُ بِجَوَامِعِ الْكَلِمِ
“আমি প্রেরিত হয়েছি সারসমৃদ্ধ সংক্ষিপ্ত বাক্যের সাথে।” -সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৯৭৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫২৩
নবীজি ﷺ বলেন,
مَثَلُ الصَّاحِبِ الصَّالِحِ وَالصَّاحِبِ السَّوْءِ كَمَثَلِ صَاحِبِ الْمِسْكِ وَنَافِخِ الْكِيرِ ، صَاحِبُ الْمِسْكِ إِمَّا أَنْ يُعْطِيَكَ ، وَإِمَّا أَنْ تَبْتَاعَ مِنْهُ ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيحًا طَيِّبَةً ، وَنَافِخُ الْكِيرِ إِمَّا أَنْ يُحْرِقَ ثِيَابَكَ ، وَإِمَّا أَنْ تَجِدَ مِنْهُ رِيحًا خَبِيثَةً
“সৎ ও অসৎ বন্ধুর উপমা হলো আতর বিক্রেতা ও হাপরে ফুঁ দেওয়া কামারের মতো। আতরওয়ালা হয়তো তোমাকে আতর উপহার দেবে, নয়তো তুমি তার কাছ থেকে আতর কিনবে, নয়তো অন্তত তার সুঘ্রাণ পাবে। আর কামার হয়তো তোমার কাপড় জ্বালিয়ে দেবে, নয়তো তার কাছ থেকে দুর্গন্ধ পাবে।” -সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৫৩৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬২৮
নবীজি ﷺ বলেছেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ الَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ كَمَثَلِ الْأُتْرُجَّةِ طَيِّبَةٍ رِيحُهَا وَطَيِّبَةٍ طَعْمُهَا ، وَمَثَلُ الْمُؤْمِنِ الَّذِي لَا يَقْرَأُ الْقُرْآنَ كَمَثَلِ التَّمْرَةِ طَيِّبَةٍ طَعْمُهَا وَلَا رِيحَ لَهَا ، وَمَثَلُ الْمُنَافِقِ الَّذِي يَقْرَأُ الْقُرْآنَ كَمَثَلِ الرَّيْحَانَةِ طَيِّبَةٍ رِيحُهَا وَمُرَّةٍ طَعْمُهَا ، وَمَثَلُ الْمُنَافِقِ الَّذِي لَا يَقْرَأُ الْقُرْآنَ كَمَثَلِ الْحَنْظَلَةِ مُرَّةٍ طَعْمُهَا وَلَا رِيحَ لَهَا
“কুরআন তিলাওয়াতকারী মুমিনের দৃষ্টান্ত কমলালেবুর মতো। এর স্বাদ উৎকৃষ্ট এবং গন্ধও সুমিষ্ট। যে মুমিন কুরআন তিলাওয়াত করেন না, তার দৃষ্টান্ত খেজুরের মতো। খেজুর সুস্বাদু কিন্তু গন্ধহীন। পাপাচারী কুরআন তিলাওয়াতকারীর দৃষ্টান্ত সুগন্ধি ফুলের মতো। যার গন্ধ আছে কিন্তু স্বাদ তিক্ত। আর যে পাপাচারী এবং কুরআন পড়েন না, তার দৃষ্টান্ত মাকাল ফলের মতো। যার স্বাদ ও গন্ধ কোনোটিই নেই।” -সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০২০
নবীজি ﷺ বলেন,
إِنَّ مَثَلِي وَمَثَلَ الْأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِي كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى بَيْتًا فَأَحْسَنَهُ وَأَجْمَلَهُ إِلَّا مَوْضِعَ لَبِنَةٍ مِنْ زَاوِيَةٍ فَجَعَلَ النَّاسُ يَطُوفُونَ بِهِ وَيَعْجَبُونَ لَهُ وَيَقُولُونَ هَلَّا وُضِعَتْ هَذِهِ اللَّبِنَةُ قَالَ فَأَنَا اللَّبِنَةُ وَأَنَا خَاتِمُ النَّبِيِّينَ
“আমার এবং পূর্ববর্তী নবীদের দৃষ্টান্ত সুরম্য প্রাসাদের মতো, যার প্রাচীর অত্যন্ত সুসজ্জিত ও মনোলোভা। কিন্তু একটি ইটের স্থান ফাঁকা রাখা হয়েছে। দর্শনার্থীরা প্রাসাদ ঘুরে দেখেন এবং ফাঁকা স্থানটি ছাড়া এর নির্মাণশৈলীতে বিস্ময় প্রকাশ করেন। আমি এসে সেই ইটের শূন্যস্থান পূরণ করেছি।” -সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৫৩৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৮৬
নবীজি ﷺ বলেছেন,
يَدْرُسُ الإِسْلاَمُ كَمَا يَدْرُسُ وَشْىُ الثَّوْبِ
“ইসলাম ধীরে ধীরে বিবর্ণ হতে থাকবে, যেভাবে কাপড়ের নকশা বিবর্ণ হয়।” -সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৪০৪৯
নবীজি ﷺ বলেন,
لَيَأْتِيَنَّ عَلَى أُمَّتِي مَا أَتَى عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ حَذْوَ النَّعْلِ بِالنَّعْلِ
“বনি ইসরাইলের যা ঘটেছে, অচিরেই আমার উম্মতেরও তাই হবে, যেভাবে এক পায়ের জুতা অপর পায়ের জুতার সমান হয়।” -জামি‘ আত-তিরমিজি, হাদিস: ২৬৪১
নবীজি ﷺ বলেছেন,
تُعْرَضُ الْفِتَنُ عَلَى الْقُلُوبِ كَالْحَصِيرِ عُودًا عُودًا فَأَيُّ قَلْبٍ أُشْرِبَهَا نُكِتَ فِيهِ نُكْتَةٌ سَوْدَاءُ وَأَيُّ قَلْبٍ أَنْكَرَهَا نُكِتَ فِيهِ نُكْتَةٌ بَيْضَاءُ حَتَّى تَصِيرَ عَلَى قَلْبَيْنِ عَلَى أَبْيَضَ مِثْلِ الصَّفَا فَلَا تَضُرُّهُ فِتْنَةٌ مَا دَامَتِ السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ وَالْآخَرُ أَسْوَدُ مُرْبَادًّا كَالْكُوزِ مُجَخِّيًا لَا يَعْرِفُ مَعْرُوفًا وَلَا يُنْكِرُ مُنْكَرًا إِلَّا مَا أُشْرِبَ مِنْ هَوَاهُ
“ফিতনা অন্তরে এমনভাবে প্রবেশ করে, যেভাবে বোনা চাটাইয়ের এক অংশ অপর অংশের মধ্যে প্রবেশ করে। যে অন্তরে ফিতনা প্রবেশ করে, সেখানে কালো দাগ পড়ে। আর যে অন্তর ফিতনাকে স্থান দেয় না, সেখানে সাদা দাগ পড়ে। ফলে অন্তর দুই প্রকার হয়। একটি মর্মর পাথরের মতো সাদা অন্তর, যতদিন আকাশ-পৃথিবী থাকবে ততদিন এতে ফিতনা প্রবেশ করতে পারবে না। আরেকটি উপুড় করা হাঁড়ির তলার মতো কুচকুচে কালো অন্তর, যা ভালো-মন্দ বোঝে না, শুধু প্রবৃত্তির অনুসরণ করে।” -সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৪৪
নবীজি ﷺ বলেছেন,
إِنَّ الَّذِي لَيْسَ فِي جَوْفِهِ شَيْءٌ مِنَ الْقُرْآنِ كَالْبَيْتِ الْخَرِبِ
“যার অন্তরে কুরআনের কোনো অংশ নেই, সে যেন এক বিরান ঘর।” -সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস: ২৯১৩
নবীজি ﷺ বলেছেন,
أَلَا وَإِنَّ لِلْقَلْبِ رَانًا كَرَانِ الْحَدِيدِ (জিজ্ঞাসা করা হলে) ذِكْرُ الْمَوْتِ وَتِلَاوَةُ الْقُرْآنِ
“অন্তরে মরিচা পড়ে, যেভাবে লোহায় পানির সংস্পর্শে মরিচা ধরে। মরিচা দূর করার উপায় কী? উত্তর: মৃত্যুকে বেশি স্মরণ করা এবং কুরআন তিলাওয়াত করা।” -মিশকাত আল-মাসাবিহ, হাদিস: ২১৬৮
নবীজি ﷺ বলেছেন,
تَعَاهَدُوا الْقُرْآنَ فَوَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَهُوَ أَشَدُّ تَفَصِّيًا مِنَ الإِبِلِ فِي عُقُلِهَا
“কুরআন সংরক্ষণে সতর্ক থাকো। সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ, কুরআন রশিতে বাঁধা উটের চেয়েও বেশি পলায়নপর।” -সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫০৩৩
এসব উপমাসমৃদ্ধ হাদিস মাত্র কয়েকটি নমুনা। নবীজি ﷺ -এর অমূল্য হাদিসগ্রন্থগুলোতে ভোরের শিশিরের মতো ঝলমল করা অসংখ্য উপমা ছড়িয়ে রয়েছে। কোনো ঘটনার পরপর সংঘটনকে তিনি সুতাছেঁড়া পুঁতির দানার সঙ্গে, দুই জাতির সমপরিণতিকে দুই পায়ের জুতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। এই অতুলনীয় ভাষাশৈলী আমাদের বিস্ময় ও মুগ্ধতায় ভরিয়ে দেয় এবং নবীজি ﷺ -এর প্রতি ভালোবাসা নতুন করে জাগিয়ে তোলে।
নবীজি ﷺ -এর উপমায় প্রাণ ও প্রকৃতি
মহানবী ﷺ -এর দাওয়াতি কর্মসূচিতে উপমা ছিল এক অপরিহার্য অংশ। প্রাত্যহিক জীবনের পরিচিত বস্তু ও প্রকৃতির ছবি টেনে এনে তিনি জটিল বিষয়কে সহজ করে তুলতেন। তাঁর উপমায় প্রাণ ও প্রকৃতির সঙ্গে গভীর সখ্য ফুটে ওঠে। এসব উপমা থেকে বোঝা যায়, তিনি প্রকৃতিকে কত সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।
নবীজি ﷺ বলেন,
مَثَلُ مَا بَعَثَنِي اللَّهُ بِهِ مِنَ الْهُدَى وَالْعِلْمِ كَمَثَلِ غَيْثٍ أَصَابَ أَرْضًا فَكَانَتْ مِنْهَا طَائِفَةٌ طَيِّبَةٌ قَبِلَتِ الْمَاءَ فَأَنْبَتَتِ الْكَلَأَ وَالْعُشْبَ الْكَثِيرَ وَكَانَتْ مِنْهَا أَجَاجَةٌ أَمْسَكَتِ الْمَاءَ فَنَفَعَ اللَّهُ بِهَا النَّاسَ فَشَرِبُوا وَسَقَوْا وَزَرَعُوا وَأَصَابَتْ مِنْهَا طَائِفَةٌ أُخْرَى إِنَّمَا هِيَ قِيعَانٌ لَا تُمْسِكُ مَاءً وَلَا تُنْبِتُ كَلَأً فَذَلِكَ مَثَلُ مَنْ فَقِهَ فِي دِينِ اللَّهِ وَنَفَعَهُ مَا بَعَثَنِي اللَّهُ بِهِ فَعَلِمَ وَعَلَّمَ وَمَثَلُ مَنْ لَمْ يَرْفَعْ بِذَلِكَ رَأْسًا وَلَمْ يَقْبَلْ هُدَى اللَّهِ الَّذِي أُرْسِلْتُ بِهِ
“আল্লাহ আমাকে যে হেদায়েত ও জ্ঞান দিয়ে পাঠিয়েছেন, তার উদাহরণ প্রবল বৃষ্টির মতো, যা কোনো ভূখণ্ডে পড়েছে। কিছু অংশ উর্বর ছিল, পানি শুষে নিয়ে প্রচুর ঘাস-লতা জন্মিয়েছে। কিছু অংশ শক্ত ছিল, পানি ধরে রেখেছে, ফলে মানুষ উপকৃত হয়েছে, তারা পান করেছে, পশুকে পান করিয়েছে ও চাষ করেছে। আবার কিছু অংশ সমতল মরুভূমি, যা পানি ধরে না, ঘাসও জন্মায় না। যারা চিন্তাশীল, তারা হেদায়েত গ্রহণ করে। যারা অজ্ঞ ও অহংকারী, তারা হেদায়েত পায় না।” -সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৮২
নবীজি ﷺ বলেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ كَمَثَلِ النَّخْلَةِ لَا تَسْقُطُ وَرَقَتُهَا
“এমন এক গাছ আছে, যার পাতা কখনো ঝরে না। সেই গাছ মুমিনের মতো। সেটি কোন গাছ? সাহাবিরা উত্তর দিতে পারেননি। নবীজি ﷺ বললেন, ‘খেজুরগাছ।’” -সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩১; সুনান আত-তিরমিজি, হাদিস: ২৮৬৭
নবীজি ﷺ বলেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ كَمَثَلِ النَّخْلَةِ أَيَّمَا شَيْءٍ أَخَذْتُمْ مِنْهَا فَهُوَ نَافِعٌ
“মুমিনের উদাহরণ খেজুরগাছের মতো। যা-ই গ্রহণ করো, তা উপকারী হবে।” -সহিহুল জামে, হাদিস: ৫৮৪৮
নবীজি ﷺ বলেন,
إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ مَا فَتَحَ اللَّهُ عَلَيْكُمْ مِنْ بَرَكَاتِ الْأَرْضِ (অতিরিক্ত ঘাস খেয়ে পশুর মৃত্যুর উপমা দিয়ে)
“আমি তোমাদের জন্য সবচেয়ে বেশি যা আশঙ্কা করি, তা দুনিয়ার চাকচিক্য। কল্যাণ কখনো অকল্যাণ বয়ে আনে না। ধনসম্পদ আকর্ষণীয়, কিন্তু বসন্তে অতিরিক্ত ঘাস খেয়ে পশু মারা যায়। যে পরিমাণমতো খায়, সে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না।” -সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪২৭
নবীজি ﷺ বলেন,
مَثَلِي وَمَثَلُ النَّاسِ كَمَثَلِ رَجُلٍ اسْتَوْقَدَ نَارًا فَلَمَّا أَضَاءَتْ مَا حَوْلَهَا جَعَلَ الْفَرَاشُ وَالْجَانُّ يَقَعُونَ فِيهَا فَجَعَلَ يَدْفَعُهُمْ وَهُمْ يَقَعُونَ فِيهَا
“আমার ও মানুষের উদাহরণ সেই ব্যক্তির মতো, যে আগুন জ্বালাল। আলো ছড়ালে পোকা-পতঙ্গ ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে তাদের সরানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তারা আগুনে পড়ল। আমি তোমাদের জাহান্নাম থেকে টেনে রাখছি, অথচ তোমরা তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ছ।” -সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৮৩
নবীজি ﷺ বলেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ وَالْإِيمَانِ كَمَثَلِ الْفَرَسِ الْمُعَقَّلَةِ فِي الْوَتَدِ تَدُورُ وَتَرْجِعُ إِلَى وَتَدِهَا
“মুমিন ও ইমানের উদাহরণ সেই ঘোড়ার মতো, যা খুঁটিতে বাঁধা। সে ঘুরে ঘুরে শেষে খুঁটিতে ফিরে আসে। মুমিনও অমনোযোগী হয়, কিন্তু ইমানে ফিরে আসে।” -সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৩৮৩৭; শুআবুল ইমান, বায়হাকি, হাদিস: ১০৪৬০
নবীজি ﷺ বলেন,
مَثَلُ الَّذِي يَأْكُلُ بِلِسَانِهِ مِنَ الدُّنْيَا كَمَثَلِ الْبَقَرَةِ تَأْكُلُ بِلِسَانِهَا مِنَ الْأَرْضِ
“অচিরেই এমন জাতি আসবে, যারা জিহ্বা দিয়ে দুনিয়ার ধন ভক্ষণ করবে, যেভাবে গরু জিহ্বা দিয়ে ঘাস খায়।” -মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ১৫১৭
নবীজি ﷺ বলেন,
أَرَأَيْتُمْ لَوْ أَنَّ نَهْرًا بِبَابِ أَحَدِكُمْ يَغْتَسِلُ فِيهِ كُلَّ يَوْمٍ خَمْسَ مَرَّاتٍ هَلْ يَبْقَى مِنْ دَرَنِهِ شَيْءٌ قَالُوا لَا قَالَ فَذَلِكَ مَثَلُ الصَّلَوَاتِ الْخَمْسِ يَمْحُو اللَّهُ بِهَا الْخَطَايَا
“তোমাদের বাড়ির সামনে নদী থাকলে প্রতিদিন পাঁচবার গোসল করলে শরীরে ময়লা থাকবে? না। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও তেমনি, গোনাহ মিটিয়ে দেয়।” -সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৮
নবীজি ﷺ বলেন,
الصَّلَاةُ جَمَاعَةً خَيْرٌ مِنْ صَلَاةِ الْفَذِّ بِسَبْعٍ وَعِشْرِينَ دَرَجَةً وَالذِّئْبُ يَأْكُلُ الشَّاةَ الْقَاصِيَةَ
“জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়ো। নেকড়ে সেই ভেড়া খায়, যে পাল থেকে আলাদা হয়।” -সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৫৪৭
নবীজি ﷺ বলেন,
النَّاسُ مَعَادِنُ كَمَعَادِنِ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ
“মানুষ স্বর্ণ-রুপার খনির মতো। জাহিলি যুগে যারা উত্তম ছিল, ইসলাম গ্রহণের পরও উত্তম হবে যদি জ্ঞান অর্জন করে।” -সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৩৮
নবীজি ﷺ বলেন,
مَثَلُ الَّذِي يَسْمَعُ الْحِكْمَةَ ثُمَّ لَا يُبَلِّغُهَا كَمَثَلِ رَاعٍ أَتَى رَاعِيًا فَقَالَ أَعْطِنِي شَاةً لِأَذْبَحَهَا فَقَالَ اذْهَبْ فَخُذْ أَحْسَنَ شَاةٍ فَأَخَذَ كَلْبَ الْغَنَمِ
“প্রজ্ঞা শুনে মন্দ অংশ প্রচারকারীর উদাহরণ সেই লোকের মতো, যে রাখালের কাছে গিয়ে ছাগল চাইল। রাখাল বলল, ভালো ছাগলের কান ধরে নাও। সে কুকুরের কান ধরল।” -মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ৯২৬০
নবীজি ﷺ বলেন,
إِذَا اغْتَسَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيُبْلِغِ الْمَاءَ جَذُورَ الشَّعْرِ وَالْبَشَرَةَ فَإِنَّ مَثَلَ الَّذِي لَا يُبْلِغُ الْمَاءَ إِلَى جَذُورِ الشَّعْرِ كَمَثَلِ الشَّجَرَةِ الَّتِي رُشَّ عَلَيْهَا الْمَاءُ وَلَمْ تَبْلُلْ وَرَقُهَا وَلَا أَصْلُهَا
“গোসলের সময় চুলের গোড়া ও চামড়া ভালো করে ভেজাও। যারা তা করে না, তাদের উদাহরণ সেই গাছের মতো, যার ওপর পানি ছিটানো হয়েছে কিন্তু পাতা ও গোড়া ভেজেনি।” -আল-মুজামুল কাবির লিত-তাবরানি
নবীজি ﷺ বলেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ كَمَثَلِ الذَّهَبِ الْخَالِصِ لَا يَتَغَيَّرُ بِالنَّارِ وَمَثَلُ الْمُؤْمِنِ كَمَثَلِ النَّحْلَةِ تَأْكُلُ الطَّيِّبَ وَتَخْرُجُ الطَّيِّبَ
“মুমিন স্বর্ণের টুকরোর মতো, আগুনে পুড়েও অপরিবর্তিত থাকে। মুমিন মৌমাছির মতো, পবিত্র খায়, পবিত্র বের করে এবং ফুল নষ্ট করে না।” -মুসনাদ আহমদ, হাদিস: ৬৮৭২
নবীজি ﷺ বলেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِ كَمَثَلِ الزَّرْعِ يَمِيلُ مَرَّةً وَيَسْتَقِيمُ مَرَّةً وَمَثَلُ الْمُنَافِقِ كَمَثَلِ الْأَرْزَةِ لَا تَمِيلُ حَتَّى تُقْطَعَ
“মুমিন নরম চারাগাছের মতো, বাতাসে নোয়ায় আবার সোজা হয়। মোনাফিক দেবদারু গাছের মতো, কখনো নোয়ায় না, শেষে মূলসহ উপড়ে যায়।” -সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৬৪৩
নবীজি ﷺ বলেন,
إِنَّ هَذَا الدِّينَ مَتِينٌ فَأَوْغِلُوا فِيهِ بِرِفْقٍ وَلَا تُثْقِلُوا أَنْفُسَكُمْ فَإِنَّ الْبَعِيرَ إِذَا أُثْقِلَ لَمْ يَبْلُغْ وَلَمْ يَبْقَ
“দীন অত্যন্ত মজবুত। কোমলতার সঙ্গে প্রবেশ করো। ইবাদতকে বিরক্তিকর করো না। যে বাহনকে অতিরিক্ত চাপ দেয়, সে পথও পার হয় না, বাহনও বাঁচায় না।” -শরহুস সুন্নাহ লিল-বাগাবি
নবীজি ﷺ বলেন,
لَا يُلْدَغُ الْمُؤْمِنُ مِنْ جُحْرٍ وَاحِدٍ مَرَّتَيْنِ
“মুমিন একই গর্ত থেকে দুবার দংশিত হয় না।” -সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৩৩
নবীজি ﷺ বলেছেন,
مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِي تَوَادِّهِمْ وَتَرَاحُمِهِمْ وَتَعَاطُفِهِمْ مَثَلُ الْجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهَرِ وَالْحُمَّى
“মুমিনদের পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া ও সহানুভূতির উদাহরণ একটি দেহের মতো। যখন দেহের একটি অংশ আক্রান্ত হয়, তখন পুরো দেহ জ্বর ও অনিদ্রায় কষ্ট পায়।” -সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৮৬; সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১১
নবীজি ﷺ বলেছেন,
مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لَا يَذْكُرُ مَثَلُ الْحَيِّ وَالْمَيِّتِ
“যে আল্লাহকে স্মরণ করে আর যে করে না, তাদের উদাহরণ জীবিত ও মৃতের মতো।” -সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪০৭
এসব উপমা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ প্রকৃতিকে অত্যন্ত গভীর ও সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তাঁর অসাধারণ, অনন্য এবং অনুপম উপমাগুলো জটিল ধর্মীয় ও নৈতিক সত্যগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য, হৃদয়গ্রাহী এবং চিরস্মরণীয় করে তুলত। এই অতুলনীয় উপমা-প্রয়োগের ধারা ছিল তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশক্তি, সৃজনশীল চিন্তা এবং মানুষের মনকে সহজে স্পর্শ করার অসাধারণ ক্ষমতারই এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।
রেফারেন্সঃ
সহিহ বুখারি
সহিহ মুসলিম
সুনান আত-তিরমিজি
সুনান আবু দাউদ
সুনান ইবনে মাজাহ
মুসনাদ আহমদ
শুআবুল ইমান লিল-বায়হাকি
সহিহ ইবনে হিব্বান
আল-মুজামুল কাবির লিত-তাবরানি
মাজমাউয যাওয়ায়েদ
শরহুস সুন্নাহ লিল-বাগাবি
মিশকাত আল-মাসাবিহ
সহিহুল জামে
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


