
শীতের রৌদ্রজ্জল দুপুরে শহরের ব্যস্থতম সড়ক ধরে এগিয়ে যাচ্ছে ২৩-২৪ বছর বয়সী দুইজন যুবক। সম্রাট এবং সুজন। তাদের হাতে বই খাতা, কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ। সম্ভাবত কলেজ থেকে ফিরছে! তারা স্থানীয় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। দু'জনেই একই ডিপার্টমেন্টের। এছাড়াও তারা একে অপরের খুবই ঘনিষ্ট বন্ধু। সেই হাইস্কুলের সময় থেকেই দু'জনের মধ্যে পরিচয়। তারপর পরিচয় থেকে বন্ধুত্ব। তাছাড়া দু'জনের বাড়িও অনেকটা কাছাকাছি অবস্থিত। যদিও কলেজ থেকে তাদের বাড়ির পথ কিছুটা দূরে। কিন্তু ঐ যে কথায় বলে না, 'ভ্রমণে ভাল সঙ্গী জুটলে অনেক দূরের পথ কেও কাছে মনে হয়'। ঠিক সেই কারণে ওরা বাড়ি থেকে কলেজে আসার সময় অথবা কলেজ থেকে বাড়িতে ফেরার সময় কোন ধরনের যানবাহন ব্যবহার করে না। বরং দু'জনে গল্প করতে করতে যায় আবার গল্প করতে করতে আসে।
তবে আজকে তাদের কথার ভাব দেখে মনে হচ্ছে যেন দু'জনেই বেশ উত্তেজিত। আর তাদের এই উত্তেজিত হওয়ার কারণটাও নেহায়েত ফেলনা নয়। সম্প্রতি বিশ্ব নন্দিত আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম 'বিবিসি বাংলা' থেকে প্রচারিত একটি সংবাদের জের ধরে শুধু ওরা দু'জন কিংবা শুধুমাত্র বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বেই এক ধরনের তোলপাড় আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। সবার মনে একই প্রশ্ন; এটাও কি সম্ভব? কেউ কেউ মনে করছে এটা হয়তো প্রত্যেক বারের মত ইউরোপ/আমেরিকার একটা নতুন চাল। তবে বিশ্বাস করার মত লোকেরও অভাব নেই। তাদের ধারনা, বর্তমান আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে সব কিছুই যখন সম্ভব হচ্ছে তখন এটাও বা অসম্ভব থাকে কেন?
তবে এই বিষয়টা নিয়ে অন্য সকলের মত এই দুই বন্ধুর মধ্যেও আগ্রহের কোন কমতি নেই। আর সেই আগ্রহটাই এখন ক্রমে ক্রমে উত্তেজনার রুপ ধারন করার চেষ্টা করছে। দু'জনের মধ্যে কেউ কারো থেকে কম নয়। একজন এর পক্ষে যুক্তি তর্ক উপস্থাপন করে বিষয়টা বোঝানোর চেষ্টা করছে, তো অপরজন সেই যুক্তির পাল্টা কারণ দেখিয়ে তার বিপক্ষ যুক্তি দিয়ে আবার সেটাকে খন্ডন করে দিচ্ছে। মানে বিষয়টা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যেন, যে যেটা বলছে তার কাছে সেটাই ঠিক। কেউ কারো যুক্তি থেকে এক চুল পরিমাণ এদিক ওদিক হতে রাজি নয়। ওদের এই বাক যুদ্ধ কতক্ষণ চলতো তা হয়তো বলা যেত না। কিন্তু ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন হঠাৎ করে প্রচন্ড ঘূর্ণিঝড়ের মত বাতাস বইতে শুরু করলো। আর সেই ঝড়ের তান্ডবে রাস্তার ধুলোবালি, ময়লা-আবর্জনা সব একতাবদ্ধ হয়ে তাদের স্লোগান করতে শুরু করে দিল।
হঠাৎ প্রচন্ড দমকা হাওয়া আর সাথে উড়ে আসা ধুলাবালিতে ওদের দুজনেরই কথার মাঝে ছেদ পড়লো। প্রচন্ড ধুলাবালির হাত থেকে নিজেদের চোখকে রক্ষা করার জন্য দু'জনেই হাতের তালু দিয়ে যার যার চোখ ঢাকলো। এভাবে কতক্ষণ যে ঢেকে রাখলো তা ঠিক মনে করতে পারলো না, কিন্তু সহসা চোখ খুলে দেখলো ওদের চারপাশটা ভীষণ রকমের অন্ধকার হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে যেন হাজারটা আমাবস্যার অন্ধকার রাত এক হয়ে একটা কুৎসিত কালো রাতে রুপান্তরিত হয়েছে। যেন কাকের চোখের মত কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার। যে অন্ধকারের মধ্যে একহাত দূরের কোন বস্তুই ঠিকঠাক মত দেখা যায় না। তাছাড়া চারপাশের পরিবেশটা এতটাই শান্ত এবং নিস্তব্দ যে মনে হচ্ছে যেন, চারদিকে একটা কবরের নিস্তব্দতা বিরাজ করছে! যে নিস্তব্দতা এতটাই ভয়ংকর যে, তার মধ্যে পড়ে সম্রাট ওর নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনে নিজেই যেন চমকে উঠছে! কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর হঠাৎ সম্রাটের মনে হলোঃ
-'ওর সাথে যে ওর বন্ধু সুজন ছিল? তাহলে সে হঠাৎ গেল কোথায়?'
সম্রাট কেবল সুজন বলে ডাক দিতে যাবে ঠিক এমন সময়, ওর কাঁধে একটা শক্ত হাতের স্পর্শ অনুভব করলো।......কে?...... বলে সে একটা আত্মচিৎকার দিয়ে পিছন দিকে ঘুরলো! কিন্তু তার সামনে আবছা একটা ছায়া ছাড়া আর কিছুই সে দেখতে পেল না! তখন ঐ স্পর্শকৃত হাতটাকে ধরে একটা মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে সম্রাট আবারও আত্মচিৎকারের মত করে বলে উঠলো- 'সুজন?'
পাশ থেকে তেমনই আত্মচিৎকার কিন্তু অত্যন্ত কাঁপা কাঁপা কন্ঠে উত্তর এলো- 'হু, দোস্ত আমরা এটা কোথায় এসে পড়লাম বলতো?'
-কেন......রে?
কথাটা বলতে গিয়ে সম্রাটও অনুভব করলো, নিজের অজান্তেই ওর কেমন জানি গলাটা কাঁপছে! আস্তে আস্তে সে আরো একটু এগিয়ে গিয়ে সুজনকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরলো। সুজনও যতটা সম্ভব নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে বললঃ-
-আরে দেখছিস না, আমাদের পায়ের নিচে কোন মাটি নেই? সবটাই কেমন যেন ইস্পাতের মত শক্ত নূড়ি নূড়ি পাথর। তাছাড়া আমরা তো হাঁটতে হাঁটতে আমাদের বাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম। কিন্তু এই জায়গাটাকে তো কিছুতেই আমাদের বাড়ি বলে মনে হচ্ছে না?
সুজনের কথায় সম্রাট বিষয়টা পরীক্ষা করার জন্য মাটিতে বসে পড়লো। তারপর খামচা দিয়ে একমুষ্টি মাটি উঠিয়ে নিয়ে হাত দিয়ে পরীক্ষা করে দেখলো যে, সুজন যা বলছে তার এক বিন্দুও মিথ্যা নয়! সে খামচা দিয়ে মাটি উঠাতে চেয়েছিল বটে, কিন্তু তার হাতে নরম মাটির পরিবর্তে উঠে এসেছে নূড়ি নূড়ি পাথর। যেগুলো সব ইস্পাতের মত শক্ত আর কঠিন। সম্রাট এবার আরো বেশি নার্ভাস ফিল করতে লাগলো। কিন্তু সেটা সে মুখে প্রকাশ না করে, সুজনকে বললঃ-
-দোস্ত আমারও ঠিক তাই মনে হচ্ছে। আমার মনে হয় সেই প্রচন্ড ঘূর্নিঝড়ের কবলে পড়ে আমরা নিজেরদের এলাকা ছেড়ে বাইরের কোন এলাকায় এসে পড়েছি। হয়তো বাইরের কোন গ্র.............
সম্রাটের কথা শেষ হলো না। হঠাৎ একটা সম্পূর্ন অচেনা গলার আওয়াজে ওরা দু'জনেই আতঙ্কে সামনের দিকে চাইলো। দেখলো ওদের সামনেই একটা মোমবাতির মত মোলায়েম আলোর শিখা জ্বলছে। ঠিক ওদের নাক বরাবর। তবে মোমবাতির পিছনে যে কেউ আছে, প্রচন্ড অন্ধকারের মধ্যে পড়ে সেটা তারা বুঝতেই পারলো না। ঠিক তখনই আবারও সেই অচেনা আওয়াজ- 'বা,বি,বা,বো,বু'!
আতঙ্কে সম্রাট চিৎকার করে উঠলো- 'কে আপনি?'
হঠাৎ করে মোমবাতির আলোটা একটু দুলে উঠলো! তারপর তার পিছন থেকে কেউ একজন কথা বলে উঠলো। তবে এবার আর আনকমন কোন ভাষা নয়। মোমবাতিটা হাতে করে যিনি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি সম্পূর্ন বাংলা ভাষায় বলে উঠলেনঃ
"শুভ সন্ধা! 'প্ল্যানেট নাইন' গ্রহে আপনাদের দু'জনকে সুস্বাগতম! যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আপনারা আমার প্রথম বলা কথাগুলো বুঝতে পারেন নি, সেজন্য আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত!"
সম্রাটরা কথা বলবে কি? এইমাত্র ওদেরকে উদ্দেশ্য করে যে কথা গুলো বলা হয়েছে, তা শুনে দু'জনেই ঐ মোমবাতির আলোটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো। তাছাড়া কি আশ্চার্য কন্ঠস্বর! দু'জনেরই মনে হলো এমন সুন্দর এবং মিষ্টি সুরেলা কন্ঠস্বর মনে হয় ওরা জীবনে এই প্রথম শুনলো। মনে হলো কন্ঠটার মধ্যে যে যান্ত্রিকতা কাজ করছে সেটা যদি না থাকতো, তাহলে সেই কন্ঠস্বরটা শুনতে যে আরো কত মধুর হতো, তা কল্পনাও করা যায় না! সম্রাট এবং সুজনকে এভাবে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মোমবাতিটা আবারও নড়ে উঠলো। এবং আবারও সেই মিষ্টি কন্ঠস্বরটা ওদের কানে ভেসে এলোঃ
-না জানিয়ে আপনাদের দু'জনকে আমাদের গ্রহে উঠিয়ে আনার জন্য 'প্ল্যানেট নাইন' গ্রহের সকল অধিবাসীদের পক্ষ থেকে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। তবে আপনাদেরকে আমরা সারা জীবনের জন্য এখানে আটকে রাখবো না। আমাদের কাজ মিটে গেলেই আপনাদেরকে আবারও ফেরত পাঠানো হবে, আপনাদের সেই পূর্বের ঠিকানায়। অর্থাৎ পৃথিবীতে!
সুকন্ঠির কথা শুনে সম্রাট এবার প্রশ্ন করলো- 'কি কাজ?'
-আপনাদের কাছ থেকে আমাদের কিছু বিষয় জানার আছে। সেগুলো জানতে পারলেই আমরা আপনাদেরকে আর ধরে রাখবো না।
এবার সুজন কথা বলল। তবে সে যে এখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি সেটা তার কথা শুনলেই বোঝা যায়। কিছুটা আমতা আমতা করে সে উঠলোঃ
-আমরা কি পা-র-বো আপনাদের অ-জা-না বিষয় গুলোর সমাধান দি-তে?
-অবশ্যই পারবেন! আর পারবেন বলেই তো সমগ্র পৃথিবী থেকে আপনাদের দু'জনকেই সিলেক্ট করা হয়েছে!
হঠাৎ করে সুজন এবার একটা অন্যরকম প্রশ্ন করে বসলোঃ-
-আচ্ছা আপনাদের এই গ্রহটা এত অন্ধকারময় কেন? আমরা যে কিছুই দেখতে পাচ্ছি না? এমনকি আপনার ঐ মোমবাতির মত আলোটা ছাড়া আর কোন কিছুই যে আমরা দেখতে পাচ্ছি না?
সুজনের কথা শুনে সুকন্ঠি হঠাৎ করে মৃদু হেসে উঠলো! আহঃ সেই হাসির কি সুর! মনে হচ্ছে কেউ যেন হারমনির কিবোর্ডে নিপূণ হাতের সুর তুলছে। তারপর হাসি থামিয়ে কথা বলে উঠলোঃ
-হুম, তা অবশ্য ঠিক। তবে এই অন্ধকারে আমাদের কোন অসুবিধা হয় না। কারণ এই অন্ধকারটাই আমাদের কাছে আলোর সমান। তবে আপনাদের দৃষ্টির একটা সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে মূলত আপনারা এই অন্ধকারে কিছু দেখতে পাচ্ছেন না! নইলে আমাদের মত হলে অবশ্যই আপনারা সব কিছুই পরিষ্কার দেখতে পেতেন!
সুকন্ঠি থামতেই সম্রাট এবং সুজনের মনে হলো যেন এতক্ষন ওরা কোন রেকর্ড করা কথার আওয়াজ শুনছিল। এইমাত্র যেটা থেমে গেছে। তবে সম্রাট এবার বললঃ
-আচ্ছা কোন ভাবেই কি আপনাদেরকে দেখা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়?
-অবশ্যই সম্ভব! কেন নয়? আর আপনাদের জন্য আগেই আমরা সে ব্যবস্থা করে রেখেছি। অবশ্য এমন যান্ত্রিক ব্যবস্থা ছাড়া কোন মতেই খালি চোখে আমাদের কে দেখা বা পর্যবেক্ষণ করা আপনাদের জন্য সম্ভব ছিল না। তবে যেহেতু আপনাদের সাথে আমাদের গ্রহের প্রেসিডেন্ট কথা বলবেন সেজন্যই এই ব্যবস্থাটা করা হয়েছে। আচ্ছা আপনারা আসুন আমার সাথে!
বলে মোমবাতির আলোটা হঠাৎ নড়ে উঠলো। এবং ঘুরে সামনের দিকে চলতে শুরু করলো। সম্রাট এবং সুজনও সেই আলোকে অনুসরণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। এভাবে অল্প কিছুক্ষণ চলার পর মোমবাতিটা একটা প্রকান্ড হল ঘরের মধ্যে এসে প্রবেশ করলো। সম্রাট এবং সুজনও পিছন পিছন সেই ঘরের মধ্যে গিয়ে ঢুকলো। এবার ওরা আবছা আবছা ভাবে দেখতে শুরু করলো। কারণ ঘরটাতে যথেষ্ট পরিমাণ আলোর ব্যবস্থা করা আছে। তবে ওদের চারপাশের অন্ধকারটা এতটাই ঘন যে সেই একচাপ অন্ধকারের ভিড়ে এই যথেষ্ট আলোতেও ওরা এখনো সব কিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে না। আস্তে আস্তে যখন অন্ধকারটা ওদের চোখ সওয়া হয়ে গেল তখন দু'জনেই লক্ষ করে দেখলো যে, ওদের ঠিক সামনেই একটা ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী যুবতী/ষোড়শী মেয়ে ধবধবে সাদা স্যালোয়ার কামিজ পরে ওদেরই সামনে সামনে হেঁটে চলেছে। শুধু সাদা স্যালোয়ার কামিজটা ছাড়া মেয়েটার আর কোন কিছুই ওরা স্পষ্ট ভাবে দেখতে পেল না। তবে সেই শুভ্র স্যালোয়ার কামিজেই মেয়েটাকে পিছন থেকে যা আকর্ষণীয় লাগছে, না জানি মুখটা তার আরো কত সুন্দর? কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা সেই হল ঘরটাকে অতিক্রম করে আরো সুন্দর ভাবে সাজানো ছোট খাটো একটা কামরার মধ্যে এসে উপস্থিত হলো। এই রুমটাতে এসে সম্রাট এবং সুজন এতক্ষণ পর সব কিছু স্পষ্ট ভাবে দেখতে পাচ্ছে। দু'জনেই খেয়াল করে দেখলো, কামরাটার একপাশে একটা সিংহাসন সাদৃশ আসন পেতে রাখা হয়েছে। আর তার সামনেই আরো দুইটা সোফা পাশাপাশি ভাবে রাখা আছে। কামরাটার একেবারে মাঝ বরাবর এসে মেয়েটা হঠাৎ করে থমকে দাঁড়ালো! কিছুক্ষন ঐভাবে দাঁড়িয়ে থেকে কি যেন ভাবলো। তারপর হঠাৎ করে সে ওদের দিকে ঘুরে দাঁড়ালো.........!
কিন্তু এটা কি দেখছে ওরা! এই মুখটা কি কোন ১৬/১৮ বছর বয়সী যুবতীর হতে পারে? আতঙ্কে সুজন আবারও সম্রাট কে জড়িয়ে ধরলো। ঐ মুখের চেহারা দেখে দু'জনের কেউই আর কোন কথা বলতে পারলো না। এত সুন্দর একটা মেয়ের মুখ মন্ডলটা যে এতটা কুৎসিত আর কদাকার হতে পারে সেটা ওরা কল্পনাও করতে পারলো না! ঠিক আশি কিংবা নব্বই বছরের একজন থুরথুরে বুড়ির মুখ যেমন তোবড়ানো আর বাঁকা হয়, মেয়েটার মুখটাও ঠিক তেমন! এছাড়া আরও একটা জিনিস ওরা খুব ভাল ভাবে খেয়াল করলো। সেটা হলো, ১৬/১৮ বছর বয়সে একটা মেয়ে যতটা লম্বা এবং যতটা মানান সই হতে পারে এই মেয়েটা ঠিক তেমন নয়! লম্বায় মেয়েটা কত আর হবে? ঐ আড়াই ফুট থেকে তিন ফুট! তাছাড়া মেয়েটার পিছন দিকে প্রায় এক থেকে দেড় ফুটের মত লম্বা একটা লেজ কোমরের কাছ থেকে ঝুলে আছে! পৃথিবীতে বসবাস রত বানর, শিম্পাঞ্জী বা হনুমানের যেমন থাকে, ঠিক তেমনই! ওদেরকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেয়েটি এবার কিছু বলার জন্য মুখ খুললো। কিন্তু কি আশ্চার্য! মেয়েটার মুখের মধ্যে যে অগনিত দাঁত! একটার সাথে আর একটা, তার সাথে আরও একটা এভাবে প্রায় এক থেকে দেড়'শ টা দাঁত ক্রমান্নয়ে সাঁজানো।
নিজের অজান্তেই সম্রাট অস্পষ্ট স্বরে বলে উঠলোঃ
-' ওহ মাই গড! এ আমি কি দেখছি? আরে, মেয়েটার মুখের মধ্যে এত দাঁত কেন?'
কিন্তু মেয়েটা সম্রাটের প্রশ্নের কোন উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করলো না। সে তার মত করে বলে উঠলোঃ
-আপনাদের এতটা অবাক হওয়ার কোন কারণ নেই! আমাদের গ্রহের সবাই-ই আমার মত একই রকম দেখতে! কেউ লম্বা নয় আবার কেউ খাটোও নয়! কেউ মোটা নয় আবার কেউ চিকনও নয়! আমাদের কে চিহ্নিত করতে হলে দেখতে হবে আমাদের লেজ! কারণ আমাদের স্ট্যাটাস অনুযায়ী আমাদের লেজ হয়। আমাদের যে যত বেশি মর্যাদা সম্পন্ন হন, তার লেজও ঠিক ততটাই লম্বা আর অধিক লোমশ বিশিষ্ট হয়।
মেয়েটার কথা শুনে এবার দু'বন্ধু ফিক করে হেসে দিল! লেজ দেখে নাকি বিচার করতে হবে কে কেমন? ভাবতেও হাসি পায়! কিন্তু এর মধ্যেও সম্রাটের মাথায় অনেক্ষণ ধরে একটা প্রশ্ন ঘুরপাঁক খাচ্ছিলো। যেটা এবার সে জিজ্ঞাসা না করে পারলো নাঃ
-আচ্ছা বুঝলাম যে, লেজ দেখে আপনাদের মধ্যে কে কেমন সেটা চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু আমার প্রশ্নটা হলো, আপনাদের মধ্যে নারী/পুরুষ চিহ্নিত করেন কিভাবে? নাকি সেটাও ঐ লেজ দেখে?
সম্রাটের কথা শুনে মেয়েটা একটু হাসলো। তারপর বললঃ
-জ্বি না! আমাদের মধ্যে কোন নারী/পুরুষ নেই! আমরা সবাই সমান, একই গোত্রীয় ভুক্ত! যৌণ আকাঙ্খা কিংবা আপনাদের পৃথিবীর মানুষদের মত কোন ইন্দ্রীয় শক্তি বা কামনা-বাসনা নামক কোন শব্দ আমাদের কারো মধ্যেই অবশিষ্ট নেই!
-তাহলে আপনাদের বংশ বৃদ্ধি হয় কিভাবে?
হঠাৎ করেই সুজন আচমকা প্রশ্নটা করলো! কিন্তু এবারও মেয়েটা একটু মুচকি হাসি দিয়ে বলতে আরম্ভ করলোঃ
-আপনাদের পৃথিবীর হিসাবে আজ আমার বয়স নয় হাজার বছর! আমাদের গ্রহটা আপনাদের পৃথিবীর তুলনায় প্রায় নয়গুন বড়! আমার জন্মের পর থেকে আমাদের গ্রহের মোট লোক সংখ্যা দেখে আসছি প্রায় নিরানব্বই কোটি। আর তার মধ্যে বিভিন্ন গবেষণার কারণে আজ অবধি মাত্র নয়জনকে মৃত্যু মুখে পতিত হতে দেখেছি। এখন আপনারাই বিবেচনা করে দেখুন যে, আমাদের এই গ্রহে আদৌ জনসংখ্যা বৃদ্ধি/কম হওয়ার কোন কারণ আছে কি? যদি না দূর্ভাগ্যক্রমে কোন কিছু না হয়ে যায়!
বলে মেয়েটা একটু থামলো। তারপর একটা নিঃশ্বাস নিয়ে সে আবারও বলতে শুরু করলোঃ
-কিছু মনে করবেন না! আসলে আমরা সাধারণত খুব একটা বেশি কথা বলি না। কিন্তু আপনাদের কে সব সময় হাসি খুশি রাখার জন্যই এতক্ষণ যাবত শুধু বকবক করেই চলেছি। কারণ আপনাদের মনকে প্রফুল্ল রাখার জন্য আমাদেরকে উপর থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের প্রেসিডেন্ট মহোদয় আপনাদের সাথে স্বাক্ষাত করতে চলে আসবেন! দয়া করে আপনারা দু'জন এই দুই চেয়ারটাতে বসে পড়ুন!
বলে মেয়েটা পাশে পেতে রাখা সেই সোফা দুটির দিকে ঈঙ্গিত করলো। দুই বন্ধু কোন রকম কথা না বলে বাচ্চা শিশুর মত সেই সোফা দুটি অধিকার করে বসে পড়লো। কিছুক্ষণ এভাবে বসে থেকে হঠাৎ সম্রাট সুজনের কানে কানে বললঃ
-দোস্ত একটা জিনিস খেয়াল করেছিস?
-কি?
-আরে ওদের হিসাবের মধ্যে?
-হিসাবের মধ্যে আবার কি বুঝছি নাতো?
-আরে গাধা দেখলি না, সব কিছুতেই নয় সংখ্যার একটা ব্যাপার স্যাপার আছে! মেয়েটার বয়স নয় হাজার বছর, ওদের গ্রহটা আমাদের গ্রহের তুলনায় নয় গুণ বড়, ওদের গ্রহের লোক সংখ্যা মোট নিরানব্বই কোটি, তার মধ্যে আবার মারা গেছে নয় জন। গ্রহের নামটার সাথেও এই নয় সংখ্যার কেমন একটা মিল দেখেছিস?
-হুম, প্ল্যানেট নাইন! আসলেই চমৎকার!
তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে সম্রাট আবারও বললঃ
-আচ্ছা এখানে একটা প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যাচ্ছে?
-কি সেইটা?
-দেখ মেয়েটা বলল যে ওদের গ্রহের মোট অধিবাসী হলো নিরানব্বই কোটি। এখন এই নিরানব্বই কোটি কি ঐ নয় জন মারা যাওয়ার পর নিরানব্বই কোটি, নাকি মরা বাঁচা ধরে নিরানব্বই কোটি?
-আমার তো মনে হয় মারা যাওয়ার পর নিরানব্বই কোটি হবে। কারণ তা না হলে তোর কথা মত সেই নয় সংখ্যার ব্যাপারটা তো আর থাকে না। একটা জিনিস দেখ, যদি মোট জনসংখ্যা নিরানব্বই কোটি হয়, আর তার মধ্যে যদি নয় জন মারা যায়! তাহলে কিন্তু বর্তমান জনসংখ্যা থাকে 'আটানব্বই কোটি নিরানব্বই লক্ষ নিরানব্বই হাজার নয় শত একানব্বই' জন!
-হুম, তাও হতে পা.......
সম্রাটের কথা শেষ হলো না। তার মধ্যেই হঠাৎ করে ওদের বসে থাকা ঘরটা আরো বেশি আলোকিত হয়ে উঠলো। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন বৃদ্ধ এবং তার সাথে আরো জনা কয়েক বৃদ্ধ-যুবক মিলিয়ে ঘরটার মধ্যে এসে প্রবেশ করলো! আর তাদের পিছনে আরো একজনকে দেখলো, যার হাতে একটা খাবারের ট্রে। আর সেই ট্রের মধ্যে পাথরের নূড়ির মত কি যেন আছে। ওদের কে আসতে দেখে সম্রাট এবং সুজন বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। প্রথম প্রবেশকারী সেই বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি হাত উঁচিয়ে ওদের কে অভিবাদন জানালো। ওদের সবারই মুখ একই রকম, যেমন কুৎসিত ঠিক তেমনই এবড়ো থেবড়ো। একমাত্র কন্ঠস্বর শুনে ছাড়া সামনে থেকে দেখে কিছুতেই বোঝার উপায় নেই যে কার বয়স কত। তাছাড়া সবারই গায়ে সেই একই পোশাক। বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি সিংহাসনের মত সেই আসনটিতে বসতে বসতে বললেনঃ
-শুভ রাত প্রিয় বন্ধুরা! আপনারা কেমন আছেন?
-জ্বি ভাল আছি!
একটা ঢোক গিলে নিয়ে কোন রকমে সম্রাট উত্তর দিল। আচার ব্যবহার এবং চালচলন দেখে ওরা বুঝলো যে, এই বৃদ্ধই 'প্ল্যানেট নাইন' গ্রহের প্রেসিডেন্ট। বুড়োটা এবার সেই ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকে কি যেন নির্দেশ করতেই, লোকটা তার ট্রেটা নিয়ে ওদের সামনে আসলো। তারপর সেই ট্রেতে সাঁজানো দুইটা পাথর দেখিয়ে বললঃ
-এগুলো আপনাদের জন্য!
দুই বন্ধু পাথরের নূড়ি দুইটা ট্রে থেকে উঠিয়ে নিল। সম্রাট পাথরের নূড়িটাকে হাত দিয়ে একটা চাপ দিল, কিন্তু কিছুতেই নরম করতে পারলো না। এত শক্ত একটা জিনিস ওরা কিভাবে খাবে, সেটা ভেবেই দু'জনে বেশ অপ্রস্তুত হয়ে গেল। ওদের এমন অপ্রস্তুত ভাব দেখে সিংহাসনে বসা বৃদ্ধটি মৃদু হেসে বললেনঃ
-আপনারা খাচ্ছেন না কেন? খেয়ে দেখেন ও গুলো অনেক সুস্বাদু আর পুষ্টিকর!
অনিশ্চা স্বত্তেও দুই বন্ধু এবার পাথর দুটিতে কামড় বসালো। আর কামড় বসানোর সাথে সাথে কি এক মজাদার আবেশে দুজনের মুখ ভরে গেল। আসলে যেটাকে ওরা পাথর ভেবে এতক্ষণ ভুল করেছিল সেটা আসলে কোন পাথর নয়। খুবই নরম এবং সুস্বাদু একটা খাবার। তবে ওরা অনেকটাই নিশ্চিত যে, এটা ওদের পরিচিত পৃথিবীর কোন খাবার নয়। সম্পূর্ন অচেনা। দুই বন্ধু এবার আস্তে আস্তে খেতে শুরু করলো। কিছুক্ষণের মধ্যে খাওয়া শেষ করে সম্রাট এবার বৃদ্ধটির দিকে তাকিয়ে বললঃ
-কিছু মনে করবেন না! এবার যদি বলতেন যে আসলে ঠিক কি কারণে আমাদের দু'জনকে আপনারা সেই পৃথিবী থেকে উঠিয়ে এনেছেন, তাহলে খুব খুশি হতাম?
সম্রাটের কথা শুনে এবার বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি বললেনঃ
-দেখুন কারণটা হয়তো আপনাদের কাছে খুবই সিম্পল মনে হতে পারে। কিন্তু সেটা আমাদের কাছে খুবই জরুরী। আর তা হলো, আমারা দীর্ঘকাল যাবত একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজছি; কিন্তু কিছুতেই সেই প্রশ্নের উত্তরটা বের করতে পারছি না। আমাদের বিশ্বাস এই প্রশ্নের উত্তর একমাত্র পৃথিবীর মানুষই দিতে পারবে। আর সেজন্যই আপনাদের কে আমরা আমাদের এই গ্রহে উঠিয়ে নিয়ে এসেছি।
-তো বলুন আপনার সেই প্রশ্নটা কি?
-হ্যাঁ! সেটা হলো, একজন মানুষের কোথাও বেঁচে থাকার জন্য ঠিক কি কি প্রয়োজন হয় বলে আপনারা মনে করেন? কিংবা একজন মানুষ যদি পৃথিবী ছাড়া অন্য কোথাও যেয়ে একাকী বাঁচতে চায় তাহলে তার জন্য তাকে ঠিক কি কি দরকার হতে পারে?
প্রশ্নটা শুনে দুই বন্ধু একজন আর একজনের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ হাসলো। কারণ একটু আগে যে প্রশ্নটা ওদের দুজনকে উদ্দেশ্য করে করা হয়েছে, পৃথিবীর একজন পাঁচ বছরের বাচ্চাও অনায়াসে তার উত্তর বলে দিতে পারবে। কিন্তু তারপরেও যতটা সম্ভব অত্যন্ত বিনয় সহকারে সম্রাট উত্তর করলোঃ
-দেখুন, আমাদের পৃথিবীতে বাস করা মানুষের অনেক গুলো চাহিদার মধ্যে অন্যতম প্রধান মৌলিক চাহিদা হলো মোট পাঁচটি। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং শিক্ষা। আমার মনে হয় এই পাঁচটা জিনিস একজন মানুষের কাছে থাকলে তার আর কোন কিছুরই দরকার পড়ে না।
-আর একটা জিনিস আছে!
হঠাৎ করে পাশের সোফায় বসে থাকা সুজন চিৎকার করে উঠলো। সুজনের চিৎকার শুনে সম্রাট অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালো! সিংহাসনে বসা বৃদ্ধ লোকটিও সুজনের কথায় অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেনঃ
-কি সেই আর একটা জিনিস?
-অক্সিজেন! অক্সিজেন ছাড়া তো কোন মানুষ অন্য কোথাও গিয়ে বাঁচতে পারবে না!
সুজনের কথায় সম্রাট ও মাথা ঝাঁকিয়ে সায় দিল। তারপর কিছুক্ষন সবাই চুপ। হঠাৎ করে নিরাবতা ভেঙে বৃদ্ধ লোকটি অত্যন্ত গুরু গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলেনঃ
-হুম, আপনি খুবই গুরুত্বপূর্ন একটা কথা বলেছেন। তবে প্রিয় বন্ধুরা, আজ এ পর্যন্তই! বুঝতে পারছি আপনারা ভীষণ ক্লান্ত। সুতরাং আজ আর আপনাদের কে বিরক্ত করবো না। তবে আমার আর একটা প্রশ্ন আছে, আর সেটার উত্তর পেলেই আপনাদেরকে আমরা খুব শীঘ্রই আবারও পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেবো!
-আচ্ছা হঠাৎ করে আপনারা মানুষের মৌলিক চাহিদার খোঁজ করছেন কেন সেইটা তো বললেন না?
হঠাৎ করেই সম্রাট বৃদ্ধকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্নটা করলো। সম্রাটের প্রশ্ন শুনে বৃদ্ধ একটু মৃদু হাসি দিয়ে বললেনঃ
-আজ নয়, কাল বলবো। আজ আপনার বিশ্রাম করেন। বাকি কথা কালকেই বলবো। ভাল থাকবেন, শুভ রাত্রি!
বলে তিনি উঠে দাঁড়ালেন! তারপর সম্রাটদের কে রিসিভ করা সেই মেয়েটার দিকে কি একটা নির্দেশ করতেই মেয়েটা পিছন দিক থেকে বলে উঠলোঃ
-দয়া করে আপনার আমার সাথে আসুন!
এই মেয়েটার কথা এতক্ষণ যাবত সম্রাট বা সুজন কারোরই মনে ছিল না। হঠাৎ করে পিছন থেকে সেই পরিচিত কন্ঠস্বর শুনেই তারা বুঝতে পারলো যে, মেয়েটা এতক্ষণ যাবত ওদের পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিল। দুই বন্ধু আর কোন বাক্য ব্যয় না করে ঐ মেয়েটিকে অনুসরণ করে চলতে লাগলো। কিছুক্ষণের মধ্যে ওরা একটা সুন্দর ছোট খাটো কক্ষে এসে উপস্থিত হলো। একটা মাত্র পালঙ্ক ছাড়া যে কক্ষের মধ্যে আর কোন বস্তুই অবশিষ্ট নেই। এমনকি দেওয়ালে একটা ক্যালেন্ডার পর্যন্তও নেই। সম্রাট এবং সুজন এগিয়ে গিয়ে বিছানাতে বসলো। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি বললঃ
-আপনারা শুয়ে পড়ুন। আবারও আপনাদের সাথে কথা হবে। পরে, কোন এক সময়! শুভ রাত্রি।
বলে মেয়েটি আর ওদের উত্তরের অপেক্ষা করলো না। বেশ দ্রুততার সহিত রুম থেকে বেরিয়ে গেল। মেয়েটার চলে যাওয়ার সাথে সাথে দরজাটাও অটোমেটিক বন্ধ হয়ে গেল। সম্রাট এবং সুজন প্রচন্ড ক্লন্তিতে বিছানায় ঢলে পড়লো। বিছানাটা এতটাই নরম এবং কোমল ছিল যে, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজনে গভীর ঘুমের মধ্যে তলিয়ে গেল।
হঠাৎ করে কিসের জানি একটা শব্দে সম্রাটের ঘুম ভেঙে গেল। ও চোখ মেলে চাইলো। চারদিকটা কেমন জানি আবছা আবছা অন্ধকার। এখনো ভাল করে দিনের আলো ফোটেনি। সম্রাট যে রুমটাতে শুয়ে আছে তার প্রত্যেকটা জানালা দরজা বন্ধ। কিন্তু হঠাৎ করে পাশ ফিরে চাইতেই ও অবাক হয়ে গেল! নিজের চোখকেই যেন ও বিশ্বাস করতে পারছে না! দুই হাতের তালু দিয়ে চোখ দুটোকে একটু ঘষে নিয়ে সে আবারও দেখলো। কিন্তু নতুন কিছু সে দেখতে পেল না। এটাও কি সম্ভব! সম্রাট নিজের কাছেই নিজে প্রশ্ন করলোঃ
-আরে, সুজন কই? গত রাতে সুজন তো ওর পাশেই ঘুমিয়ে ছিল? কিন্তু এত ভোরে সে গেল কোথায়? দরজাটাও তো ঠিক তেমনই বন্ধ আছে! সেই একই পালঙ্ক, একই ঘর, ঘরের চেহারাও একই! তাহলে, সুজন গেল কোথায়?
নিজের অজান্তেই সম্রাটের দু'চোখের কোণ ভিজে উঠলো। আনমনে সে বিছানার চারদিক পাগলের মত হাতড়াতে লাগলো। সুজন ওর সব থেকে কাছের বন্ধু! আজ যদি সুজনকে রেখে ওকে ফিরে যেতে হয়, তাহলে সুজনের মায়ের কাছে ও কি জবাব দেবে? সম্রাটের মাথায় কোন কাজ করছে না! এখন ওর শুধু চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে! সম্রাট সুজনের নাম ধরে কেবল চিৎকার করতে যাবে.............. ঠিক তখনই, হঠাৎ দরজার ও পাশে ক্যাচ করে একটা শব্দ হলো। আর সঙ্গে সঙ্গে খুলে গেল দরজা! সম্রাট খুব ভাল ভাবে লক্ষ করে দেখলো, দরজার সামনে ধবধবে সাদা স্যালোয়ার কামিজ পরে দাঁড়িয়ে আছে একটা মেয়ে! মুখে হাসি হাসি ভাব! কিন্তু মেয়েটার চেহারা দেখেতো সম্রাট অবাক হয়ে গেল! এটা ও কাকে দেখছে? এ যে আর কেউ নয়! ওরই ছোট বোন শান্তা! সম্রাটকে চোখ মেলে চাইতে দেখে শান্তা হাসতে হাসতে বললঃ
-কিরে ভাইয়া? আজ এতক্ষণ ধরে ঘুমাচ্ছিস? ওদিকে সেই কখন থেকে তোর বন্ধু সুজন ভাইয়া এসে গেস্ট রুমে বসে আছে! জলদি ওঠ, তোদের নাকি আজ কোথায় যাওয়ার কথা আছে শুনলাম!
বলে শান্তা চলে গেল! সম্রাট ওর গমন পথের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে! কিছুক্ষণ ওভাবে তাকিয়ে থাকার পর এবার ও সমস্থ রুমটার উপর একবার নজর বুলালো! সারা ঘরের মাঝখানে একটাই মাত্র পালঙ্ক পাতা। যে পালঙ্কটাতে ও এতক্ষণ অবধি ঘুমিয়ে ছিল। ঘরের আর কোথাও কোন জিনিস নেই। এমনকি একটা ক্যালেন্ডার পর্যন্তও কোথাও টাঙানো নেই! হঠাৎ করে সম্রাটের মনে পড়লো-
"গতকাল বিকালে ওরা আগের সেই বাসাটা পরিবর্তন করে একটা নতুন বাসাতে উঠেছে। আর নতুন বাসায় এসে উঠতে উঠতে প্রায় সন্ধা হয়ে গিয়েছিল। সেজন্য ওর রুমে শুধুমাত্র খাটটা ছাড়া আর কোন কিছুই রাখা হয়নি!"
এছাড়া গতকালকের আরো একটা ঘটনার কথা ওর মনে পড়ে গেল। গতকাল রাত্রে ঘুমানোর আগে ও ইন্টারনেটে বিবিসি বাংলার ওয়েবসাইটে একটা সংবাদ পড়েছিল। যেটাতে লেখা ছিলঃ
"সৌরজগতে পৃথিবীর চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি ভরের একটি সম্ভাব্য নতুন গ্রহের সন্ধান পাওয়ার দাবী করছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। গবেষকরা সম্ভাব্য ঐ গ্রহটির নাম দিয়েছেন ‘প্ল্যানেট নাইন’।"
খবরটার কথা মনে পড়তেই একটু অন্য মনষ্কভাবে সম্রাট ওর দু'চোখের পাতাকে আবারও বন্ধ করে ফেললো। আর চোখ বন্ধ করার সাথে সাথে আজ রাতে স্বপ্নের মধ্যে ওর সাথে ঘটা সকল ঘটনাই সম্রাটের পরিষ্কার ভাবে মনে পড়ে গেল। আর মনে পড়লো সেই সুন্দর কন্ঠস্বর এবং লম্বা লেজ বিশিষ্ট শুভ্র স্যালোয়ার কামিজ পরা মেয়েটার কথা। প্রচন্ড আবেশে সম্রাট ওর গায়ের উপর থেকে লেপটা সরিয়ে দিয়ে একটু আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে, প্রকান্ড একটা হাই তুলে মৃদু হাসতে হাসতে অনেকটা আপন মনে বলে উঠলোঃ
-চেহারাটা যাই থাকুক, মেয়েটার কন্ঠস্বরটা কিন্তু দারুন! কিছুতেই যেন ভোলা যায় না! তাছাড়া তার আবার অতিরিক্ত পাওনা হিসাবে একটা লেজও আছে..........!!
পুনশ্চঃ- গত ২১ শে জানুয়ারি ২০১৬ ইং তারিখে উক্ত 'প্ল্যানেট নাইন' নামক গ্রহের খবরটা আমি বিবিসি বাংলার ওয়েবসাইটে পড়ি। খবরটা পড়ার সাথে সাথে উক্ত গ্রহ নিয়ে একটা গল্প লেখার আইডিয়া আমার মাথায় আসে। যেটা সম্প্রতি আপনারা পড়ে শেষ করেছেন। খবরের সত্যতা সম্পর্কে পাঠককে অবহিত করার জন্য তার লিংকটা আমি আগেই উল্লেখ করে দিয়েছি। ইচ্ছা হলে উক্ত লিংকে ক্লিক করে আপনারাও খবরটা পড়ে নিতে পারেন।
বিঃ দ্রঃ- এই গল্পের বিষয়বস্তু সহ সমস্থ চরিত্রই সম্পূর্ন কাল্পনিক। যদি কারো ব্যক্তিগত জীবনের সাথে মিলে যায়, তাহলে সেটা একান্তই কাকতালীয় মাত্র। সেজন্য লেখক কোন ক্রমেই দ্বায়ী থাকবে না। তাছাড়া টাইপিংয়ের ভুলের কারনে হয়তো অনেক জায়গায় বানানে ভুল থাকতে পারে। সেটাকে বিবেচ্য বিষয় হিসাবে না ধরে, ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখলে কৃতার্থ হবো!
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০১৬ সন্ধ্যা ৬:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



