প্রাণীকুলে মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্ব দেহের গুণে নয়; সেটি চিন্তা-ভাবনা বা দর্শনের গুণে। এ গুণটিই মানুষকে পশু থেকে পৃথক করে। উন্নত সভ্যতার নাগরিকরা এ গুণের বলেই অনুন্নত বা বর্বরদের (?) থেকে মাথা তুলে দাঁড়ায়। চিন্তা-ভাবনার এ বিস্ময়কর সামর্থ্যই জন্ম দেয় জ্ঞান-বিজ্ঞান। গড়ে তোলে সমৃদ্ধ সাহিত্য ও সংস্কৃতি। নির্মিত হয় উচ্চতর সভ্যতা। গাছ যেমন প্রতিদিন বাড়ে, তেমনি প্রতিদিন বেড়ে উঠতে হয় ব্যক্তিকেও। সেটি শুধু দেহের গুণে নয়; নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক গুণে। এ কারণেই মানুষের উন্নীত ক্রমবর্ধ্বমান।
বেড়ে ওঠার সামর্থ্য বাড়াতে ব্যক্তিকে প্রতিমুহূর্তেই কিছু না কিছু শিখতে হয়। নতুন কিছু যেমন শিখতে হয়, তেমনি ভাবনা ও কর্মের মধ্য দিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টিও করতে হয়। তবে এক্ষেত্রে নিতান্তই মনে রাখা বাঞ্চনীয় যে, ‘বৃক্ষের কিন্তু কাজ বীজ দিয়ে হয় না, আবার বীজ ছাড়া বৃক্ষের অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। যদিও ফুল-ফল পাবেন বৃক্ষের কাছ থেকে। তাই বলে বীজ কিংবা শেকড় ভুলে যাওয়া কিন্তু মূর্খতা ছাড়া কিছুই নয়!’ ইংরেজিতে একে বলে, Forgotten roots. বা শেকড় ভুলে যাওয়া।
বেড়ে ওঠার বিষয়টি ইসলামে এতই গুরুত্ববহ যে, ইসলামের প্রবর্তক মহানবি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
‘যার জীবনে পর পর দুটি দিন অতিবাহিত হল, অথচ তার জ্ঞানের রাজ্যে কোনো সমৃদ্ধি এলো না। তার জন্য আফসোস।’
মানবজাতির এ বেড়ে ওঠার পেছনে একান্ত ভূমিকা রাখে শিক্ষা। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। মানবসন্তান জন্মলাভের পর তার মধ্যে সুপ্ত মানসিকতা বিকাশের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষা ঘুমন্ত বিবেককে জাগ্রত করে। বাস-ব জীবনক্ষেত্রে শিক্ষার প্রয়োগ একজন মানুষকে ক্রমান্বয়ে মানবিক উৎকর্ষের অনতিক্রম্য চূড়ায় আরোহিত করে। মানুষ বলতে কিছু অঙ্গের সমষ্টি শুধু নয় বরং আত্মার উৎকর্ষতা একজন সত্যিকার মানুষের বিরামহীন সাধনা। শিক্ষা তারই প্রধানতম উপাদান। যুগে যুগে মনীষীগণ পরবর্তী প্রজন্মের জন্য যে অমূল্য সম্পদ রেখে গেছেন তা আর কিছু নয় ‘শিক্ষা’। শুধু শিক্ষা নয় সুশিক্ষাও বটে। কারণ সুশিক্ষা দিয়েই মানবজাতি সুশিক্ষিত হয় আর এর মাধ্যমেই মানবজাতির জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রতিভা হয় বিকশিত। তাই শুধু শিক্ষা নয়; সুশিক্ষার কোনো বিকল্প নাই।
উপরন্তু শিক্ষা এমন একটি শক্তি যা মানুষকে অদৃশ্য থেকে সুক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ করে, একজন মানুষ যে পৃথিবীতে উদ্দেশ্যহীন বিচরণ করতে পারে না বরং এক মহৎ উদ্দেশ্যে তার এই জীবন। তার জন্ম, কথাবার্তা, উঠাবসা, নাওয়া-খাওয়া এবং মৃত্যু সবকিছু যে অর্থবহ আর জবাবদিহিতার দাবি রাখে সে অনুধাবন মানুষ শিক্ষা থেকেই অর্জন করে। এ কারণেই পৃথিবীর ইতিহাসে এ পর্যন্ত সুস্থ মস্তিষ্কের এমন ব্যক্তি পাওয়া যায় নি যে শিক্ষার তাৎপর্যকে অগ্রাহ্য করেছে। বরঞ্চ একজন মুর্খও তার কঠিন বাস্তবতা জীবনে হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে সক্ষম হন, তার পিছিয়ে থাকার কারণ কী?
শিক্ষাহীন ব্যক্তি নাকি সমাজের বোঝা। আসলে বোঝা কিনা জানি না, তবে এদের নিয়ে সমাজ পরিচালনা সাধ্যের বাইরে। আবার অনেক নিরক্ষর, মূর্খ কিংবা শিক্ষাহীন ব্যক্তি যাই বলি-এদেরকে দিয়ে যা হয়; ভদ্র, জ্ঞানীগুণী ও শিক্ষিত লোকদের দিয়েও তা হয় না। এর কারণ হলো, শিক্ষা যেমন মানুষের জীবনে উৎকর্ষ আনতে পারে; তদ্রূপ তার পদ্ধতিগত সামান্য বিচ্যুতি একজন মানুষকে সমাজের নিম্নস্তরে নিক্ষেপ করতে পারে। এর নেপথ্যে রয়েছে সেক্যুলারিজম। কারণ তারা ‘শিক্ষা’ পেয়েছে; সুশিক্ষা পায় নি।
সেক্যুলারিজম হলো সেক্যুলার ও ইজম শব্দদ্বয়ের সন্ধিরূপ। এর অর্থ হলো ধর্মহীনতা বা ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’। সেক্যুলারিজম বা ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ কিংবা ধর্মহীনতা যেটাই বলি-তা কেবলই বস্তুকে অস্বীকার করে, যার সাথে ধর্মবিশ্বাস বা আধ্যাত্মিকতার কোনো সম্পর্ক নেই। ‘Not connected with spiritual and religious matters’ কিন্তু এ অর্থে আমরা সেক্যুলারিজমকে গ্রহণ করি নি; আমরা করেছি মরহুম শেখ মুজিবর রহমানের ভাষায়-‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়; এর অর্থ হচ্ছে স্ব স্ব ধর্মপালনে সকল অনুসারীদের সমান অধিকার।’
অগত্যা বলতে হয়, আমাদের সংবিধানে মহান সৃষ্টিকর্তার ওপর পূর্ণবিশ্বাস ও আস্থার পাশে ধর্মনিরপেক্ষতাও সাচ্ছন্দে থাকতে পারে। যেমন সমাজতন্ত্র পারছে গণতন্ত্রের বাহু ধরে থাকতে। সরি, একটু ভুল হল, বাহু ধরে নয়; খোদ বাহু হয়ে থাকতে। রাষ্ট্রের নাগরিকদের ধর্মপালনের স্বাধীনতা কন্ঠলগ্ন হয়ে আছে সেক্যুলারিজম বা ধর্মহীনতা। বর্তমানে বাংলাদেশের সংবিধানে এর অর্থ করা হয়েছে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’। এ তো গেল সংবিধানে সেক্যুলারিজম।
৯০ ভাগ মুসলমান দেশের নাগরিক হয়ে আমি তা সাচ্ছন্দে মানতে পারি না। তবুও মানি। মাঝেমধ্যে এই ভেবে-‘যার যার ধর্ম তার তার।' থাক না তারা সেক্যুলার নিয়ে; আমি থাকি আমার মতো।’ কিন' পরক্ষণই যখন ভাবি ‘আমার প্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজনও তো এ রোগে আক্রান্ত। তাদের মনে এ বস্তাপঁচা অনুভূতির জন্য তো আমিও বেকসুর নই। আমি কেন তাদের সঠিক পথ দেখালাম না, কেনই বা হলাম না রাহবর।’ যদিও জানি, স্বল্প পরিধিতে আমার জ্ঞানের বিস্তার আর দু’দিনের সন্তরণবিদ্যার ওপর সাহস করে অকুল দরিয়ায় ঝাঁপ দেয়ার পরিণাম যে কী হয়, সেটাও আমার জানা। এরপরও খুব ইচ্ছে হয় আমার এ অণুতম জ্ঞান দিয়ে বড়দের না হোক, অন্তত কোমলমতি শিশুদের তো একটুখানি আলোর দিশা হবে। কিন্তু এখানেও নিস্তারণ নেই। সেক্যুলারের নিকষ কালো অন্ধকার ধীরে ধীরে শিক্ষাঙ্গণকেও সংক্রামণ করেছে। শুধু সংক্রামণই নয়; অলরেডি শিক্ষাঙ্গন আহত হয়ে গেছে সেক্যুলারের এ কালো থাবায়।
আজ পাশ্চাত্য প্রণীত শিক্ষার পদ্ধতিগত চরম ভ্রষ্টতা জাতিকে অবর্ণনীয় বিপথগামী করে তুলছে। নৈতিকতা বিবর্জিত শিক্ষায় শিক্ষিতরা জাতিকে আশার চেয়ে হতাশা করছে বেশি। উপরন্তু' শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যেসব অপরাধ প্রকাশ পাচ্ছে, তা আপামর জনতাকে হতবিহ্বল করে দেয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



