
বসন্তের সিগ্ধ রোদ ঝলমলে,
কৃষ্ণচূড়া, পলাশ ও শিমুল ফোটার দিন।
সময়টা মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসায় আপ্লূত হবার লগন।
বসন্তের আগমনে দখিনা মলয়ের মতো ভেসে চলার দিন এদিক ওদিক পানে।
মায়া মায়া সিগ্ধ সমীরণে হাসি খেলার সে ক্ষণ।
ঠিক এরকম একটা দিনে রক্তাক্ত হলো ঢাকার রাজপথ।
সময়টা একুশ ফেব্রুয়ারী উনিশ বাহান্ন সাল।
পাকিস্তানি পুলিশ ও সৈন্যবাহিনী বুলেটে ঝাঁঝরা করে দিলো,
কেড়ে নিলো আন্দোলনরত নিষ্পাপ কয়েকটি তাজা প্রাণ।
রফিকউদ্দিন, আব্দুল জব্বার,আবুল বরকত,আব্দুস সালাম,
শফিউর রহমান, কিশোর ওলিউল্লাহ সহ নাম না জানা
গুম হয়ে যাওয়া, আরো অনেক নাম।
দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সদ্য দ্বিখণ্ডিত দেশ,
রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ।
রাতারাতি পটপরিবর্তনে
আর্ত কত কত মানুষের সব হারানো শোক, কে নালিশ জানাবে কাকে?
তার উপর এলো আরো একটি আঘাত,
চক্রান্তকারীদের কূটচাল,
এবার সমূলে শিকড়ে টান।
স্বাধীন দেশে মেঘের মতো ভাসবে বলে,
ফুলের মতো ফুটবে বলে,
পাখির মতো গাইবে বলে,
কত আয়োজন ছিলো লক্ষ কোটি প্রাণের।
স্বপ্ন আশার নতুন প্রভাতে,
স্বপ্ন ভঙ্গের যাত্রা শুরু ।
এ যেন শোক তাপ কাটানোর আগেই
বুকে এসে বিধলো
হায়নাদের আরেকটি বিষাক্ত তীর।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর দম্ভোক্তি, " উর্দুই এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা"।
বোধোদয় হলো বাঙালির,
জাগ্রত হলো চেতনা।
শত শত বছরের বঞ্চনার শিকার বাঙালি পারেনি কখনো পরিপূর্ণ মুক্ত স্বাধীন হতে,
কোথায় যেন সুক্ষ্ণ বাধা,
আবার,
কখনোবা ষড়যন্ত্রের শিকার, কখনো বিশ্বাসঘাতকের দ্বারা প্রতারিত হয়েই চলেছে বাঙালি জাতি,
কাঙ্খিতস্বাধীনতা সে বুঝি দূর্লভ কোন মণি মাণিক্য!
এ যেন নিয়তি।
আবার,
কখনো কখনো অনৈতিক কূটকৌশলের কাছে অসহায় আত্নসমর্পণে বাধ্য হয়েছে বাঙালি জাতি
যুগের পর যুগে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শোষিত লাঞ্ছিত জাতি হিসেবে পরিচিতি হয়েছে সমগ্র বিশ্বে।
কেন? কেন আবার,
শুধুমাত্র গুটিকয়েক সুযোগ সন্ধানী সুবিধাভোগী মানুষের কারণে।
বিশ্বাসঘাতকতা যেন এ জাতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে বারবার করেছে আঘাত।
যতবার স্বপ্ন দেখেছে ততবার সেই স্বপ্নকে নিষ্ঠুর আঘাতে ভেঙে চুরে দিয়েছে লোভী স্বার্থবাজ হায়েনার দল।
ভুল ভাবনায়,
ভুল ঐক্যে,
দেশভাগের পর।
আবারো আরেকটি ছক,
আরেকটি নতুন ষড়যন্ত্র।
যুগে যুগে বাঙালি কি শুধু পড়ে পড়ে মার খাবে এভাবে?
এবার কি সমূলে উৎপাটিত হবে?
ঝাড়ে বংশে শেষ হবে?
না, না, না, তা হবে না, অনেক হয়েছে,অনেক।
তাই যত কূটকৌশল ষড়যন্ত্র সব তীব্র গতিতে রুখে দিতে,
আর পড়ে পড়ে মার না খাওয়ার প্রত্যয়ে।
নিজ অস্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত দাবি জানাতে এসেছিল তারা রাজপথে।
চার কোটি চল্লিশ লক্ষ বাঙালির প্রাণের দাবি জানাতে এসেছিল ওরা।
”রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই,
বাংলা চাই বাংলা চাই।”
”তোমার আমার ঠিকানা
পদ্মা মেঘনা যমুনা।”
নিজের ভাষায় প্রাণ ভরে কথা বলতে চায় ওরা।
লিখতে চায় অমর গান।
গাইতে চায় ভাটিয়ালি, মুর্শিদি জারি সারি কবিগান।
কাঁদতে চায় প্রাণ খুলে।
হাসতে চায় অট্টহাসি।
বুকের দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে চায় পুরো দম নিয়ে।
হ্যাঁ ওরা এসেছিল মাতৃভাষার সম্মান রক্ষার্থে।
মাতৃভাষাকে সুসংহত করতে।
এতটুকু বুঝে ছিলো ওরা মাতৃভাষার অধিকার রক্ষা না হলে নিজেদের অস্তিত্ব বিলীন হবে এবার চিরতরে।
রাষ্ট্রভাষা উর্দু হলে,
সমস্ত উর্দু ভাষাভাষী যোগ্য হিসাবে বিবেচিত হবে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সকল ক্ষেত্রে।
চরমভাবে পিছিয়ে পড়বে বাঙালি জাতি,
হয়তো অস্তিত্বই হারিয়ে বসবে কালে কালে।
শোষণের জাতাঁকলে পিষ্ট হয়ে হারাবে নিজস্ব স্বকীয়তা, ভাষা সংস্কৃতি।
আর তাই সকল বিভেদ,কোন্দল ক্লেদ, আত্নঅভিমান ভুলে,
চাটুকারদের বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে,
নিজেদের অস্তিত্বের লড়াইয়ে সামিল হতে এসেছিল ওরা।
আসেনি তো ওরা আক্রমণ করতে।
আসেনিতো কোন দয়া বা করুনা চাইতে।
আসেনি ভিক্ষা পাত পাততে।
ততদিনে এটুকু তো জলের মতো স্বচ্ছ,
যে সদ্য ধর্মের দোহাই দিয়ে ভাগ হওয়া একটি দেশের দুটি অংশের দূরত্ব প্রায় দুহাজার কিলোমিটারের অধিক।
আর তাই তাদের মধ্যকার সংস্কৃতিক ,ভৌগোলিক, ভাষাগত পার্থক্য মানচিত্রে প্রদর্শিত দূরত্বের মত স্পষ্ট হবে।
এতে আশ্চর্য হবার কোন কারণ নাই।
ততদিনে বাঙালি উপলব্ধি করেছে
বাঙালিয়ানা টিকাতে হলে,
পেছন ফিরে চাইবার আর কোন অবকাশ নেই ।
পিঠ যে ঠেকে গেছে দেয়ালে।
ধর্মের ভিত্তিতে বিভেদের রেখা ইতিমধ্যে চিড় ধরিয়েছে পুরো বাঙালি জাতি স্বত্ত্বাকে।
রাতারাতি নিজ দেশ হয়ে গেছে পরবাসী একাংশ জনগোষ্ঠী।
চেনা বাড়ি ,চেনা পথ,
বাড়ির পাশের নদীর ঘাট,ফলের বাগান,শীতল ছায়া।
সবুজ ফসলের মাঠ,নিজের পুকুর, পুকুর ভরা মাছ সবুজ বন বনানী ।
কোন এক অদৃশ্য যাদু মন্ত্র বলে সেগুলি আর তাদের নিজের নয় যেন।
কেন নয়?
এ প্রশ্নের উত্তর নেই কোন।
লোভী এক শ্রেণি মানুষের নিরন্তর প্রশ্ন তাদের উৎপাত করে, “কবে যাচ্ছো হে ওপারে?”
ভূমিদস্যুতা।
সুক্ষ্ম উৎপাত।
অধিকারহীন জনপদে।
সূযোগ সন্ধানী পাকিস্তানি ও তাদের দোসরদের রাজ্য পাট।
বিভীষিকাময় দিন।
নতুন রূপে দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়ার ষড়যন্ত্রকে রূখতে।
দ্বিখণ্ডিত বাঙালি জাতি স্বত্ত্বাকে বাঁচাতে
শুরু হলো এই প্রতিবাদ।
আচ্ছা কেউ কোন দাবি জানাতে এলে বুঝি তার প্রাণ ধরে টান দিতে হয়?
তাকে গৃহবন্দী করতে হয়?
তাকে কারা অন্তরীণ করে রাখতে হয়?
উপড়ে ফেলতে হয় বুঝি তার চিন্তা চেতনাকে?
তার রক্ত দিয়ে বুঝি স্নান করে জ্বালা জুড়াতে হয়?
জ্বালা যে কোথায় তা বাঙালি জাতি জানে ও বোঝে।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না মানুষ তাই ইতিহাস ফিরে আসে বারবার।
তাই ফিরে এলো প্রতিবাদ।
বীর বাঙালি গর্জে উঠল আরেকবার।
মেহনতী,নিপীড়িত,নির্যাতিত জনতাকে এক নিমেষে বুলেটের ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো জিন্নাহ গং।
দ্বি-জাতি তত্ত্বের প্রবক্তারা।
ক্ষমতা লোভী,বর্ণচোরা, সুযোগ সন্ধানী লুটেরার দল
বাংলা মায়ের দামাল সন্তানেরা
দ্বি জাতি ত্বত্ত্বের মাতাল বাঁশির সুরের ফাঁদ কেটে বেরিয়ে এলো অচিরেই,
ভুল ভাবনার দিক নির্দেশনা কাটিয়ে
উজ্জীবিত হলো নতুন প্রত্যয়ে।
তখন শুধু একটাই দাবি,
" আমরা হিন্দু বা মুসলিম যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি।”
আমাদের মাতৃভাষা বাংলা।
মিছিল,গুলি, হত্যা গুম...... বেগবান হল আন্দোলন।
আদায় হলো দাবি।
তারপর...
তারপর বাকিটুকু ইতিহাস।
© রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জানুয়ারি, ২০২৩ দুপুর ২:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


