
গল্পঃ বন্ধ দুয়ারে ওপাশে ( প্রথম অংশ)
(৪)
জননী কুরিয়ার সার্ভিসের মালিক রহমান সাহেবের অফিস কক্ষে দাঁড়িয়ে আছে রেজওয়ান। ডাক পেয়ে অনেকক্ষণ আগে সে এখানে এসেছে । কাজ পাগল রহমান সাহেব নিজের কাজ নিয়ে অতি ব্যস্ত রয়েছেন। তিনি সম্ভবত রেজওয়ানের উপস্থিতি খেয়াল করেন নি।
তবে রেজওয়ান রুমে ঢোকার মুখে শুধু একবার চোখ তুলে তাকিয়েছিলেন মাত্র।ব্যস ওইটুকুই। রেজওয়ান বুঝতে পারছে না তাকে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। চেয়ার টেনে বসার সাহস তার নেই কারণ সে এই অফিসের সামান্য কর্মচারী। মনে মনে ভাবে সে চেয়ার টেনে বসলে কি খুব অন্যায় হয়ে যাবে? হঠাৎ নিজের ল্যাপটপটা শাট ডাউন করে রহমান সাহেব রেজওয়ানের উদ্দেশ্যে বললেন।
- কি আশ্চর্য এখনও দাড়িয়ে আছো কেন? বসো! বসো!!
- কাজ কেমন লাগছে?
- ভালো স্যার।
- গুড। আমার সাথে তোমার এই প্রথম সাক্ষাৎ আসলে আমি গত দু মাস বাইরে ছিলাম ,নিজের ব্যক্তিগত কিছু কাজে। তারপর ফিরে অফিসের পেন্ডিং কাজ নিয়ে ছিলাম ব্যস্ত। তোমার সাথে সাক্ষাৎ করার সময় হয়নি। তবে তোমার কাজের বেশ প্রশংসা শুনেছি।
- কোন রকমের কোন অসুবিধা হচ্ছে না তো? সমস্যা হলে জানাবে। আমি দেখবো। মন দিয়ে কাজ করো সামনে ভালো কিছু হবে।
- জ্বি স্যার।
- কোন কাজ না বুঝতে পারলে অয়নের কাছ থেকে বুঝে নেবে ।ওকে তোমার কথা বলাই আছে।অবশ্য ওর ব্যবহারটা একটু রুক্ষ কিন্তু কাজে ভীষণ দক্ষ। আর বেশি সমস্যা হলে আমি তো আছিই। তুমি নিঃসঙ্কোচে জানাবে আমাকে।
- জ্বি স্যার, আচ্ছা।
- ও হ্যাঁ বসো বসো,এখনও দাঁড়িয়ে কেন? কি অবস্থা।
রেজওয়ান চেয়ার টেনে বসলো।
- দুপুরের খাওয়া কি হয়ে গেছে?
- জ্বি স্যার খেয়েছি।
- কি দিয়ে খেলে , মাইন্ড করো না আবার হা হা হা। আমার খাওয়া দাওয়ায় গল্প করতে বেশ ভালো লাগে।
মনে হচ্ছে রহমান সাহেব বেশ দিল খোলা মানুষ।কিন্তু প্রশ্ন শুনে রেজওয়ানের একটু অস্বস্তি লাগলো।সে যা খেয়েছে সেটা বলার মত কিছু নয়,মিথ্যা বলতে ইচ্ছে করছে না। অকারণ মিথ্যা বলা তার পছন্দও নয়।
রহমান সাহেব রেজওয়ানের দিকে তাকিয়ে কি একটু ভাবলেন। তিনি লোক চরিয়ে খান ছেলেটাকে আপাতদৃষ্টিতে অন্য রকমই মনে হচ্ছে। ভীষণ রকম চুপচাপ,শান্ত প্রকৃতির বোঝা ই যাচ্ছে। তাছাড়া তিনি অফিসে খোঁজ খবর নিয়ে শুনেছেন কাজ ছাড়া বাড়তি কথা খুব একটা বলে না রেজওয়ান। এই বয়সের ছেলেরা স্বভাবে উচ্ছল চঞ্চল হয়। এই ছেলেটা বেশ ব্যতিক্রম।এর ভালো মন্দ দুটো দিক হতে পারে। সময়ই বলে দেবে। তবে এখন পর্যন্ত রেজওয়ানের কোন খারাপ রিপোর্ট তার কাছে আসেনি। ছেলেটি আগে আরেকটি কুরিয়ার সার্ভিসের অফিসে কাজ করতো।সেখানকার রিপোর্টও ভালো। রহমান সাহেব নিঃসন্তান তার বয়স হচ্ছে।বিবিধ কারণে তার বিশ্বস্ত কিছু লোক প্রয়োজন।
- কথা বলছো না কেন রেজওয়ান? আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি তোমাকে।আবার বললেন রহমান সাহেব।
-রুটি আর আলু ভর্তা খেয়েছি স্যার।
রেজওয়ানের কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন রহমান সাহেব,বুকের মধ্যে কেমন যেন হাহাকার করে উঠলো।তিনি তার প্রতিটি কর্মচারীকে নিজের লোকই মনে করেন। ছেলেটির আর্থিক অবস্থা মনে হয় ভালো নয়।আহারে! না হলে দুপুরবেলা কেউ রুটি আলুভর্তা খায়!
- স্যার আমি কি এখন যেতে পারি?
- তুমি কোথায় থাকো?
- শ্যামলীতে।
- বাসায় তোমার কে কে আছেন?
- আমি একা থাকি স্যার। এ পৃথিবীতে আমার কেউ নেই।
অদ্ভুত তো! কেমন যেন মায়া হলো রহমান সাহেবের।
তিনি নিজেও এখনও দুপুরের খাওয়া খান নি।রেজওয়ানকে কি তিনি খেতে বলবেন? বাসা থেকে খাবার পাঠিয়েছে। ভাত সাথে আট নয় পদের তরকারি। রহমান সাহেব ইতস্তত বোধ করলেন ।ছেলেটি যদি বিব্রত হয়।কাউকে বিব্রত করার কোন অধিকার তার নেই অবশ্য । সে যেমনই অর্থনৈতিক অবস্থার অধিকারী হোক না কেন।
রহমান সাহেব বললেন
-আচ্ছা তুমি এখন যাও। পরে প্রয়োজনে তোমাকে ডেকে নেব। তারপর একটু থেমে বললেন,
-কাল থেকে তুমি দুপুরে আমার সাথে খাবে।
রেজওয়ান নিঃশব্দে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল। তার কেন জানি কান্না পাচ্ছে।
***★******
ঘর খুলেই বিথি নাক মুখ সিটকালো। কি অবস্থা করে রেখেছে এসব। খুব দ্রুত হাতে ঘর গোছাতে শুরু করলো সে। গোছগাছ করতে করতে মনে মনে ভাবলো এত অগোছালো কি করে হয় মানুষ!
সাথে করে বেশ কিছু বাজার সদাইও এনেছে বিথি।ঘর গোছগাছের পরে প্রথমে মুরগী কেটে, কাটা মসলা দিয়ে রান্না বসালো চুলায়। মুরগীর কষা ঝাল মাংস রান্না হবে এখন।এদিকে রেজওয়ান অফিস থেকে এখনও ফেরেনি। তাতে অবশ্য বিথির ঘরে ঢুকতে কোন সমস্যা হয়নি।তার কাছে এই এক কামরার ডুবলিকেট চাবি সবসময়ই থাকে।রেজওয়ানের ফিরতে আজ দেরি হচ্ছে কেন কে জানে? আজ দেরি হলে অবশ্য সমস্যা নেই বিথি বরং চাইছে রেজওয়ান দেরি করেই ফিরুক।এই ফাঁকে সে রান্না শেষ করবে। আজকের আইটেম মাংস,বেগুনভাজি, প্লেন পোলাও আর টক মিষ্টি দই।
অন্যের বাসায় এসে রান্না করার ব্যপক ঝামেলা।কোন জিনিস ঠিক মত পাওয়া যায় না আর রেজওয়ান তো চুড়ান্ত অগোছালো। কোন জিনিস হাতের নাগালে নেই।
এই রান্নার উদ্দেশ্য কি? উদ্দেশ্য তো অবশ্যই আছে। বিথি হঠাৎ লজ্জা পেল।
আজ বিথি চাকরি জীবনে প্রথম বেতন পেয়েছে। বিথি যে চাকরি করছে সেটা সে রেজওয়ানকে জানানো হয়নি এ ক"দিনে। আজ জানাবে। ঘটা করেই জানাবে। সে জন্যই এতো আয়োজন।
প্রথমে খাওয়া দাওয়া হবে তারপর রেজওয়ানের হাতে একটা মিষ্টি পান ধরিয়ে খুশির খবরটা দেবে বিথি।তারপর যত দ্রুত সম্ভব বিয়ের আয়োজন নিয়ে আলোচনা হবে। দীর্ঘ প্রেমের সফল সমাপ্তি হবে এই সপ্তাহে ।আহ! ভাবতেই শরীরের মধ্যে রোমাঞ্চ হচ্ছে তার।
আগামীকালের কেনাকাটা আর নতুন বাসা খোঁজাখুঁজির ব্যাপারে আলোচনা করতে হবে।সে অবশ্য একটা লিস্ট করে রেখেছে। মদপ্য বাবার হাত থেকে মুক্তির আনন্দে বিথির মন আজ ভীষণ চঞ্চল।মনের মধ্যে জমা কষ্টের মেঘগুলো কেটে যাচ্ছে দ্রুত। আহ! মুক্তি!!!
রেজওয়ান আর সে। তাদের দুজনের আয়ে ভালোভাবে সংসার চলে যাবে। সুখেই কাটবে দিন।
সমস্ত কাজ গুছিয়ে বিথি গোসল সেরে নিলো। গোসল করার আগে সে একটু দ্বিধা করছিল। এর আগে সে কোনদিন রেজওয়ানের বাসায় গোসল করেনি। ওয়াশরুমটাও যাচ্ছেতাই অবস্থা।
বাড়িতে অশান্তি বলে রেজওয়ান তাকে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে রেখেছে। তার অবর্তমানে যেন সময় সুযোগ মত বিথি এসে এখানে বিশ্রাম নেয় তবে গোসল টোসল সে বরাবরই এড়িয়ে গেছে অন্য কোন কারণে ।
রাত বাড়ে বিথি অপেক্ষা করে। অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় না।রেজওয়ান ফেরে না। ফোনও ধরে না। বিথি এক বুক অভিমান নিয়ে অপেক্ষা করে করে শেষ রাতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু কোথায় গেল রেজওয়ান?
৫)
হঠাৎ কাকের কর্কশ ডাকে ঘুম ভাঙলো বিথির।রাত এখনও পোহায়নি।রেজওয়ানের জন্য অপেক্ষা করতে করতে কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছে সে নিজেই জানে না।ঘুম ভেঙে প্রথমে সে মনেই করতে পারলো না ঠিক কোথায় আছে। তারপর আস্তে আস্তে সব মনে পড়তেই ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো। সে তো রেজওয়ানের বাসায় কিন্তু রেজওয়ান তো এখনও ফেরেনি। কোন বিপদ হয়নি তো? গতরাতে অজস্রবার ফোন দিয়েও ফোন বন্ধ বলে কল ঢোকেনি। রেজওয়ানের ফোনের চার্জ ফুরিয়ে যেতে পারে এটাই ভেবেছে সে কিন্তু... । জসীমের ফোনে ফোন দিয়ে জানলো জসীম এখন গ্রামের বাড়িতে, তার মায়ের শরীর খারাপ। গত দুদিন রেজওয়ানের সাথে তার যোগাযোগ হয়নি।জসীম রেজওয়ানের একমাত্র বন্ধু, জানতে চাইলো অনেক কিছু কিন্তু পরে কথা বলবে বলে এড়িয়ে গেল বিথি।তার ভীষণ খারাপ লাগছে, কেন জানি কান্না পাচ্ছে। অফিসে বা অফিসের কারো কাছে ফোন দিলে কেমন হয়। তবে এত সকালে খোঁজ নেওয়া যাবে না অপেক্ষা করতে হবে কিন্তু অফিসের কারও ফোন নাম্বারও তো বিথির কাছে নেই । রেজওয়ান বরাবরই ফোনের সংক্রান্ত ব্যাপারে বেশ উদাসীন। তার উপর ইদানীং ওর ফোনে ব্যাটারীটা ঝামেলা করছে।চার্জ দিলেও চার্জ দাঁড়াচ্ছে না।সেই কারণে হয়তো যোগাযোগ করেনি তাই বলে রাত ভোর হয়ে যাবে তবু বাসায় ফিরবে না। ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিতে দিতে আযানের ধ্বনি কানে ভেসে এলো বিথির।হাত মুখ মুছে মোবাইল চেক করে দেখলো বিথির বাবা ওসমান আলী ফোন দিয়েছে বেশ কয়েকবার। বিয়াল্লিশটা মিস কল।বিথি তাচ্ছিল্যের সাথে ঠোঁট উল্টালো ,কল ব্যাক করার কোন ইচ্ছে আপাতত নেই তার। মদপ্য জুয়াড়ি বাপের প্রতি সে কোন টান অনুভব করে না।শুধুমাত্র জন্মদাতা পিতা বলে তার সাথে কোন খারাপ ব্যবহার করতে পারে না।
কল লিস্টে অন্য একটা আননোন নাম্বার থেকে পনেরটা মিসকল এসেছে ! বিথির ভ্রু কুঁচকে এলো..
রেজওয়ান কি? কিন্তু... কল ব্যাক করার আগে।
মেসেজ চেক করে দেখলো। নতুন মেসেজ এসেছে সেই আননোন নাম্বার থেকেই।
-বিথি তুমি যত দ্রুত সম্ভব ইবনেসিনা হাসপাতালে চলে আসো।
~রেজওয়ান
মেসেজটা কিছুক্ষণ আগে সেন্ড করা হয়েছে । এর মানে কি.... হঠাৎ রেজওয়ান অসুস্থ হবে কেন।সারা রাত ও কোথায় ছিল? হাজারটা প্রশ্ন। এটা কোন ফাঁদ নয় তো। কত কিছু তো আজকাল ঘটে এ শহরে.........
৬)
রহমান সাহেবের মেজাজ খারাপ হয়ে আছে, খুব খারাপ। তাঁর সামনে যে পড়ছে তার সাথেই তিনি খারাপ ব্যবহার করছেন। এই ধরনের আচরণ তার স্বভাবের সাথে যায় না। সবাই তাকে সদালাপী আর মিষ্টভাষী বলেই জানে আর তাই সকলেই কম বেশি যথেষ্ট বিস্মিত ।
অবশেষে কারণ জানা গেল, কারণ সামান্যই তবু তিনি এতটা অস্থির হয়ে আছেন কেন? কি এমন কাহিনী সেটাই বুঝতে পারছে না কেউ ।
রেজওয়ান হঠাৎই অনুপস্থিত তার হদিস ক'দিন ধরে পাওয়া যাচ্ছে না । হঠাৎ নিরুদ্দেশ বা লাপাত্তা যাকে বলে ঠিক তাই।এখনকার সময়ে জলজ্যান্ত একটা মানুষ হুট করে উধাও হয়ে যাবে এটা কিভাবে সম্ভব? কোন না কোন ট্রেস তো থাকবেই অথচ কোন রকমেই কোন ট্রেস পাওয়া যাচ্ছে না। কি অদ্ভুত! কেন সে নিরুদ্দেশ কেন সে অফিসে আসছে না কেউ কিছুই বলতে পারছে না।রেজওয়ানের ফোন বন্ধ। বাসার ঠিকানাও কেউ জানে না। এটা কিভাবে সম্ভব।
অদ্ভুত!
অফিসে যে ঠিকানা দেয়া সেই ঠিকানায় গিয়ে তার কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি।সে নাকি বাসা বদলেছে ক’মাস আগে। তার মানে লোকটি সত্যি সত্যি নাই হয়ে গেছে। কিন্তু রহমান সাহেব সে-সব কিছু মানতেই চাইলেন না তাঁর যে কোন মূল্যে রেজওয়ানকে চাই।
সময় গড়িয়ে আজ বারো দিন হলো সে অফিসে আসেনি। এই দুই মাসের মধ্যে এত ভালো,সহজ সরল একটা ছেলের সাথে কারোই ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি ? ঘণিষ্ঠতা হয়নি? কি আশ্চর্য!
পনেরোতম দিনে রহমান সাহেব রেজওয়ানের বায়োডাটা আনতে বললেন অয়নকে। এবার তিনি স্থানীয় ঠিকানায় খোঁজ খবর নিবেন। যথা সময়ে স্থায়ী ঠিকানায় পৌঁছে খোঁজ খবর নিয়ে স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন তিনি। কিন্তু রেজওয়ান কোথায়?
------------------------
বিথি বসে আছে রহমান সাহেবের সামনে। এই কদিনে তার চেহারায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। তার চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। চোখ জল ছলছল।চুলগুলোও সে ঠিক মত বাঁধেনি।পোষাকটাও মলিন। চোখে মুখে অসম্ভব এক কষ্টের ছাপ।
- তোমার নাম কি?
- বিথি। কামরুন্নাহার বিথি।
- বলো কি বলতে চাও?
- আসলে আমি এসেছি একটা খবর জানাতে।
- খবর? কি খবর? তাড়াতাড়ি বলতে হবে আমার হাতে বেশি সময় নেই। আমি একটু ঝামেলায় আছি।
- আপনার এখানে কাজ করতো। রেজওয়ান নাম ছিল ওর।
চমকে তাকলেন রহমান সাহেব
-রেজওয়ান ? তুমি রেজওয়ানকে চেনো? রেজওয়ান কোথায় ও কোথায় আছে এখন?
- গত কিছুদিন আগে সন্ধ্যার সময় ওর একটা এক্সিডেন্ট হয়। মারাত্মক এক্সিডেন্ট।
ফুঁপিয়ে ওঠে বিথি।
- এক্সিডেন্ট!
- হ্যাঁ
-তারপর.....
- যমে মানুষে লড়াই চলল টানা বারো দিন। অবস্থা ক্রমশ খারাপ হলো এবং তেরোতম দিনে রেজওয়ান মারা গেল। আমি ওকে বাঁচাতে পারলাম না।
- তুমি আমাদের সাথে একটু যোগাযোগ করতে পারতে?
- আসলে আমার কাছে ফোন নাম্বার ছিল না। আর সবে মাত্র জয়েন্ট করা একজন সাধারণ কর্মচারীর দায়ভার কোন কোম্পানি কি নেয় বলুন। আমি সেই ভাবনা থেকে
-তাই বলে অফিসের নাম তো জানতে নাকি? অফিসে যোগাযোগ করবে না?
- আমার মাথায় অত কিছু আসেনি স্যার। আমি আসলে একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম। কোন সহায় পাচ্ছিলাম না। কি করবো কোথায় যাবো টাকা কেথায় পাবো... আমরা দরিদ্র শ্রেনির মানুষ কে করবে সাহায্য? কেউ করেনি।গত সোমবার ও মারা গেছে। বলেই হু হু করে কেঁদে উঠলো বিথি। রহমান সাহেবও কাঁদছেন।তার দুচোখে স্বজন হারানোর ব্যথা।
- ওহ! রেজওয়ান। আমার রেজওয়ান! বলে সবাইকে অবাক করে দিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন তিনি।
বিথি কাঁদছিল হঠাৎ রহমান সাহেব আর্তনাদ শুনে সে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। সেই চোখে হাজার প্রশ্ন।
অনেকটা পরে ধাতস্থ হয়ে জাহিদুর রহমান বললেন,
- রেজওয়ান আমার ছেলে ছিল। ওর মা মিলা ছিল আমার হারিয়ে যাওয়া স্ত্রী।আমার ভুল আর গোয়ার্তুমির কারণে মিলা হারিয়ে গিয়েছিল। অনেক খুঁজেছি ওকে কিছুতেই পাই নি।
সেদিন রেজওয়ানের বায়োডাটায় ওর মায়ের নাম দেখে চমকে উঠি। তারপর আমি রেজওয়ানের বায়োডাটা অনুযায়ী ওর স্থায়ী ঠিকানায় গিয়ে সব খোঁজ খবর নিয়ে নিশ্চিত হয়েছি ও আমার আর মিলার ছেলে।ব্যপারটা আমার জন্য কতটা আনন্দের ছিল সে শুধু আমিই জানি তার মধ্যে ও নিখোঁজ হল। আহ! নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিহাস।জানো মেয়ে আমার স্ত্রী মিলা অনেক অভিমানী ছিল। ও আমাকে সবচেয়ে বেশি বুঝতো, খুব ভালোবাসতো। আমারই ভুলে আমার একমাত্র বংশধর মায়ের মত এক বুক অভিমান নিয়ে চিরকালের মত হারিয়ে গেল।ওহ! আমার প্রাণ প্রিয় স্ত্রী মিলা। আমার প্রিয় রেজওয়ান চিরজনমের মত হারিয়ে গেল !!
বিথি অবাক হয়ে তখন তাকিয়ে আছে। কাঁদতেও ভুলে গেছে সে।
সমাপ্ত
© রফিকুল ইসলাম ইসিয়াক
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে জুলাই, ২০২২ সকাল ৯:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



