স্মৃতির পথ ধ’রে আন্দামানে (ষষ্ঠ পর্ব)
আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ জনহীন ছিলনা। প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ আশুতোষ ভট্টাচার্যের লেখা থেকে জানতে পারা যায়:-“এখানে অরণ্যে,সমুদ্র-সৈকতে বহু প্রাচীনকাল থেকেই মানবগোষ্ঠীর এক অতি প্রাচীন অংশ বাস করত,তাদের কিছু অভাব ছিলনা। সুস্থ সবল দেহ নিয়ে পরিপূর্ণ জীবনের আদিম অদম্য উল্লাসের মধ্যে তাদের জীবন কাটত। কিন্তু সভ্যতার সংস্পর্শে এসে তারা আজ নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে”। সভ্য মানুষের অসভ্য আচরণ ও বিশ্বাসঘাতকতার ঢেউ এসে লেগেছিল আদিম উপজাতিদের বুকে। তৎকালীন আন্দামান শাসকবৃন্দ, আদিবাসীদের সঙ্গে মিত্রতার সুযোগ নিয়ে, কোনো কোনো সময় তাদের প্রতি কী দুর্ব্যবহার করতেন তা’ এক ইংরেজ লেখকের গ্রন্থে (The Aboriginal Inhabitants of the Andaman Islands—Man,E.H.) পাওয়া যায়; যার বাংলায় অনুবাদ:-“সম্প্রতি [জুলাই,১৮৮৩] চারজন পুরুষ এবং দু’জন স্ত্রীলোককে (সবাই আদিবাসী) কলকাতায় পাঠানো হয়েছিল, একটা আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে তাদের চেহারার নমুনা তৈরী ক’রে পাঠানোই তার উদ্দেশ্য ছিল। কয়েক সপ্তাহের জন্য তাদের কলকাতায় চিড়িয়াখানায় থাকতে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে দলে দলে বাঙালি দর্শক, তাদের দেখতে আসতো।তারা এমন লোক দেখার সুযোগ পায়নি। তারা মনে করেছিল, এরা রাক্ষসের বংশধর—রাক্ষস”।
এখানেই শেষ নয়। "আদিবাসীদের নগ্ন প্রদর্শণীতে পেঁচানো একগুচ্ছ (কোঁকড়ানো চুল) চুলের বদলে, আন্দামানী আদিবাসী নাচের বদলে অর্থ সংগ্রহ, তত্ত্বাবধায়কদের একটা বাড়তি আয় ছিল। যেমন ক’রে পশুশালায় হাতি তার শুঁড় দিয়ে টাকাকড়ি তোলে, তা’ দেখে আনন্দ লাভ করার জন্য খুচরো পয়সা (সিকি বা আধুলি) তার সামনে ছুঁড়ে দেয়---তেমনি আদিবাসীদের ক্ষেত্রেও করা হয়েছিল। মানুষে-পশুতে কোনো ভেদজ্ঞান করা হয়নি"।...আজ যদি মুখ্যভূমির কেউ আন্দামান উপজাতির বর্তমান জনসংখ্যা জানার আগ্রহ প্রকাশ করেন, তার সদুত্তর আমাদের কাছে নেই। নেই কেন? এ প্রশ্নের জবাব দেবে ইতিহাস।...সারা পৃথিবী জুড়ে আজ যেখানে জনসংখ্যা ক্রমে বেড়েই চলেছে, সেখানে আন্দামানের মতো স্বাস্থ্যকর জলবায়ূ থাকা সত্ত্বেও কেন যে আদিম জনসংখ্যা হ্রাস পেতে পেতে বিলুপ্তির পথে যাচ্ছে---এ প্রশ্ন শুধু ব্যক্তিগত নয়, মানবিক দিক দিয়ে সকলের।
ভারতীয় নৃতত্ত্ববিদ ড: বিরজাশঙ্কর গুহ কোনো সূত্র থেকে জানতে পেরেছিলেন, ১৭৭৯ খৃস্টাব্দে আন্দামানী আদিবাসীদের সংখ্যা ছিল ১০,০০০(দশ হাজার)। কিন্তু ১৯৪৮ খৃ: যখন ড: গুহ আন্দামানে গিয়েছিলেন তখন তার সংখ্যা পেয়েছিলেন মাত্র ৩৭। [Report of a survey of the Inhabitants of the Andaman&Nicobar Islands during 1948---1949 (Bulletin of the department of Anthropology,vol.1,1952,P.1)]
১৯৮২-র ৫-ই জুন তারিখে কলকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত এক সংবাদে প্রকাশ যে বিলুপ্তপ্রায় আন্দামানী উপজাতির এক জননী সম্প্রতি এক কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছেন, তাতে উপজাতির জনসংখ্যা এখন ২৭-এ দাঁড়িয়েছে। ১৯৬১-তে এই সংখ্যা মাত্র ১৯ ছিল অথচ ১৯০১ খৃস্টাব্দে এই সংখ্যা ছিল ৬২৫।….(চলবে)


সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই এপ্রিল, ২০১৮ সন্ধ্যা ৭:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





