somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

২৪ সালে ফেনীতে ভয়াবহ বন্যা: আমার কিছু দুর্বিষহ স্মৃতি

২২ শে আগস্ট, ২০২৫ রাত ৯:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



গতবছর আজকের এই দিনে আমার সাথে ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা সবার সাথে শেয়ার করছি । (রিলেটেড সব ঘটনাগুলো কয়েকটি পর্বে লিখবো—এটি প্রথম পর্ব)

২২ আগস্ট ২০২৪, দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার । সেদিন ছিল ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালের এনিমেল হেলথ এন্ড ভ্যাক্সিন ডিভিশনের মান্থলি কনফারেন্স । সেকারণে আগের দিন-ই এলার্ম সেট করে রেখেছিলাম সকাল সাড়ে ৬টায় । যেন সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া কনফারেন্সে অ্যাটেন্ড করতে পারি ।

১৮/১৯ আগস্ট থেকে ভারীবর্ষণ এবং ভারত থেকে নেমে আসা ঢলে ইতিহাসে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়তে শুরু করেছে । ফুলগাজী, পরশুরাম, ছাগলনাইয়ার অধিকাংশ বাড়ি-ঘর তলিয়ে গেছে । মানুষ জীবন বাঁচাতে জিনিসপত্র, পশুপাখিদের নিয়ে শহরের দিকে আসতেছে ।

২২ আগস্টে আমি সকাল ৬টা ১৮ মিনিটে ঘুম থেকে উঠি । উঠে রুমের দরজা খুলে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছি । বাহিরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে । বাহিরের উঠোন ডুবে গেছে । তিন তলা বাসার আমি থাকতাম নিচতলায় । মোটামুটি মিনিট চারেকের মধ্যে আমার রুমের মধ্যে হুহু করে পানি ঢুকতে শুরু করে ।

তখন দেখি পাশের রুমে থাকা ছোটভাই Md. Nahid Hossain ও ঘুম থেকে উঠে গেছে । আমি কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়ি । রুমে থাকা একটা বেলচা দিয়ে পানি সেচতে শুরু করি । কিন্তু কিছুতেই পানি আটকানো যাচ্ছিলোনা । উপায়ান্তর না পেয়ে আমি আমার তোষক, চালের বস্তা, আলুর বস্তা তড়িঘড়ি করে রুমের ভেতর থাকা আমার বাইকের ওপর রাখি ।

যখন বুঝতে পারলাম এ পানি আরও উঁচুতে উঠবে তখন তিন তলায় বাসার মালিককে ডেকে বলি নিচে সব ডুবে গেছে । তখন তিনি পরামর্শ দেন জিনিসপত্রগুলো তাঁদের ওখানে রাখতে । চটজলদি করে জিনিসপত্রগুলো বাসাওয়ালার ফ্ল্যাটে রেখে আসতে আসতেই রুমের মধ্যে এক হাঁটু পানি জড়ো হয়ে গেলো ।

নাহিদকে বললাম আমার তো থাকার জায়গা নেই আমি চললাম । রুমে হোন্ডাটা যদিও ডুবে যাচ্ছিল কিন্তু নিয়ে যাওয়ার উপায় নেই । আগে জীবন বাঁচাতে হবে । পরনের কিছু জামাকাপড় নিয়ে রওনা দিই । বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় দেখি বুক পরিমাণ পানি । কাপড়চোপড়গুলো মাথার ওপর নিয়ে বুক সমান পানির মধ্যে দিয়ে ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজের রোড ধরে হেঁটে হেঁটে এগোতে থাকি । রাস্তায় শত শত মানুষ গাট্টি বোঁচকা মাথায় নিয়ে এগোচ্ছে ।

আমাকে যেতে হবে সিজলার রেষ্টুরেন্টে, যেখানে কনফারেন্স চলছে । প্রায় ৪ কিলোমিটার রাস্তা ওভাবেই হেঁটে হেঁটে গেলাম । গিয়ে দেখি কনফারেন্স শুরু হয়েছে । আমার এরিয়া ম্যানেজার আব্দুল জলিল খানকে বললাম আমার রুম ডুবে গেছে । আমি এক বুক পানির ভেতর দিয়ে এখানে আসলাম । তিনি আমাকে বললেন কনফারেন্সে অ্যাটেন্ড করতে ।

আমি ভেজা শরীরটা গামছা দিয়ে মুছে কনফারেন্স রুমে প্রবেশ করলাম । বাহিরে যখন মানুষ জীবন বাঁচাতে ছোটাছুটি করছিল তখন আমাদের কনফারেন্স চলছিল । এরপর দুপুরের লাঞ্চ পর্ব, লাঞ্চের পেমেন্ট আনার জন্য এরিয়া ম্যানেজার আমাকে বললেন ডিপোতে গিয়ে টাকা আনতে । আমি কিছু না বলে শহীদুল্লাহ কায়সার রোডে আবারও এক বুক পানির মধ্যে নেমে গেলাম । প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে ডিপোতে হেঁটে গেলাম । টাকা এনে ম্যানেজারের হাতে দিলাম ।

তারপর একা একা নিজের লাঞ্চ সারলাম । দুপুর আড়াইটার দিকে ঢাকা থেকে সেখানে অবস্থানরত কোম্পানির বড় অফিসারদের বলা হলো কনফারেন্স দ্রুত শেষ করে যেন ঢাকায় ব্যাক করে । কারণ ফেনীর অবস্থা খারাপ । তার আধা ঘণ্টার মধ্যে কনফারেন্স শেষ করা হলো ।

কনফারেন্স শেষে আমাকে বলা হলো এক অফিসারের কাপড়চোপড় অন্য এক হোটেলে আছে সেটা যেন আমি নিয়ে এসে দিই । আমি আবারও এক বুক পানি ঠেলে সেই হোটেলে গিয়ে তাঁকে কাপড়চোপড় এনে দিই । সব কাজ শেষ হওয়ার পর হোটেলের নিচে এসে আমার ম্যানেজারকে বলি, ‘আমার রুম পানিতে ডুবে গেছে । থাকার জায়গাও নেই । আমি বাড়ি যেতে চাই ।’

এ কথা বলার পর তিনি আমাকে ছুটি দিতে অস্বীকৃতি জানান । বলেন আমি যেন তাঁর বাসায় গিয়ে থাকি । কিন্তু হাস্যকর ঘটনা হলো তাঁর নিজের বাসা ডুবে যাওয়ায় তিনি নিজেই রিজিওনাল ম্যানেজারের বাসায় গিয়ে উঠেছিলেন । উপায়ান্তর না দেখে আমি সরাসরি রিজিওনাল ম্যানেজারকে বাড়ি আসার সম্মতি চাই । তিনি দুই দিন ছুটির শর্তে আমাকে বাড়ি যাওয়ার সুযোগ করে দেন ।

বলে রাখি— তখন আমার অনাগত সন্তান তাঁর মায়ের গর্ভে । দু মাস পরেই ডেলিভারি । সুতরাং চাকরির চাইতে আমার জীবন বাঁচানো এবং আমার সন্তানের চাঁদমুখ দেখাটা আমার কাছে অত্যাবশকীয় হয়ে ওঠে । সম্ভবত পৃথিবীর সকল পিতার ক্ষেত্রেই তাঁর সন্তানের কাছে ফেরা অধিক গুরুত্বপূর্ণ ।

সিজলার রেষ্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে আবার ডিপোতে আসি । কিছু অবশিষ্ট খাবার আমাদের অন্য সহকর্মীদের দিতে । তাঁদের খাবার দিয়ে মহিপালের উদ্দেশ্যে রওনা দিই । মহিপালে সহস্র মানুষ দাঁড়িয়ে আছে । আমার চিন্তা যেকোনোভাবে যতদুর যাওয়া যাবে সেই গাড়িতেই উঠে পড়বো ।

একটা লোকাল বাসে ঠেলাঠেলি করে উঠে পড়ি । সেই বাস কুমিল্লা পর্যন্ত যাচ্ছিল । কুমিল্লা পড়ন্ত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই আসি । এসে যাত্রাবাড়ির বাসে উঠি । তারপর সেখান থেকে গাবতলীতে এসে বগুড়ার দিকে রওনা দিই । এই পুরোটা সময় আমার গা ভেজাই ছিলো ।

ফেনীর ইতিহাসে ভয়াবহ এই বন্যার মধ্যে আমার সাথে ম্যানেজারের ঘটা সেই নির্দয় ও অমানবিক ঘটনাটি আমার খুব মনে পড়ে । সম্ভবত সারা জীবনেও এই ঘটনাগুলো আমি ভুলতে পারবোনা । ফার্মাসিউটিক্যালসে উচ্চ বেতন হওয়া সত্ত্বেও দিন দিন ম্যানেজারের নির্দয়তা যেভাবে বাড়তেছিল তাতে বাধ্য হয়ে চাকরিটা আমাকে ছেড়ে আসতে হয় । নয়তো লাশ হয়ে আমাকে হয়তো বগুড়ায় ফিরতে হতো!

সাব্বির আহমেদ সাকিল
০৭ ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল | শুক্রবার | ২২ আগস্ট ২০২৫ ইং | বগুড়া
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে আগস্ট, ২০২৫ রাত ৯:৩৩
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গণজাগরণের ১৩ পেরিয়ে আজও অনিশ্চিত বাংলাদেশ ‼️ প্রজন্মের ভুল পথে চলা .....!

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৫:৪৫


গণজাগরণ মঞ্চের শুরুটা খুবই অকল্পনীয় ছিল/ ব্লগারদের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ হঠাৎ করেই ডাক দিয়েছিলো। মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের বিচার সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা সংকটের কারণেই ছিলো এই জাগরণ।আমারও সৌভাগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

জামাত কি আদতেই বাংলাদেশে রাজনীতি করার অধিকার রাখে?

লিখেছেন এমএলজি, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৮:৫৯

স্পষ্টতঃই, আসন্ন নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি এবং জামাত। দুই পক্ষের কর্মীরা মাঠ পর্যায়ে যেমন সক্রিয়, একইভাবে ফেইসবুকেও সরব।

বিএনপি'র কিছু কর্মী বলছে, জামাত যেহেতু ১৯৭১-এ স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তাই,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আল্লাহ্‌কে কীভাবে দেখা যায়?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৩

যে কোন কিছু দেখতে হলে, তিনটি জিনিসের সমন্বয় লাগে। সেই জিনিসগুলো হচ্ছে - মন, চোখ এবং পরিবেশ। এই তিন জিনিসের কোন একটি অকেজো হয়ে গেলে, আমরা দেখতে পারি না। চিন্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শতরুপা

লিখেছেন মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫২

তুমি কি কোন স্বপ্ন রাজ্যের পরী?
কিভাবে উড়ো নির্মল বাতাসে?
ঢেড়স ফুলের মতো আখি মেলো-
কন্ঠে মিষ্টি ঝড়াও অহরহ,
কি অপরুপ মেঘকালো চুল!
কেন ছুঁয়ে যাও শ্রীহীন আমাকে?
ভেবে যাই, ভেবে যাই, ভেবে যাই।
তুমি কি কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভূমি-দেবতা

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ৮:৪৩


জমিজমা নিয়ে দ্বন্দ্বে ভাইয়ে ভাইয়ে
মারামারি-কাটাকাটি-খুনোখুনি হয়;
শুধু কি তাই? নিজের বোনকে ঠকিয়ে
পৈতৃক সম্পত্তি নিজ নামে করে লয়।
অন্যদের জমির আইল কেটে নিয়ে
নিজেরটুকু প্রশস্ত সময় সময়;
অন্যদের বাড়ি কব্জা- তাদের হটিয়ে
সেখানে বানায় নিজেদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×