somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হাত দিয়ে বলো সূর্যের আলো রুধিতে পারে কি কেউ

০৬ ই মার্চ, ২০১৫ সকাল ১০:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্স্ট ইয়ারে। আমরা ৭০/৮০ জন মিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকা এর পাঠক সংগঠন স্বজন সমাবেশ এর কার্যক্রম শুরু করি। আমাকে যুগ্ম আহবায়ক করা হয়। যুগান্তরের অফিস ছিল তখন মতিঝিল। আমরা ক্যাম্পাসে আড্ডা দিতাম। মাঝে মাঝে আড্ডা দিতে যুগান্তরের অফিসে যেতাম। একদিন যুগান্তর অফিসে আড্ডা দিতে গিয়ে ছোট একটা মেয়েকে দেখি। বুদ্ধিদীপ্ত চোখ, চটপটে। আমাদের সৃজনশীল, মানবতাবাদী আর মুক্তবুদ্ধির চর্চ্চায় এ রকম এক ছোট মেয়েকে দেখে তার সম্পর্কে আগ্রহ বাড়ে। কথা বলে জানলাম, তার নাম ছন্দা। ভিকারুন্নেছা স্কুলে ক্লাশ নাইনে পড়ে। এরপর থেকে ছন্দা সবসময়ই আমদের আড্ডার একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠে।

ঢাকার পূর্বাঞ্চলে তখন ভয়াবহ বন্যা। ঢাকার বৌদ্ধ মন্দিরের পূর্বদিকের এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক ছিন্নমুল মানুষ ওই এলাকার স্কুলগুলোতে আশ্রয় নেন। হাসানুজ্জামান সাকী ভাই, যিনি ওই পাতার দায়িত্বে ছিলেন- আমাদের জানালেন স্বজন সমাবেশের পক্ষ থেকে একদিন খিচুরী বিতরণ করা হবে। আমরা বৌদ্ধ মন্দিরের এলাকায় খিচুরী রান্না করে একটি নৌকায় তুলে আশ্রয় কেন্দ্রের দিকে যাই। রাস্তাগুলো যেন খাল। এর উপর দিয়ে তখন নৌকা চলছে। আমাদের সঙ্গে ছন্দাও ছিল। নর্দমা, টয়লেটের সেফটি ট্যাংক উপচে চারদিক একাকার। প্রচন্ড দুর্গন্ধ। আমরা নাকে কাপড় চেপে নৌকা নিয়ে একটি স্কুলে যাই। স্কুলের সামনে নৌকা ভিড়িয়ে আশ্রয় কেন্দ্রের লোকজনের মধ্যে খাবার বিতরণ শুরু করি। বিরাট এক ডেক থেকে একটি বড় চামচে খিচুরি তুলে আমি লোকজনের হাতে ধরে রাখা প্লেটে দিচ্ছি। কিন্তু স্কুলের সিড়ির কারণে নৌকাটাকে স্কুলের সঙ্গে লাগানো যায়নি। ফলে স্কুল আর নৌকার মধ্যে কিছু গ্যাপ থেকে যায়। এতে নৌকা থেকে হাত বাড়িয়ে খিচুরি দিতে হচ্ছিল। পিতলের বড় চামচ। ওজনও কেজি দুয়েক হবে। আমার কষ্ট হচ্ছিল। ছন্দা বিষয়টি লক্ষ্য করে। একপর্যায়ে ছন্দা আমার হাত থেকে ওই চামচ নিয়ে নেয়। বলে, ভাইয়া আমার কাছে দেন। দেখলাম, মেয়েটা হাতে চামচ নিয়ে সিড়ির উপরে সেই দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে নেমে গেল। তারপর ওই পানিতে দাড়িয়েই নৌকায় রাখা পাতিল থেকে খিচুরী স্কুলের প্লাটফর্মে দাড়ানো লোকজনের প্লেটে বিতরণ করতে লাগলো। আমি বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে চেয়ে থাকি। এতটুকুন মেয়ে মানুষের জন্য কত দরদ তার। মেয়েটার হাত থেকে চামচ নিয়ে পানিতে নামার কথা ভুলে গিয়ে খিচুরি বিতরণ দেখতে থাকি।

এই হলো নাদিয়া শারমিন। আমাদের ছন্দা। আসলে জীবনের এক সময়ের ছোট একটা ঘটনা পরবর্তী সময় এসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আর এসব দিয়েই একজন মানুষকে চেনা যায়। একদিন জানলাম, সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হয়েছে। আমি আবারও বিস্মিত হই। এই্টুকুন মেয়ে এসএসসি, এইচএসসি পাস করলো কবে? তাজ্জব ব্যাপার হলো-সেই ছোট্ট মেয়েটাইে একসময় সাংবাদিকতায় আমার সহকর্মী হয়ে যায়।

২০১৩ সালের এপ্রিলে আমি চুয়াডাঙ্গা জেলায় সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মরত। পত্রিকায় দেখলাম-হেফাজতের সমাবেশের দিন পথে তার উপর হামলা করা হয়েছে। তাকে দীর্ঘদিন হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে। কি দোষ ছিল তার? সে সড়কে দাড়িয়ে দায়িত্ব পালন করছিল। কারও সঙ্গে অশালীন কোন আচরণ করেনি। সেখানে বসে প্রেমও করেনি। সে একজন মেয়ে। আর কতগুলো গর্দভ মোল্লাদের মিছিলের পাশে দাড়িয়েছে- এই তার অপরাধ। তার সেই কারণে তার উপর বর্বর হামলা করা হবে? যারা করেছিল তারা এদেশেরই মানুষ। ধর্মের নামে কুসংস্কার আর কুপমন্ডুকতায় দেশের এই অংশটি কতবড়- কতদূর এগিয়েছে-এটি ছিল তার প্রদর্শনী। ওই সংবাদটি দেখেই ক্লাশ নাইনে পড়ুয়া ছন্দার সেই দুর্গন্ধময় পানিতে নেমে খিচুরি বিতরণের দৃশ্যটি আমার মনে পড়ে যায়। ভাবি হায়, এরা যদি জানতো- যার ওপর তারা হাত দিয়েছে, সেই মানুষটি কত ভালো একটা মেয়ে। মানুষের জন্য কত দরদ তার। সেই ছোট বেলা থেকে। যদিও অমানুষগুলোর এতে কিছুই আসে যায়না। তবে তাদের হাত এমনকি ইটিভি যেখানে ছন্দা দায়িত্বরত ছিল সেখানেও সম্প্রসারিত হয়েছিল। আমি বিব্রতকর কিছু না বললেও, এতটুকু বলবো ছন্দা সেই ইটিভিতে নেই। এর পেছনে এই ঘটনারও একটি ভূমিকা রয়েছে বলে একজন সাংবাদিক আমাকে বলেছিলেন। ছন্দাই ভালো বলতে পারবে।

সেই নাদিয়া শারমিনই যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক সাহসী নারীর পুরস্কার পাচ্ছেন আজ । মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের আয়োজনে আজ রাত বারোটায় তার হাতে এই পুরষ্কার তুলে দেবেন যুক্তরাষ্ট্রের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিগিনবটম। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামাও ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। প্রতিদিন ফেসবুকে তার আপডেট দেখি। ভীষণ ভালো লাগছে ছন্দা।

হাত দিয়ে বলো সূর্যের আলো রুধিতে পারে কি কেউ?
নাদিয়া শারমিন। এদেশের অগণিত মেয়েদের আদর্শ হলেই দেশটা এগিয়ে যাবে। আমরা গর্বিত। অভিনন্দন।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মার্চ, ২০১৫ সকাল ১০:৩৯
৫টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তারা ভারতের এই সফট টুলস রবীন্দ্রনাথকে রক্ষা করবে।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩


কয়েকদিন আগে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জাতীর পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা হলো, সেখানে তো গ্রেপ্তার দেখলাম না! সেখানে কি পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবণতির শঙ্কা ছিলো না? পাকিস্তানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

এআই মন্তব্যের পর ব্লগারগণের পোষ্ঠ ভালো বুঝে আসে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২০



চাঁদগাজী/সোনাগাজী বলতেন অনেক ব্লগার গরুর রচনা এবং অনেক ব্লগার গার্বেজ লেখেন। তাঁর এমন মন্তব্যের কারণে তাঁর বিরোধী ব্লগার সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে তিনি বার বার ব্যানের শিকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

=মনে রং নেই আর=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৫২


মন তো ছিল গোলাপী রঙ আভায় বন্দি, মন ছিল চন্দ্র মল্লিকা,
মন আর সেই মন নেই, মনের চারিপাশে এক সমুদ্দুর কুহেলিকা;
মন যেন পাথর হয়ে আছে, নেই অফুরন্ত ফুরসত
মন গোলাপী রঙ নয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ, রাজনীতিতে আতঙ্ক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৫০


দেশে এখন যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা মধ্য ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের মানুষজন । সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে আছেন প্রবীণ নেতা নিতাই চন্দ্র রায়। এই অবস্থায় শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে দেয়ালে... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় পরিচয়, গ্রাফিতিতে চুনকালি ও পলিটিক্যাল ইসলাম

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৩ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:০৪


রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে চুনকালি দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন প্রগতিশীল লেখকের লেখা পড়ে আমি হতাশ ও বিস্মিত হয়েছি। তাঁদের মধ্যে একাধিকজন লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×