দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের হতাশা আর ক্ষোভের মধ্যে কাটলো আরো একটি বছর। গত বছরের ৫ ডিসেম্বর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সূচক ছিল আট হাজার ৯১৮ দশমিক ৫১ পয়েন্ট, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। এ সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই শুরু হয়েছিল পতন। বছরের শেষ দিকে অর্থাৎ ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে (১৮-২২) এসে সামান্য স্থিতিশীলতা পেয়েছে।
পুঁজি হারিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের যে কান্না শুরু হয়েছিল তার যেন শেষ নেই। ইতিমধ্যে নিঃস্ব হয়ে পথে বসেছেন অনেকেই। সর্বস্ব হারিয়ে আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে কয়েকটি। বাজার স্থিতিশীলতার জন্য বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বছরের অধিকাংশ সময় রাজপথে বিক্ষোভ করেছে। এ সময় পুলিশের লাঠিচার্জ, এমনকি মামলারও শিকার হতে হয়েছে অনেককে।
বাজার-বিশ্লেষকরা বলছেন, পুঁজিবাজার নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই আইন প্রণয়ন না করা, হতাশ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের বাজারবিমুখতা, কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের অনীহা ও ব্যাংকগুলোর সুদহার বাড়ার কারণে পুঁজিবাজারের এ সংকট বছরজুড়ে প্রকট থেকে প্রকটতর হয়েছে।
গত বছরের ডিসেম্বরের ধসের পর টানা সাড়ে ছয় মাস নিম্নমুখী থাকার পর গত জুলাইয়ে কিছুটা ইতিবাচক ধারায় ফিরলেও আগস্ট থেকে আবারও শুরু হয় দরপতন। এ সময় বিনিয়োগকারীদের অনেকেই বাজারবিমুখ হয়ে পড়েন। আর অস্থির এ পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এ সময়ের মধ্যে প্রায় অর্ধশত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। এসব সিদ্ধান্ত নেয়ার দিন থেকে পরবর্তী দু’এক দিন বাজার ঊর্ধ্বমুখী থাকে। কিন্তু কোনবারই স্থায়িত্ব পায়নি। এতে বাজার আরো অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে।
তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, ফলাফল শূন্য: বছরের সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিল পুঁজিবাজার কারসাজির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন। কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের ওই কমিটি ৭ এপ্রিল অর্থমন্ত্রীর কাছে এ প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে যাদেরকে বাজার কারসাজির নায়ক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল পরে তাদের হাতেই বাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দেয়া হয়। গোটা বছরে বাজার স্থিতিশীলতা মূখ্য ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে তাদেরই। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা বছর জুড়েই আস্থার সঙ্কটে ভুগেছেন। তদন্ত কমিটি যে সুপারিশ করেছিল তা এড়িয়ে চলেছে সরকার। প্রতিবেদনে যাদের নাম এসছিল তারা অনেক প্রভাশালী বলে মন্তব্য করে প্রতিবেদন প্রকাশে অনীহা জানিয়েছিলেন খোদ অর্থমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রীর অর্থহীন বক্তব্য: অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত বছরের বিভিন্ন সময়ে দেশের পুঁজিবাজার নিয়ে এমন অনেক মন্তব্য করেছেন, যা পরে ‘অর্থহীন’ বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাজার সংশ্লিষ্ট ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদরা । পরে তিনি নিজেই স্বীকার করে বলেছেন, ‘আমি কথা বললেই বাজারে ধস নামে’। পুঁজিবাজারকে জুয়ার আসর আর বিনিয়োগকারীদের জুয়াড়ি বলে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। এমন পুঁজিবাজার বিশ্বের কোথাও নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বাজার কীভাবে স্থিতিশীল হবে সেটাও তার জানা নেই বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলন অর্থমন্ত্রী। তার এসব বক্তব্যে বাজারে ধস আরো গতিশীল হয়েছে।
বিএবি’র তহবিল গঠন নিয়ে নাটক: ২৩ অক্টোবর পুঁজিবাজার স্থিতিশীল করতে প্রাথমিকভাবে এক হাজার কোটি টাকার একটি মিউচ্যুয়াল ফান্ড গঠনের ঘোষণা দেয় বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি)। বিএবি’র চেয়ারম্যান ও এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার সাংবাদিকদের বলেন, “প্রাথমিকভাবে এক হাজার কোটি টাকা নিয়ে শুরু করলেও তহবিলের আকার বেড়ে পাঁচ থেকে দশ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। ব্যাংকের দায়ের ১০ শাতাংশের মধ্যে থেকেও যদি বিনিয়োগ করা হয় তাহলে বর্তমানে ব্যাংকগুলো ৪০ থেকে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে পারবে।” অথচ বছর শেষ হলেও সেই তহবিল গঠন হয়নি। এমনকি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটের কথা বলে পুঁজিবাজারে নতুন করে বিনিয়োগ করেনি। এর আগে বাংলাদেশ ফান্ড নামে একটি তহবিল গঠনের ঘোষণা দেয়া হলেও তার কোনো কার্যকারিতা দেখা যায়নি।
প্রধানমন্ত্রীর হ্তক্ষেপ: বিনিয়োগকারীদের বিক্ষোভের মুখে অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতায় সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ১৬ নভেম্বর গণভবনে বৈঠক করেন। অবশ্য তার এ হস্তক্ষেপ বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার ব্যর্থতা বলে দাবি করেছেন অনেকেই। ওই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বাজার স্থিতিশীলতায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি পুষিয়ে দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পুঁজিবাজার স্থিতিশীলতায় ২৪ নভেম্বর এসইসি ২০টি পদক্ষেপ গ্রহণের গুচ্ছ প্যাকেজ ঘোষণা করে। স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের অধিকাংশই ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। এছাড়া পুঁজিবাজারে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য আগামী দুই মাসের মধ্যে বিশেষ স্কিমেরও ঘোষণা দেয়া হয়। এর আগে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের ব্যাক্তিগতভাবে কমপক্ষে দুই শতাংশ ও সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার সংরক্ষণ বাধ্যতামুলক করে নির্দেশনা জারি করে এসইসি। ১৪ ডিসেম্বর ডিএসই পরিচালকদের হাতে থাকা শেয়ারের পরিমাণ জানিয়ে হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, প্রায় এক হাজার ৪০০ পরিচালকের হাতে ন্যূনতম শেয়ার নেই। এর পর থেকে পরিচালকরা শেয়ার কেনার ঘোষণা দিতে শুরু করেন। এর প্রভাবে বছরের শেষ দিকে এসে বাজার কিছুটা স্থিতিশীলতার দেখা পায়।
গত এক বছরে এর সাধারণ সূচক কমেছে দুই হাজার ৮৬৪ পয়েন্ট। ২০১০ সালের ২৬ ডিসেম্বর ডিএসই সাধারণ সূচক ছিল আট হাজার ৯৬ পয়েন্ট। আর চলতি বছর ২২ ডিসেম্বর সূচক নেমে এসেছে পাঁচ হাজার ২৩২ পয়েন্টে। সূচক ও লেনদেনের পরিমাণের সঙ্গে বাজার মূলধনও বিপুল পরিমাণে হারিয়েছে দেশের পুজিবাজার। গত এক বছরে ডিএসই’র বাজার মূলধন কমেছে ৮৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা।
তবে পুজিবাজার বিষয়ে অনেকের অনেক বিশ্লেষণ ও অভিযোগ থাকলেও নতুন বছরের প্রথম দিকেই পুঁজিবাজারে আবারো স্থিতিশীল অবস্থা ফিরে আসবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞ মহলসহ সাধারণ বিনিয়োগকারীরা।
সুত্র Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

