সিলেকশন গ্রেড বহাল, গ্রেড সমস্যা নিরসন ও পৃথক বেতন স্কেলের দাবিতে ১১ জানুয়ারি থেকে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করছেন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা। প্রায় নয় মাস আগে অষ্টম বেতন কাঠামোর প্রস্তাব আসার পর থেকেই উপরোক্ত বিষয়গুলো নিয়ে প্রতিবাদে সোচ্চার ছিলেন তারা। কিন্তু দাবি আদায় না হওয়ায় তারা কর্মবিরতিতে যাওয়ায় সিদ্ধান্ত নেন। আন্দোলনের কারণে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস-পরীক্ষা না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। তারা এখন শিক্ষাজীবন নিয়েও উদ্বিগ্ন। উদ্বিগ্ন গোটা দেশবাসীও।
শিক্ষকদের আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে গেলেও অচলাবস্থা নিরসনে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। বরং শিক্ষকগণকে নানাভাবে কটাক্ষ্য করা হচ্ছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষকগণের দাবীর সাথে একাত্বতা প্রকাশ করছি। যাইহোক, আজ আমি আলোকপাত করব সরকারি চাকুরেদের বয়সসীমা নিয়ে। এটা একান্তই আমার ব্যক্তিগত অভিমত। এ ব্যাপারে আপনাদের মূল্যবান মতামত প্রত্যাশা করছি।
যেমনটা বলছিলাম শিক্ষকদের দাবীর প্রতি ন্যুনতম সম্মান দেখানো ত দুরের কথা বরং তাদেরকে নানাভাবে হেয় করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, কোন এক তালেবর শিক্ষকদের চলমান কর্মবিরতির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট-ই দায়ের করেছেন। অবশ্য শেষ খবর হল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ডেকেছেন প্রধানমন্ত্রী। যাইহোক, বিভিন্ন স্তরে সরকারি অন্যান্য চাকুরেদের তুলনায় শিক্ষকদের চাকুরীর বয়সসীমার ফারাক নিয়ে সবখানে আলোচনা হচ্ছে। উল্লেখ্য, আমাদের দেশে শিক্ষকদের অবসরের বয়স সীমা ৬৫ বছর; আর সরকারী চাকুরেদের ৫৯ বছর।
অবসরের বয়সসীমা কারো ৫৯, আর কারো ৬৫ কেন (যদিও এই ফারাকের আসল কারণ নিজেও জানিনা)? এটা আরো বেশী নয় কেন? আসলে মানুষের গড় আয়ু, স্বাস্থ্য-পরিস্থিতি, কর্মক্ষমতা, বেকার সমস্যা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে বয়স সীমা নির্ধারিত হয়। ‘রিপোর্ট অন বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিক ২০১৪’-এর তথ্য মতে, ২০১৪ সালে আমাদের দেশের মানুষের গড় আয়ু ৭০ দশমিক ৭ বছর। ১৯৭৪ সালে যখন পাবলিক সার্ভেন্ট রিটায়ারমেন্ট অ্যাক্ট হয়, তখন বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৪৬ দশমিক ২ বছর। গড় আয়ুর মাত্রা প্রতিবছর বাড়ছে।
এখন প্রশ্ন হলো, বর্তমানে আমাদের দেশের মানুষ কি ৫৯ কিংবা ৬৫ বছর বয়সেই কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলছেন? তারা কি এই বয়সে স্বাস্থ্যহানির চুড়ান্ত সীমায় উপনীত হন? এর উত্তর এককথায় ‘না’। তাহলে এই বয়সসীমা কেন নির্ধারিত হল? চলুন, এবার বাস্তব পরিস্থিতি কি তা আলোচনা করা যাক। আমি/আমরা হয়ত ডজন ডজন শিক্ষক বা আমলাকে চিনি যারা ৭০ বছর বয়সেও অনেক কর্মক্ষম থাকেন। খোদ সরকারের অনেক মন্ত্রী, উপদেস্টাগণের দিকে একবার তাকান। এছাড়া অনেক বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ষাটোর্ধ্ব বহু মানুষকে কাজ করতে দেখা যায়। এরা সবাই কি দায়িত্ব পালনে অপারগ? উত্তর ‘হ্যা’ হলে বলতে হবে ৫৯ বা ৬৫ কোনটাই সঠিক নয়। আর ‘না’ হলে বলতে হবে অকর্মণ্য লোক নিয়োগ দেয়ার কারণে সরকার দোষী সাব্যস্ত হবে।
অন্যদিকে শিক্ষকগণের অবস্থাও এর বিপরীত নয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকগণ অবসরে গিয়ে সোজা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চপদে আসীন হচ্ছেন। তারা যদি অক্ষম হতেন তাহলে নিশ্চয়ই বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় অথোরিটি কমপক্ষে দেড় থেকে ৫ লক্ষ টাকা বেতন দিয়ে তাদের নিত না। আমি এমন অনেক শিক্ষকগণকে চিনি যাদের বয়স ৭০/৭৫ এর উপরে এবং তারা তরুণদের সাথে সমানতালে কাজ করে যাচ্ছেন।
তাহলে, এই বয়সসীমা কি ঠিক আছে? আমি বলব ‘না’। এবার চলুন দেখি অন্যান্য দেশে কি হয়। গতকাল একটা অনলাইন পত্রিকায় ড. শফিক সিদ্দিকি স্যার এক সাক্ষাতকারে বলেন, “শিক্ষা ক্ষেত্রে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম দেশ আমেরিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের অবসরের কোনো বয়সসীমাই নেই। ৭০, ৭৫ বা ৮০ বছর প্রফেসররা থাকতে পারেন। উন্নত দেশে- ইংল্যান্ড, আমেরিকা, কানাডায় অধ্যাপক যখন ফিল করবেন তিনি আর থাকতে চাচ্ছেন না, তখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানাবেন তিনি অবসরে যেতে চান। আর আমাদের ৬৫ বছর বয়স করেছে, এতে হা-হুতাশ শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু ৬৫ বছর বয়স ভারত, জাপান, চায়না, অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশেই অধ্যাপকদের চাকুরির সীমা ৬৫ বছর রয়েছে”।
আমার মতে, পুরোপুরি না হলেও এই নীতির অনেকটা আমরা অনুসরণ করতে পারি। কারণ একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক যিনি শুধু ক্লাস নিয়েও ক্ষান্ত হবেন না বরং তিনি একদল গবেষকের ‘টীম লিডার’ হিসেবে নতুনদের দিক-নির্দেশনা দিবেন। আর যেহেতু মানুষের গড় আয়ু বেড়ে গেছে, স্বাস্থ্য-পরিস্থিতিও ভালো হয়েছে। তাই মানুষের পক্ষে দীর্ঘ সময় কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চাকুরীর বয়সসীমা বাড়ানোর অন্যতম আর একটা কারণ হলো, আমাদের দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি। যেমন, এখন একটা ছেলে পড়াশোনার পাঠ শেষ করা, একটা চাকুরি ম্যানেজ করা, নিজেকে গুছিয়ে নেয়া, পরিবারের দায়িত্ব পালন ইত্যাদি করতে করতে বয়স তিরিশের কোঠা পার করে ফেলে। মানে আমরা এখন সংসার শুরুই করছি অনেক দেরিতে। ৪০/৫০ বছর আগে মানুষ সংসারী হত ২৫ বছর বয়সে; আর আজকে সেখানে ৩০/৩২ লাগছে। ধরুন, একটা ছেলে ঠিক ৩০ বছর বয়সে করলে সব কিছু স্বাভাবিক থাকলে ৩২ বছর বয়সে বাবা হবে। এখন ঐ বাচ্চা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে থাকবে বা পড়া সদ্য শেষ হবে তখন লোকটি অবসরে যাবে। ২য়, ৩য় সন্তান হলে সংসারের ভরণ-পোষণ কিভাবে হবে?
তবে চাকরির বয়স বাড়ানোর নেতিবাচক দিকও আছে। যেমন এতে কিছু সময়ের জন্য নতুন চাকরি সৃষ্টি কমে যাবে। স্কিলমিক্সডও (দক্ষতার মিশ্রণ) কঠিন হবে। উদাহরণস্বরুপ, একজন টাইপিস্ট, বর্তমান ব্যবস্থায় যাঁর কাজের সুযোগ অনেকটা কম। তিনি অবসরে গেলে সরকার তাঁর জায়গায় একজন কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগ করতে পারত। এটি এখন কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে যাবে। এ রকম আরো অনেক ব্যাপার আছে। তবে এক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদেরকে দক্ষ করা যেতে পারে।
সবশেষ কথা হলো, সামগ্রিক পরিস্থিতি বিচার বিশ্লেষণ করে আমার মত হলো, সরকারি চাকুরেদের বয়সসীমা আরো বাড়ানো উচিত। উল্লেখ্য, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও পাকিস্তানে সরকারি চাকরি থেকে অবসরের বয়সসীমা ৬০ বছর।
সবাইকে অনেক ধন্যবাদ।
কৃতজ্ঞতায়ঃ লেখায় ব্যবহার করা তথ্যাদি সংগ্রহ করা হয়েছে বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকা থেকে।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জানুয়ারি, ২০১৬ বিকাল ৩:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


