somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি রক্তাক্ত লাল পদ্ম

২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৪:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সেল ফোনটা বেজেই চলেছে ।বিরক্ত হয়ে ফোনটা তুললাম। রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে বলে নাম্বারটা না দেখেই চেঁচিয়ে বললাম ।
-এই কে ?
- আমি ।
মিষ্টি একটা কণ্ঠ । আমি আবার চেঁচাতে গিয়েও থমকে গেলাম । মাধবী ! খুশিতে আমার চোখে জল চলে আসার মত অবস্থা হলো।এই একটি মেয়ে যার পিছনে আমি অনেকটা দিন ঘুরঘুর করেছি কিন্তু পাত্তাই পাইনি..........
-একটু বাইরে দেখা করব। সময় হবে ?
-আমি খুশিতে টগবগ করে ফুটতে লাগলাম ।
-মাধবী তুমি সত্যি বলছো ।
-বারে মিথ্যা বলবো কেন?আমি কি আপনাকে কোনদিন মিথ্যা বলেছি ?
মাধবীর প্রথম আহ্বান আমি কি করে ফেলি !কিন্তু পারিবারিক ব্যস্ততার কারণেআমার আর ওমুখো হওয়া হলো না।কয়েক দিন খুব ব্যস্ততার মধ্যে কেটে গেল।তার মধ্যে কয়েকটা কবিতা লেখার ছিলো । অনেকদিন ধরে ঝুলে আছে।সেগুলো ঘসেমেজে সুপাঠ্য করে তুললাম ।রাত বারোটা প্রায়ই। আপন মনে সিগারেট টানছি। এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। কানে তুলতেই সেই মিষ্টি কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
- কি করছেন ? ঘুমোচ্ছেন?
সঙ্গে সঙ্গে সিগারেটটা জানালার বাইরে ছূড়ে ফেলে দিলাম, মনে হল যেন মাধবী দেখে ফেলবে আমি সিগারেট খাই।
আমি বললাম -ঘুমালে কি ফোন ধরতাম ?শুয়ে বসে আছি কিছু লেখার কাজ ছিল, সেগুলোই শেষ করছিলাম।
ও প্রান্ত থেকে মাধবী বলল-আপনি লেখক?
সঙ্গে সঙ্গে বিনয়ে গদগদ হয়ে বললাম
-মোটেই না। লেখক একটা গ্রেট শব্দ। আমি জাস্ট একজন ...।টাইম পাস করি আরকি ?
-ওভাবে বলবেন না, আপনার মধ্যে উড়ুউড়ু ভাব রয়েছে।হি হি হি ।
কথা পাল্টাবার জন্য বললাম
-কী করছো এখন?
মাধবী এবার অনুযোগের সুরে বলতে লাগল
-আর বলবেন না। পরীক্ষার জ্বালায় অস্থির , পড়তে পড়তে ভালো লাগছিলো না আর। মনে হল আপনার সঙ্গে কথা বলে বোরিং ভাবটা কাটাবো।
সেদিনের মতো মাধবী আবার বলে উঠল
-আচ্ছা, আমরা দেখা করতে পারি না?
আমার তখন ক্লান্তিতে চোখের পাতা আপনা থেকে বুঁজে আসছে। ঘুম ঘুম স্বরে বললাম
-পারি ,পারি তো। নিশ্চয় দেখা হবে ।
মাধবী আমার ঘুম ঘুম ভাবকে খুব একটা পাত্তা দিল না, বলে চলল,
-আপনি বুড়ো বটগাছের বাজার চেনেন তো? আমি কাল বিকেলে দাঁড়িয়ে থাকব ওখানে, নীল শাড়ি পরে থাকব। হাতে থাকবে একটা লালপদ্ম। বুঝলেন কিছু?
আমি তখন অন্য জগতে চলে গেছি। মোবাইলটা হাত থেকে পড়ে গেল একসময়। পর দিন খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গল। কালকের রাতের ঘটনাটা মনে পড়ল এবং দারুণ খারাপ লাগলো, মাধবী কী ভাবল কে জানে! আমি আসলে ওকে নিরাশ করতে চাইনি ।কিন্তু কী করব, এত ক্লান্ত লাগছিলো। মাধবী আমাকে দেখা করার কথা বলছিল না? কিন্তু কীভাবে? আমার মনে পড়ে পড়ল না ও কী বলেছিল।আগে একবার কথা দিয়েও কথা রাখতে পারিনি।
এরপর আবার রাত নটার সময় ফোন বেজে উঠল। মাধবীর বেশ রাগীস্বর ভেসে এল,
-আপনি কি ভেবেছেন আমি কিছু বুঝতে পারবো না?
আমি বিস্ময় প্রকাশ করে মৃদু হাসলাম,
-কেন, কী হয়েছে?
- একদম কথা বলবেন না। আপনি ভদ্রলোকের মুখোশ পরে থাকেন, কিন্তু আপনি একটা বাজে লোক ।
আমার অপমানে কান লাল হয়ে গেল। মাধবীর ব্যবহারে প্রচুর খারাপ লাগতে লাগলো। মাধবী বলেই চলল,
-আপনাকে বলেছিলাম আমি নীল শাড়ি পরে লাল পদ্ম হাতে একা দাঁড়িয়ে থাকব, । অমনি দুষ্টুমি শুরু হয়ে গেল। আপনি আমার পিছন নিলেন। তারপর ছবি তোলার খুব শখ না, যেদিকে আমি যাচ্ছি সেদিকে আপনি যাচ্ছেন এবং ছবি তুলছেন। আপনাকে বারণ করা সত্বেও আপনি শোনেননি। আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল, আপনাকে দেখা করবার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম।আর আপনি.......
আমার খুব রাগ হলো খুব, মনে হল এই মেয়েটাকে আমি মিছেই মূল্য দিয়েছি্লাম। আমি বললাম
-তুমি কী করে বুঝলেন ঐ ফটো তোলা লোকটি আমি?আর আমার ক্যামেরা দুরে থাক আমিতো ছবিই তুলতে পারি না।তাছাড়া তুমি তো আমায় চেনো ।কেন মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছো।
মাধবী চেঁচিয়ে ওঠে
-ওই সময় আপনি ছাড়া কেউ জানত না আমি দাঁড়িয়ে থাকব। তাছাড়া যে বিদঘুটে চেহারা, আপনি না হয়ে যান না। আপনি পালিয়ে গেলেন কেন, আমার চড় খেয়ে?
হাতটা নিজের অজান্তে গালে চলে গেল, কখন আমায় ও চড় মারল?কি অদ্ভুত কথাবার্তা ।
মাধবী বলল
-মনে রাখবেন আমি আপনার বাজে বিচ্ছিরি ভাষার কবিতাগুলি নই। আপনাকে পুলিশে দেওয়ার ক্ষমতা আমার রয়েছে। আপনার সাথে ব্রেক আপ।ব্যস
বলেই ফোনটা কেটে দিল। আরে কবে আমার সাথে সম্পর্ক হল যে ও শেষ করে দেবে? আমি কিন্তু খুব কষ্ট পেলাম। সারা রাত ঘুমতে পারলাম না। কী বাজে অভিযোগ করল...আর আমার সাথে সম্পর্ক শেষ করে দিল? কোন দিন আর ফোন করবে না আমায়?
কয়েকটাদিন খুব বিচ্ছিরিভাবে কাটল। দিন পাঁচেক পরে মনটা একটু শান্ত হয়েছে। আপন মনে আমার ঘরে সিগারেট টানছি। এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। নাম্বার দেখে আমার বুকটা ধড়াস করে উঠল। ফোন তুলতে চাইছিলাম না তারপর কি যে হলো ফোনটা তুলতেই সেই মিষ্টি কণ্ঠস্বর ভেসে উঠল,
-আমি দোষ স্বীকার করছি, আমি ভুল করেছি। ওটা আপনি ছিলেন না ।সবই আমার বানানো ।
আমি বললাম
-তুমি খুব অদ্ভুত তো, প্রথমে আমায় অপমান করবে তারপর ভুল স্বীকার করবে। তোমার সাথে এখন কথা বলতে ভয় পাই।
মাধবী কান্না জড়ান গলায় বলল,
- জানেন আমার খুব অহঙ্কার। আমার ধারনা কেউ আমাকে উপেক্ষা করতে পারে না। আপনি সেই অহঙ্কার ভেঙ্গে দিলেন। সেই জন্য প্রতিশোধ নেবার আকাঙ্ক্ষা জেগেছিল। কিন্তু আমি আপনাকে ভুলতে পারছি না।আপনার সাথে দেখা করতে চাই। প্লিজ আমার সাথে দেখা করুন...
সঙ্গে সঙ্গে আমার রাগ গলে জল হয়ে গেল , মনের মধ্যে শত শত ভালোবাসার লাল পদ্ম ফুটে উঠলো।
- কীভাবে দেখা হবে ?
মাধবী বলল
- আমি কাল বিকেলে ফুলতলা স্টেশনে একা দাঁড়িয়ে থাকব, নীল শাড়ি পরে, হাতে... কথা কেড়ে নিয়ে বললাম ,
-হাতে থাকবে একটা লাল পদ্ম । মাধবী মিষ্টি হেসে বলল
-হ্যাঁ।ঠিক বিকাল পাঁচটায় । আমি অপেক্ষা করবো কিন্তু ।হলুদ পাঞ্জাবী পরে আসবে ।
-আমার যে খুব কবিতা লিখতে ইচ্ছে করবে ।মাধবী খিল খিল করে হেসে উঠল্, লিখুন । লিখবেন যত খুশি। আমি মিষ্টি স্বপ্ন দেখতে আরম্ভ করলাম।
পরের দিন ।এবারে আর ভুল হলো না ।
আমি পরের দিন সুন্দর একটা হলুদ পাঞ্জাবী পরলাম । নিজেকে হিমু হিমু লাগলো । হিমু কী আতর মাখে ? মনে পড়ছে না ।হুমায়ূন আহমেদ স্যার বেঁচে থাকলে জিজ্ঞেস করা যেতো।
মা দেখে বলল ,
--কিরে এতো সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছিস ?
-কি যে বলোনা বলো।সাজলাম কোথায় । তুহিন আর আমি ফুলতলা স্টেশনে যাবো তাই বেরুচ্ছি ।
-অ ..এই যে সেন্টের গন্ধ পাচ্ছি । তাই বলছিলাম আর কি । মনেমনে ভাবলাম মায়ের চোখ কিছুই এড়ায় না ।
যথা সময়ে আমি স্টেশনে পৌছলাম । দুর থেকে মাধবীকে দেখতে পাচ্ছি । নীল শাড়ী ......।হাতে কি হ্যাঁ একটি লাল পদ্ম । অসম্ভব সুন্দর লাগছে তাকে ।আমি জোরে হাটতে লাগলাম । রেললাইনের ওপারে মাধবী । হঠাৎ আমায় দেখতে পেলো সে । এগিয়ে আসতে লাগলাম আমরা দুজন দুজনার দিকে । ট্রেন আসার শব্দ হচ্ছে আমি একটু সাবধানী হলাম কিন্তু ..কিন্তু মাধবী কি শুনতে পাচ্ছে ? ট্রেন এবং মাধবী খুব কাছাকাছি চলে এসেছে ।।
আমি চিৎকার দিলাম দাড়াও মাধবী দাড়াও ট্রেন আসছে ।মাধবীর এক পা তখন রেললাইনের উপরে হঠাৎ আমার ডাকে সে সম্মতি ফিরে পেল কিন্তু কি হচ্ছে ওখানে ? মাধবীর পাটা মনে হয় রেল লাইনে আটকে গেছে । সে চেষ্টা করছে ছাড়িয়ে নিতে । তাকে কি যে অসহায় দেখাচ্ছে ! কি যে বলবো ।তার ভয়ার্ত মুখ দেখে আমার বুকটা কেপে উঠলো ।আমি প্রাণপণ দৌড়ে যাবার আগেই ট্রেনটি চলে এলো।
মুহুর্তে চারদিক থেকে দলেদলে লোক ছুটে এলো । মাধবীর মৃতদেহ দেখে আঁতকে উঠলাম আমি ,ভয়ঙ্কর চিৎকারে ডুকরে কেঁদে উঠলাম।আমি....।আমি বিশ্বাস ই করতে পারছি না মাধবী আর নেই ।মাধবী রেল লেইনের উপর শান্তভাবে রক্তাক্ত শরীর নিয়ে ঘুমিয়ে আছে ।হাতে একটি লালপদ্ম।লাল পদ্মটিতে রক্ত লেগে আছে।তাজা রক্ত। রক্ত লেগে পদ্মটি আরো লাল হয়ে উঠেছে ।এ জনমে আমার আর মাধবীর হাত থেকে লাল পদ্ম নেওয়া হলো না .........।আমি আকাশের দিকে তাকালাম ।লোকের ভীড়ে শেষ বিকালের আলোয় মাধবীর মুখটা আস্তে আস্তে হারিয়ে যেতে লাগলো ।চিরদিনের জন্য পর হয়ে গেল মাধবী যেন হঠাৎ করে ।যে কিনা আমার অনেক আপন হতেই এসেছিলো আমার কাছে ।
ছবি ইন্টারনেট থেকে
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৪:৫৭
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কমলা রোদের মাল্টা-১

লিখেছেন রিম সাবরিনা জাহান সরকার, ১৯ শে অক্টোবর, ২০১৯ ভোর ৫:১৫



চারিদিক রুক্ষ। মরুভূমি মরুভূমি চেহারা। ক্যাকটাস গাছগুলো দেখিয়ে আদিবা বলেই ফেলল, ‘মনে হচ্ছে যেন সৌদি আরব চলে এসেছি’। শুনে খিক্ করে হেসে ফেললাম। টাইলসের দোকান, বিউটি পার্লার আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেপ্টেম্বর ১১ মেমোরিয়াল ও ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার-২

লিখেছেন রাবেয়া রাহীম, ১৯ শে অক্টোবর, ২০১৯ সকাল ৮:০০



২০০১ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী হামলায় ধসে পড়ে নিউইয়র্কের টুইন টাওয়ার খ্যাত বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রের গগনচুম্বী দুটি ভবন। এই ঘটনার জের ধরে দুনিয়া জুড়ে ঘটে যায় আরও অনেক অনেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের গল্প- ২১

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৯ শে অক্টোবর, ২০১৯ দুপুর ১২:৩৯



সুমন অনুরোধ করে বলল, সোনিয়া মা'র জন্য নাস্তা বানাও।
সোনিয়া তেজ দেখিয়ে বলল, আমি তোমার মার জন্য নাস্তা বানাতে পারবো না। আমার ঠেকা পরে নাই। তোমার মা-বাবা আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

চন্দ্রাবতী

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৯ শে অক্টোবর, ২০১৯ দুপুর ১:৪১


চন্দ্রাবতী অনেক তো হলো পেঁয়াজ পান্তা খাওয়া........
এবার তাহলে এসো জলে দেই ডুব ।
দুষ্টু স্রোতে আব্রু হারালো যৌবন।
চকমকি পাথর তোমার ভালোবাসা ।
রক্তমাখা ললাট তোমার বিমূর্ত চিত্র ,
আমায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুই নোবেল বিজয়ী নিজ দেশে রাজনৈতিক কুৎসার শিকার

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ১৯ শে অক্টোবর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:৪০

সুয়েডীয় বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের ১৮৯৫ সালে করে যাওয়া একটি উইলের মর্মানুসারে নোবেল পুরস্কার প্রচলন করা হয়। সারা পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সফল এবং অনন্য সাধারণ গবেষণা ও উদ্ভাবন এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

×