
এখন যদি রবীন্দ্রনাথের ‘অগ্নিস্নানে শূচি হোক ধরা’কে সাম্প্রদায়িক মনোভাবের বলি, সেক্যুলাররা তেঁতিয়ে উঠবেন। কিন্তু যখন তাদের বলা হবে, উযুর পানিতে শূচি হোক ধরা—তখন তারা বলবে এটা সাম্প্রদায়িক। এখানে ‘উযুর পানি’ যদি নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের বিশ্বাস হয়ে থাকে, তাহলে ‘অগ্নিস্নান’ কিভাবে সার্বজনীন হলো?
এই কথার প্রেক্ষিতে একজন সেক্যুলার বলল—রবীন্দ্রনাথে আপনার নানা কারণেই অরুচি থাকতে পারে, সেটাকে পুঁজি করে কোনো কিছুর বিচার করা ঠিক নয়, তাতে নিজের কর্মটিরই খুঁত তৈরি করা হয়। আর আরেকটি কথা আপনি যদি সেক্যুলার না হতে পারেন তাহলে মানবিক মানুষ হতে পারেননি। ইভেন মুসলমান হতে গেলেও সেক্যুলার হতে হবে।
আমি বললাম—আমার উপরের আলোচনার কোথাও রবীন্দ্রনাথে অনাগ্রহ বা অরুচি তুলে ধরিনি। আমি কেবল আমার সপক্ষে একটি উদাহরণ এনেছি মাত্র। কারণ, প্রত্যেক মানুষই কোনো না কোনো সম্প্রদায় থেকে উঠে আসা। রবীন্দ্রনাথও সম্প্রদায় থেকে এসেছেন, সে অর্থে তিনিও ‘সাম্প্রদায়িক’ বললে অত্যুক্তি হয় না।
হয়ত এই কারণেই তার নিজস্ব ধর্মের আদলে অগ্নিস্নানে ধরাকে শুচি করতে চেয়েছেন। এতে আমি মন্দ কিছুই পাইনি। কিন্তু আমি একজন ইসলাম ধর্মাবলম্বী হিসেবে আমিও উযুর পানিতে পৃথিবী শুদ্ধ করতে চাইব—এটাই আমার ধর্মীয় আবেদন। আর ‘মানবিক’ আবেদন তো কেবল পৃথিবী শুদ্ধ করা। তাই আদতে মানবীয় ও ধর্মীয় অনুভবে কোনো ব্যবধান নাই, ব্যবধান শুধু পদ্ধতিগত।
তো যাই হোক, সেক্যুলার বলতে আপনি কী বোঝেন! সেক্যুলারের জন্ম ইতিহাস বলে, যার সাথে কোনো ধর্মীয় অনুভবের সংশ্লিষ্টতা নেই। কিন্তু এ সংজ্ঞা তখন অতটাও ধোপে টেকেনি এই কারণে যে, আপনি যেই দল ও মতই প্রকাশ করছেন—তা পৃথিবীর প্রায় পাঁচ হাজার ধর্মের কোনো না কোনো ধর্মের সাথে পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে মিলেই যাচ্ছে।
তাই ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রগত কোনো চিন্তাই ধর্মাতীত হওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে আধুনিক বুদ্ধিজীবীরা সেক্যুলারের অর্থগ্রহণ করেছে—যার যার ধর্ম পালনে নিজ নিজ স্বাধীনতা। এ সংজ্ঞার প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথের অগ্নিস্নানে ধরাকে শুচি করতে চাওয়াটা উক্ত ধর্মের ব্যানারেই কেবল মানানসই। কিন্তু এটা যখন সেক্যুলাররা একটি রাষ্ট্রের সকলকে মানতে বাধ্য করেন, তখনই সেক্যুলাররা তাদের নাড়িপরিচয় থেকে বেরিয়ে আসেন এবং বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। এখন এই বিবাদে জড়িয়ে পড়াটা কি আপনি মানবিক বলবেন, যেখানে মানবিক আবেদন ছিল শুধু পৃথিবীকে শুদ্ধ করা!
আসলে সবসময় আমাদের বিবাদটা হয় পদ্ধতি ও আদর্শ নিয়ে। তো, থাকুন না আপনি আপনার আদর্শ নিয়ে। কেন নিজের আদর্শ অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন, এটা তো সেক্যুলারের ভীত নয়। তাই আবারও বলছি, নিজ আদর্শে চলা মানেই কিন্তু প্রচলিত সাম্প্রদায়িকতা নয়। সাম্প্রদায়িকতা হলো, নিজের আদর্শ অন্যের ওপর চাপাতে গিয়ে অন্য আদর্শকে কুক্ষিগত করা।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে এপ্রিল, ২০১৮ রাত ১০:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





