১ম পর্বের লিংক ---
বাঘ
মানুষের রক্তের স্বাদ বাঘেদের কাছে সবচেয়ে প্রিয়। এর থেকে উৎকৃষ্ট খাবার আর হয় না। যেসমস্ত বাঘ এইপর্যন্ত মানুষের রক্ত পান করেছে তাদের কাছে সেই স্বাদের প্রসংশা শুনে শেষ করা যায় না। আমাদের এই বাঘপাড়ায় এমন বাঘের সংখ্যা মাত্র তিনজন। তারাই এখন আমাদের এই বাঘ সমাজের নেতা। সাহস, বুদ্ধি আর শক্তির দিক দিয়ে তাদের মতো কেউ নেই এখানে। আমাদের সবার জীবনের লক্ষ্যই একদিন তাদের মতো হওয়া। কথাগুলি মাইকেল তার ভাগ্নে নিটন আর তার বন্ধুদেরকে বলছিলো।
লিটনের বন্ধু টিসার বলে উঠলো – আমার কাকা গতবর্ষায় মানুষ্য বসতিতে মানুষ শিকার করতে যেয়ে তাদের পাতানো ফাঁদে ধরা পড়ে যায়। এই মানুষ শিকারে যাবার জন্যে আমি আমার কাকাকে হারিয়েছি। তাই আমি চাই না যে আর কেউ এই শিকারে যাক।
মাইকেল তার ভ্রু কুঁচকে বলল – দেখ, আমার বাবা-সহ আরও অনেক বাঘই মানুষের গুলির আঘাতে মারা গেছে। মানুষের জন্য আজ আমরা বিলুপ্ত প্রায়।
কথার মাঝে নাক গলিয়ে নিটন বলে উঠলো – মামা ঠিক বলছে। আসলে মানুষেরা আমাদের থেকেও সাংঘাতিক হিংস্র জন্তু। তারা সর্বভূক, দক্ষ শিকারি আর অনেক সমাজবদ্ধ প্রাণী।
মাইকেল এবার উঁচু একটা মাটির ঢিবির উপর উঠে গম্ভীর গলায় সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল – মানুষেরা আমাদের শিকার হরিণ, মাছ ধরে নিয়ে খায়। আমাদের যাবতীয় কার্যক্রম তারা ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলে তাদের বাড়ির দেয়ালে ঝুলিয়ে রাখে। আমাদের জীবন-মৃত্যূকে তারা তাদের বিনোদন বানিয়েছে। আমরা যদি তাদের সামনে বিড়াল হয়ে থাকি তবে তারা আমাদের সবাইকে শেষ করে ফেলবে। তখন পৃথিবীতে আমাদের আর কোনো অস্তিত্বই থাকবে না। মানুষদেরকে মেরে ফেলতে হবে আমাদের। এবার শুরু হবে বাঘের সাথে মানুষের যুদ্ধ।
অত্র বাঘপাড়ায় মানুষ খেকো যে তিনজন বাঘ আছে তারা এখন মানুষ বাদে অন্য প্রাণীর যেমন, গরু, মহিষ বা হরিণের রক্ত খেয়ে মোটেও তৃপ্তি পায় না। কিভাবে তারা মানুষ শিকার করেছিল, সেই গল্প মাইকেল তার ভাগ্নেদেরকে সাথে নিয়ে তাদের মুখ থেকে শোনে। কিভাবে মানুষ শিকার করা যায় তার জন্যে মাইকেল নিজ এলাকার ছোট বাঘদের নিয়ে একটা ট্রেনিংএর ব্যবস্থা করে। নিটন সেই ট্রেনিংপ্রাপ্ত বাঘেদের মধ্যে সেরা। শক্তির চেয়ে বুদ্ধিই যে মানুষ শিকারের জন্যে আসল বিষয় সেটা নিটনের মাছ আর হরিণ শিকারের কৌশল দেখলেই বোঝা যায়। শিকারকে কোথায়, কতো ডিগ্রী অ্যাঙ্গেলে থাবা মেরে সর্বোচ্চ ঘায়েল করা যায় আর শিকারের গলার কোন অংশে কামড় দিতে হবে সেটা মাইকেল সব বাঘকে ভাল মতো শিখিয়ে দেয়। বাঘপাড়ায় মাইকেলের মতো দক্ষ শিকারি, শিক্ষক বাঘ আর একটাও নেই বললেই চলে।
হাইয়া নামের মেয়ে সুন্দরী বাঘটির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। তার কান খুব খাড়া এবং পরিষ্কার। আর তাই সে কোন শব্দ শুনে তার সঠিক ব্যাখ্যা করতে পারে। কোন কিছু না দেখেই সে কেবলমাত্র শব্দ শুনেই বলে দিতে পারে যে, এখান থেকে কত দূরে কয়টি হরিণ আছে। শব্দ শুনে সে আরও বলতে পারে যে এটা শূকর, হরিণ না মানুষের সৃষ্টি করা শব্দ। হাইয়ার পিতামহ সমাজের সেই তিনজন মানুষ খেকো বাঘেদের একজন। সে তার পিতামহের কাছ থেকে মানুষ শিকারের গল্প শুনে শুনে, মানুষ শিকার বিষয়ে খুবই আগ্রহী। মেয়ে বাঘ হওয়া শর্তেও দারুন শ্রবণশক্তি আর আগ্রহের জন্যে হাইয়াকে এই শিকারের ট্রেনিংএ নিয়েছে মাইকেল। হাইয়ার বুদ্ধি আর শক্তি থাকলেও মেয়ে বাঘ বলে ওর মধ্যে হিংস্রতা অন্যান্য ছেলে বাঘের তুলনায় কিছুটা হলেও কম।
মানুষ খেকো বাঘেদের মতে, বর্ষাকালের দুপুর সময়টা মানুষ্য বসতিতে যেয়ে মানুষ শিকারের জন্যে ভাল। এসময় বেশির ভাগ মানুষেরা তাদের দুপুরের খাবার খেয়ে তাদের ঘরে ঘুমিয়ে থাকে। যেকোনো প্রয়োজনে বাইরে কেউ না কেউ বের হবেই তখন। আর তখন আমরা তাদেরকে খুব সহজেই আমাদের শিকারে পরিণত করতে পারি। তবে বিপদের কথা এই যে, বসতিতে গেলে আমাদের ধরা পড়ার সম্ভাবনা বেশি। ধরা পড়লে ওরা আমাদের পিটিয়ে বা গুলি করে মারবে। আমাদেরকে মানবজাতী খায় না। তারা শুধু আমাদের চামড়াটা দেহ থেকে খুলে নেয়। আমাদের দেহটা যে তারা কি করে তা আমরা আজও জানি না।
উপরের কথাগুলো যখন হাইয়া তার পিতামহের অভিজ্ঞতা থেকে অন্যসব বাঘদেরকে বলছিল তখন বাঘগুলো হা করে তা শুনছিল। তার কথা শোনার পর ছোট ছোট বাঘেদের মধ্যে ভয়ে একপ্রকার নিরবতা নেমে এলো। সে সময় হঠাৎ নিটন গুংকার ছেড়ে বলে উঠলো – মানুষদেরকে মেরে আমাদের প্রতিশোধ নিতেই হবে। এবার আমরা মানুষের চামড়া ছিঁড়ে নিয়ে আসবই।
বর্ষাকাল। মাইকেল মানুষ্য বসতিতে মানুষ শিকারের সমস্ত প্ল্যান সেরে ফেলল। সে, নিটন আর হাইয়া মিলে তিনজনের একটি দল যাবে মানুষ্য বসতিতে। আজ দুপুরেই যাবে তারা। আজ সন্ধ্যায় তারা তাদের মায়ের জন্যে মানুষের দেহ উপহার হিসেবে নিয়ে আসবে। রাতে সবাই গলা ভেজাবে মানুষের রক্তে।
নদী সাঁতরে পার হয়ে যখন তিনজন ঠিক মানুষ্য বসতির কাছাকাছি পৌঁছালো তখন সূর্যটা তাদের মাথার উপর হবে। আকাশে মেঘ, সাথে আবার ঝিরিঝিরি করে বৃষ্টি হওয়ায় পরিবেশটা অনেকটা সন্ধ্যা সন্ধ্যা ভাব। তারা একটা গোলপাতার ঝোপের পেছনে ঘামটি মেরে বসে তাদের শিকার খুঁজতে লাগলো। ঝোপের অন্ধকারে তাদের চোখগুলো জলজল করছে। হাইয়া তার কান খাড়া করে মানুষ্য বসতির শব্দ শোনার চেষ্টা করছে। বাচ্চার কান্নার শব্দ, মানুষের পায়ের শব্দ, গুরুর ডাক, কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দ সবই শুনতে পাচ্ছে সে। শব্দ শুনে বোঝা যাচ্ছে যে তাদেরকে এখানে আরও বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। শিকারের জন্য পরিবেশটা আর একটু শান্ত হওয়া চায়।
অস্থির হয়ে নিটন বললেই ফেলল – আমরা কি এখানে অপেক্ষা করতেই এসেছি? মামা, চলো এবার আগানো যাক।
চিন্তিত মাইকেল বলল – এতো সোজা না। আমরা কেবলমাত্র একটাই আক্রমনের সুযোগ পাবো। মানুষ মারতে পারলে সেটাকে মুখে নিয়ে পালাবো। আর মারতে না পারলেও আমাদেরকে পালাবার বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তোমরা মনে রেখো, শিকারের সুযোগ বার বার আসবে তখনই যখন ভাল পালাতে পারবে। আর পালাতে না পারলে ওরা আমাদেরকে ধরে ফেলবে। ধরা পড়লেই মৃত্যু।
এমন সময় বুদ্ধিমতী হাইয়া বললো – এই ঝোপের কিছু সামনে একটা রাস্তা আছে। রাস্তার পাশে আছে একটা গেরোস্ত বাড়ি। সেখানে তিনটা গরু বাধা আছে। বর্ষার জন্য মানুষ এই রাস্তাতে নেই বললেই চলে। গেরোস্ত বাড়ির মানুষগুলোর কয়েকটির নাক ডাকার শব্দ পাচ্ছি। আর কেউ কেউ ঘরের ভেতরে কথা বলছে। আমাদের উচিত হবে ওদের বাড়ির পাশে যেয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকা। ওরা ঘর থেকে বেরোলেই আমরা ওদের আক্রমন করবো।
মাইকেল বলল – হাইয়া, তুমি এখানে থেকো। আমি আর নিটন যাবো।
কিছুক্ষণ পর হাইয়াকে রেখে মাইকেল আর নিটন এগিয়ে যেতে লাগলো সামনে। যাবার সময় মাইকেল হাইয়াকে বলল, আমাদের উপর পাল্টা আক্রমন হলে পালাতে দেরি করোনা। যেভাবে পার, পালিয়ে নিজের জীবন বাঁচাবে। এই বলে তারা হাইয়ার দৃষ্টি সীমার বাইরে মিলিয়ে গেল।
রাস্তার উপরে কোন মানুষ ছিল না। মাইকেলের কথা মতো নিটন একটা বটগাছের উপরে উঠে গেল। আর মাইকেল ধীরে ধীরে দৌড়ে গেরোস্ত বাড়ির পাশে কলাগাছের পেছনে যেয়ে বসলো।
অনেক শান্ত পরিবেশ। তাজা মানুষের রক্তের গন্ধ পাচ্ছে মাইকেল। সে অনেক সতর্ক। ওদিকে হাইয়া উত্তেজনা নিয়ে তার কান খাড়া করে বসে আছে। আর গাছের মোটা ডালের উপর নিটন তীক্ষ্ণ দৃষ্টির সাথে তাকিয়ে মানুষ ঘর থেকে বেরোনোর অপেক্ষার প্রহর গুণছে।
এমন সময় গরুগুলো বাঘের উপস্থিতি টের পেয়ে ভয়ে লাফালাফি আর জোরেজোরে ডাকা শুরু করে দিলো। সাথে সাথে দুইটি মানুষ ঘর থেকে লাঠি নিয়ে বাইরে কি হয়েছে তা দেখতে আসলো। মাইকেল একলাফে মানুষের সামনে এসে দাঁড়ালো। নিটন গাছের উপর থেকে হুংকার ছাড়ছে। মাইকেল লাফ মেরে একথাবা মারতে যাবে, এমন সময় পাশথেকে গুলি ছুড়লো মানুষগুলো। গুলিটা মাইকেলের পেছনের পায়ে লাগলো। সাথে সাথে মাইকেল মাটিতে পড়ে গেল। নিটন গাছ থেকে নিচে নেমে আসলো। মাইকেল নিটনের দিকে তাকিয়ে বলল – পালাও নিটন, পালাও।
নিটন দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে পেছন ফিরে দেখল তার মামা মাইকেল মাটিতে পড়ে আছে। আর মানুষগুলো বন্দুক, লাঠি নিয়ে তার দিকে তেড়ে আসছে।
নদী পার হয়ে হাইয়া আর নিটন যখন এপাশের তীরে এসে উঠলো তখন তারা দেখলো যে ওপাশে আগুন জ্বলছে। মানুষগুলো ঢোল বাজাচ্ছে আর চিল্লাচ্ছে। তাদের মামাকে তারা যে হারিয়েছে এটা তাদের বুঝতে আর বাকী রইলো না।
বাঘপাড়ায় তারা ফিরে ছিল অনেক রাতে। ছোট বাঘেদের মধ্যে মানুষের ভয় আর সবার মধ্যে এক বেদনার ছায়া নেমে এসেছিল। একজন ভাল শিকারি, শিক্ষক বাঘ মাইকেলকে এভাবে হারানোর ঘটনাটা তাদের সবাইকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দিল।
এদিকে পেছনের পায়ে গুলি লেগেছে মাইকেলের। লাঠির আঘাতে সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল। যখন তার জ্ঞান ফিরলো তখন সে দেখল যে, সে লোহার খাঁচায় বন্দী। তার চোখ অনেক ভারী হয়ে আছে। অনেক দুর্বল সে। তার কানে সে মানুষের আওয়াজ পাচ্ছিলো। আর পাচ্ছিলো মানুষের রক্তের গন্ধ। মনে মনে ভাবল সে, মানুষ তোমরা জেনে রেখো নিটন ও তার বন্ধুরা একদিন না একদিন ঠিকই এর প্রতিশোধ নেবেই। ভাবতে ভাবতে সে আবারও অজ্ঞান হয়ে গেল।
(ধারাবাহিক)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

