এ কথা সত্য যে, ভূমিকম্প প্রতিরোধ করার কোনো উপায় নেই। কেননা এর পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব না। নেপালে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর বাংলাদেশে ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে গত মঙ্গলবার পর্যন্ত দফায় দফায় ভূমিকম্প হয়েছে নেপালে। এর মধ্যে ২৫ এপ্রিলের ভয়াবহ ভূমিকম্পে প্রাণ হারায় দেশটির ৮ হাজার ৪০০-রও বেশি মানুষ। মঙ্গলবারের ভূমিকম্পে প্রাণহানি ঘটে ৮৩ জনের। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেই এসব ভূমিকম্পের প্রভাব প্রতিবেশী দেশ ভারত, চীন ও বাংলাদেশেও অনুভূত হয়েছে। এতে নড়েচড়ে বসেছেন বিশেষজ্ঞরা। ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে চলছে ব্যাপক পর্যবেক্ষণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমাদের দেশে শক্তিশালী ভূমিকম্পের জন্য ভূতাত্ত্বিক পরিবেশ বিদ্যমান। দেশের অভ্যন্তরে বড় চারটি ফল্টে (চ্যুতি) শক্তিশালী ভূমিকম্পের জন্যে যথেষ্ট পরিমাণ শক্তি সঞ্চিত রয়েছে। কেননা এসব ফল্টে অতীতে যে ভূমিকম্পগুলো হয়েছে তা ৭ মাত্রার বেশি ছিল। ডাউকি ফল্টে ১৮৯৭ সালে ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। মধুপুর ফল্টে ১৮৮৫ সালে ৭ মাত্রার ওপরে ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৭৬২ সালে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল সীতাকুণ্ড-মিয়ানমার ফল্টে। আসাম-সিলেট ফল্টে শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল প্রায় ৪০০ বছর আগে। অর্থাৎ বড় ধরনের ভূমিকম্পের জন্য যে পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন তা এসব ফল্টে সঞ্চিত আছে। এতে যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কায় রয়েছে বাংলাদেশ। এর বাইরে আরো ছোটখাটো অনেক চ্যুতি থাকারও আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, মধ্য এশীয় টেকটোনিক প্লেটের (ভূত্বকের বিশাল খণ্ড) নিচ দিয়ে ভারতীয় প্লেট অতি ধীরে ধীরে ঢুকে যাচ্ছে। প্রতিবছর এই দুটি প্লেট ২ ইঞ্চি করে পরস্পরের দিকে সরে আসছে, যা সঞ্চারণশীল। আর বাংলাদেশের অবস্থান ভারতীয় টেকটোনিক প্লেটে। এই প্লেটের দুপাশে রয়েছে ইউরেশীয় প্লেট ও বার্মিজ সাব-প্লেট। এই প্লেটগুলোর প্রান্তবর্তী অনেক ফল্ট বা চ্যুতি বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ভেতরে কিংবা সংলগ্ন এলাকায় রয়েছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ।

রাজধানী ঢাকা মহানগরীর ৫৯০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রায় ১২ লাখ ৫০ হাজার ভবন রয়েছে। এর মধ্যে মেইন সিটিতে রয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ভবন । আর নিয়মবহির্ভূতভাবে গড়ে ওঠা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে কয়েক হাজার। এখন এই ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবনগুলো বড় ধরনের ভূমিকম্পের ধাক্কা সহ্য করতে পারবে কি না তা নিয়ে রয়েছে সংশয় । এ ছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে প্রায় সব এলাকাতেই রয়েছে চিপা গলি, যেখানে উদ্ধার তৎপরতা চালানো কঠিন। এতে দুর্যোগের সময় আঘাতপ্রাপ্ত লাখো মানুষের চিকিৎসা নিয়েও দেখা দেবে বিপর্যয়। তাই এখনই যথার্থ পদক্ষেপ না নিলে যেকোনো সময় মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারে রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষ। দেখা দেবে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।
--------পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, ভূমিকম্পের পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর তেমন কোনো ব্যবস্থাপনা এখনো দেশে গড়ে ওঠেনি । এমনকি চোখে পড়ার মতো সতর্কতামূলক প্রস্তুতিও নেই। কেননা নিকট অতীতের দিকে তাকালে দেখা যাবে দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতিতে আমরা কতটা অসহায়! যার উদাহরণ তাজরিন অগ্নিকাণ্ড এবং রানা প্লাজা ধসের পর উদ্ধার-তৎপরতা।
যদিওবা ভূমিকম্প প্রতিরোধ করার কোনো উপায় নেই। যদিওবা এর পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব না। তার পরও এখন থেকেই ভূমিকম্পের দুর্যোগ মোকাবিলার সামর্থ্য অর্জনে নজর দিতে হবে। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা মেনে মানসম্পন্ন ভবন নির্মাণ করতে হবে। রাস্তা ঘাট প্রশস্ত করতে হবে, যেন দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া মানুষকে উদ্ধার করা যায়। অন্যথায় ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েই মারা যাবে লাখো মানুষ। এজন্য অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে সবার আগে প্রয়োজন মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। কেননা ভূমিকম্প অনুভূত হলে অনেকেই দিগ্বিদিক ছুটোছুটি শুরু করেন। অনেকে দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে আহত হন। বুঝে হোক, না বুঝেই হোক অনেকেই আবার ভবন থেকে নেমে সাইনবোর্ডে-ইলেকট্রিক তারে ঘিঞ্জি জায়াগায় বিল্ডিংয়ের পাশেই রাস্তায় এসে দাঁড়ান, যা আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

একই সঙ্গে ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের উচিত হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোকে রেট্রোফিটিং করা; হাসপাতাল, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবীদের ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির ব্যবস্থা করা; উদ্ধার-তৎপরতা চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি মজুত রাখা। ঝুঁকি এড়াতে সব দিক দিয়ে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।


অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



