১.০
আমার এই গলাচিপা উপজেলায় খালে বাঁধ দিয়ে নেতা নামধারী কয়েকজন সন্ত্রাসি মাছ চাষ করে ৷ খবর পেলাম-খালে বাঁধ দেয়ার কারণে পানির অভাবে কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকার তরমুজ নষ্ট হতে চলছে৷ আমি লোকজন নিয়ে বাঁধ কেটে দেই৷ এছাড়াও কয়েকবছর ধরে সরকারী খাস খালের মাছ লুট করার জন্য একটি মামলাও দায়ের করি৷ পরে শুনতে পাই-আমার বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের মামলা করবে বলে বেড়িবাঁধের পাশে বস্তিতে বসবাসকারী একজন মহিলাকে তারা টাকা দিয়ে ম্যানেজ করেছে৷ ওই সন্ত্রাসিরা মহিলাকে নিয়ে উপজেলা সদরে চলে আসে। যাদের নিয়ে আমি খালের বাঁধ কেটেছি তারা আমাকে ফোন করে কান্নাকাটি করেন। কারণ এর আগে এভাবে অনেক সরকারী কর্মচারীকে মামলা দিয়ে বেকায়দায় ফেলার রেকর্ড এই উপজেলায় আছে। দুশ্চিন্তার রেখা যে আমার কপালে পড়েনি তা নয়। ভাবলাম- আরও একটা মামলা আমাকে মোকাবেলা করতে হবে। কিন্তু তারা এই উপজেলার যে আইনজীবীর কাছেই যায়, তারা জানিয়ে দেন- সরকারী কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে হলে কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগে। নারী নির্যাতনের ঘটনা থাকলে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দিতে হবে। আমি আরেকটি মামলা থেকে বেচেঁ যাই।
২.০
এই উপজেলার পৌর এলকায় একটি আবাসন রয়েছে। ছিন্নমুল মানুষের আবাসস্থল। ঘর বরাদ্দপ্রাপ্তদের একজন শর্ত লংঘন করে বিক্রি করে দেয়। ঘরটি দুই হাত বদল করে অন্য একজন ব্যবসায়ী কিনে নেয়। সেই ব্যক্তি ওই ঘরের পাশে আরেকটি ঘর নির্মাণ করে। ঘরের সামনের অংশে মাছের আড়ত স্থাপন করে। পেছনে একটি কক্ষ করে অসামাজিক কাজকর্ম শুরু করে। এতে অতিষ্ঠ হয়ে- আবাসনে বসবাসরত ১০০ জন আমার কাছে এ বিষয়ে অভিযোগ দেন। এসময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাজস্ব স্যার ওই আবাসন পরিদর্শনে গিয়ে এই ঘর দেখতে পেয়ে তা ভেংগে ফেলার নির্দেশ দেন। আমি ইউএনও স্যারের সহায়তায় পুলিশ নিয়ে ঘর ভেংগে দেই। যারা ঘর তুলেছিল- তারা আমার কাছে আপোসের প্রস্তাব পাঠায়। তাদেরকে অন্য কোথাও জমি দেয়া হলে তারা মেনে নেবে। অন্যথায় আমার বিরুদ্ধে মামলা করবে। সঙ্গত কারণেই আমি মানিনি। কয়েকদিন পর তারা পটুয়াখালীর স্পেশাল ট্রাইবুনালে আমার বিরুদ্ধে একটি মামলা করে। অভিযোগের ভাষাটি ঠিক এইরকম- অবৈধভাবে ঘর তুলেছি ঠিক আছে। তবে এজন্য এসিল্যান্ড ৫০ হাজার টাকা ঘুষ চেয়েছে। না দেয়ার কারণেই ঘর ভেঙ্গে আমাদের ৫০ হাজার টাকা ক্ষতি করেছে। তারা ঘুষ চাওয়ার জন্য দুর্নীতি হয়েছে বলে মামলা করে। টুইব্যুনাল জানায়, দুর্নীতির অভিযোগে মামলা করতে হলে তা দুর্নীতি দমন কমিশন করবে। সুতরাং দুদক তদন্ত করে প্রমাণ পেয়ে মামলা দায়ের করলেই কেবল আমলে নেয়া যাবে। ট্রাইবুনাল থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠিয়ে দেয়। দুদক প্রধান কার্যালয় হাস্যকর এমন একটি অভিযোগকে বেকার বলে নথিজাত করে দিয়েছে বলে একজন সাংবাদিক আমাকে জানিয়েছেন । মাঝখানে ছয়টি মাস তাদের হম্বিতম্বি ছিল দেখার মতো। প্রতিদিন আপোষের নামে লোক পাঠিয়ে আমাকে ভয় দেখাতো।
৩.০
যার পরামর্শে আমার বিরুদ্ধে মামলা করা হয় তাকে মামলার সাক্ষী করা হয়। সে এই উপজেলার টাউট দালালদের একজন। বেশ কয়েক বছর আগে সে উপজেলা কমপ্লেক্সের ভেতর একটি ঘর তুলেছিল। ওই সময় একজন ইউএনও স্যার তার ঘর ভেঙ্গে দেন। ওই ব্যক্তি ইউএনও স্যারের বিরুদ্ধে গিয়ে একইভাবে মামলা করে। এতে ইউএনও স্যার ভীত হয়ে তার আপোষ মেনে নেন। তাকে কয়েক শতক জমি একসনা বন্দোবস্ত দেয়া হয়। সে আরও কয়েকশতক জমি বাড়তি দখল করে বিশাল ঘর তুলে এখনো ভাড়া দিয়ে যাচ্ছে। এই জমির বিনিময়ে সে মামলা তুলে নেয়। আমি ইউএনও স্যারকে দোষ দেইনা। বর্তমান বিশ্বের একজন নামকরা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারি ব্লেয়ায়ের ভাষ্যে -আমলাতন্ত্রের প্রকৃতিই এমন। চাপ সহ্য করেনা। আমলাদের বেশি চাপ প্রয়োগ করা হলে তারা নিজেরা সরে গিয়ে জায়গা করে দেন। রাজনীতিবিদদের সংগে আমলাদের পার্থক্য এখানেই। প্রকৃত রাজনীতিবিদরা তার পথ থেকে শত মামলা হলেও পথ থেকে সরে দাড়ান না। সরকারী কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলার এই রকম উদাহরণ অনেক পাওয়া যাবে। কাজ করতে গেলে কোন পক্ষ ক্ষতিগ্রস্থ হলেই মামলা দিয়ে ঝাল মিটানোর চেষ্টা করে। কয়েকদিন আগে দশমিনার এসিল্যান্ড দেবেন্দ্র নাথ ওরাও স্যারের বিরুদ্ধে খালের বাধঁ কাটার জন্য মামলা করা হয়েছে। এখন কোন কর্মচারীকে নতি স্বীকারের প্রধান অস্ত্র মামলা। ২০০৭ সালে বিচার বিভাগের পৃথককীকরণের পর এই বিষয়টি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আমার বিরুদ্ধে মামলা দিয়েও এই চক্রটি জমি বাগাতে চেয়েছিল। তবে বুঝতে পারেনি- আমি অন্য ধাতের মানুষ। দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করে এসেছি। তথাকথিত আমলা হতে পারিনি। যে চাপ দিলেই পথ করে দেবো।
৪.০
পৃথিবীর সকল সভ্য বিচার ব্যবস্থায় একটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। তা হলো-একশোজন অপরাধী ছাড়া পেতে পারে, কিন্তু একজন নিরাপরাধ যাতে সাজা না পায়। সভ্যদেশে এই নীতির আলোকেই আইন তৈরী করা হয়। একজন ব্যক্তি যখন চাকুরীতে আসেন, অসৎ উদ্দেশ্য খুব কম লোকের মধ্যেই দেখেছি। যারা পরবর্তীতে দুর্নীতিবাজ হয়ে যায় তার বেশিরভাগ চাপের কারণে । চাপ সহ্যকরা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়না। সরকারী চাকুরেদের মতো অসহায় আর কোন শ্রেণি পেশার লোকজনের মধ্যে নেই। আ্ইনের কোন সাপের্ট নেই। সবাই তাদের দিকে আঙ্গুল তুলে যায়। তারা আঙ্গুল তুলবে দূরের কথা-কথা বললেই শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে অভিযুক্ত হন। অসদাচরণ যে কিসে হয়না- তা এখনো খুজেঁ পাইনি। একজন ছিচকে চাদাবাজ সংবাদদাতার মিথ্যা একটি রিপোর্টেই তার অবস্থা শেষ। যাইহোক এই পরিস্থিতিতে এখনো সৎ কর্মকর্তাদের দেখেছি। যারা দেশপ্রেম বুকে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। কি পেলেন তার হিসাব করেন না। কোন সৎ কর্মকর্তা পেলেই লোকজন একটি কথা বলেন- এদের কারণেই দেশ টিকে আছে। আমি বলবো- এদের টিকিয়ে রাখতে গেলে রক্ষাকবচ দেয়া প্রয়োজন। দুর্নীতির বেলায় সংশ্লিষ্ট বিভাগই বলতে পারবে- কোন ফাইলে অধস্তন বাধ্য হয়ে স্বাক্ষর করেছিলেন। কোন দুর্নীতির সঙ্গে কে সরাসরি জড়িত। বিভাগীয় তদন্ত সাপেক্ষে অনুমতি নেয়া হলে প্রকৃত অপরাধির বিরুদ্ধে মামলা করে শাস্তি সহজ হবে। কাচাঁ পাকা মিলিয়ে মামলা দায়ের করলে সেনসেটাইজেশন করে বাহবাই পাওয়া যাবে। আসল কাজটি; অপরাধির শাস্তি হবেনা। মাঝখানে সৎ নিরাপরাধ কর্মচারীটির জীবন শেষ হয়ে যাবে। আগেই বলেছিলাম, মামলা এখন হাতিয়ার। নারী নির্যাতনসহ এমন কোন মামলা নেই যা- সরকারী কর্মচারীর বিরুদ্ধে হয়না। মামলা করতে হলে এই দেশের বাস্তবতায় বাদীর অভাব পড়েনা। অনেকের ভাব এমন-সে সরকারী চাকুরি করতে আসছে। তার এ বিষয়ে নাক গলানোর দরকার কি? দেখেও না দেখার ভান করবে। আর আমার এত বড় ক্ষতি করে দিলো-তাকে আমি দেখচ্ছি। মহিলা একটি যোগাড় করে নারী নির্যাতনের একটি মামলা দায়ের করে দিল। বাস্তবে কোন অসৎ কার্মচারীর বিরুদ্ধে এধরনের মামলা হয়না। সৎ কর্মচারীরা এর শিকার হন। যারা এসব মামলা করেন তাদের অনেক ক্ষমতা। পুলিশকে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করাতে চান। কোন রক্ষাকবচ না থাকলে এ ধরনের কর্মচারীরা অভিযোগ প্রমাণের আগেই গ্রেপ্তার হয়ে জেলে যাবেন। মামলার কারণে গ্রেপ্তারের ভয়ে অনেক কর্মচারী অফিসে না যাওয়ার অনেক খবর পত্রিকায় পড়েছি। পরবর্তীতে দেখা গেছে-আসলে মামলাটির ঘটনা ছিল ভিন্ন। পত্রিকায় দেখলাম- এই কারণেই ফৌজদারি মামলা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া সরকারী কর্মচারীদের গ্রেফতার করা যাবে না এমন বিধান রেখে সরকারী কর্মচারী আইন-২০১৫ এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। আর তাতে বাধঁ সেধেছে- টিআইবি। তার এর প্রতিবাদও করেছেন। তাদের অবস্থানটি হয়ত দুর্নীতির বিরুদ্ধে। কেউ যাতে কোন বৈষম্যমূলকভাবে সুবিধা না পান তারা বিষয়টি সেই দৃষ্টিকোণে দেখছেন। কিন্তু কোন সৎ কর্মকর্তা যাতে শাস্তি না পান সেজন্য তার রক্ষাকবজ কি হতে পারে-তা কি তারা ভেবেছে? কতজন সৎ কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা ফৌজদারী মামলা হয়েছে। এই হিসাব কি তাদের আছে। কোনদিন আমার চোখে পড়েনি- তারা সৎ কর্মচারীদের রক্ষায় বিবৃতি দিয়েছে। অথচ বর্তমান বিবৃতিটি পুরোপুরি সৎ কর্মকর্তাদের রক্ষার বিপরীতে চলে গেল। বিষয়টি এমন হলো-প্রয়োজনে একশ শাস্তি পাক, কিন্তু একজন অপরাধিও যাতে ছাড়া না পায়।
৫.০
শক্তিশালী আমলাতন্ত্র দেশের সম্পদ। শক্তিশালী আমলাতন্ত্র দেশের পক্ষে কাজ করেন। ভারতের আমলাতন্ত্র আর পাকিস্থানের আমলাতন্ত্রের মধ্যে অনেক পার্থক্য। এই পার্থক্যটিই দুদেশের গণতন্ত্রের পার্থক্য করে দিয়েছে। অনেককেই দেখছি পাকিস্থানের আমলাতন্ত্রের সংগে তুলনা করে। কার স্বার্থে এরা এদেশে দুর্বল আমলাতন্ত্র চাইছে? দেশে যে মুষ্ঠিমেয় সরকারী সৎ কর্মচারী রয়েছেন-এরাই শক্তিশালি আমলাতন্ত্রের প্রাণ। দেশের স্বার্থেই এদের টিকিয়ে রাখতে হবে। কোন রক্ষা কবচ না থাকলে সৎ কর্মচারী এদেশে সোনার হরিণ হয়ে যাবে।
আমরা এখন সভ্য। আমাদের আইনও হবে সভ্য নীতি অনুযায়ী। একশো অপরাধি ছাড়া পাক, কোন নিরাপরাধ যেন শাস্তি না পায়। আমি একজন নবীন সরকারী কর্মচারী হিসেবে সরকারের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই।
ডাকবাংলো, গলাচিপা।
১৫.৭.২০১৫ বিকাল. ৫.০০টা
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০১৫ সন্ধ্যা ৭:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




