রাত যত বাড়ছে৷পানি বেড়ে যাচ্ছে৷ উঠান ডুবলো৷ ঘরের ভিটা ডুবলো৷ সবাই মিলে খাটে গাদাগাদি করে বসে৷ কিন্তু নাহ৷ পানি বাড়ছেই৷ মাচায় উঠে গেলো সবাই৷ পানি মাচা ছুঁয়েছে৷ এবার শুরু হয়েছে ঢেউ৷ কোনমতে টিন কেটে টিনের উপরে উঠে পড়েছে সবাই৷ হঠাৎ অাজদাহা এক ঢেউ অাসলো৷ ভাসিয়ে নিয়ে গেলো পরিবারের সবাইকে৷ বাবা তখনো বছর চারেকের পুত্রকে ধরে টিকে অাছেন৷ ঘরের টিন তখন ভেসে চলছে৷ বাবার কোমরে গামছা বাঁধা৷ গামছাটা খুলে পুত্রকে পিঠের সাথে বাঁধলেন তিনি৷ বললেন, শক্ত করে কোমর ধরে থাকবি৷ ছাড়বি না৷ পুত্র মাথা নেড়ে সায় দেয়৷ এবার টিনটা গিয়ে অাটকে যায় একটা গাছের সাথে৷ বাবা অন্ধকারে হাতড়ে উঠে যান গাছে৷ শক্ত করে ধরে বসে থাকেন৷ পিঠে গামছায় বাঁধা পুত্র৷ বড় বড় ঢেউ অাসে৷ গাছটা নুয়ে যায়৷ সাথে তারাও পানির নিচে চলে যায়৷ একবার৷ দুই বার৷ বিরামহীন৷ যতই পানির নিচে যাক পুত্র বাবাকে শক্ত করে জড়িয়ে থাকে৷ বাবা বলেছে৷ ক্যাসাবিয়ানকা পুত্র তা মেনে চলছে৷ রাত গভীর হয়৷ ঢেউয়ের তোড়ে গাছ পানির গভীরে চলে যায়৷ অাবার দাড়িয়ে যায়৷ এবার একটা ঢেউ অাসে অনেক উঁচু৷ গাছটা পানির ভেতরে চলে যায়৷ অনেকক্ষণ৷ স্রোতের সাথে যুদ্ধ চলে গাছের৷ অার জীবনের সাথে দুটি প্রাণের৷ বাবার শ্বাস বন্ধ হয়ে যায়৷ বাঁচতে গিয়ে নিজের গামছা খুলে দেয়৷ কিন্তু পুত্র বাবাকে কোনক্রমেই ছাড়ছেনা৷ বাবার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে অাসে৷ পুত্রের হাত ছাড়াতে যায়৷ যতই ছাড়াতে যায় ছোট্ট দুই হাত অারো অক্টোপাশের মতো অাকড়ে ধরে৷ এবার বাবা সোজা হাতের উপর কামড় বসিয়ে দেয়৷ কামড়ে পুত্রের হাত থেকে মাংস উঠে অাসে৷ অালগা হয়ে যায় ছোট্ট দুটো হাতের বন্ধন৷ মুহূর্তেই গাছটা পানি ছেড়ে উপরে মাথা তুলে৷ সাথে হতভাগ্য পিতার শরীরটা৷ রাত কিভাবে কেটেছে বলতে পারেন না৷ সকালে অালো যখন পূর্বাকাশে উঁকি দিয়েছে, তখন সম্বিৎ ফিরে পান৷ নেমে অাসেন গাছ থেকে৷ পাশের পুকুরেই মেলে স্ত্রী, কন্যার লাশ৷ ছেলেকে খুঁজে বেড়ান৷ কোথাও নেই৷ কোথাও পাওয়া যায় নি তাকে৷
অামার সাথে ১৯৯৪ সালে ওই পিতার দেখা হয়েছিল৷ চট্টগ্রামে৷ পুত্রকে খুঁজছেন৷ যাকে পাচ্ছেন, অ বাজি, অার পোয়ারে দেইক্কো না৷ অার পোয়া একক্কান নাল কোর্তা চাইয়ি দে৷ কোর্তা দিওন ন পারি৷ ছিন্নভিন্ন চেহারা৷ মাথায় জট৷ পাগল বলে লোকজন দূরে সরিয়ে দিচ্ছেন৷ চেয়ে দেখি ক্ষুধার্ত৷ অামি পকেটে হাত দিয়ে দেখি, দুই টাকা অাছে৷ ওই সময় অামার কাছে দুই টাকাই অনেক৷ একটা রুটি কিনলাম৷ তার হাতে দিলাম৷ গোগ্রাসে গিলসে৷ খাওয়ার পর কান্না৷ মুরাদপুর থেকে বিবির হাটের দিকে রেল লাইনের উপর হাটতে হাটতে অাঞ্চলিক ভাষায় বলে গেলেন৷ পুত্রকে কেন খুঁজছেন৷ বিবিরহাটে পৌঁছে অামি রেল লাইন ছেড়ে রাস্তায় উঠলাম৷ তিনি তখনো একমনে হাটছেন রেল লাইন ধরে৷ যতটুকু মনে পড়ে, তার বাড়ি বাঁশখালি৷ যতদূর সম্ভব গন্ডামারা গ্রামে৷
অাজ সেই ভয়াল ২৯ এপ্রিল৷ এক হতভাগ্য পিতার সাক্ষী হয়ে অামিও বেঁচে অাছি৷
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে এপ্রিল, ২০১৮ সকাল ৯:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




