somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এই রাতে চাই কিছু আত্মহত্যা আর অ্যালকোহল

২৯ শে মে, ২০২৬ রাত ১:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বনলতা সেন যারা দেখতে এসেছিল, তারা অনেকেই শেষ করে বের হন নি। প্রথম ত্রিশ মিনিটের মধ্যেই একটি পরিবার চলে যায়। তারা সম্ভবত বনলতা এক্সপ্রেস মনে করে দেখতে এসেছিল। সিনেমা শেষ হবার ত্রিশ মিনিট আগে ১৫-২০ জনের একটা দল হল ত্যাগ করে। ঈদের সিনেমা মানে অন্য কোনোকিছু প্রত্যাশা করেছিল হয়ত। এসবের পরিপ্রেক্ষিতে ক্লিশে সেই কথাটা আসলে না বলে পারা যায় না, এই সিনেমাটা সবার জন্যে না। এমন কী যারা প্রচুর সিনেমা দেখেন দেশে বিদেশের, তাদেরও সঠিক মাইন্ডসেট নিয়ে না এলে হতাশ হবার সম্ভাবনা আছে।

একদম প্রথম থেকেই সিনেমাটা Pretentious এবং স্টাইল ওভার সাবস্টেন্স মনে হতে পারে। সংলাপগুলি আরোপিত লাগতে পারে। তবে সুখের কথা হলো এই সিনেমায় সাবস্টেন্স মোটেই কম না, বরং অনেক গভীর, সেইসাথে মনোযোগও ধরে রাখে। তবে প্রথমেই যেটা বললাম, পার্সোনাল কানেকশন না থাকলে সিনেমাটা আত্মম্ভরিতায় পরিপূর্ণ মনে হতে পারে। এই পরিচালকের আগের কাজগুলি নিয়ে সেই অভিযোগ আছে। এই সিনেমাটিকে তো আমি সেরকম বলবই না, বরং বলব এমন উচ্চাশাপূর্ণ চিন্তার সার্থক রূপান্তর কম বাংলাদেশী ছবিতেই হয়েছে।

সিনেমাটি মূলত এক দার্শনিক তৃষ্ণা নিয়ে আবর্তিত। বনলতা সেন। আমাদের ‘শি’। জীবনানন্দ বনলতাকে খুঁজেছিলেন, তার থেকে পাওয়া দু-দণ্ড শান্তি নিয়ে সারাজীবন কাটিয়ে দিতে পেরেছিলেন। এত দিন পরেও সেই অন্বেষণ থামে নি। এই অনুসন্ধান কখনও শেষ হবারও নয়। সরাইখানে থেকে বেশ্যালয়, সমুদ্রের পাড় থেকে যানবাহন জর্জরিত রাস্তা…

খুঁজতে খুঁজতে হয়ত বা আমরা বিপন্ন হব। একটা ক্লান্তির বোধ আমাদের আক্রান্ত করবে। আমরা বলব-
-কোথাও নেই বনলতা সেন।
কিন্তু বোধের জায়গা থেকে এই প্রশ্নটাও আসতে পারে,
-কোথায় নেই বনলতা সেন?
হাজার বছর ধরে আমরা পথ হেঁটে যাব তার খোঁজে। আমরা যারা শেষ পর্যন্ত সিনেমাটি দেখেছি, তাদের সবার মধ্যেই সম্ভবত এই ঘোর কাজ করেছে। আমি প্রচুর ফিসফাস আর টুকরো আলাপ শুনেছি আশেপাশে। হয়ত সবার মধ্যেই এই বিপন্নতা খেলা করছিল। সিনেমার ভালো-খারাপ বলার চেয়ে আমি এই ব্যক্তিগত সংযোগের কথাই উল্লেখ করতে চাইব। মনে হচ্ছিল আমরা সবাই এই অনুসন্ধানের অভিযাত্রী। সমুদ্রের তীরে পড়ে থাকা বইয়ের পাতায়, ব্রজমোহন কলেজের করিডরে, অশ্বত্থ গাছের তলায়, ধানসিঁড়ি নদীর তীরে, মর্গে পড়ে থাকা লাশ অথবা সরাইখানায় দূরদেশ থেকে আসা ঘোড়সওয়ারের সাথে দৃশ্যের জন্ম হয়, হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়…

প্রকৃতি, প্রাণ আর সময়কে ধরতে অনেক দৃষ্টিনন্দন ভিজুয়াল উপহার দিয়েছে বনলতা সেন। কিছু কিছু জায়গায় স্পেশাল এফেক্টের কাজ বেশ ভালো (যেমন শুকর চড়ানো মেয়েটা), কিন্তু কিছু কিছু জায়গায় আরোপিত তো বটেই, খানিকটা কাঁচাও যেন। এটা যেমন এক আক্ষেপ, আরেকটা আক্ষেপ জাগবে জীবনানন্দ দাসের বৈবাহিক জীবনের টানাপোড়েনকে একটু কম দেখানোতে। অথচ তার আগ পর্যন্ত চরিত্রের বিল্ড আপ ছিল অসাধারণ! হাতে পর্যাপ্ত সময়ও ছিল টেনে নেয়ার। মধ্যবর্তী অংশটায় আরেকটু জোর দিলে হয়ত পরিণতি আরও সার্থক মনে হতো। কিন্তু পরিচালক যেন শেষদিকে একটু বেশিই “দৃশ্যের জন্ম” দিয়ে ফেলেছিলেন। আর জীবনানন্দের চেয়ে তার ছায়াচরিত্রই যেন একটু বেশি গুরুত্ব পেয়ে গেল কিছু জায়গায়!

তবে প্রশংসা করতে হয় মূল চরিত্রে খায়রুল বাশারের গেটআপকে। শুনেছি তাকে না কি জীবনানন্দের মতো ফোলা গাল করতে গালের ভেতর লেবু দিয়ে রাখতে হয়েছিল। এতে করে তার গাল ছড়ে-টড়েও গেছে। কষ্ট সার্থক বলা যায়! আর উদাস এবং বিষণ্ণ ভাবটাও বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন পুরোপুরিই। সিনেমায় আসা নারীচরিত্রগুলি প্রত্যেকেই অসাধারণ! আর বাপ্পা মজুমদারের গান “এখানে কেউ নেই” বারবার শুনতে হবে।

দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, কেউ যদি আমার সাক্ষাৎকার নিতে চায়, সেক্ষেত্রে কী বলব। ঠিক করে রেখেছিলাম বলব, “সিনেমা দেখলাম। এখন আমার কিছু আত্মহত্যা আর পর্যাপ্ত অ্যালকোহল দরকার”।

শেষ পর্যন্ত কেউ জিজ্ঞেস করে নি, তাই এখানেই বলে দিলাম!
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে মে, ২০২৬ রাত ১:৩৭
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধার্মিক কে অনুসরণ করুন ভন্ডকে নয় ।

লিখেছেন কিরকুট, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৮

আমরা প্রায়ই নিজেদের ধর্মপ্রাণ জাতি বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসি। কিন্তু প্রশ্ন হলো ধর্ম কি সত্যিই আমাদের নৈতিকতা, মানবিকতা ও সত্যের পথে পরিচালিত করতে পারছে, নাকি কিছু অসভ্য মানুষ ধর্মকে নিজেদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য সাইলেন্ট ইকো

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৫:১০


এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও ফিকশনাল ইনভেস্টিগেটিভ ক্রাইম থ্রিলার। গল্পের সমস্ত চরিত্র, প্রতিষ্ঠান, স্থান, সাল ও অপরাধের মোটিভ লেখকের কল্পনানির্ভর। বাস্তব কোনো ব্যক্তি, পেশাজীবী বা অমীমাংসিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ক্যাপাসিটি চার্জের পর এবার নজর খাম্বায়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:০৩


বিদ্যুৎ বিল নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগের শেষ নেই । বিশেষ করে যারা নির্দিষ্ট বেতনে সংসার চালান কিংবা যেসব পরিবারে কেবল একজন মাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি আছেন, তাদের মাসে প্রিপেইড মিটারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কে হবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২২ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:৫৯



কে হবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি?

বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি পদটি সংবিধানের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন যোগ্যতার চেয়ে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেই বেশি হয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাকরির জন্য সুপারিশ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৫৮



গত কয়েকদিন যাবত ফেসবুক, ইউটিউব সহ অনলাইন সকল পত্র-পত্রিকা, টিভি নিউজ সহ এমন কোনো স্থান বাদ নেই যেইখানে এক ব্যক্তির রাজনীতি, সাংসদ, সংসদ, চরিত্র, বিবাহ, কাবিন নামা, প্রথম স্ত্রী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×