somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বঙ্গবন্ধু -গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার-আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতীয় শিল্পীদের গাওয়া সেই সব বিখ্যাত গান - একটি আলোচনা

০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ৯:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আমাদের প্রিয় সোনার বাংলাকে শ্মশানে পরিণত করে পাক হানাদার বাহিনী একাত্তরের পঁচিশে মার্চ থেকে। গণসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া বাঙালি অস্ত্র তুলে নিলো হাতে। বুকের তাজা রক্তদানে উদ্বুদ্ধ এক নিরস্ত্র জাতি এক নিমেষে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত হলো। প্রেরণা ছিল, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো, তবু এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্।’ ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোলার আহ্বান পাওয়া জাতি প্রতিরোধের দূর্গ গড়ে তুলেছিলো। সারা বাংলাকে দখলদার পাকবাহিনী জেলখানা বানিয়ে হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন অগ্নিসংযোগসহ ধংসযজ্ঞ চালিয়ে যায় নির্বিচারে নির্মমভাবে ।
একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের জন্য। বলেছিলেন, তিনি যদি না-ও থাকেন, এমনকি হুকুম দিতে না পারেন, তবু বাঙালিকে তার স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যেতে। ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা চালায় পাক বাহিনী। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা বাণী পাঠিয়েছেন ওয়ারলেসের মাধ্যমে। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ভাগ্যবিধাতা তখন শেখ মুজিব। যিনি জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হয়েছিলেন ভোটে। নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় অহিংস পন্থায় এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে পাকিস্তানী উপনিবেশ থেকে নিজেদের মুক্ত করার পথে বাঙালি জাতি অনেকটা পথ তত দিনে পাড়ি দিয়েছে।
বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানে কারাগারে নিঃসঙ্গ। ফাঁসির মঞ্চ তৈরি। কবরখানাও খোঁড়া হয়েছে। বিচারের নামে প্রহসনপর্বও চলেছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তখন সাড়ে সাত কোটি বাঙালিসহ বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম। বঙ্গবন্ধুর নামে বাঙালি যুদ্ধজয়ের নেশায় মত্ত তখন। শত্রুবাহিনী ধ্বংসে সদা লিপ্তহয়েছিল বাঙালি। বঙ্গবন্ধু সেই মার্চেই পথ দেখিয়েছিলেন। তাই স্লোগান উঠেছিল, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।’ রণাঙ্গন থেকে রণাঙ্গনে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুর বিরুদ্ধে তুমুল যুদ্ধ চালিয়েছে। বর্বর হানাদার বাহিনীর নির্যাতন নিপীড়নে কোটি মানুষ প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রিত শরণার্থী শিবিরে। অসহায়, নিরীহ মানুষের পাশে তখন অনেকেই এসে দাঁড়িয়েছেন। মুক্তিকামী বাঙালির সাহায্যে এগিয়ে এসেছিলেন বিশ্বের অনেক মানুষ।
বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে প্রেরণা ও সহায়তার জন্য তখন এগিয়ে এসেছিলো পশ্চিমবঙ্গের গ্রামোফোন রেকর্ড কোম্পানিগুলো। এইচএমভি, হিন্দুস্তান রেকর্ডস্, টুইন রেকর্ড, কলম্বিয়া, পলিডর, সেনোলা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গান, কবিতা, নাটক ও যাত্রাপালার রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। বিক্রির একটা অংশ শরণার্থীদের সহায়তা তহবিলে দান করা হয়। একাত্তর সালের জুন মাসে গ্রামোফোন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর গান তৈরির জন্য গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীদের অনুরোধ জানায়। বাংলা গানের নামীদামী শিল্পী, সুরকার, গীতিকাররাও এগিয়ে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, শ্যামল গুপ্ত, শিবদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, মীরাদেব বর্মন, সুবীর হাজরা, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, মুকুল দত্ত, অমিতাভ নাহা, বিশ্বনাথ দাস, পবিত্র মিত্র প্রমুখ গীতিকার গান লিখেছেন। সুরকাররাও প্রাণবন্ত এবং আবেগপূর্ণ সুর করেছিলেন। এর মধ্যে শচীন দেববর্মণ, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, রাহুল দেববর্মণ, বাপী লাহিড়ী, অপরেশ লাহিড়ী, নীতা সেন, দীনেন্দ্র চৌধুরী, অভিজিৎ, দেবব্রত বিশ্বাস প্রমুখ সুর দিয়েছেন। আর এঁদের ছাপিয়ে যেন প্রজ্বলিত হয়েছিলেন যুদ্ধজয়ের গানে সলিল চৌধুরী। গণসঙ্গীতের মূর্ছনায় তিনি ছিলেন অন্যরকম দিশারী। গেয়েছেন কলকাতার প্রায় শিল্পীই। হেমন্ত, দ্বিজেন, শ্যামল, মানবেন্দ্র, সত্যব্রত দত্ত, ভূপেন হাজারিকা, বনশ্রী সেন গুপ্ত, নির্মলা মিশ্র, আশা ভোঁসলে, রাহুল দেববর্মণ, দেবব্রত বিশ্বাস, ললিতা ধর চৌধুরী, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, অংশুমান রায়, , নির্মলেন্দু চৌধুরী মিন্টু দাশ গুপ্ত প্রমুখ গেয়েছেন। এছাড়া রবিশংকরও এইচএমভি থেকে কণ্ঠ ও যন্ত্রসংগীতের রেকর্ড করেছিলেন ‘জয় বাংলা’ নামে।
একাত্তরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রেও বেজেছে কোলকাতার শিল্পী অংশুমান রায়ের গাওয়া, ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোলকাতার শিল্পীদের প্রকাশিত গানের অন্যান্য রেকর্ড বাজানো হয়নি। স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে যেসব গ্রামোফোন রেকর্ড বাজানো হয়েছে, তা ঢাকায় উৎপাদিত ছিল। তবে কেবল বাপি লাহিড়ীর সুরে, শ্যামল গুপ্তের লেখা এবং আবদুল জব্বারের গাওয়া ‘হাজার বছর পরে’ এবং ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষের আরেকটি নাম’ গান দুটি বাজানো হয়েছিল। যার প্রকাশক ছিলো এইচএমভি।
একাত্তরের জুলাই মাসে এইচএমভি থেকে গান রেকর্ড করার অনুমতি পেয়ে শিল্পী অংশুমান রায় শরণাপন্ন হলেন খ্যাতনামা গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের। তিনি ততোদিনে ‘মাগো, ভাবনা কেন, আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে’ গানটি লিখে ফেলেছেন। বাংলাদেশের সুরকার সমর দাসের সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গানটি রেকর্ডও করেন। অংশুমানের অনুরোধে গৌরীপ্রসন্ন লিখলেন বাঙালির সেই বিখ্যাত চিরসবুজ চিরঞ্জয়ী গান ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি আকাশে বাতাসে উঠে রণি।’ যে গান চল্লিশ বছর পর আজও প্রাণে ঝড় তোলে। উদ্দীপনা জাগায়। মনে আনে যুদ্ধদিনের দৃশ্য। চোখে ভাসে সাত মার্চের ভাষণ। ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে থাকে জাগরণ মন্ত্র: ‘জয় বাংলা’ যে জয় বাংলা বলতে এই ৪১ বছরে এসেও অনেকেরই কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে যায়। অথচ বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষের কাছে, শিল্পী-সাহিত্যিকদের কাছে বলেছিলেন সেই একাত্তরের জানুয়ারিতে “স্বায়ত্তশাসনের অর্থই হচ্ছে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাহিত্য-সাংস্কৃতিক স্বাধিকার। ‘জয় বাংলা’স্লোগানের লক্ষ্য এই একাত্তরের সামগ্রিক স্বাধিকার অর্জন।” আবার একাত্তরের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমীতে একুশের অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধনকালে বলেছিলেন বঙ্গবন্ধু, “আমাদের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মধ্যেই এদেশের রাজনৈতিক; অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি নিহিত আছে।” তাই জয় বাংলা কেবলই রণধ্বনি ছিল না। ছিল, আছে, থাকবে জাতীয় জাগরণের মন্ত্র হিসেবে। বাংলার কতো শহীদ ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি তুলে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে এই বাংলার জন্য। অথচ জয় বাংলা বলতে বাংলার মানুষ আজ ভাবে। এই গানে সে কথাও বলা হয়েছে ৪১ বছর আগে অংশুমান রায় গান নিয়ে সুরকার ও সংগীত পরিচালক দীনেন্দ্র চৌধুরীর সঙ্গে বসে সুর তৈরি করেন। রেকর্ড করার সময় বিপাকে পড়েন অংশুমান অপর পিঠের গান নিয়ে। উদ্ধার করলেন আবারো গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। সুর কথা ঠিক রেখে গানটির ইংরেজি ভার্সন তৈরি করলেন। এইচএমভি ইংরেজি ভার্সনে নারীকণ্ঠ সংযোজনের পরামর্শ দেয়। করবীনাথ নামে একজন শিল্পী তখন মঞ্চে ইংরেজি গান গাইতেন। দীনেন্দ্র চৌধুরী তাকেই বেছে নেন। তারপর তৈরি হলো গানটির ইংরেজি ভার্সন ‘মিলিয়ন মুজিবরস সিংগিং’ খুব দ্রুতলয়ে গানটি গাওয়া হয়েছে। গানটির রেকর্ড বিক্রি হয়েছিল প্রচুর পরিমাণে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশেও এই গানের রেকর্ড বিক্রি হয়েছে। ইংরেজি গানটি আজকাল আর শোনা যায় না। বেতারে টিভিতে বাংলাটিই বাজানো হয়। অথচ ইংরেজি ভার্সনটি বাজানো হলে বিদেশী শ্রোতাদের কাছেও গানটি জনপ্রিয় হতো। কারণ এই গানে আছে বাংলার সেই সব শিক্ষিত মানুষদের কথা, যারা এই বাংলাকে দেখেছেন সোনার বাংলা, রূপসী বাংলা। আর বঙ্গবন্ধু এনে দিলেন জয় বাংলা। একাত্তরে শরণার্থী শিবিরে, মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্পে গানটি বেজেছে তখন। আকাশবাণী থেকে প্রথম গানটি প্রচারিত হয় ‘সংবাদ বিচিত্রা’ নামে একটি অনুষ্ঠানে। উপেন তরফদার ছিলেন যিনি অনুষ্ঠান প্রযোজক, তিনি গানটি তৈরি হবার পর হারমোনিয়াম সহযোগে গাওয়া অংশুমানের কণ্ঠে গানটি টেপ রেকর্ডারে ধারণ করে তা প্রচার করেছিলেন একাত্তরের জুলাই মাসে। স্বাধীনতার পর ঢাকা বেতারের বিশ্বসংগীত অনুষ্ঠানে ও বহির্বিশ্ব কার্যক্রমে গানটির ইংরেজি ভার্সন বাজানো হয়েছে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলা-ইংরেজি কোন গানই বাজেনি। সেসব ইতিহাসের করুণ পথ।
অংশুমান রায় ছিলেন মূলতঃ লোকগায়ক। সাঁওতালী সুরে গাওয়া তার গান ‘ঝিঙেফুল লেল জাতি’ বা ‘বড় লোকের বেটি লো’ ইত্যাদি বেশ কিছু গান ঊনসত্তর, সত্তর সালে বেশ জনপ্রিয় হয়। ভরাট কণ্ঠের অধিকারী হলেও আধুনিক গানের শিল্পী ছিলেন না। তবে আকাশবাণীর অনুরোধের আসরে তার লোক গান বাজানো হতো বেশ পরিমাণে। অংশুমান রায় যখন এই গানে কণ্ঠ দেন, তখন তার বয়স ২৬ পিতৃপুরুষ রাজশাহীর হলেও জন্মেছেন মালদহে। তাই সাঁওতালী গান তাকে আলোড়িত করতো। দুঃখজনক যে, এই শিল্পী ব্যক্তিগত জীবনে হতাশা থেকে আত্মহননে নিঃশেষিত হলেও বাংলার মানুষের কাছে এখনো সতেজ। এখনো চিরতরুণ, আবেদনময়। দীনেন্দ্র চৌধুরী লোকগীতির গায়ক। পিতৃভূমি সিলেট হলেও জন্মেছেন কোলকাতায়। পরিবারে সংগীতচর্চা ছিল। সত্তর সাল থেকে এইচএমভিতে লোকগানের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু হলেও অনেক আধুনিক গানের সংগীতায়োজনে শুধু নয়, সুরও দিয়েছেন। তার অন্য এক সেরা প্রকাশনা হচ্ছে, মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’-র গীতিনাট্য রূপ। তিনি নিজে সুর দিয়েছেন। সেই সুর রেখে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার গীতিনাট্যটির ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন। বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে দক্ষতা ছিল দীনেন্দ্র চৌধুরীর। সলিল চৌধুরীর সঙ্গে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। তিনিও প্রয়াত আজ। করবীনাথের পূর্বপুরুষ বিক্রমপুরের অধিবাসী। কলকাতায় জন্ম এ শিল্পী ইংরেজি গান গাইতেন বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা কনসার্টে। এইচএমভি থেকে একাত্তর সালে তার ইংরেজি গানের রেকর্ডও বেরিয়েছে।
‘শোন একটি মুজিবুরের রক্ত থেকে লক্ষ্য মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি’ গানের স্রষ্টা খ্যাতিমান গৌরীপ্রসন্নর শেকড় বাংলাদেশের পাবনাতে। তার পিতা হরিপ্রসন্ন মজুমদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার পর বিজ্ঞান অনুষদে অধ্যাপনা করেছেন। শৈশবে ঢাকায় এলেও কোন স্মৃতি মনে নেই। গৌরীপ্রসন্ন যখন ‘শোন একটি মুজিবর’ লেখেন তখন তিনি ইংরেজিতে মাস্টার্স পরীক্ষার্থী। এর কুড়ি বছর আগে ১৯৫১ সালে বাংলায় এমএ করেছেন। বাল্যকালে সংগীতচর্চা শুরু। প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র থাকাকালে সুরকার অনুপম ঘটকের কাছে গান শিখেছেন। প্রিয়শিল্পী ছিলেন শচীনদেব বর্মণ ও আব্বাসউদ্দিন আহমদ। তাদের গানের জলসার নিয়মিত শ্রোতা ছিলেন। সে সুবাদে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে শচীনদেব বর্মণের সঙ্গে। ভেবেছিলেন অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করবেন, পিতার মতোই অধ্যাপনা বেছে নেবেন। কিন্তু শচীন কর্তা তাকে যেন বেঁধে দিলে আষ্টেপৃষ্ঠে গানের জগতে। কিন্তু ছিলেন তিনি বাঁধন হারা। গানপাগল হলেও গায়ক হিসেবে নিজের আত্মপ্রকাশে আগ্রহী ছিলেন না। শচীন কর্তার অনুরোধে গান লেখা শুরু, তারপর আর থেমে থাকেন নি। এরই মাঝে কালিদাসের মেঘদূত অনুবাদ করেছেন। সময় নিয়েছিলেন মাত্র ১৫ দিন। নিতান্ত সাধাসিধে, পাজামা-পাঞ্জাবী পরিহিত এক বলিষ্ঠ মানুষ ছিলেন। উচ্চতায় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সমান বলেই হয়তো ঘনিষ্ঠতাও ছিল বেশি। একসঙ্গে কাজও করেছেন।
সমকালে ছিলেন তিনি গীতিকার শ্রেষ্ঠ। তার গানের বাণী কখনো একঘেঁয়ে নয়। ভাব, ভাষা, শব্দ, ছন্দ ও রচনাশৈলী নিয়ে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গেছেন। একই ফর্মে বেশিদিন গান লেখেননি। এ ব্যাপারে ছিলেন সতর্ক, সচেতন। সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “আমি চেষ্টা করি এক এক সুরকার ও গায়কের জন্য এক এক রকম গান লিখতে। অনেক সময় সুরের স্বাধীনতা স্বীকার করে শব্দ বসাই।” গৌরীপ্রসন্ন যখন গান লেখা শুরু করেন, তখন তেমন প্রতিভাবান গীতিকার ছিলো না। অজয় ভট্টাচার্য, মোহিনী চৌধুরী, শৈলেন রায়, সুবোধ পুরকায়স্থ, প্রণব রায়, পবিত্র মিত্র প্রমুখ গীতিকারদের রচনায় সমৃদ্ধ আধুনিক বাংলা গানের ঐতিহাসিক ধারার যোগ্য উত্তরাধিকারী হলেও গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার জীবৎকালে যথাযথ সম্মান পাননি বলে অভিমান ছিল। নানা পুরস্কারে ভূষিত এই গীতিকার চাইতেন কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেতে। একসময় বাংলা ও ইংরেজিতে অনেক কবিতাও লিখেছেন। দেশ পত্রিকায় তাঁর কবিতাও ছাপা হয়েছে। কিন্তু গীতিকার হিসেবে পরিচিতি পাবার পর তাঁর কবিতা আর সমাদর পায়নি। মূল ধারার কবিতার আসনে ঠাঁই পায়নি সে সব কবিতা। তার গান যতো আলোড়ন তুলেছে, কবিতা সেখানে নিষপ্রভ বলেই পাঠকপ্রিয়তা পায়নি। ছড়াও লিখেছেন। তা যতোটা সমাদর পেয়েছে, তুলনায় তাঁর ছড়াগান জনপ্রিয়তা পেয়েছে বেশি।
গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ১৯৮৫ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘কাব্য সাহিত্যের ইতিহাসে গীতিকারদের স্থান দেওয়া হয় না। এ বড় ক্ষোভের কথা। অজয় ভট্টাচার্য, শৈলেন রায়, মোহিনী চৌধুরী প্রমুখ গীতিকারদের কবি প্রতিভা সম্বন্ধে কারোর কোন সন্দেহ থাকার কথা নয়। তবু কবি সম্মেলনে কোন গীতিকারকে ডাকা হয় না। কবিতায় সুর দিলেই গান হয় না। গানের ভাষা সম্পূর্ণ আলাদা। তা না হলে রবীন্দ্রনাথ কবিতা ছাড়াও অত গান লিখতেন না। তিনি যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তা একটি গানের বইয়ের জন্য।’ তবু গৌরীপ্রসন্ন বেঁচে থাকবেন চিরদিন তাঁর বিপুল সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। যত দিন বাংলাদেশ থাকবে এমনকি বাংলা আধুনিক গান, ততোদিন স্মরিত হবেন। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার কত গান লিখেছেন? এক হাজার? দেড় হাজার? হতে পারে। তার নিজেরও কোন হিসেব ছিল না। বিশ শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে আশির দশকের মাঝামাঝি, মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মন ছুঁয়ে যাওয়া অসংখ্য গান তিনি লিখেছেন। কে ভুলতে পারে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া স্মৃতির সুরভী মাখা তাঁর সেই সব গান ‘ওগো মোর গীতিময়, গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু, কে তুমি আমারে ডাকো, জানি না ফুরাবে কবে, ঘুম ঘুম চাঁদ, এখানে প্রজাপতি, শুধু গানের দিন; আমি যে জলসা ঘরে’ ইত্যাদি।
মনে পড়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান_ এ মোর গানের স্মরলিপি, স্মরণের এই বালুকা বেলায়, মেঘ কালো অাঁধার কালো, আকাশ মাটি ঐ ঘুমালো, আমি দূর হতে তোমারেই দেখেছি, পথের ক্লান্তি ভুলে, ও নদীরে, ধিন কোটে ধিন, নীড় ছোট ক্ষতি নেই এবং এক গোছা রজনীগন্ধা’ ইত্যাদি। ‘জীবনে যদি দ্বীপ জ্বালাতে নাহি পারো’ কিম্বা ‘জানি একদিন আমার জীবনী লেখা হবে’_ সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের এই দুটি গান লিখেই একজন শ্রেষ্ঠ গীতিকারের সম্মান লাভ করেন।
শ্যামল মিত্র তাঁর বহু গানে সুর দিয়েছেন, গেয়েছেনও, মনে পড়ে সেই সব গান_ ‘এমন দিন আসতে পারে, যদি ডাক ওপার হতে, জীবন খাতার প্রতি পাতায়।’ মান্না দে’র সংগীত জীবনের প্রথম দিকের বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় গান গৌরীপ্রসন্ন লিখেছেন; কত দূরে আর নিয়ে যাবে বল, তীর ভাঙা ঢেউ আর নীড় ভাঙা ঝড়, তুমি আর ডেকো না, হায় হায় গো রাত যায় গো, যদি কাগজে লেখো নাম, ওগো বরষা তুমি ঝরোনা গো। কিশোর কুমারের কণ্ঠে উল্লেখযোগ্য গান_ আকাশ কেন ডাকে, কী আশায় বাঁধি খেলাঘর, আমার দ্বীপ নেভানো রাতি, আমার মনের এই ময়ূর মহলে। লতার গাওয়া_ প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে, ও পলাশ ও শিমুল, গীতা দত্তের_ তুমি যে আমার, আশা ভোঁসলের_ যেতে দাও আমায় ডেকো না, পোড়া বাশি শুনলে এমন, না এখনি নয়, ফুলে গন্ধ নেই এতো ভাবতেই পারি না, ময়না বল তুমি কৃষ্ণ রাধে। অজস্র শিল্পোত্তীর্ণ গান লিখেছেন। জনপ্রিয় গানের সংখ্যাও কম নয়। একের পর এক হিট হয়েছে। কালপ্রবাহে তাঁর গান বিলীন হয়ে যায়নি। এসব গান বুঝি চিরদিনের। কোনদিন পুরনো হবার নয়। কোন গান জনপ্রিয় হয় গীতিকার, সুরকার ও কণ্ঠশিল্পীদের একাত্ম মিলনে। তাঁর গানে সুর দেননি, তাঁর গান গাননি এমন সুরকার অথবা গায়ক কেউ নেই। আমাদের সাবিনা ইয়াসমিনও তাঁর লেখা গান গেয়েছেন সেই বাহাত্তরে রেকর্ডে।
গৌরীপ্রসন্নর সব গানই কাব্য সুষমায় অতুলনীয় একথা বলা যাবে না। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে কখনো কখনো তাঁকে সমঝোতা করতে হয়েছে। বেশ কিছু হাল্কাচালের গানও তিনি লিখেছেন। বোম্বের এক বিখ্যাত শিল্পীর ডাকে তিনি তড়িঘড়ি বোম্বে গেছেন। গিয়ে দেখেছেন সুর তৈরি, কথা বানানোর জন্য তাঁর ডাক পড়েছে। অল্পসময়ের মধ্যেই গৌরীপ্রসন্ন সে সব সুরে কথা বসিয়ে দিলেন। হালকা মেজাজের গান, কিন্তু বাজারে দারুন হিট। বাংলা সিনেমার গানেও গৌরীপ্রসন্ন অনন্য সাফল্যের অধিকারী। বিন্যাসে সুপ্রযুক্ত একটি গানের ব্যঞ্জনা অপরিসীম হতে পারে জানা ছিল তার। অসংখ্য ছায়াছবিতে তিনি গান লিখেছেন এবং সেসব গান জনপ্রিয়ও হয়েছে। অরক্ষণীয়া, অগি্নপরীক্ষা, পথে হল দেরী, মরুতীর্থ, হিংলাজ, সপ্তপদী, দেয়া নেয়া, সবার উপরে, সূর্যমুখী, বনপলাশীর পদাবলী, নীল আকাশের নীচে, এন্টনি ফিরিঙ্গি, নিশিপদ্ম প্রতিদান, ইন্দ্রানী, সন্ন্যাসী রাজা, জয় বাবা তারকানাথ, অমানুষ তিনমূর্তি, স্মরলিপি গৌরীপ্রসন্ন সম্পর্কে দীর্ঘকথন, বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরিচিতিটুকু তুলে ধরা। যার সৃষ্টি আজো বাংলার মানুষকে প্রেরণা যোগায়, যার সৃষ্টি বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশবিশেষ। সেই গৌরীপ্রসন্ন ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে বাংলাদেশে এসেছিলেন। সবুজের মেঠো ছায়াপথ নয়, দেখেছেন বিধ্বস্ত দেশ, পিতৃস্মৃতি হাতড়াতে ঘুরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাতেও। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের সহায়তার জন্য। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের ছবি পরদিন ঢাকার কাগজে ছাপা হয়েছিল। প্রায় এক দশক ধরে তিনি ক্যান্সারে ভুগছিলেন। কিন্তু লেখা থামাননি। ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট ৬১ বছর বয়সে বোম্বের এক হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পরলোক গমন করেন। মৃত্যুর আগে হাসপাতালে লিখেছিলেন শেষ গান, গেয়েছিলেন নিজের সুরে সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, ‘এবার তাহলে আমি যাই, সুখে থাক ভালো থাক, মন থেকে এই চাই।’
এখনো দশ জানুয়ারি, চবি্বশ জানুয়ারি, একুশ ফেব্রুয়ারি, সাত মার্চ, সতর মার্চ, ছাবি্বশ মার্চ, পনের আগস্ট, ষোল ডিসেম্বরের বিশেষ দিনগুলোতে যখন বেজে ওঠে অমর সেই গান ‘শোন একটি মুজিবরের থেকে লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বর’ শ্রুতি গোচর হয় বাঙালির। প্রাণে প্রাণে যেন সাড়া জাগে, ভেতর থেকে গেয়ে ওঠে যেন, ‘লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে।’ আমরা তাঁদের প্রতীক্ষায়। যারা এই গান গেয়ে উজ্জীবিত করবেন আবারো বাংলার মানুষকে মুক্তির সংগ্রামে। বাঙালি জাতি তার মুক্তিসংগ্রামে বাংলার মানুষকে উজ্জীবিত করার জন্য গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, অংশুমান রায়, দীনেদ্র চৌধুরী ও করবীনাথ যে মহৎ সৃষ্টি রেখে গেছেন, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে সেটাই স্বাভাবিক। বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে ভারতের বাংলাভাষী মানুষদের যে সহায়তা ও অবদান বাঙালির স্বাধীনতা ও মুক্তির ইতিহাসে সন্নিবেশিত থাকাই যুক্তিযুক্ত।
এই লেখার সমস্ত তথ্যই ইন্টারনেট থেকে নেওয়া। এখানে আমার কোন কৃতিত্ব নেই। পড়ে ভালো লাগলেই আমার আনন্দ।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ৯:৩৬
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অটোপসি

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ দুপুর ১২:৩২

যে পাহাড়ে যাব যাব করে মনে মনে ব্যাগ গুছিয়েছি অন্তত চব্বিশবার-
একবার অটোপসি টেবিলে শুয়ে নেই-
পাহাড়, ঝর্ণা, জংগলের গাছ, গাছের বুড়ো শিকড়- শেকড়ের কোটরে পাখির বাসা;
সবকিছু বেরিয়ে আসবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গৌরব গাঁথা আমাদের ইতিহাস : ঘটনাপঞ্জি ও জানা অজানা তথ্য। [১]

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:১৮


আমার এ পোষ্টটি সবার ভালো না ও লাগতে পারে । যাদের মুক্তিযুদ্ধ ও আমাদের স্বাধীনতার গৌরবগাঁথা সর্ম্পকে বিন্দু মাত্র শ্রদ্ধাবোধ বা আগ্রহ নাই তারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজ দেশে অবহেলিত এশিয়া কাপে স্বর্ণ পদক বিজয়ী!

লিখেছেন ঘূণে পোকা, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:০৪

‘আমার দেশে আমার কোনো দাম নেই’



রোমান সানা (তীরন্দাজ) : ‘বড় পর্যায়ের কারও কাছ থেকে কোনো শুভেচ্ছা পাইনি। এটা নিয়ে কষ্ট হচ্ছে। অথচ ক্রিকেটে জিম্বাবুয়েকে হারানোর পর আফিফ হোসেনকে কত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকার পথে পথে- ১৪ (ছবি ব্লগ)

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:২৩



ঢাকা শহরের মানুষ গুলো ঘর থেকে বাইরে বের হলেই হিংস্র হয়ে যায়। অমানবিক হয়ে যায়। একজন দায়িত্বশীল পিতা, যার সংসারের প্রতি অগাধ মায়া। সন্তনাদের প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা- সে-ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছাত্রলীগ নিয়ে শেখ হাসিনার খোঁড়া সমাধান!

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৫ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:২৫



Student League News

স্বাধীনতা যুদ্ধের পর, ছাত্র রাজনীতির দরকার ছিলো না; ছাত্ররা ছাত্র, এরা রাজনীতিবিদ নয়, এরা ইন্জিনিয়ার নয়, এরা ডাক্তার নয়, এরা প্রফেশালে নয়, এরা শুধুমাত্র ছাত্র;... ...বাকিটুকু পড়ুন

×