বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি ( বেলা ) এর যেই কর্মকান্ড সেটার উভয়মুখী চরিত্রই আমরা পরিলক্ষিত হয় । মার্কিন কোম্পানী শেভরনের সাথে বেলার যৌথ উদ্যোগে লাউয়াছড়া নামক একটি বন ধ্বংসের মুখে পড়েছে এটা যেমন সত্য তেমনি বাংলাদেশে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পে ( একে শিল্প আদপেই বলা যায় কিনা তা তর্কসাপেক্ষ ) শ্রমিকদের নিরাপত্তা , পরিবেশ রক্ষা , উপকূলের মানুষদের জীবনরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আন্দোলন করে আসছে এটাও সত্য । সম্প্রতি ধানমন্ডি মাঠকে দখলের হাত থেকে রক্ষা করতে বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা হাসানেরও একটি সুনির্দিষ্ট অবস্থান আছে যা যে কোন বিচারে প্রশংসনীয় । সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান অতি অবশ্যই স্ট্যাবলিশমেন্টের অংশ । কিন্তু তার উপরিউক্ত কাজকর্ম সেই স্ট্যাবলিশমেন্টের বিপক্ষেই অবস্থান নেয় ।
সম্প্রতি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিককে অপহরণের যেই ঘটনাটি ঘটেছে সেটা স্ট্যাবলিশমেন্টের যেই অংশের সাথে রিজওয়ানা হোসেনের বিরোধ আছে সেটার ফলাফল বলেই মনে হয় । রিজওয়ানা হাসানের যেই শ্রেণীগত অবস্থান তাতে স্ট্যাবলিশমেন্টের অংশগুলোর নিজস্ব একটা লড়াইও বিদ্যমান আছে তাতে সন্দেহ নেই । কিন্তু উল্লিখিত ঘটনাটি সেই লড়াইয়ের অংশ নয় । উল্লিখিত ঘটনায় কিংবা যেই লড়াইয়ের ফলাফল হিসাবে ঘটনাটি ঘটেছে সেই লড়াইয়ে রিজওয়ানা হাসান সাধারণ মানুষদেরই একজন । রিজওয়ানা হাসানের স্বামীকে অপহরণের ঘটনাটি যতো না স্ট্যাবলিশমেন্টের দুই অংশের নিজস্ব লড়াইয়ের পরিণতি তার চাইতেও অনেক বেশী স্ট্যাবলিশমেন্ট বনাম অর্থনৈতিক , রাজনৈতিক ক্ষমতাবিহীন সাধারণ জনগণের লড়াইয়ের একটি সামান্য চিত্র । তার একটি প্রমাণ হলো রিজওয়ানা হাসানের স্বামীর অপহরণের পরে রিজওয়ানা হাসানের বাবা সম্পর্কিত তথ্যকে সামনে তুলে ধরা হচ্ছে । যতোদূর মনে পড়ে জাহাজ ভাঙ্গা শিল্পের বিরুদ্ধে বেলার আন্দোলনের সময়তেও রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে কালের কন্ঠ কুৎসিত ধরণের কিছু রিপোর্ট ছাপিয়েছিলো । এই সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সাধারণ জনগনেরই একজন । যে কোন অবস্থায় তার সাথে এসব কুৎসিত কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়াটাই বাঞ্ছনীয় । বিএনপির ইলিয়াস আলীর মতো একজন ঘৃণিত অপরাধীর গুমের ঘটনার সাথে এই ঘটনাটির সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো প্রথম ঘটনাটি ছিলো ক্ষমতা নিয়ে কামড়াকামড়ি করা দুই অংশের মধ্যকার লড়াই । কিন্তু দ্বিতীয় ঘটনাটির ভিকটিম রিজওয়ানা হাসান অন্ততপক্ষে এই ঘটনায় অসহায় , ক্ষমতাবিহীন সাধারণ মানুষের কাতারেই অবস্থান করছেন । এই পার্থক্যের বিষয়টা মাথায় রাখা জরুরী বলেই মনে করি ।
এই ইস্যুটিতে আরেকটি বিষয় আছে যা তুলে ধরা জরুরী বলেই মনে করি সেটা হলো এই ধরণের গুম , বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড ইত্যাদি রাষ্ট্রের প্রবল পুরুষতান্ত্রিক চরিত্রেরই চিত্র বা প্রতিফলন । ক্রসফায়ারে যেসব মানুষকে হত্যা করা হয় সেই হত্যাকান্ডের বিভিন অর্থনৈতিক , রাজনৈতিক কঠিন পরিণতি ভিকটিমের বা , বোন , স্ত্রী , কন্যাদের জীবনে ভোগ করতে হয় । স্বামী গ্রেফতার হবার পরে রিজওয়ানা হাসানকে যেই পরিস্থিতির মধ্যে যেতে হয়েছে সেটাও উপরিউক্ত বিষয়টির বাইরে নয় । কিন্তু নারী প্রশ্নটি এড্রেস করবার সময়ে এই বিষয়টিকে তুলে আনবার প্রচেষ্টা বিশেষ দেখা যায়না । যদি নারী প্রশ্নটি আপাদমস্তকই রাজনৈতিক হয়ে থাকে তবে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড , গুম , ইত্যাদি ঘটনাগুলোর আগেপিছের পরিণতি , সেইসকল ঘটনায় নারীর অধঃনস্ততার বিষয়টির সাথে সম্পর্কিতভাবে রাষ্ট্রের , সমাজের পুরুষতান্ত্রিকতার শাখা-প্রশাখা বিস্তৃতির বিষয়গুলো কেন এই আলোচনায় সচরাচর উঠে আসেনা ? স্বামীর অপহরণের ঘটনায় রিজওয়ানা হাসানকে যেই ট্রমার মাঝে যেতে হয়েছে সেটা কোন বিচারে স্রেফ ব্যক্তিক বিচারে তার পাশে দাঁড়াবার প্রয়োজনীয়তা আমাদের মাঝে তৈরী করেনা সেটা বিশেষ বোধগম্য হয়না । তাহলে কি ধরে নেওয়া যায় এই ঘটনায় আমাদের অবস্থান আমাদের “ ইতর “ চরিত্রের সামান্য এক্সটেনশন ?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



