somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

প্রহর্তা অন্তর
আমি একজন স্বপ্নবাজ মানুষ। স্বপ্নের ঘোরেও আমি স্বপ্ন দেখি একটি বকশিত অসাম্প্রদায়িক মানব সভ্যতার।

চিকিৎসা আর সেবা নয়, ক্লাসিক ব্যবসা

০৮ ই এপ্রিল, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

চাতুরীর একটি কৌশল দিয়ে লেখা শুরু করছি। আমরা প্রায়শঃ লক্ষ করি শহরে; বিশেষ করে অভিজাত এলাকার বাড়িতে বাড়িতে কুকুরের ছবি সহ “কুকুর থেকে সাবধান” লেখা সাইনবোড টাঙানো থাকে। বেশিভাগ বাড়িতে আসলে কোন কুকুর থাকে না। ভিক্ষুক বা আগন্তুককে ভয় দেখাতে এমন অভিনব উপায়।

একটা সময় ছিল যখন মানুষ বিশ্বাস করতো ডাক্তার সৃষ্টকর্তা প্রেরিত ঋষি-সাধু বা অনেকে বলেন ডামি ঈশ্বর। এখন আর আগের সেই বিশ্বাস নেই। হয়ত পোশাকের সাথে কিংবা পেশার সাথে সমদৃশ থাকার কারণে অনেকে ডাক্তারকে সন্মান করে কসাইও বলেন। বিদেশে ডাক্তার আর কসাইয়ের ওভারকোট দেখতে দৃশ্যত, এখই রঙের, যদিও আমাদের দেশে কসাইরা সাদা ওভারকোট পরে না। এমন মর্যাদা হ্রাসের জন্য বেশিরাংশে ডাক্তারেরা নিজেরাই দায়ী, এইসব দুর্নাম মোচনের গুরুদায়িত্ব নিতে হবে ডাক্তারদেরকে। আমাদের শ্রদ্ধেয় প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ মোহাং ইব্রাহিম তাঁর রোগীদের বলতেন "আমাকে আপনার সেবা করার সুযোগ দিয়েছেন বলে আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ এবং আল্লাহর করুণা যে তিনি আমাকে আপনার সেবা করার জন্য পাঠিয়েছে"। এমন মন্ত্রমুগ্ধ ব্যবহারে রোগী অর্ধেক ভালো হয়ে যেত। তবে চিকিৎসা সেবা আজ আর সেই চৌহদ্দিতে নেই। এই খাতে বিনিয়োগ এসময়ের সবচেয়ে লাভজনক বাণিজ্যিক ব্যবসা যেখানে ডাক্তারেরা বিক্রয়-কৌশলী, ডাক্তারের ডিগ্রি এক ধরণের বিপণন, রোগ হচ্ছে জৈব-সার, রোগীরা কাঁচামাল, ল্যাবটেস্ট “পণ্য”, হসপিটাল বা ক্লিনিক হচ্ছে “হাটখোলা” আর ফার্মেসি হচ্ছে পণ্যশালা


একজন লাইসেন্স বিহীন ড্রাইভার, মাঝি, পাইলট যেমন বহু জীবনের জন্য বিপদজনক, তেমনি প্রশিক্ষিত, যোগ্যতাসম্পন্ন, স্নাতকধারী নয় এমন একজন নামধারী ডাক্তারের কাছে আপনার, আমার জীবন প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে। পার্থক্য শুধু ড্রাইভার, মাঝি, পাইলটের ক্ষেত্রে ঝুঁকি দৃশ্যমান, ডাক্তারদের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা অস্পষ্ট। মেডিকেল ও ডেন্টাল আইন অনুযায়ী নুন্যতম এমবিবিএস অথবা বিডিএস ডিগ্রী প্রাপ্তগণ ব্যতীত অন্য কেউ তাহাদের নামের পূর্বে ডাক্তার পদবী ব্যবহার করিতে পারিবে না অথচ এসএসসি তে জিপিএ ২.৫ পেয়ে পাস করা Medical Assistant Training School (MATS) থেকে LMAF (Local Medical Assistant and Family Planning), Diploma in Medicine and Gynecology (DMDG), Diploma in Medical Faculty (DMF), Diploma in Clinical Medicine & Surgery (DCMS), Diploma in Medicine & Surgery (DMS), Diploma in Dental Surgery (DDS)। ডাক্তারের পদবী হিসেবে সাংকেতিক শব্দে লেখা কোর্সের নামগুলো সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়। বাংলাদেশে general practitioner বা সাধারণ অনুশীলনকারী কোনো ডাক্তার নেই বললেই চলে, সাথে কোন না কোন রোগের বিশেষজ্ঞ (বিশেষ অজ্ঞ) লিখে প্রত্যাশিত চিকিৎসা সেবায় রোগীদের প্রতারিত করছে প্রতিনিয়ত। নিয়ম অনুযায়ী হোমিওপ্যাথ চিকিৎসকগণ “হোমিওপ্যাথ” পদবী ব্যবহার করবেন, ইউনানী চিকিৎসকগণ “তাবিব” বা “হাকিম” পদবী ব্যবহার করবেন এবং আয়ুর্বেদ চিকিৎসকগণ “বৈদ্য” বা “কবিরাজ” পদবী ব্যবহার করবেন। “ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু” বা “চিকিৎসকের অবহেলায় রোগীর” মৃত্যু একটি নিয়মিত হেডলাইন। সাধারনের পক্ষে চিকিৎসকের ভুলগুলো জানার কথা নয় বলে অনেক অপমৃত্যু, অপঘাত, অস্বাভাবিক মৃত্যু অদৃষ্ট থেকে যায় অথবা সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা বলে মেনে নেয় স্বজনেরা। এমবিবিএস চিকিৎসক ব্যতীত কেউ আল্ট্রাসনোগ্রাফি টেস্ট না দেয়ার কথা থাকলেও এখন এলএমএএফ ডাক্তারও এই টেস্টের ব্যবস্থাপত্র দেন।



আমাদের মফঃস্বল শহরে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আসেন সপ্তাহে দুই দিন। চেম্বারে বসেন তিন ঘণ্টা। এই দুই দিনের প্রতিদিন ৬০-৭০ জন রোগী সেবা নিতে আসে। ফিস ৮০০ টাকা। তিন ঘণ্টা মানে ১৮০ মিনিটে ৬০ জন রোগী দেখলে গড়ে প্রতিজন রোগী সময় পায় ৩ মিনিট। ডাক্তারের চেম্বারে ডুকে সালাম-নমস্কার করতেও এক-দেড় মিনিট চলে যায়। প্রেসক্রিপশন লিখতে ১ মিনিট সময় লাগলে বাকি আধা মিনিটে রোগীর কিভাবে চিকিৎসা করা হয় আমার বোধগম্য নয়। তবুও নিরূপায় মানুষগুলোর লাইন বাড়ছে দিনের পর দিন শুধুমাত্র ডাক্তারের প্রতি অগাধ বিশ্বাসের কারণে।


স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার জনগণের ঘরদোরে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব সরকারের। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকে চিকিৎসার জন্য ভারতে আসা রোগীদের মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষে। চিকিৎসাসেবা খাতে প্রতি অর্থবছের ৫০০০ কোটি বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হচ্ছে বিদেশে। প্রতি বছর এই অর্থের সংখ্যা বাড়ছে। অর্থনৈতিক ভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশি চিকিৎসাবিদ্যা ও চিকিৎসকের উপর রোগীদের অর্পিত আস্থা ও বিশ্বাস। রোগীদের শরীরের কোন পচন হয়ত বিশেষায়িত জীবাণুধ্বংসী ঔষধ দিয়ে সারানো যাবে কিন্তু চিকিৎসকের মতো মহান পেশার যে পচন ধরেছে এই পচন কোন ঔষধে সারানো যাবে বুঝে আসে না? রোগী ও ডাক্তারের মধ্যে অবিশ্বাসের জায়গা প্রশস্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টেস্ট করাতে ডাক্তারের নির্দেশের মানে বুঝে না এমন রোগী কম আছে। রোগের আদিঅন্ত জানার চেয়ে রোগীর আর্থিক সামর্থ্য জানতে ব্যস্ত থাকেন অত্যন্ত মেধাবী ডাক্তারেরা। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, পিতামাতাদের মধ্যে একটা ক্রেজ ছিল ডাক্তার ছেলেমেয়ের সাথে নিজের ছেলেমেয়ের বিবাহ দেয়ার। আজ এই মানসিকতার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। একজন মেয়ের পিতা ডাক্তার ছেলের হাতে তার মেয়ের হাত তুলে দিতে অনাগ্রহ এই ভেবে যে ডাক্তার ছেলেটির সেই হাত হয়ত একজন অসহায় সম্বলহীন রুগ্ণ গরীব রোগীর টেস্টের নামে নির্গত রক্তে ভেজা।


পৃথিবীর সব দেশে প্রত্যেক ডাক্তার ও মেডিকেল পেশাধারীদের একটি শপথ বাক্য পাঠ করতে হয়। "I pledge to consecrate my life to the service of humanity. I will not use my knowledge contrary to the laws of humanity. I will maintain the utmost respect of human life from the time of conception". I will practice my profession with conscience and dignity. The health of my patient will be my first consideration। I will respect the secrets, which are confided in me. I will not permit considerations of religion, nationality, race, party politics or social standing to intervene between my duty and my patient Etc. একজন ডাক্তার খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যার এই শপথ বাক্যকে মনে আছে। রাজনীতিকদের শপথ আর ডাক্তারদের শপথ - অনুধাবন ও অনুশীলনের দিক দিয়ে সমকক্ষ এবং উভয় ক্ষেত্রে বলির পাঁঠা সাধারণ জনগণ।


সাইনবোর্ডের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। “ডাক্তার আছেন” লেখা অনুরূপ সাইনবোর্ড ঝুলানো থাকে অনেক ঔষধালয়ে। মানুষ এসব সাইনবোর্ড ভয় পেতে শুরু করেছে। আমার পরিচিত একজন এই ভেবে পুরনো কাপড় পরে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল; পাছে ডাক্তার যেন ২-১ টেস্ট কম লিখে দেন। অনেকে বাদানুবাদ করবেন তাহলে লক্ষ কোটি বাংলাদেশের জনগণ কী প্রতিনিয়ত চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে না? আমি একমত, পাচ্ছে; তবে যে সেবা জনগণ অনায়াসে পাওয়ার কথা ছিল, পাচ্ছে না বরং উচ্চ দামে সেই সেবা কিনছে। যেই সেবাটি অনায়াসে অনুভূতির তত্ত্বাবধানে আসার কথা ছিল সেই সেবা আসছে বিপণনের মোড়কে। কিন্তু সেই মোড়কে সবাইকে ব্র্যান্ডিং করা ঠিক হবে না। এখনো জাতীয় অধ্যাপক ডাঃ মোহাং ইব্রাহিমের উত্তরসরিরা আছেন, যাদের জন্য গর্ব হয়।

সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই এপ্রিল, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:৫৫
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ভালো শিক্ষার্থী কখনো পরীক্ষা পেছাতে চায় না

লিখেছেন মুনতাসির, ১৫ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৮:২৯

কারণ একজন প্রস্তুত শিক্ষার্থী জানে, পরীক্ষা যত দ্রুত শেষ হবে, সে তত দ্রুত জীবনের পরবর্তী ধাপে এগিয়ে যেতে পারবে। অনিশ্চয়তা, বারবার সময়সূচি পরিবর্তন কিংবা দীর্ঘ অপেক্ষা—এসব কারও জন্যই কল্যাণকর নয়।

বৃষ্টি,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারত কোন ভাবেই স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশে সৈন্য পাঠায়নি!!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৫ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:২৬


ভারত কোন ভাবেই বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য সৈন্য পাঠায়নি! সৈন্য পাঠিয়েছিল পাকিস্তানকে বিভক্ত করতে ও তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানকে লুটপাট করার উদ্দেশ্যে। প্রতিবেশি দূর্বল হলে দাদাগিরি করতে পারবে এটাই ছিল ইন্দ্রিরাগান্ধির ভিষন... ...বাকিটুকু পড়ুন

উপপোকায় খাওয়াচ্ছ

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৫ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৮


তোমার ফসলী মাঠের ফসল.
কেন উইপোকায় খাওয়াচ্ছ
কিছুদিন পর করবেটা কি
পাগল পাগল হবেই. শুনি!
পড়ালেখা করে একদিন বড় হবে
এটাই তো স্বপ্ন দেখি ওগো সোনাধন
তোমার সুনাম ভরে যাবে পাড়ায় পাড়ায়
গর্বে ভরে ওঠবে বাবা মায়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মূল্যটা খুব কম দিইনি...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৫ ই জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২২

মূল্যটা খুব কম দিইনি...

দলের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত- এই বিশ্বাসকে নিজের সিদ্ধান্তের ঊর্ধ্বে রেখেছি সারাজীবন। কতবার ব্যক্তিগত ইচ্ছা, সুযোগ, এমনকি ন্যায্য অভিমানও গিলে ফেলেছি। কতবার চুপ থেকেছি, শুধু এই বিশ্বাসে যে ব্যক্তির... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকাল বিবাহযোগ্য নারী-পুরুষ যে কারণে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে ভয় পায়

লিখেছেন এমএলজি, ১৬ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৩৪

বছর দশেক আগের কথা। আমি তখন কানাডায় ব্যবসারত অস্ট্রেলিয়ান এক ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মে সিনিয়র স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করি। আমার এক সহকর্মী ছিলেন যার বয়স কমবেশি ৪৫ বছর। বেশ ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×