নতুন বছরের প্রথম মাস। নতুন শ্রেণিকক্ষ, পুরান সহপাঠীর সাথে কিছু নতুন সহপাঠীরও দেখা। তদুপরি, সরকারপ্রদত্ত নতুন। ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের আনন্দটা দেখার মতো। বই নিয়ে দৌড়াদৌড়ি, নতুন বইয়ের গন্ধ নেয়া, সারা দিন বইয়ের পৃষ্ঠা ওল্টানো ইত্যাদি। এবার সরকারের বিনামূল্যে দেয়া ষষ্ঠ শ্রেণীর এক সেট বই দেখার সুযোগ হয়েছে। বই হাতে, যেন ফিরে গিয়েছিলাম স্কুলজীবনে। তবে আমার ক্ষণিকের আনন্দ বেদনায় পরিণত হলো। কারণ দেখে সন্দেহ হয়, এটা কি আমাদের দেশের বই নাকি ভারতের? এবার অনেকগুলো বই ভারত থেকে প্রিন্ট হয়ে এসেছে জানি এবং এ নিয়ে অনেক কথা শোনা গেছে।
যারা ষষ্ঠ শ্রেণীর বাংলা চারুপাঠ বইটি দেখেছেন, নিশ্চয়ই একটি বিষয় লক্ষ করে থাকবেন। বইটি শুরু হয়েছে একটা ভ্রমণকাহিনী দিয়ে, নাম ‘রাঁচি ভ্রমণ’। রাঁচি ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের রাজধানী ও মনোরম শহর। দীর্ঘকাল এটা ভারতের বিহার রাজ্যের অংশ ছিল। সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রত্যেকটি গল্পের পর ‘পাঠের উদ্দেশ্য’ দেয়া থাকে। এই গল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে লেখা আছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সমাজ-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা।
কিন' সাথে সাথে মনে প্রশ্ন জাগে, বইয়ের প্রথমেই স্বদেশ ফেলে ভিনদেশের পরিচয়সূচক গল্প থাকবে কেন? আগে তো কখনো এমন হয়নি? সব শ্রেণীর বাংলা বইয়ে আগে প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের পরিচয় তথা নিজেদের দেশের মানুষ, প্রকৃতি, গ্রামীণ জীবন, সংস্কৃতি ঐতিহ্য ইত্যাদি তুলে ধরা হতো। উদ্দেশ্য নিজ দেশকে জানা, স্বদেশের সাথে পরিচিত হওয়া, দেশপ্রেম জন্মানো। এবার কেন সেই কাঙ্ক্ষিত সুন্দর পদ্ধতির ব্যত্যয় ঘটল? আগে নিজেকে জানা নাকি অন্য দেশকে জানা বেশি জরুরি?
অপর দিকে, মূল রচনার পর সৃজনশীল পদ্ধতির এক ও দুই নম্বর প্রশ্ন দেখে আরো অবাক হতে হয়। চার-পাঁচ লাইনে সিলেটের জাফলং ও বান্দরবানের থানচি শহরের ভ্রমণকাহিনী নমুনাস্বরূপ লিখে রাঁচি ভ্রমণের সাথে তুলনা করে প্রশ্ন করা হয়েছে। এতে আমাদের দেশপ্রেমের অনুভূতিতে দারুণ আঘাত অনুভব করছি। মূল রচনা ভারতকে নিয়ে আর সহায়ক প্রশ্ন তৈরি হলো আমাদের দেশকে নিয়ে। এভাবে কি অবমূল্যায়ন করা হলো না বাংলাদেশকে? নিশ্চয়ই শিক্ষামন্ত্রী, পাঠ্যপুস্তক বোর্ড তথা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞ ব্যক্তিদের এসব ব্যাপার অজানা নয়। কথাগুলো আমরা নিজেরাই যদি নিজের দেশকে হেয় করি, তাহলে কেউ আমাদের সম্মান করবে না।
আজকের শিশু জাতির ভবিষ্যৎ। ছোটবেলা থেকে সে যা দেখবে ও পড়বে সেটাই শিখবে, ওর মনে ছাপ ফেলবে। আমি বিশেষ কোনো দেশের বিরোধী কিংবা অন্ধভক্ত কোনোটাই নই। যা হোক আশা করি, পাঠ্যপুস্তক বোর্ড স্কুল পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন এবং এ জন্য লেখা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ সচেতনতার পরিচয় দেবে। তথা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সেটাই হবে দায়িত্বশীলতার পরিচয়।
সূত্র http://www.dailynayadiganta.com/details/26704

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

