somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইসলামে গান হালাল আবার হারামও

১৭ ই জানুয়ারি, ২০২০ রাত ৮:২৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কওমী ও আলীয়া মাদরাসায় একটা বই পড়ানো হয়ে থাকে। নাম উসুলুস শাশি। ইসলামের প্রথম যুগের লেখা বই। কেন হানাফি মাজহাবের এজতেহাদকৃত মাসয়ালা সহজে আমলযোগ্য তা বইটা পড়লে বুঝা যায়। মাসয়ালার ক্ষেত্রে ইমামদের মতামতের কিছু চিত্র বইটিতে পাওয়া যায়। কোরআন পড়া সহজ, কিন্তু বুঝা কঠিন। কোরআনের আয়াত থেকে মাসয়ালা বের করা আরো কঠিন। আয়াতের কোন শব্দ আম, খাস, মুতলাক মাকাইয়াদ তা বুঝতে হয়। বুঝতে হয় মুশতারাক, মুআওয়াল, হাকীকত মাজাজ বা ইশতেয়ারা। এরমধ্যে সবচেয়ে যে বিষয়টাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে, তা হলো-সবব। সববের বাংলা অর্থ কারণ বা কার্যকারণ। কোনটা কখন ওয়াজিব, কোনটা হালাল বা কোনটা হারাম তা নির্ধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সবব। উসুলুস শাসী বইটিতে হালাল হারাম নির্ধারণে একটা পরশ পাথরের সন্ধান দেয়া আছে। বলা হয়েছে- আল আহকামুস শারইয়াহ ইয়াতআল্লাকু বি আসবাবিহা। অর্থ হলো- শরীয়তের সব বিধান সবব সম্পর্কিত হয়। সবব বুঝতে পারলে অনেক বিষয় পরিস্কার হয়ে যাবে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, নামাজ ওয়াজিবের সবব হলো ওয়াক্ত হওয়া। এবার একটু গভীরে যাই। কোন জিনিস হালাল না কী হারাম তাও আপনি সবব দিয়ে নির্ধারণ করতে পারবেন। ধরুন, সকল প্রকারের মদ হারাম। মদ কখন হবে। এমন পানীয় যাতে নেশা থাকতে হবে। আঙ্গুর ফলের রস দিয়ে মদ বানানো হয়। আঙ্গুর ফল হারাম না। রসও হারাম না। যখনি খেয়ে নেশা হবে তখনি সেটা হারাম হবে। কার্যকারণ বা সববটা হলো নেশা। নেশা পাওয়া গেলে সেটা বৈধ হবেনা। এবার আঙ্গুরের রস ঘরে রেখে দিলেন, এমন হালাল কিছু মিশালেন, তাতে নেশা হলোনা। তখন সেটা আর মদ থাকেনা। জুস হয়ে যায়। কারণ তাতে নেশার অস্তিত্ব নেই। নেশার অস্তিত্ব পাওয়া গেলে সেটা হারাম হবে। তবে এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। উদাহরণ হিসেবে মদকে বলা হলেও মদ বা নেশা ইসলামে খুব কঠোরতার সাথে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মদ খাওয়ার পাত্রও পরিহার করতে বলা হয়েছে। সুতরাং ভুল বুঝার কোন অবকাশ নেই।
এবার আসি গান নিয়ে। গান হালাল আবার গান হারাম। কারণ ওই সবব। সববটা হলো- অশ্লীলতা। গান গাওয়া হলো- আপনার আল্লাহ আর রাসুল বা তার ওলীদের কথা মনে পড়ে কাদলেন, এটা হারাম হওয়ার কোন কারণ নেই। আবার কুতকুতি মাইয়া টাইপের গান শুনলেন, এটা বৈধ হওয়ার কোন কারণ নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখলেন, সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর, আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর। অন্যদিকে নির্মেলেন্দু গুণ লিখেলেন, আমি প্রেমিকার পায়ুপথে নাসারন্ধ্র রেখে কস্তুরির গন্ধ পাই। দুইটা কবিতা এক নয়। একটুকু বুঝলেই বিষয়টা পরিস্কার ও সহজ হয়ে যায়। এভাবে আধুনিক যন্ত্রপাতি হোক, অথবা সিনেমা হোক, সবব অশ্লীল হলে তা অবৈধ। আর অশ্লীলতা না পাওয়া গেলে তা ইসলামের দৃষ্টিতে অবৈধ নয়।
আমি জাহেলী যুগে লেখা কিছু কবিতা পড়েছি। ভয়াবহ রকমের অশ্লীল। একটা কবিতা পড়েছিলাম, সেটা প্রেমিকার গোপন অঙ্গের বর্ণণা দিয়ে লেখা। আমি যতটুকু আরবী বুঝি তাতে মনে হয়েছে, তার যে কাব্যিক ঝংকার তা আধুনিককালের কবিতায় পাওয়া কঠিন। আমাদের নবী দ. কবিতা গানে যে অনুৎসাহিত করেছেন, তা এই অশ্লীলতার কারণে। কারণ ওই সময় এসব কবিতা বিখ্যাত ছিল। কিন্তু রসুলের উপস্থিতিতেই খন্দকের যুদ্ধের পরিখা খননকালে সাহাবারা গান কবিতা পাঠ করেছেন। বহু হাদীস আছে যেখানে রাসুল দ. উপস্থিত ছিলেন, অথচ গান করা হয়েছে। রাসুলের বিয়েতে আরবের ঐতিহ্য অনুযায়ী দফ বাজানো হয়েছে। কিন্তু রাসুল দ. আবার গান গাইতে নিষেধ করেছেন- এমন হাদীসও পাওয়া যায়। দুটোকে সমন্বয় করলে সহজেই বুঝা যায়- যেসব হাদীস দিয়ে অশ্লীলতাকে বুঝানো হয়েছে।
হযরত মাইনুদ্দীন চিশতি রা. এসব বুঝে শুনেই সেমা বা সুফবাদী গান বাজনা করেছেন। অনেক ওলীর কথা বলা যাবে। যাদের হাত ধরে এই উপমহাদেশের মুসলমান হলাম, আজ আমরা তাদের ভুল ধরি। ইসলামি গান বা তাতে যন্ত্রের ব্যবহার নিয়ে বহু কিতাব লেখা হয়েছে। শরিয়ত বয়াতি ওসব বই পড়েছেন। তিনি জানেন, এসব বইয়ের জবাব কখনোই এর বিরোধীরা দিতে পারেন নি। এজন্যই তিনি চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন। আমার ধারণা যারা গান বাজনাকে ঢালাওভাবে হারাম বলেন, তারা সববটা বুঝতে পারেন না। আর না বুঝতে পারার ফলাফলটা যে কত ভয়াবহ হতে পারে তা পাকিস্তানের কাওয়ালি শিল্পী আমজাদ সাবারিকে গুলি করে হত্যার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। বেশি দিন আগের কথা নয়। ২০১৬ সালের টেলিভিশনে গান শেষে ফেরার পথে তাকে হত্যা করা হয়। কয়েকশ বছর ধরে বংশপরম্পরায় সুফিগান করে আসছিলেন সাবরিরা। আমজাদ সাবরির পিতা মকবুল সাবরিও ছিলেন বিখ্যাত সুফি শিল্পী। তাদের গান শুনে মানুষ কাঁদতেন। মকবুল সাবরির শেষ গজল ছিল, ম্যায় কবর আন্ধেরি মে, ঘাবরাও গা জব তানহা, এমদাদ মেরি করনে আ জানা রাসুলাল্লাহ।‘ আমি কবরের অন্ধকারে একাকী যখন ঘাবড়ে যাবো, আমাকে সাহায্য করতে চলে আসো হে রাসুলাল্লাহ। টেলিভিশনে এই নাতটি শুনে উপস্থিত আলেম, দর্শক উপস্থাপক সবাই কাঁদছিলেন। এমন একজন গায়ককে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশে হয়ত, এরা গায়ককে হত্যা করেনি সত্যি। তবে একই মতদর্শী এরা।
যাই হোক একটা গল্প বলি, একবার একজন আল্লাহর ওলী কোনো এক শহরে যাবেন। সেখানকার মানুষ জানতে পারলেন, একজন আল্লাহর ওলী ওই শহরে আসছেন। তারা তাকে স্বাগত জানাতে দলে দলে শহরের প্রান্তে একত্রিত হলেন। বহুদূর থেকে আল্লাহর ওলী তা লক্ষ্য করলেন। তিনি ভাবলেন, এত মানুষ তার রীয়ার কারণ হতে পারে। এছাড়াও তারা তার ইবাদতে বিঘ্ন ঘটাবেন। তখন রমজান মাস। মুরিদকে বললেন, খাবার আছে? মুরিদ খাবার হিসেবে একটা রুটি এনে দিলেন। তিনি সেটা খেতে খেতে শহরের দিকে এগুতে থাকলেন। এসময় রটে গেলো যাকে মনে করা হচ্ছে- আল্লাহর ওলী, তিনি রোজার দিনে খাবার খেতে খেতে আসছেন। শুনে লোকজন চলে গেলো। শুধু কিছু সংখ্যক ইসলামি জ্ঞান সমৃদ্ধ ব্যক্তি থেকে গেলেন। কারণ তারা জানতেন কোরআনের আয়াত- ইন কানা মারিজান আও আলা সাফরিন ফা ইদ্দতুল লি আইয়ামিল উখার। অর্থাৎ- যদি কেউ রোজার দিনে রুগ্ন বা সফরে থাকেন- তবে তাদেরজন্য রোজা অন্যকোন দিন। সাধারণ মানুষ এটা বুঝতে পারেননি। আর বুঝা তাদের পক্ষে সম্ভবও নয়।
এজন্যই ইসলামি জ্ঞানহীন অথবা ভ্রান্ত আকীদার কোন ব্যক্তি কোনটা বৈধ বা অবৈধ তা নির্ণয় করতে গেলে যিনি সৎপথে আছেন, তাকেও তাদের কাছে ভ্রান্ত মনে হবে। এটা বুঝতে পারলে রোজার মাসে কেউ সকল খাবারের দোকানপাট বন্ধ করতে বলতেন না। রোগী, শিশু, মুসাফির বা অমুসলিমদের কথা বিবেচনা করতেন। ইসলাম যার হাতে থাকা উচিত, তার হাতেই থাকা উচিত। একারণেই কম জানে বা অবিবেচক অথবা ভ্রান্ত আকীদার লোকজনের হাতে ইসলামের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা গেলে তা অন্যদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাড়ায়, অথচ ইসলামে যার ভোগান্তির কথা ছিলনা৷

দক্ষিণ কোরিয়া
১৭ জানুয়ারি ২০২০
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জানুয়ারি, ২০২০ রাত ১১:৫২
৩৫টি মন্তব্য ২৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জাপান কেন বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু?

লিখেছেন রায়হানুল এফ রাজ, ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৮:৫০



জাপানী সম্রাট হিরোহিতো বাঙ্গলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলেছিলেন, ‘যতদিন জাপান থাকবে, বাঙালি খাদ্যাভাবে, অর্থকষ্টে মরবেনা। জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু’! এটি শুধু কথার কথা ছিলো না, তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার লেখা প্রথম বই

লিখেছেন ফারহানা শারমিন, ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৯:১৩



ছোটবেলা থেকেই প্রচন্ড রকম কল্পনাপ্রবণ আমি। একটুতেই কল্পনাই হারিয়ে যাই। গল্প লেখার সময় অন্য লেখকদের মত আমিও কল্পনায় গল্প আঁকি।আমার বহু আকাংখিত বই হাতে পেয়ে প্রথমে খুবই আশাহত হয়েছি। আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির আয়নায়

লিখেছেন নিভৃতা , ২২ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ১১:০৪





কিছুদিন আগে নস্টালজিতে আক্রান্ত হই আমার বাসার বুয়ার জীবনের একটি গল্প শুনে। স্মৃতিকাতর হয়ে সেই বিটিভি যুগে ফিরে গিয়েছিলাম।

এই বুয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন জীবন- নয়

লিখেছেন করুণাধারা, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ দুপুর ১২:০২



আগের পর্ব: নতুন জীবন- আট

অবশেষে আনুষ্ঠানিক ভাবে আমার বোন পেট্রার জন্মকে স্বীকৃতি দেয়া হল। আমাকে জানানো হল আমার একটা বোন হয়েছে। আমি বোন দেখতে গেলাম, দেখি মায়ের পাশে ছোট একটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সর্বশ্রেষ্ঠ নবী এবং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর ওফাতকালীন ঘটনাসমূহ (প্রথম পর্ব)

লিখেছেন নীল আকাশ, ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৪:৩৬



[সকল প্রশংসা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য, যিনি আমাদেরকে সর্বোত্তম দীনের অনুসারী ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর উম্মত হওয়ার তৌফিক দান করেছেন। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×