somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বরূপকথা- আজ থেকে ৩২,০০০ বছর আগে...

২৪ শে এপ্রিল, ২০২২ বিকাল ৩:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সে অনেক আগের কথা। কত আগের কথা? প্রায় ত্রিশ হাজার বছর আগের! অত আগের কথা কি আমরা ভাবতে পারি? এখন তো দশ বছরেই সবকিছু পুরোনো হয়ে যায়। বদলে যায় ভাষা, বদলে যায় গেজেট, বদলে যায় সঙ্গীত, বদলে যায় জীবন যাপনের যাবতীয় অনুষঙ্গ। মহাকালের আবর্তে আমরা ক্রমশই তলিয়ে যাই। এই মহানিমজ্জনের কালে কেউ যদি শোনায় আমাদের গুহাবাসী আদিপিতাদের কথা, যারা পাথর খুঁদে তৈরি করতো অস্ত্র, কাঁচা মাংস আগুনে ঝলসে খেয়ে মেতে উঠতো জীবনের উল্লাসে, সেই গল্প শোনার ধৈর্য এই প্রজন্মের হবে কি না জানি না, তবে মহাপুস্তকের পাতায় এই গল্পের জন্যে অবশ্যই একটা বিশেষ স্থান থাকা উচিত। সেই গল্পটাই শুনিয়েছেন আশান উজ জামান তার সাম্প্রতিক উপন্যাস “স্বরূপকথা”তে, বাংলা ভাষায় এমন লেখা, তাও আবার এত বড় পরিসরে আছে বলে আমার জানা নেই।

ত্রিশ হাজার বছর আগের পৃথিবীর গল্প বলতে হলে প্রচুর প্রস্তুতি প্রয়োজন। তৈরি করতে হবে পৃথিবীর বুকে এক টুকরো নতুন পৃথিবী। কোথায় গেলে পাওয়া যাবে জলের সন্ধান, কোথায় মিলবে সাগরসোহাগী অন্তরীপ, দেবগাছ আর আলোপাতার মাঝখানে আছে ঘাসফুলের কোন বংশ, নিজের বসতি থেকে কতদূর গেলে বনমানুষদের আক্রমণের শঙ্কায় মনের তন্ত্রী বাজানো শুরু করবে বিপদের সংকেত এমন অসংখ্য বিস্তারিত উপাদান দিয়ে একটা প্রতিবেশ তিনি তৈরি করেছেন নিপুণ হাতে। একজন লেখকের রিসোর্স হতে পারে কয়েকরকম। প্রচুর বই, অভিজ্ঞতা, এবং কল্পনা। স্বরূপকথা’তে কল্পনার সুচারু প্রয়োগ বিস্ময় জাগায়। তার ভাষা এতটাই চিত্রময়, যে চোখের সামনে দৃশ্য ভেসে অঠে। বইয়ের শেষে ভেবেছিলাম সহায়ক গ্রন্থের একটা বড় তালিকা থাকবে। সেটা না থাকাতে নিশ্চিত হওয়া যায় তার ধ্যান এবং নিমজ্জন এর ব্যাপারে।

বইটিতে লেখকের মূল প্রচেষ্টা ছিলো আদিম পৃথিবীর দিনকালকে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করতে। বিশাল কলেবরের এই উপন্যাসটিতে তাই পাতার পর পাতা অনেকসময় থেকে গেছে তেমন কোন ঘটনা ছাড়াই। আপনি যদি লেখার আবহের সাথে ভালোভাবে সম্পৃক্ত হতে পারেন, তাহলে আপনার এই জল-জঙ্গল, সাগর-অন্তরীপে ঘুরে বেড়াতে এবং নতুন কোন শিকারের কৌশল উদ্ভাবন করতে, বিশ্রাম অথবা স্নানের জন্যে নতুন কোন জায়গা খুঁজতে খারাপ লাগবে না। তারপরেও যদি আপনার কাছে গতি ধীর মনে হয়, সময়মত পেয়ে যাবেন নতুন উত্তেজনা।

উপন্যাসটিতে আমরা কাছাকাছি জায়গায় দুটি মানবপ্রজাতিকে দেখতে পাই। হোমো স্যাপিয়েন্স আর নিয়ানডারথাল। হোমো স্যাপিয়েন্স নারী হু এর সাথে নিয়ানডারথাল নর অব এর প্রণয়পর্ব থেকেই মূলত হোমো স্যাপিয়েন্স পাড়ার দৈনন্দিকতা থেকে বের হয়ে কাহিনী গতি পাওয়া শুরু করে। হু আর অব এর সন্তান মান এর জন্মের পর থেকে কাহিনী জল-জঙ্গল চরিত বর্ণনের পাশাপাশি তুমুল গতিতে মানব মন আর আচরণকে অবলম্বন করে লতিয়ে ওঠে। অন্যদের চেয়ে আলাদা, জিজ্ঞাসু এবং কৌতূহলী মান এর জন্ম এবং বেড়ে ওঠার মাধ্যমে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিবর্তনের। এদিকে নিয়ানডারথাল পাড়ার ক্রমাগত মৃত্যু আর কমজোর হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তাদের বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার বেদনাদায়ক আখ্যান। তবে বইটিতে কোথাও হোমো স্যাপিয়েন্স অথবা নিয়ানডারথাল বলে আলাদাভাবে কিছু উল্লেখ করা নেই। এক প্রজাতির কাছে আরেক প্রজাতি হলো বনমানুষ। এটা পাঠকের মধ্যে কিছুটা সংশয় তৈরি করতে পারে। বইয়ের ফ্ল্যাপে অবশ্য ছোট করে উল্লেখ আছে, তবে সেটা অনেকের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে।

পুরো বই জুড়ে যে দ্বান্দ্বিক অবস্থানটি রোমাঞ্চের আবহ যুগিয়ে গেছে তা হলো দলপতি নির্বাচন এবং নারীর দখল। পৃথিবীর আদিম অপরাধগুলি আজ নানা শাখা-প্রশাখা বিস্তার লাভ করেছে, তবে মূল কিন্তু ঐ দুটোই। নারী আর ক্ষমতা। তবে কেন যেন মনে হয়েছে উপন্যাসের দলপতিরা একটু বেশিই সদয়। যেমন সর্দার আফা রাবাকে মারার সিদ্ধান্ত নিলে পারা তাকে নিষেধ করে। আবার বনমানুষের সাথে শুয়ে এসে কৃশকায় সন্তান জন্মদানের পরেও হু’কে হত্যা না করে আলাদা গুহায় বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়। কিছুক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পেছনের যুক্তিকে অতিমাত্রায় জটিল মনে হয়েছে সে সময়কার মানুষের তুলনায়। যেমন, হু’কে যখন দলপতি হিসেবে নির্বাচন করার প্রস্তাব তোলা হয়, তখন হু প্রত্যাখ্যান করে এই বলে, সে দলপতি হলে তার ছেলের প্রতি অন্যায়-অবিচারের বিচার করতে গিয়ে সে বেশি কঠোর হয়ে যাবে, তাই দলপতি হবে না।

কিছু কিছু জায়গায় শব্দচয়ন এবং বাক্যের ব্যবহার যথাযথ মনে হয় নি। যেমন, কয়েকজায়গায় ‘শিশু’ বোঝাতে ‘পিচ্চি’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এক জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে “খবর আছে”। উপন্যাসের প্রথম দিকে ‘বিয়ে’ শব্দটি ব্যবহৃত হলেও পরে সেটি বদলে “ঘরে তোলা” ব্যবহৃত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে কোন প্রয়োগটি সঠিক? আমি যতদূর জানি বিয়ের প্রচলন আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে। তাই ত্রিশ হাজার বছর আগের গল্পে বিয়ে শব্দটি থাকা সমীচীন নয়। বিশেষ করে যখন একটি নারী চরিত্র তার পুরুষটিকে বলে “মেয়ে বড় হচ্ছে, বিয়ে দিতে হবে”, তখন যেন আদিম আবহটা হুট করে কেটে যায়।

হোমো স্যাপিয়েন্স আর নিয়ানডারথালদের ভাষার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রাখা হয়েছে। নিয়ানডারথালদের ক্ষেত্রে সেটা যথাযথ ছিলো, তবে হোমো স্যাপিয়েন্সদের ক্ষেত্রে কিছু কিছু জায়গায় মনে হয়েছে আরেকটু সরল হলে ভালো হতো। যেমন, কোন এক জায়গায় কাউকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে “ তুমি ঠিক আছো তো? কোন সমস্যা?”
এরকম খুব বেশি জায়গায় নেই অবশ্য।

স্বরূপকথা পড়েছি প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে, ধীরে ধীরে। এখন আবার ফিরে যাবো শহুরে বাস্তবতায়। হাতে তুলে নিবো কোন ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস, অথবা ম্যাজিক রিয়ালিজমের কৌশল দেখানো গল্প। নিজেও লিখতে বসবো এরকম কিছুই। এখন আর লিখতে এমন কি কালি কলমও লাগে না। ভার্চুয়াল অক্ষরে সাজাই শব্দদল। এই মধ্যবিত্ত আয়েশ এসেছে বহুদিনের ত্যাগ আর তিতিক্ষার ফলে। আমাদেরই পূর্বপিতারা কোন একসময় গুহাচিত্রে হরিণ এঁকেছিলেন বলেই আমরা এখন পরাবাস্তবতা চর্চা করতে পারি। সেই সময়ে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে আশান উজ জামানকে ধন্যবাদ। বইয়ের শেষ লাইনে সমুদ্রের গর্জনের সাথে মানুষের ধ্বণি মিলেমিশে যে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়া হয়, তা আমাদের জীবনচর্চায় রাখা উচিত।

“গাছটার শিকড় ছেঁড়া। বাঁচবে তো?”


সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে এপ্রিল, ২০২২ সন্ধ্যা ৭:৪৬
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতার মতো মেয়েটি

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২২ সকাল ১১:২০




কবিতার মতো মেয়েটি সুচারু ছন্দে আনমনে হাঁটে
দু চোখে দূরের বাসনা, চুলের কিশলয়ে গন্ধকুসুম, প্রগাঢ় আঁধারে হাসনাহেনার ঘ্রাণ; কপোলে একফোঁটা তিল, তেমনি একফোঁটা লালটিপ কপালে

কবিতার মতো মেয়েটি নিজ্‌ঝুম বনের মতো; কখনোবা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফুল ফুল আর ফুল (ভালোবাসি ফুল)-২

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২২ দুপুর ১:২৬

০১।



=চন্দ্রমল্লিকার পাপড়িতে কী মুগ্ধতা=
হে মহান রব, তোমার সৃষ্টির সৌন্দর্য এই ফুল;
তোমার দয়াতেই সে পাপড়ির ডানা মেলে, ভুল নাই এক চুল;
হে মহান প্রভু, দৃষ্টিতে দিয়েছো তোমার নূরের আলো;
তোমার সৃষ্টি এই দুনিয়া,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মেয়েরা কেমন স্বামী পছন্দ করে?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২২ দুপুর ১:২৬



বাঙ্গালী মেয়েরা মূলত দুঃখী। তাঁরা আজীবন দুঃখী।
ভাতে দুঃখী, কাপড়ে দুঃখী, প্রেম ভালোবাসায় দুঃখী। এজন্য অবশ্য দায়ী পুরুষেরা। যদিও পুরুষের চেয়ে নারীরা চিন্তা ভাবনায় উন্নত ও মানবিক। প্রথম... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রকৃতির খেয়াল - ০৭

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২২ দুপুর ২:৫৬

১ : সৌভাগ্যবান


অস্ট্রেলিয়ার হেরন দ্বীপের কাছে, একটি সামুদ্রিক সবুজ কচ্ছপের (green sea turtle) ছানা সতর্কতার সাথে ক্ষুধার্ত শিকারি পাখিতে ভরা আকাশের নিচে জলের উপরে সামান্য বাতাসের জন্য মাথা তোলে। সমস্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতবর্ষের নবী ও রাসূলগণকে সঠিক ভাবে চিহ্নিত করা গেলো না কেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২২ সন্ধ্যা ৭:১৯



অনেক নির্বোধ ব্যক্তি মনে করে যে, প্রাচীন ভারতবর্ষে কোন নবী-রাসূল আসেননি। যদি আসতেন, তাহলে প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থসমূহে এই সম্পর্কে তথ্য থাকতো। প্রথমেই বলে নেওয়া উচিৎ, যেহেতু আল্লাহ পবিত্র... ...বাকিটুকু পড়ুন

×