somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

প্রবাসীদের প্রতি আরো মানবিক হোন - বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য প্রবাসীদের প্রতি

২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ দুপুর ২:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নুর মোহাম্মদ (নুর):- শুধু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নয়, পৃথিবী জুড়ে অভিবাসীরা সবচেয়ে নিগৃহীত জনগোষ্ঠী। নিগৃহীত হলেও অবদান ও অর্জনের দিক দিয়ে তাদের সমানুপাতিক অংশগ্রহণ গগনস্পর্শী। বাংলাদেশ মোট জনসংখ্যা ষোল কোটির উপাত্ত ও বয়স কাঠামো হিসেবে ২৫ থেকে ৫৪ বছরের মধ্যে জনসংখ্যার অনুপাত ৩৯.৭৩ শতাংশ মানে প্রায় সাড়ে ৬ কোটির মত, তাদের মধ্যে এই বয়স কাঠামোর প্রায় সোয়া এক কোটি প্রবাসী। প্রতি বছর ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি অর্থের উৎস এসব প্রবাসীরা। গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রবাসীরা পাঠিয়েছে ১৫.৪৯ বিলিয়ন যা সচরাচর প্রত্যেক বিগত বছরের তুলনায় আগমনী বছরে ক্রমবৃদ্ধি হয়। এই বড় অঙ্কের প্রায় ৬২.২০ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে। বাকি ৩৭.৮০ শতাংশ আসে ইউরোপ, আমেরিকা, মালেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, হংকং, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, জাপান সহ দূরপ্রাচ্য, পশ্চিমা ও আফ্রিকার দেশের অন্যান্য অঞ্চল ও দেশ থেকে।


মধ্যপ্রাচ্যে আসা অভিবাসীদের অধিকাংশ শ্রমজীবী মানুষ; যাদের আবার বেশিরভাগ আসে অদক্ষ, আধা-দক্ষ শ্রমিক হিসেবে। সেসব অদক্ষ, আধা-দক্ষ শ্রমিকদের ৫০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় অর্জিত ঘামার্ত বৈদেশিক মুদ্রায় আমাদের দেশের রিজার্ভ ভোল্টকে শীতল রাখে। অথচ এই মানুষগুলোই প্রতিনিয়ত সবচেয়ে নিগৃহীত হচ্ছে; সেটা দেশে আসা যাওয়ার ক্ষেত্রে হোক কিংবা বাংলাদেশের কোন দূতালয়ে হোক। বছরের পর বছর পরিবার পরিজন থেকে দূরে থাকা এসব মানুষের প্রতি রাষ্ট্রযন্ত্রের সবাইকে আরো মানবিক হতে হবে। বস্তুত ভাসমান এসব মানুষেরা বেশিরভাগই প্রবাসে ও স্বদেশে অনভিপ্রেত ও অনাহূত। আকাশচুম্বী চাহিদা তাদের নেই; চায় শুধু দূতাবাসে কিংবা বিমানবন্দরে একটু মানবিক ব্যবহার, একটু দয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গি। এসব মানুষেরা স্বদেশে ফেরার পথে পরিবার-পরিজনের জন্য নিয়ে আসা বড় বড় লাগেজ বা কার্টুন টেনে হিঁচড়ে স্ক্যানার মেশিনে রাখতে হয়, উঠাতে হয় নিজেদের, যেটা খুবই অমানবিক। সেটি একজন আন্তর্জাতিক যাত্রী, রেমিটেন্স যোদ্ধাদের জন্য যতই না অমানবিক তার চেয়ে বেশি অনুভূতিশূন্য একজন নারী যাত্রীর ক্ষেত্রে। কর্তৃপক্ষ চাইলে দুই চার জন পোর্টার দিয়ে স্ক্যানার মেশিনে উঠা-নামার এই অপারেশনটা চালাতে পারে, এতে প্রবাসীরা সম্মানিত বোধ করবে। অন্যদিকে বিশেষায়িত মহিলা/ ফ্যামিলি কাউন্টার না থাকায় পুরুষের পাশাপাশি মহিলা ও শিশুদের ঘণ্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা দৃষ্টিকটু কিন্তু কর্তৃপক্ষের কোন দৃষ্টিক্ষেপণ হয়নি এখনো।


গত এক দশকে বিদেশ থেকে ২২ হাজার ৬৫১ জনের লাশ ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে দেশে এসেছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৫৫৭ জনই কাজ করতেন মধ্যপ্রাচ্যের কোনো-না-কোনো দেশে। অনিরাপদ কর্ম-পরিবেশ, আর্থিক ঋণ, খাদ্যাভ্যাস সহ মানসিক চাপই বেশিরভাগ প্রবাসীর মৃত্যুর কারণ। মৃত্যুঝুঁকি মাথায় নিয়ে ওরা দেশে রেমিটেন্স পাঠাচ্ছে। অধিকাংশই মৃত্যুর কারণ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, হৃদরোগ, কর্মক্ষেত্র বা সড়ক দুর্ঘটনা কিংবা ক্যান্সারের মতো জটিল কোন রোগ হলে ভাষাগত কারণে সাধারণ রোগীরা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে ইতস্তত বোধ করেন বেশিরভাগ প্রবাসীরা। সরকার চাইলে মধ্যপ্রাচ্যের দুতাবাসগুলোর অধীনে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নিয়োগ দিতে পারেন এতে সুফল পারে সিংহভাগ প্রবাসীরা। ইদানিং প্রবাসে আত্মহত্যার ও অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে বিভিন্ন ঋণ, চিন্তা, হয়রানী, ঝন্ঝাট, ঝামেলা ও পীড়নের কারণে। এই প্রবণতা রুখতে সরকার চাইলে একজন অনাবাসিক মনস্তত্ত্ববিদ (psychologist) নিয়োগ দেয়া কঠিন কিছু নয়।


১ এপ্রিল, ২০১৩ তারিখ থেকে বিদেশে বৈধভাবে গমনকারী মৃত কর্মীর প্রত্যেক পরিবারকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড হতে ৩,০০,০০০/- (তিন লক্ষ) আর্থিক অনুদান প্রদান করছে সরকার। ছয়-সাত লক্ষ টাকা দিয়ে ভিসা কিনে আসার তুলনায় এই অংক অপ্রতুল। এই অনুদান দ্বিগুণ করার জন্য নতুন সরকারের কাছে দাবি থাকবে। প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে অভিবাসন ঋণ, পুনর্বাসন ঋণ দেয়া হয় কিন্তু সেসব অভিবাসন ঋণ, পুনর্বাসন ঋণ দুটো শতভাগ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সুষম বণ্টন ও নজরদারিতে রাখতে হবে।
সরকার প্রবাসীদের উৎকৃষ্ট সাধনে কাজে যে করছে না তা নয় কিন্তু কাজগুলো প্রবাসীদের অনেকের জানা বা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না। যেসব প্রবাসীরা গুরুতর অসুস্থ হয়ে কর্ম অক্ষম হন সেই সকল কর্মী কল্যাণ তহবিলের অর্থায়নে দেশে ফেরত আনা এবং চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সকল প্রকার ব্যবস্থা করে থাকে সরকার। যদি অসুস্থ কোন প্রবাসী কর্মী সাহায্যের জন্য কল্যাণ বোর্ডে আবেদন করেন সেক্ষেত্রে যাচাই পূর্বক সর্বোচ্চ ১০০,০০০/ (এক লক্ষ) টাকা আর্থিক সাহায্য প্রদান করে সরকার কিন্তু কতজন প্রবাসী সরকারের এই অনুদান বা সেবা পেয়েছে আর কত জন প্রবাসী এই অনুধান বা সেবার খবর জানে তা কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ।


অস্বচ্ছল প্রবাসী কর্মীর সন্তানদের শিক্ষিত জনসম্পদে রূপান্তরিত করতে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের অর্থায়নে ২০১২ সাল হতে “শিক্ষা বৃত্তি ও শিক্ষা সহায়ক প্রকল্প” গ্রহণ করেছে সরকার। বিদেশগামী কর্মীদের যাবতীয় সেবা একই স্থান হতে প্রদানের লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৮ ডিসেম্বর ২০১১ সালে ঢাকার ইস্কাটন গার্ডেনে ২০ তলা বিশিষ্ট “প্রবাসী কল্যাণ ভবন” উদ্বোধন করেন। এ ভবনে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ সংস্থা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড, জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর বহির্গমন শাখা, বাংলাদেশ ওভারসীজ এমপ্লয়মেন্ট এন্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক অবস্থিত। বর্তমানে প্রবাসী কল্যাণ ভবন হতে প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারকে ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেবা প্রদান সহ প্রবাসে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের যে কোন সমস্যা সমাধানে প্রবাসবন্ধু কল সেন্টার রয়েছে। সরকারের এসব বহুমুখী সেবার কথা অনেক প্রবাসীরা জানে না। এসব সেবার কথা প্রবাসীদের জানাতে হবে। ইতিমধ্যে রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি “প্রবাসী সহায়তা ডেস্ক” চালু করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ।


নতুন কোন উড়োজাহাজ বিমান বহরে যুক্ত হলে প্রথমে বিশেষ এক রুটে অন্তর্ভুক্তি কিংবা যাত্রী আসা যাওয়ার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ বিশেষ রুটের যাত্রীদের প্রতি বিশেষ অভিনিবেশ এর কারণে মধ্যপ্রাচ্যগামী অভিবাসীদের অধস্তন ভাবাতে বাধ্য করে। ধরে নিলাম মধ্যপ্রাচ্যের বেশীরভাগ অভিবাসী অন্য অঞ্চলের অভিবাসীর তুলনায় স্বল্প শিক্ষিত, অদক্ষ, আধা-দক্ষ, শ্রমিক শ্রেণীর কিন্তু তাতে কি? অজপাড়া গায়ের কোন এক অল্প শিক্ষিত, ও অদক্ষ বা আধা-দক্ষ অভিবাসী শরীরের ঘামের বিনিময়ে রাষ্ট্রের রিজার্ভ ভোল্ট যদি উর্বর থাকে তাহলে রাষ্ট্র যন্ত্রের মাধ্যমে সেই অভিবাসীদের সার্বিক পরিপোষণ দিতে ক্ষতি কী? আশা করি রাষ্ট্রযন্ত্র এ বিষয়ে ভাববে।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ বিকাল ৩:০৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

যেখানে খোদা নেই; সেই ঠিকানার সন্ধানে( একটি দীর্ঘ সুফি দার্শনিক আত্মজিজ্ঞাসা)

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:১৮


প্রথমেই জানাই আমার এই লেখাটি ব্লগার মরুভুমির জলদস্যুর লেখা “শরাব পিনে দে”
হতে উৎসারিত, তাই তাঁর প্রতি জানাই কৃতজ্ঞতা ।

সেই লেখাটিতে তিনি মির্জা গালিব এর বিখ্যাত শেরটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুলিশ বদলাবেন, নাকি পুলিশ সংস্কার করবেন?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৮

পুলিশ বদলাবেন, নাকি পুলিশ সংস্কার করবেন?

ফ্যাসিস্ট আমলে পুলিশকে দলীয় ক্যাডার বাহিনীতে পরিণত করা হয়েছিল- এ অভিযোগ শুধু রাজনৈতিক নয়, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার অংশ।
জুলাইয়ের পর- সেই পুলিশ কি সত্যিই বদলেছে, নাকি শুধু... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৮ বছর পর ঋণের খোঁজে সন্তান বনাম হাজার কোটি টাকার খেলাপি: আমাদের ব্যাংকিং ও শেয়ারবাজারের ট্র্যাজেডি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৯

সংবাদের পাতার দুটি বিপরীতমুখী ছবি সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের চরম এক সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈপরীত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

একদিকে আমরা দেখি, ২৮ বছর আগে বাবার নেওয়া মাত্র ১০ হাজার টাকার দাদন... ...বাকিটুকু পড়ুন

এই ধরণের মানুষগুলোই বি,এন,পি-কে আবারও ডোবাবে!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:০১



পড়ালেখার পিছনে টাকা খরচ করা 'টাকা পাচার'?
যারা বিদেশে পড়ালেখা করতে যান, তাঁরা কি দেশের টাকা লুট করে নিয়ে যান, নাকি নিজের বাপের টাকায় পড়ালেখা করেন?

পড়ালেখার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম কি?

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৩০



প্রায় বিশ কোটি মানুষের এক লক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গ কিলোমিটারের দেশ বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের ফরেন কারেন্সি আয়ের মাধ্যম মাত্র: - রেমিট্যান্স আর পণ্য রপ্তানি।

রেমিট্যান্স: সাধারণত কোনো ব্যক্তি যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×