মুকুন্দপুর থেকে পাকিস্তানিদের একটি ব্যাটালিয়ন লেফটেন্যান্ট হেলাল মোর্শেদ খানের কোম্পানির উপর মারাত্মকভাবে আক্রমণ করে। এমনকি চান্দুরার দিক থেকে পাকিস্তানিদের যে ব্যাটালিয়ন সুবিদের কোম্পানির উপর আক্রমণ করে তাঁদের পিছু হটিয়ে দেয়, তারা এবার হরষপুরে অবস্থানরত এই মোর্শেদ কোম্পানির উপর হামলা চালায়। এই চরম অবস্থায় পাকিস্তানিরা হেলিকপ্টারের সাহায্যে হেলাল মোর্শেদের অবস্থানের পেছনে ছত্রীসেনা (Paratroopers) নামাতে থাকে। ফলে মুক্তিবাহিনীর অবস্থা আরো নাজুক হয়ে পড়ে। লেফটেন্যান্ট হেলাল মোর্শেদের কোম্পানি চারদিক থেকে পাকিস্তানি সৈন্যদের দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় থেকেও বীরবিক্রমে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলো। কিন্তু সত্যিকার অর্থে মুক্তিবাহিনীর এই কোম্পানিটি পাকিস্তানিদের ঘেরাওয়ে পড়ে মারাত্মক বিপদের সম্মুখীন হয়। এ সময় মোর্শেদের কোম্পানিটিকে পাকিস্তানি বাহিনীর মরণথাবা থেকে বের করে আনার লক্ষ্যে মেজর সফিউল্লাহ ক্যাপ্টেন মতিনের দু’টি প্লাটুন নিয়ে পাকিস্তানিদের ওপর পাল্টা আক্রমণ করেন। আক্রমণের ক্ষুরধার তীব্রতায় পাকিস্তানি সৈন্যরা বেশ হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। মেজর সফিউল্লাহ পাকিস্তানি সৈন্যদেরকে হরষপুরের একাংশ থেকে পিছু হটিয়ে দিতে সক্ষম হন। এই সাহসী আক্রমণের ফলে মোর্শেদের কোম্পানিকেই যে শুধু সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় তা নয়, বরং বেশ কিছু এলাকাও মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্দখলে চলে আসে যা চূড়ান্ত বিজয় অর্জন পর্যন্ত মুক্তিবাহিনীর হাতেই থেকে যায়। রণাঙ্গনের সেই অগ্নিপরীক্ষার দিনগুলোয় উত্তাল একাত্তর তার ইতিহাসের পাতায় এক স্মরণীয় যুদ্ধ রচনা করে যার এক কোণে বিস্মৃত থেকে যায় বীর মুজাহিদ দুলা মিয়া। মনতলার যুদ্ধের সেই ভুলে যাওয়া যোদ্ধার বীরত্বগাঁথাই আজ শোনাবো।
দুলা মিয়া। জন্ম কুমিল্লা জেলায়। দুরন্ত শৈশব ও কৈশোরে বেড়ে ওঠা শালদা নদীর ধারে। একাত্তর যখন যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে গেলো দুলা মিয়া তখন ২৬ বছরের যুবক। হঠাৎ একদিন তার ছোট্ট মেয়েটি এসে বলল, “আব্বা, তুমিও মুক্তিফৌজে যোগ দাও, পাঞ্জাবীদের বিরুদ্ধে লড়াই কর, দেশকে স্বাধীন কর। আব্বা, তুমি বাড়ি থেকে কি করবে? যদি দেশ স্বাধীন না হয় আমাদের অবস্থা কি হবে? তারা ত যাকেই সামনে পাচ্ছে তাকেই গুলি করে মারছে।” আট বছরের ছোট্ট মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে কেই বা চুপ করে বসে থাকতে পারে গৃহকোণে! দুলা মিয়া তাই চলে গেলো মুক্তিযুদ্ধে। প্রথমে ক্যাপ্টেন মতিনের কোম্পানিতে যোগ দেয় সে। ক্যাপ্টেন আব্দুল মতিন ছিলেন সিমনা সাব-সেক্টর কমান্ডার। তবে মনতলার যুদ্ধে দুলা মিয়া লেফটেন্যান্ট হেলাল মোর্শেদ খানের আন্ডারে যুদ্ধ করেছিলেন। লেফটেন্যান্ট মোর্শেদ ছিলেন কলকলিয়া সাব-সেক্টর কমান্ডার। আর মনতলা ছিল সেক্টর তিনের অন্যতম একটি সাব-সেক্টর।
দক্ষিণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আখাউড়া হয়ে একটি রেলপথ হরষপুর, মনতলা, তেলিয়াপাড়া, শাহজীবাজার হয়ে মৌলভীবাজার ও সিলেট পর্যন্ত চলে গেছে। মনতলা স্টেশনের অবস্থান ছিল এই রেলপথের মধ্যবর্তী স্থানে, যার নিয়ন্ত্রণ ছিল মুক্তিবাহিনীর হাতে। ফলে পাকিস্তানি সামরিক শক্তি মনতলার মুক্তিবাহিনীর ডিফেন্সকে ভেঙ্গে দিয়ে মনতলা করায়ত্ত করে তাদের ঢাকা-সিলেট রেল সংযোগকে নির্বিঘ্ন রাখতে ছিল বদ্ধপরিকর। তিন সপ্তাহ ধরে পাকিস্তানিরা মনতলা আয়ত্তে আনার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়। এজন্য তাদের যথেষ্ট মূল্য দিতে হয়েছিলো; প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করতে হয়েছিলো। কনভেনশনাল বা প্রচলিত যুদ্ধ কৌশলের মাধ্যমে মনতলা দখলের কয়েকটি প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেলে পাকিস্তানিরা তাদের আক্রমণ কৌশলে পরিবর্তন ঘটায়। আর সেই নতুন কৌশলে ১৫ জুন তারা মনতলায় আক্রমণ চালায় এবং আংশিকভাবে সফলও হয়।
মনতলার সেই বিখ্যাত যুদ্ধ হয়েছিল ১৫ থেকে ২১ জুন। টানা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ক্রমশ নাজুক হয়ে পড়ছিল। অল্প কয়েকটি মর্টার আর সীমিত গোলাবারুদ দিয়ে সুসজ্জিত পাকিস্তানি সৈন্যদের প্রতিহত করা মুক্তিবাহিনীর পক্ষে খুব কঠিন ছিল। অন্যদিকে পাকিস্তানিদের গোলাবর্ষণের পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলছিল। ২১ জুন মাল্টিডিপ্লয়মেন্ট প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানীরা লেফটেন্যান্ট মোর্শেদের কোম্পানির উপর মুহুর্মুহু আক্রমণ শানায়। মুক্তিসেনারা সারারাত পাকসেনাদের সাথে প্রচণ্ড যুদ্ধ করে। কিন্তু চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে যাওয়া মোর্শেদের কোম্পানি একসময় পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু তারও যে ক্ষীণতম সম্ভাবনা। কাউকে কাভারিং ফায়ার করতে হবে। তখন এগিয়ে আসে দুলা মিয়া। ইতোমধ্যেই সে একটা কার্যকর স্থান থেকে মেশিনগান দিয়ে অবিশ্রাম গুলিবর্ষণ করে হানাদারদের ঠেকিয়ে রেখেছিল। এখন সে সবাইকে নিরাপদে সরে যাওয়ার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিল। একা রয়ে গেলো রণাঙ্গনের মাটিতে। নির্ভয়, নিঃশঙ্কে অপারবিক্রমে সে এক ভয়াবহ শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছিল। কাভার দিতে গিয়ে একসময় গুলিবিদ্ধ হল দুলা মিয়া। শত্রুর একঝাঁক গুলি এসে বিদ্ধ করে তাঁকে। ডান পায়ে গুলি লেগে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া মাংসগুলি কোনক্রমে পায়ের হাড়ের সাথে লেগে ছিল। পেটে গুলি লাগায় বের হয়ে আসছিল নাড়িভুঁড়ি সব। বাঁ’হাত দিয়ে সেই ক্ষতস্থান চেপে ধরে ডান হাতে মেশিনগান সচল রেখে যাচ্ছিল দুলা মিয়া। নিজের জীবন যায় যাক, কিন্তু সহযোদ্ধারা নিরাপদে থাক। স্বাধীন জন্মভূমির জন্য যে এটা খুব প্রয়োজন। আর তাই রুধিরাক্ত সর্বাঙ্গ নিয়েও, ক্লান্ত অবসন্ন চোখেও, দুর্বল হাতেও সচল রেখেছিল সে তার মেশিনগানটি। থামিয়ে দিয়েছিল এক অতিপ্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর নিশ্চিত অগ্রযাত্রা।
এদিকে সেক্টর তিনের কম্যান্ডার মেজর সফিউল্লাহর সাহায্যে লেফটেন্যান্ট মোর্শেদ তার কোম্পানিকে নিরাপদ অবস্থানে নিয়ে আসে। কিন্তু দুলা মিয়া রয়ে গেলো সেই পশ্চাতে, শত্রু অবস্থানের কাছে। বেলা তখন ১১টা। খবর এলো যে, দুলার পেটে ও ডান পায়ে কয়েকটা গুলি লেগেছে। কাদাপানির মধ্যে অসহায় পড়ে আছে। ছোট একটা দল গিয়েছিল তাঁকে উদ্ধার করতে কিন্তু শত্রুর সতর্ক অবস্থানের কারণে কিছুতেই তাঁর (দুলা মিয়ার) কাছে যাওয়া যাচ্ছিল না। তৎক্ষণাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় দুলা মিয়াকে উদ্ধার করে নিয়ে আসার। পুনর্বার যুদ্ধে যাওয়ার পরিকল্পনা করার সময় একটি ছেলে দৌড়াতে দৌড়াতে এসে খবর দিল যে, দুলা মিয়াকে নিয়ে আসা হচ্ছে। আহত দুলা গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে সম্পূর্ণ নিস্তেজ ও নিশ্চুপ হয়ে গেলে শত্রুরা তাঁকে মৃত মনে করে তাঁর দিকে গুলি ছোঁড়া বন্ধ করে দেয়। এই সুযোগে দুজন সাহসী ছেলে অতি সন্তর্পণে নালার ফাঁকে গিয়ে দুলাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে।
দুলাকে যখন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে নিয়ে আসা হয় তখন এক করুণ ও বেদনাদায়ক দৃশ্যের অবতারণা হয়। একটা গুলিবিদ্ধ বাঘের মতো ছটফট করছিল সে। ক্ষীণ বাকশক্তির জোরে তাঁর অফিসার যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে বলল, “স্যার, আমি আর বাঁচবো না, এক্ষুনি মারা যাবো। আমার আফসোস রয়ে গেলো স্বাধীন বাংলার মাটিতে আমি মরতে পারলাম না। স্বাধীন বাংলা দেখা আমার ভাগ্যে হয়ে উঠলো না। স্যার, আমাকে কথা দিন যেভাবেই হোক স্বাধীন বাংলার মাটিতে আমাকে কবর দেবেন। আজ হোক কাল হোক বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই। তাই আমার লাশ বাংলাদেশের মাটিতে কবর দেবেন।” দুলা মিয়ার মুমূর্ষু কণ্ঠের আর্তি কঠিন হৃদয়ের যোদ্ধাদের চোখে জল নিয়ে আসলো। সবাই গভীর শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়লো। দুলা মিয়া ক্যাপ্টেন এম সুবিদ আলী ভূঁইয়ার হাতটি ধরে বলল, “স্যার, আপনার বাড়ি কুমিল্লা, আপনি নিশ্চয়ই শালদা নদী চেনেন। সেখানে আমার বাড়ি। আমার এলাকার সবাই আমাকে চেনে। দয়া করে আমার মেয়েকে এবং সেই এলাকার কাউকে আমার মৃত্যুর খবরটা দেবেন না। আমার মৃত্যুর খবর পেলে আমার মেয়েটি বাঁচবে না। সে আমার জান। দয়া করে তার কাছে, স্যার, আমার মৃত্যুর খবরটা গোপন রাখবেন। তবে আমার একটা দাবী, আমার হতভাগী মেয়েটিকে আপনি দেখবেন। স্যার, আমার এই একটি কথা ভুলে যাবেন না।”
এদিকে দুলার মুমূর্ষু অবস্থা দেখে অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষা না করে মেজর সফিউল্লাহ তাঁকে নিজের জীপে করে নিয়ে যান আগরতলা পিজি হাসপাতালে। সাথে মুক্তিফৌজের ডাক্তার আবুল হোসেনও যান যাতে দুলা মনোবল না হারায়। কি হয়েছিল তারপর দুলা মিয়ার? বেঁচে গিয়েছিল নাকি শহীদের বিরল সম্মান নিয়ে চির অমর হয়েছিল?
না, দুলা মিয়া বেঁচে গিয়েছিল। হাসপাতালে নেওয়ার পর তার অপারেশন করা হয়। ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে সে। দেড় মাস পর পূর্ণ সুস্থ হয়ে আবার রণাঙ্গনে যোগ দেয়, লেফটেন্যান্ট হেলাল মোর্শেদের কোম্পানিতে থেকে যুদ্ধে অংশ নিয়ে স্বাধীন করে তাঁর প্রাণপ্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশকে। চোখে পানি এসে যাওয়া আর গর্বে বুক ভরে ওঠার মতো এমন যার বীরত্বগাঁথা আজ সে সবার আড়ালে থাকা এক বিস্মৃত বীরযোদ্ধা।
পরিশেষেঃ কেউ কি জানেন, সেদিনের সেই দুলা মিয়ার আজকের কথা? কেমন আছেন তিনি? বেঁচে আছেন কিনা? যদি কেউ জেনে থাকেন তো সনির্বন্ধ অনুরোধ থাকলো, দয়া করে আমাকে জানাবেন।
তথ্যসূত্রঃ
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্রঃ দশম খণ্ড (পৃষ্ঠা ৩২৫-৩২৯)
বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস – সেক্টর তিন
-----
১৯৭১: একটি সত্য গল্প 1971: A True Story -একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আপোষহীন পেইজ
-----
রণাঙ্গনের দিনগুলিঃ কুমিরার প্রতিরোধ যুদ্ধ (২৬-২৮ মার্চ ’৭১)
রণাঙ্গনের দিনগুলিঃ তেলিয়াপাড়ায় গেরিলা আক্রমণ
রণাঙ্গনের দিনগুলিঃ অপারেশন জাতিসংঘ গ্যারেজ
রণাঙ্গনের দিনগুলিঃ আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংক অপারেশন
-----
হিরু ওনোদা: ভুলযুদ্ধের বীরযোদ্ধা
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মে, ২০১৪ সন্ধ্যা ৭:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



