somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

২৮ অক্টোবর - বীরশ্রেষ্ঠ (কনিষ্ঠতম, ১৮ বছর বয়স) হামিদুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

২৭ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ৯:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একবার ভাবুন তো , শত্রুপক্ষের মেশিনগানের মুহুর্মুহু আক্রমণ চলছে আপনার দিকেই – আপনার বয়স মাত্র ১৮ আর আপনার দায়িত্ব সেই মেশিনগানের আক্রমণ থামানো! পারবেন? সাহস করে গেলেন, কী হবে? গুলি খেয়ে আপনি মরে যাবেন কিন্তু মুহুর্মুহু আক্রমণ কীভাবে থামাবেন?

তারমানে শুধু গুলি খেয়ে মরলেই চলবে না, আপনাকে (১) মেশিনগানের কাছে যেতে হবে , (২) গ্রেনেড মেরে তাতে আঘাত হানতে হবে, এবং (৩) মেশিনগানটি যারা চালাচ্ছে তাদেরও থামাতে হবে!!

চোখ বন্ধ করে একবার ভাবুনতো! এই তিনটি কাজই করেছিলেন বীরশ্রেষ্ঠদের মধ্যে কনিষ্ঠতম, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান (২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ – ২৮ অক্টোবর ১৯৭১)।

২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ তে জন্মগ্রহণ করেন আর ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। মাত্র এক মাস পরেই বাজে যুদ্ধের দামামা! ২৫ মার্চ রাতে তার চোখের সামনেই তার কর্মস্থলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অসহায় ২৫০০ নতুন রিক্রুট আর বাঙালি সৈনিকদের হত্যা করে। সেখান থেকে পালিয়ে চলে আসেন নিজ গ্রাম ঝিনাইদহ জেলার কালিগঞ্জের খদ্দখালিশপুর গ্রামে।
কিন্তু যুদ্ধের ডাক তাঁকে আর ঘরে থাকতে দেয়নি।। মায়ের অনুমতি নিয়ে যোগ দেন ১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাথে (সৈনিক নাম্বার ৩৯৪৩০১৪)। তার দায়িত্ব রান্নার কাজ হলেও মনে তার সম্মুখ যুদ্ধের তীব্র বাসনা। তার এই অদম্য আগ্রহে শেষ পর্যন্ত তিনি সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণের সুযোগ পান।

১৯৭১ এর অক্টোবরের শেষ দিকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরাজয় আস্তে আস্তে অনেকটা নিশ্চিত হয়ে আসছিলো, আর সীমান্তের চৌকিগুলো ক্রমশই মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসতে থাকে। কিন্তু তখনো বাকি সিলেট জেলার শ্রীমঙ্গল থানার ধলই চা বাগানের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত শক্তিশালী হানাদার বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত ফাঁড়ি!

সময়কালটা ২৮ অক্টোবর ১৯৭১! ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ফাঁড়িটি দখল করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ফাঁড়ির মেশিন গান পোস্ট থেকে বিরামহীন আক্রমণে সুবিধা করা দুরূহ। এগুতে হলে মেশিনগান থামাতে হবে। কিন্তু কীভাবে তা সম্ভব ? একটা অসম্ভব উপায় হলো গ্রেনেড মেরে গানপোস্ট ক্ষতিগ্রস্ত করা! ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট সেটিকেই সম্ভব মনে করলো – সিদ্ধান্ত নিলো গ্রেনেড মেরে এই পোস্ট ক্ষতিগ্রস্ত করতে হবে। কিন্তু গ্রেনেড হামলা করবে কে, ওই গান পোস্টের কাছেই কে যাবে মৃত্যু যেখানে নিশ্চিত?

মৃত্যু নিশ্চিত জেনে দায়িত্বটি নেন ১৮ বছরের হামিদুর রহমান, কর্মজীবনে যার বয়স তখন ৯ মাসও হয়নি। গ্রেনেড নিয়ে পাহাড়ি খালের মধ্য দিয়ে বুকে হেঁটে যতটা কাছ থেকে আক্রমণ করলে তা মেশিনগান পোস্টকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, হামিদুর রহমান পৌছে যান সেই দূরত্বে। গ্রেনেড ছুড়তে থাকেন হামিদুর রহমান। দুটো গ্রেনেড আঘাত হানতে সক্ষম হয় মেশিনগান পোস্টের ঠিক নিশানায়। তবে মেশিনগানের গুলি হামিদুর রহমান এড়াতে পারেননি, কারণ সেটা ছিলো অনেকটাই অসম্ভব।

ঘটনা এখানেই থেমে যেতে পারতো। হামিদুর রহমান কিন্তু সেখানেই থেমে যান নি।

গুলিবিদ্ধ হামিদুর রহমান সে অবস্থায় পৌছে যান মেশিনগান পোস্টে। হানাদান বাহিনীর দুই হানাদারের সাথে হাতাহাতি যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। হামিদুরের মাথায় তখন কী ছিলো? হ্যাঁ, দুজনকে ব্যস্ত রাখতে পারলে মেশিনগানের হামলা কিছুক্ষণ বন্ধ থাকবে (সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সময়টুকু) আর সেই সময়টুকুতে ইস্টবেঙ্গলের সৈন্যরা ফাঁড়ির কাছে চলে আসতে পারবেন।

গুলিবিদ্ধ হামিদুর রহমানের সাথে দুই পাকিস্তানি হানাদারের হাতাহাতি যুদ্ধ চলছে – ক্ষণিকের জন্য থেমে গেছে মেশিনগানের আক্রমণ। আর সেই সময়টুকুকে কাজে লাগিয়ে ইস্টবেঙ্গলের সৈন্যরা অদম্য গতিতে ফাঁড়ির কাছে চলে আসেন এবং ফাঁড়ির দখল চলে আসে আমাদের।

এভাবেই হামিদুর রহমান অসীম সাহস, বুদ্ধি আর জীবনের বিনিময়ে আমাদেরকে বিজয়কে নিশ্চিত করেছেন।

কী করে ভুলে যাবো এই অসমসাহসী সৈনিক বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে? যাদের ত্যাগের বিনিময়ে পেয়েছি এই দেশ, পেয়েছি লেখার এই স্বাধীনতা। তাঁর এই বীরত্বগাঁথা এখন আমাদের জানা আরো বেশি প্রয়োজন। এই বীরত্বপূর্ণ আত্মত্যাগ যে কোন সংকটে আমাদের পথ দেখাবে।

[তাঁকে কবরস্থ করা হয় ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামের এক পরিবারের পারিবারিক কবরস্থানে। ২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রাইফেলসের একটি দল ত্রিপুরা সীমান্ত থেকে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুরের দেহবশেষ গ্রহণ করেন এবং ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।]

সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ৯:২১
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Ripe Age দুই প্রান্তের দুই মানুষঃ সামু শব্দের সেতু প্রজন্মের বন্ধন

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:২৪


একজন দাঁড়িয়ে জীবনের শুরুতে
চোখে তার অগণিত স্বপ্ন
আগামীর পথে কত প্রশ্ন
কত না-জানা, কত বিস্ময়
কত দূরের নীল আকাশ
ডাকে তাকে প্রতিদিন।

অন্যজন বসে জীবনের শেষে নয়
বরং দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা এক প্রান্তে
প্রায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও তার যতসব অপরাধ।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:১৫



আজ ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে বলতে গেলে সব মিডিয়াতে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে। উহা দুবাইয়ে ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ট্রেন টু কক্সবাজার: টিকিট পেলাম না, পেলাম বিকল্প পথের সন্ধান

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:০৭

কক্সবাজার যাওয়ার ইচ্ছে ছিল অনেক দিনের। তবে এবার লক্ষ্য ছিল একটু আলাদা—বাসে নয়, বিমানে নয়; ট্রেনের জানালায় চোখ রেখে সমুদ্রের শহরের পথে যাত্রা। কিন্তু সেই সহজ পরিকল্পনার প্রথম বাধাই হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিন্নাহ কি বাঙালি মুসলমানের শত্রু?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৪


মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা বা পাকিস্তানের জাতির জনক। একজন বাংলাদেশী হয়ে পাকিস্তানের জাতির জনককে নিয়ে আলোচনা করলে কি গুনাহ হতে পারে কিংবা বড় ক্ষতি হতে পারে? বাংলাদেশে জিন্নাহর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেয়ার বাজারকে গতিশীল করতে স্টক ব্রোকারদের নিয়ে বৈঠকে বসছে ডিএসই আজ ১৪-০৯-২০২৬

লিখেছেন কাজী আবু ইউসুফ (রিফাত), ১৪ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৭



বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে মন্দার কারণ ও প্রতিকার

ভূমিকা

একটি দেশের অর্থনীতিকে যদি একটি জীবন্ত দেহ হিসেবে কল্পনা করা হয়, তবে তার শেয়ারবাজার অনেকটা হৃদস্পন্দন ও তাপমাত্রা মাপার যন্ত্রের মতো। অর্থনীতির কোথায় প্রাণশক্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×