somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

পথেরদাবী
শিরোনামহীন....

”বুড়িগঙ্গায় অ-গল্প…”

৩০ শে জানুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৪:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

রিকসা তখন নবাবপুর রোডে। রাস্তার দুই পাশে কতোশত দোকান আছে জানি না, তবে ব্যস্ত এ সড়কের সবগুলো দোকন তখনো বন্ধ। কিন্তু রাস্তার ধার ধরে দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোস্ট আর বৈদ্যুতিক খুঁটিগুলোকে আমার খেজুর গাছ মনে হচ্ছিলো সেসময়। মনে হচ্ছিলো এই বুঝি কেউ খেজুরের রসের হাড়ি হাতে তুলে দিয়ে বলবে, ‘যা তোর নানীর কাছে দি আয়, শিন্নী রাঁইনতো ক’।

রিকসা তখনো চলছে। দেখলাম কোর্ট কাচারির শতবর্ষী জেলা পরিষদ ভবনটা ভেঙে এখন সুবিশাল টাওয়ার হচ্ছে। এবার কল্পনা আরো প্রসারিত করি। টাওয়ারটাকে বট গাছ ভাবতে থাকি। পাশ দিয়ে ঘোড়া গাড়ি চলে যায়। ওগুলো আসলে ঘোড়া না খচ্চর বোঝা যায় না তবে গাড়িতে চড়া মানুষগুলোকে নবাব সিরাজুদৌলার বংশধর মনে হচ্ছিলো। সকাল তখন ছয়টা বিশ মিনিট। ধীরে ধীরে মানুষ বাড়ছিলো চারপাশে।

রিকসা থামে সদর ঘাটের যেকোন একটি পন্টুনের মাথায়। একটা টিকেট কেটে ঘাটের ভেতরে ঢুকতেই হাজারো মানুষের কন্ঠের যে তীব্রতা তাতে আমার শরীরের ওম লাগে। আমি আরো ভেতরে ঢুকতে থাকি। মানুষের মাঝে মিশে যাই। আমাকে যাত্রী ভেবে হাত ধরে টানাটানি শুরু হয়। কিন্তু আমি হ্যা না কিছুই না বলে হাঁটতে থাকি। গন্তব্য যেহেতু জানি না তাই এমন কারো কোনো কথার উত্তর দেয়ার প্রয়োজন বোধ করি না। তবে লঞ্চওয়ালাদের এই টানাটানি বেশ উপভোগ করে একটু ভিড় এড়িয়ে ভাসমান দোকন থেকে সিগারেট ধরিয়ে নদীটা দেখতে থাকি।

আমার আসলে নদী পাড়ে যাবার কোন কথাই ছিলো না। এই নদী দেখার পেছনে একটাই কারণ আর সেটা হলো, গ্রাম থেকে আসা বন্ধুদের মধ্যে কাজ করা ‘দেমাগ’। তাদের যেনো দেমাগে মাটিতে পা পড়ে না। তাদের নদীর দেমাগ, গাছের দেমাগ, মাঠের দেমাগ, পুকুর, মাছ, খাল, গরু, ছাগল, ধানক্ষেত আরো আরো কতো কিছুর দেমাগ। কিন্তু আমার এসব কিছুই নেই।

বন্ধুদের এই দেমাগের কথা মনে হলো ফজরের আযানের সময় ঘুম ভাঙার পর। কেননা ঘুমটা ভাঙার পর আমার ইচ্ছে হচ্ছিলো একটু নদীপাড়ে যাই। পাড়ে বসে সকালের শীতটা গায়ে মাখি, চা খাই, সিগারেট খাই সুরমার পাড়ের সৈকতের মতো, কীর্তনখোলার সিদ্দিকের মতো, ব্রহ্মপুত্রের রণির মতো, শীতলক্ষার সাজ্জাদের মতো। মানে আয়েশ করতে মন চাইলো অনেকদিন পর। কিন্তু নদী কই? নদীতো নাই এখানে। মাঠ নাই, গাছ নাই, নৌকা নাই কিছুইতো নাই। নিজের ভেতরে হীনমন্যতা ভীষণভাবে চেপে ধরতে থাকে সেসময়।

ভাবতে ভাবতে হঠাৎ, শোয়া অবস্থাতেই মনে পড়লো আমার নদীটার কথা। আমার নদীটা বেশি দূরে না। বাড়ি থেকে পঞ্চাশ ষাট টাকা রিকসা ভাড়া। নিজ নিজ নদীতে সাঁতার কেটে আসা বন্ধুদের প্রত্যেকের বাড়ী থেকে নদীগুলো যতোদূর আমার নদীটাও অনেকটা ততদূরেই। এদিক থেকে একটা বিষয় মিল পেয়ে হীনমন্যতা কিছুটা কমে। আর যখনই নদীটা পুরোপুরি চোখের সামনে ভাসছিলো তখন আর শুয়ে থাকতে পারলাম না। বেরিয়ে গেলাম নদী দেখবো বলে। ভাবতে থাকলাম আমিও দেমাগ করার মতো অন্তত একটা নদী পেলাম। হোক সে যতোই কালো।

নদী দেখতে একটারপর একটা পন্টুন পেছনে রেখে যখন এগিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন মনে হলো কতোশত বছর পেছনে রেখে এসেছি জানা নাই। কিন্তু এগিয়ে যে যাচ্ছি এর তো শেষ প্রান্ত আছে। এই এগুনোর ফলে যদি পড়ে যাই। ডুবে যাই। ভেসে যাই? এসব ভাবতে ভাবতে সবগুলো পন্টুন পেছনে ফেলে একদম শেষ প্রান্তে যখন চলে আসলাম তখন দেখি অনেক মানুষের জটলা। জটলা ভেদ করে দেখি একটা লাশকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে সবাই। কেউ চিনছে না, কিন্তু চিনতে চাইছে। সবার মুখে একটাই কথা, ‘পোলাডারে না করসিলাম আর আগাইয়েন না, পইড়া যাইবেন’।

লাশটার আরো কাছে গিয়ে ছেলেটাকে চেনার চেষ্টা করি। ওদেরই মতো চিনতে চেষ্টা করি। সবশেষে যা দেখলাম তার বর্ণনা দেবার মতো তেমন কিছু নেই। শুধু ছেলেটা দেখতে অবিকল আমার মতো। অথবা কাছাকাছি। অথবা কোন মিলই নাই। কিন্তু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমাদের দু’জনের গল্প যে একই ছিলো এতোটুকু নিশ্চিত হওয়া গেছে। কেননা, ছেলেটার পকেটে একটা চিরকুট পাওয়া যায়, তাতে লেখা-

কালো? তা সে যতোই কালো হোক
দেখেছি তার কালো হরিণ চোখ....

(৩০ জানুয়ারি ২০১৬, সদরঘাট)
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৪:৩১
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০

কোয়ান্টাম হৃদয়ে বিগ ব্যাং : স্পেস-টাইমের প্রেমকাব্য (আধুনিক ও রোমান্টিক)
.................................................................................................................



কক্ষপথে ঘোরে আমার একলা মনের ইলেকট্রন,
নেগেটিভ চার্জে মেঘ জমেছে, খুঁজছে আজি কার্বন মাখা অন্যমন।
তুমি যখন পজিটিভ এনার্জিতে, এ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৪ ঠা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৫৮



পোড়ামাটি নীতি (Scorched Earth Policy).....

একটি একটি সামরিক কৌশল। কোনো সামরিক বাহিনী যখন পিছু হটে বা শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করতে চায়, তখন তারা নিজেদেরই ফেলে যাওয়া এলাকার সমস্ত ফসল,... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনগণের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের পরিকল্পনাটা কোথায় ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১০


ডা. জাহেদ উর রহমান। জুলাই আন্দোলনে শেখ হাসিনা বিরোধী ছিলেন এবং তাঁকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। মানুষটি অ্যাক্টিভিজম ছেড়ে নতুন সরকারের মুখপাত্র হয়েছেন। এতে আমার মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

[মানুষ এতো দুষ্ট কেন? পুরনো কথা ভিডিও সহ ফেসবুকে এভাবে না ছাড়লে হয় না। ]

“আপনাদের আমরা পরিষ্কার করে বলি, ভয় ভেঙে রাজপথে নেমে আসুন"

২৫ হাজার টাকার মজুরি আন্দোলন আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে- ভাল্লাগে!

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৫ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৭


আমাদের ঝাল খাওয়ার ইতিহাস হাজার বছরের নয়, তবুও কেন আমরা ঝাল পাগল জাতি হলাম এইটা নিঃসন্দেহে গবেষনার বিষয়। পর্তুগীজেরা না আসলে আমরা হয়তো কাঁচা লঙ্কা বা শুকনো লঙ্কা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×