somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যে কারণে ভারতে মুসলমানদের উপর হামলায় আমার মন্তব্য নেই

২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ সকাল ৯:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমি আমার দেশকে নিয়েই ভাবি। দেশের স্বার্থের আয়নায় বাইরে দেখি। বাইরের দেশের ঘটনা দেখি। একটা কারণে আমি দিল্লিতে হামলা, হত্যা আর লুটপাট নিয়ে স্টাটাস দেইনি। কারণটা কী- ক্লিয়ার করি।

ভারতের দিল্লীতে এখন আগুন জ্বলছে। এ পর্যন্ত ২৩ জন মানুষ মারা গেছে সেই আগুনে। বাড়িঘর, দোকানপাট, মসজিদ কিছুই রক্ষা পায়নি। গুজরাটের আগুনের সাথে এই আগুনের একটাই সামঞ্জস্য দেখতে পেয়েছি। তা হলো- গুজরাটে দ্রুত সেনাবাহিনী নামানো হলে সাথে সাথেই নিয়ন্ত্রণ করা যেতো। এবারও একই ঘটনা মনে হচ্ছে। সেনাবাহিনী নামানো হচ্ছেনা। আমার কাছে এ ধরণের ঘটনা মানবতার ইতিহাসের বড় ধরণের লজ্জা ছাড়া কিছুই নয়। সেই ১৯৪৬ সালের পর ৭০ বছর পার হলেও ভারত একই জায়গায় রয়ে গেছে। বিন্দুমাত্র আগাতে পারেনি। অনেকাংশে পিছিয়ে গেছে।

আমার ফেসবুকের ফ্রেন্ডলিস্টে ধর্মমত নির্বিশেষে সবাই আছেন। আমি সাধারণত এসব সাম্প্রদায়িক বিষয়ে ফেসবুকে স্টাটাস বা মন্তব্য দেইনা। তবে সবার লেখা পড়ি। জনমত বুঝার চেষ্টা করি। ভারতের চলমান ঘটনায় কদিন আমি আমার বন্ধুদের লেখাগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলাম। তবে একটা জিনিস খেয়াল করে দেখলাম- আমার ফ্রেন্ডলিস্টের মুসলমান বন্ধুদের বেশিরভাগই স্টাটাস দিয়েছেন। কেউ যুক্তিসহকারে কথা বলেছেন, কেউ নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন, কারো মধ্যে জেহাদি জোসও দেখা গেছে। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো- হিন্দু ধর্মাবলম্বী বন্ধুদের মধ্যে যারা ধর্মকর্ম মানেন না এবং উচ্চ শিক্ষিত তাদের দু একজনকেই দেখলাম এ বিষয়ে স্টাটাস দিয়েছেন। কেউ নিন্দা করেছেন। কেউ বুদ্ধিবৃত্তিক কথা বলেছেন। তবে অধিকাংশ হিন্দু ধর্মাবলম্বী এ বিষয়ে নিরব। এটা আমার কাছে অনেক তাৎপর্যবহ। এই জায়গাটায় আমরা একটু পিছিয়ে আছি। ভারতে একজন সংখ্যালঘু নির্যাতিত হলে আমাদের গায়ে লাগে। এটা কী নিজের দেশে চিন্তা করি। দূর্বল পেলে তার উপরে চড়াও হই। আমাদের দেশের হিন্দু ধর্মালম্বী সাধারণ মানুষ কেন নিন্দা জানান না- সেটা আমরা কী ভেবে দেখেছি। যে ধর্মের নামই শান্তি। যে ধর্মে কাউকে দেখা হলেই প্রথমে যে কথাটা বলতে হয়- আপনার উপরে শান্তি বর্ষিত হোক, সে ধর্মের লোকজন কেন অন্য ধর্মের লোকজনের মনের কষ্টের কারণ হবে- এটাই আমার প্রশ্ন। দেশে এখন বেশিরভাগ ওয়াজ মাহফিলের নামে চলে বিদ্বেষের প্রসার। অন্য ধর্ম, অন্য মতের বিরুদ্ধে খিস্তি-খেউর৷ আমাদের কোন ব্যর্থতা থাকলে তা এটাই।

তাই বলে কী সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে আমাদের সফলতা নেই? একটু ইতিহাস ঘুরে আসি। ১৯৪৬ সালে কলকাতা দাঙ্গার মাধ্যমে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার সূত্রপাত হয়। দাঙ্গায় নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন মুসলমান। বেশিরভাগের বাড়ি ছিল নোয়াখালী। এর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নোয়াখালীতে হিন্দুদের মারা হয়। ১৯৫০ সালে ঢাকা, বরিশাল, সিলেট, চট্টগ্রামে পাকিস্তানি শাসকদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় হিন্দুদের মারা হয়। বরিশালে একটি গুজব ছড়ানো হয় যে, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে কোলকাতায় খুন করা হয়েছে। এরপরেই বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের হত্যা করা হয়। ১৯৬৪ সালে ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে অবস্থিত হজরতবাল নামক মসজিদে হজরত মুহাম্মদ দ. এর সংরক্ষিত মাথার চুল চুরি করা হয়েছে- এই সংবাদ ছড়ানোর মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুদের মারা হয়েছিল। ১৯৭১ সালেও রাজাকার, আলবদর ও আল শামসের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও সহযোগিতায় হিন্দুদের মারা হয়। এরপর ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙ্গার পর ভারতে দুই হাজারের মতো মুসলমান নিহত হয়। তবে তার রেশ এদেশেও ছড়িয়ে পড়েছিল। ঢাকাসহ সারাদেশে অন্তত ৩০টি শহরে মন্দিরে হামলা চালানো হয়। বিভিন্ন জেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, ও লুটপাট চালানো হয়েছিল। ওই সময়কার সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সেই সহিংস পরিস্থিতির শিকার হয়ে সারা দেশে অন্তত ১০জন মানুষ মারা গিয়েছিলেন এবং ভাঙ্গা হয়েছিল অনেক মন্দির। জাতীয় স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এ দলের ওয়ান ডে ম্যাচ ছিল। তবে খেলা শুরুর আগে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী মাঠে ঢুঁকে পড়ায় সে ম্যাচ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। যতটুকু মনে পড়ে, মন্দিরে হামলাকারী একজনকে পুলিশ আটক করে ওই সময়। তার মাথায় টুপি ছিল। পরনে পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। পরে জানা যায়, সে হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এই ঘটনার পরপরই হিন্দুদের উপর দেশব্যাপী হামলা বন্ধ হয়ে যায়। বকধার্মিক মুসলমান নামধারী দুবৃত্তরাও হামলা বন্ধ করে দেয়। হিন্দুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হামলা এদেশের মাটিতেই চালানো হয়েছে। সব রক্তের রঙ একই। দাঙ্গা নয়, ভারতের মতো একতরফাই মারা হয়েছে, লুটপাট করা হয়েছে, ধর্ষণও করা হয়েছে। বহুমুখি রাজনীতি হয়েছে৷ সবগুলো অাবার সরল সাম্প্রদায়িক হামলাও ছিলনা৷ কোন পক্ষ লাভবান হওয়ার চেষ্টা করেছে৷তবে এসব ঘটনার বেদনা আর কষ্টের ছাপ এখনো এদেশের হিন্দুদের মনে লেগে থাকলে সেটা কী দোষের হবে! এ কারণে পৃথিবীর কোথাও দাঙ্গা হলে অতীতের কথা মনে করে আমাদের তো লজ্জা পাওয়া উচিত৷

যাই হোক ২০০২ সালে এলো গুজরাট দাঙ্গা। এসময় থেকেই বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে অভাবনীয় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। গুজরাটে যেভাবে মুসলমানদের পুড়িয়ে মারা হয়েছে, তার রোমহর্ষক কাহিনী পত্রিকায় ছাপা হতো। বিভৎস সব ছবি দেখতে পেতাম। কয়েকটা ছবির কথা মনে আছে। এক লোক মৃত্যু ভয়ে কম্পমান দুই হাত জোড় করে জীবন ভিক্ষা চাচ্ছেন। সারা গায়ে আঘোতের দাগ। আর সামনে তরবারি হাতে উন্মত্ত দুবৃত্তরা। একজন মহিলাকে একজটলা মানুষের মধ্যে কাড়াকাড়ি। এসব ছবি দেখে মুসলমানরা ব্যথিত হয়েছেন ঠিকই, তবে বাংলাদেশের মানুষ ততদিনে অসাম্প্রদায়িক হয়ে গেছে। এই ঘটনার রেশ ধরে কোথাও কোন হিন্দু নির্যাতন হয়েছে কী না আমার জানা নেই। এরপর বাবরি মসজিদ রায় ইস্যু এসেছে, কাশ্মির ইস্যু আসলো- এদেশে এসব ঘটনার বিন্দুমাত্র প্রভাবও পড়েনি।

এবার শুরু হলো- দিল্লী দাঙ্গা। দাঙ্গা না বলে মুসলমানদের উপর হামলা বলাটাই শ্রেয় হবে। একটা ছবি চোখের সামনে ভাসছে। সাদা পাঞ্জাবী পাজামা পড়া মুসলিম যুবক। সেজদা দেয়ার মতো করে মাটিতে পড়ে আছেন। সারা গায়ে রক্ত। আর চারপাশে দাড়িয়ে পেটানো হচ্ছে তাকে। ছবিটা চোখের সামনে ভেসে উঠলে এই বিদেশ বিভূঁইয়ে বসেও চোখটা ভারি হয়ে ওঠে। প্রতিবেশিরা ভালো না থাকলে নিজের ভালো থাকা কঠিন। এসব ছবি দেখে এমন কোন মানুষ নেই যে ব্যথা অনুভব করবেন না। আমার ধারণা বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ ব্যথিত। তবে এ পর্যন্তই। আমার বিশ্বাস বাংলাদেশের মানুষ এ নিয়ে উগ্র সাম্প্রদায়িক একটা মিছিল পর্যন্ত করবেনা। হামলা, লুটপাট তো দূরের কথা। আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বমানের। এখানে যেটা আছে তা একান্তই আইন শৃঙ্খলার ব্যাপার। একারণেই অমর্ত্য সেন কয়েকদিন আগে সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন, ধর্মীয় ভাবধারায় ভারতের মতো সংকীর্ণতা বাংলাদেশে নেই। এটাই আমাদের বড় অর্জন। মুক্তিযুদ্ধের অর্জন।

শুধু জিডিপির প্রবৃদ্ধি নয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মাতৃমৃত্যুর হারের দিক দিয়েও নয়, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দিক থেকেও আমরা ভারতের থেকে উন্নতি করেছি। এগিয়ে আছি। এসব বিষয়ে ভারত অন্তত বাংলাদেশকে অনুসরণ করতে পারে। এ বিষয়ে একজন বাংলাদেশি হিসেবে সত্যিই গর্ববোধ করি।

যা বলছিলাম, বাংলাদেশের মানুষ শুধু ভারত নয়, পৃথিবীর যেকোন দেশের সাম্প্রদায়িক হানাহানীর বিরুদ্ধে যেদিন ধর্ম-বর্ণ নিবিশেষে প্রতিবাদ করবে, করতে পারবে, সেদিনই আমি সবার সাথে এর নিন্দা জানাবো। আমি বিশ্বাস করি সময়টা চলে এসেছে।


দক্ষিণ কোরিয়া
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জানুয়ারি, ২০২১ সন্ধ্যা ৬:২১
২৬টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মন্তব্যে অনন্য রাজীব নূর

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২৬ শে জুন, ২০২৬ রাত ১০:৩২



অনন্য রাজীব নুর মন্তব্য বেলায়
পাওয়া ও দেওয়ায় লক্ষ করে পার
সম্মুখে এগিয়ে চলে গন্তব্যে অপার
প্রতিটি পোষ্টের ক্ষেত্রে তার আছে টান।
মন তার দোলে চলে আনন্দ ভেলায়
ব্লগেতে নিশ্চুপ দেখে পোষ্ট... ...বাকিটুকু পড়ুন

অপারেশন ইকারুস: জেনেভার ছায়া

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৭ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



বালি অপারেশন শেষ করে ঢাকায় পিবিআই সদর দপ্তরে যখন আরিয়ান, তানভীর ও বর্ষা ফিরে এলো, তখনো বাইরের আকাশ থমথমে। বালি থেকে উদ্ধার করা ৬০% ডেটায় একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুরাগের বুকে আমার ছোট ভাইদের লাশ ২০২৪-এর উপহার ‼️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২৭ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:১৩



২০২৪ আমাদের নতুন করে শত্রু মিত্র চিনতে শিখিয়েছে। আমি কোনো করুনা, সান্ত্বনা কিংবা বিচারের দাবি নিয়ে আজকের এই ক্ষুদ্র পোস্ট লিখতে চাই না।শুধু সময়ের স্বাক্ষী হিসেবে একটু আচর কেটে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আম গেল ছালাও গেল

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৭ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩


আমিনুল ইসলাম বুলবুল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এমন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার নাম মুছে ফেলা অসম্ভব। ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে শক্তিশালী পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করেছিলেন এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

এবার বাধ্যতামূলক হচ্ছে এনআইডি নবায়ন

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৭ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:৫৫

বাধ্যতামূলক ভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নবায়ন করার কথা ভাবছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এনআইডির মেয়াদ ১৫ বছর পূর্ণ হলে অবশ্যই নবায়ন করতে হতে পারে।
বর্তমানে আইন অনুযায়ী এনআইডি নবায়নের সুযোগ থাকলেও সেটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×