এত কাছ থেকে কখনও রাস্তার পিচগুলোকে দেখা হয় নি! রাস্তায় চলার সময় দেখতাম, রোদের আলোতে রাস্তার পিচ হীরার মত ঝলমল করছে। কিন্তু এখন দেখছি অন্য কিছু।আর কেমন যেন বোটকা বোটকা একটা গন্ধ। অন্য সময় হলে আমি এতখুনে বমি করে ফেলতাম। কিন্তু এখন আমার সেরকম কোন অনুভূতিই হচ্ছে না!
এই মাত্র একটা মালবাহী ট্রাক আমার উপর দিয়ে চলে গেছে। মনে হচ্ছে ট্রাক টা আমার একেবারে মাথার উপরে দিয়ে চলে গেছে। প্রথমে খুব ব্যাথা অনুভব করেছিলাম, অথচ এখন কোন ব্যাথাই অনুভব করছি না। কিন্তু সেটা নিয়ে আমার কোন চিন্তা নেই। আমার নিজের মুখটা দেখতে খুব ইচ্ছে করছে, কিন্তু সেটা কি করে সম্ভব! এতক্ষণ ওঠার চেষ্টা করতে করতে আমি হাঁপিয়ে গিয়েছি। নাহ্, আর ওঠার চেষ্টা করবো না, দেখি এভাবে কতক্ষণ আমি শুয়ে থাকতে পারি। আমার আশেপাশে তো দেখি অনেক লোক জড়ো হয়েছে। ওদের কাছ থেকে সাহায্য চাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এরা তো নিজেদের মধ্যেই শুধু হা হুতাশ করে যাচ্ছে। আচ্ছা ওই লোকটাকে ডাকা যেতে পারে। এই যে ভাই, শুনছেন! আমাকে একটু সাহায্য করবেন। আমি উঠতে পারছিনা, আমাকে যদি এখান থেকে উঠতে একটু সাহায্য করতেন, তাহলে ভীষণ কৃপা থাকবো। আরে এই যে নীল শার্ট ওয়ালা ভাই। আরে আজব তো কেউ আমার কথা কানেই নিচ্ছে না। আর সবাই আমার দিকে এভাবে চেয়ে আছে কেন। অকস্মাৎ এদের একজন বলে উঠল (মনে হল রিক্সা চালক), পুরা দোষ ওই ট্রাক ড্রাইভারের। ওই বেটারে সবাই আটকাইয়া রাখ। আমিও বলে উঠলাম, আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি তো ঠিক করেই রাস্তাটা পার হচ্ছিলাম, ওই ট্রাকটাই তো ধেয়ে আসল ফুল স্পীডে। আমি কোন কিছু বুঝে উঠবার আগেই ট্রাকটা আমার উপর দিয়ে চলে গেল। কিন্তু মনে হল না ওই রিক্সা চালক আমার কোন কথা শুনেছে। সে তো আরেকটা লোকের সাথে কথা বলছে কানে কানে। ‘ওই ট্রাক ড্রাইভার মুন্সুইররা কাইলকা আমার লগে বেশি ফুডানি দেখাইছিল না, অহন দ্যাখ ক্যামনে অয় জেলের ভাত খায়’। এই কথাগুলি সে আরেকটা রিক্সা চালকের সাথে কানে কানে বলছিল, কিন্তু কিভাবে যেন প্রতিটি কথা আমি অনেক স্পষ্ট শুনছিলাম। ওদিকে কোন মত চেয়ে দেখলাম যে ওই ট্রাক ড্রাইভার টিকে কত গুলো লোক জড়সড় হয়ে আটকে রেখেছে। অথচ আমি যে এখানে কতক্ষণ ধরে আমাকে সাহায্য করার জন্য ডাকছি, সেদিকে তাদের কোন খেয়াল নাই। সব হুজুগে পাবলিক। দূর থেকে পুলিশের গাড়ীর আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, মনে হচ্ছে এদিকেই আসছে। দর্শক জনতার একটা বিরাট অংশ ওইদিকেই ছুটল। তারা পুলিশের প্রধান অফিসার টিকে ঘিরে বলা শুরু করল, ‘ স্যার একদম স্পট ডেড স্যার, পোলাডারে একেবারে চিপসা ফেলছে ওই ট্র্যাকটা। স্যার, ওই যে আমরা ট্রাক ড্রাইভার টারে আটকাইয়া রাখছি ।’ ‘ আরে এরা কার মৃত্যুর কথা বলছে, আমার সঙ্গে আর কারোরই এখানে অ্যাকসিডেন্ট হয় নি। এর মানে কি? আমি শুয়ে শুয়ে ঐ অবস্থাতেই দেখার চেষ্টা করলাম আমার সাথে আর কারও অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে নাকি। না, এভাবে শুয়ে শুয়ে তো কোন কিছুই ঠিকভাবে দেখা যাচ্ছে না। ঐ অফিসার তো আমার কাছেই আসছে, ওনাকে বলা যেতে পারে আমাকে একটু উঠতে সাহায্য করতে। এই যে অফিসার ভাই, আমাকে একটু উঠতে সাহায্য করেন। সেই কখন থেকে পড়ে আছি। রাস্তায় এভাবে শুয়ে থাকলে বাসায় বলবে কি আমাকে! আরে, বাসায় তো আম্মু আমার জন্য অপেক্ষা করছে, সেই কখন বের হয়েছি বাজার করব বলে! এর থেকে বরং নিজে আরেকবার চেষ্টা করি উঠবার জন্য।
যাক, উঠতে পারলাম তাহলে... । শরীরটা এখন ভালমতো ঝেড়ে নিতে পারলেই হয়। কিন্তু নিজেকে হঠাৎ এত হালকা মনে হচ্ছে কেন ! যদিও ব্যাথা অনুভব করছি না, তারপরও রিস্ক নিয়ে লাভ নেই। অফিসারকে বলে দেখি মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট নিতে হবে। কিন্তু অফিসার তো বকেই চলেছে, ‘লাশ টাকে মর্গে পাঠানোর ব্যবস্থা কর আর দেখো লাশের পকেটে কোন আইডি কার্ড, মোবাইল পাও কিনা’। কি আজব! এখানে লাশ পেল কই সে? আমি নিচে তাকিয়ে যেটা লক্ষ করলাম সেটার জন্য আমি তৈরী ছিলাম না...। ঠিক যেখানটাতে আমি এতক্ষণ পরে ছিলাম, সেখানে একটা লাশ পরে আছে। লাশটার মুখ দেখে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তবে মানুষটাকে আমার খুব পরিচিত মনে হচ্ছে। আর আমার পোশাকের মত একই পোশাক ওর গায়ে।....(চলবে)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


