নেগোশিয়েশনে একটা কৌশল আছে৷ ব্যাড গাই, গুড গাই৷ বিষয়টা কী বিস্তারিত বুঝিয়ে বলছি৷ ধরুন, কোন একজন আসামীকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে৷ পারিপার্শ্বিক অবস্থায় বুঝা যায় তার কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে৷ তবে তাকে যতই প্রেসার দেয়া হোকনা কেন সে কিছুতেই মুখ খুলবেনা৷ এ অবস্থায় ব্যাড গাই গুড গাই কৌশল প্রয়োগ করা হয়৷
তাহলে কৌশলটা কী! এ কৌশলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজন কর্মকর্তা থাকেন৷ এদের একজন জুনিয়র৷ আরেকজন তার চেয়ে সিনিয়র৷ জুনিয়র কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করবেন ব্যাড গাই হিসেবে৷ তার আচরণ হবে খুব খারাপ৷ হুমকি দেবেন৷ মারধর করতে চাইবেন৷ অপমান করবেন৷ এমনকি মারধরও করতে পারেন৷ মোটকথা জিজ্ঞাসাবাদের নামে পরিস্থিতি খুব খারাপ করে তুলবেন৷ খুব সিরিয়াস মুহূর্তে অন্য তদন্তকারী কর্মকর্তা সেখানে প্রবেশে করবেন৷ তিনি আসামির সাথে খারাপ ব্যবহারের জন্য তার জুনিয়র কর্মকর্তাকে বকাঝকা করবেন৷ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দেবেন৷ তারপর তীব্র ক্রোধে তাকে কক্ষ থেকে বের করে দেবেন৷ যাতে আসামী তাকে ভালো মানুষ মনে করেন৷ এরপর তিনি তার সাথে ভালো ব্যবহার করবেন৷ যাতে তাকে ভালো মানুষ হিসেবে বিশ্বাস করেন৷
আসামী ঘুর্ণাক্ষরেও বুঝতে পারেন না এটা আসলে সাজানো ছিল৷ তিনি খারাপ কর্মকর্তার হাত থেকে ভালো কর্মকর্তার হাতে পড়েছেন বলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন৷ আর এ সুযোগটাই সিনিয়র কর্মকর্তা কাজে লাগিয়ে তথ্য উদ্ধার করবেন৷
এটি আসামীর জিজ্ঞাসাবাদে ব্যবহৃত কৌশল বলে এই নাম দেয়া হয়েছে৷ তবে এই কৌশল বাণিজ্য নেগোশিয়েশন বা রাজনৈতিক সংলাপেও ব্যবহার করা হয়৷ এসব ক্ষেত্রে জুনিয়র বড়সড় দাবি সম্বলিত প্রস্তাব দেয়৷ পরে সিনিয়র তাতে হস্তক্ষেপ করেন৷ বলেন, আরে ওনারা তো অতিথি মানুষ৷ অথবা তাদের সাথে আমাদের এত বছরের সম্পর্ক৷ অথবা আরে এভাবে কথা বললে তো সমাধান হবেনা৷ অথচ আমরা সমাধানে আসতে চাই৷ এত কড়া দাবি করলে কী হয় নাকি! সম্পর্কের ভিত্তিতে আমি এটাকে এই পর্যায়ে নামিয়ে নিচ্ছি৷ ব্যস! এতে প্রতিপক্ষ ধোকা খেয়ে যেতে পারেন৷
ব্যাড গাই গুড গাই কৌশলটা নিয়ে আলোচনার একটা কারণ রয়েছে৷ আমি নিশ্চিত গাজা ইস্যুতে ইসরায়েল ব্যাড গাই ও যুক্তরাষ্ট্র গুড গাইয়ের ভূমিকা পালন করছে৷ যুক্তরাষ্ট্র মাঝে মাঝে ইসরায়েলকে ধমকও দিচ্ছে৷ এই যেমন গাজা উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলে হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে গিয়ে ইসরায়েল যে ধরনের আচরণ করছে, তার কঠোর সমালোচনা করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন। তিনি বলেছেন, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিতে এবং হতাহতের ঘটনা এড়াতে ইসরায়েল সরকার যে লক্ষ্যের কথা বলেছিল, তার সঙ্গে তাদের আচরণে ফারাক থেকে যাচ্ছে। তার এ বক্তব্য আরবদের খুশী করার উদ্দেশ্য ছাড়াও ইসরায়েল যাতে তার কাজ চালিয়ে যেতে পারে তা নিশ্চিত করা ৷ কোন দিন গণহত্যার প্রশ্ন উঠলে যুক্তরাষ্ট্র এই বাণি স্মরণ করিয়ে দেবে৷ এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরায়েলের ওপর ভিসা নীতি প্রয়োগেরও হুমকি দিয়েছিলেন৷
সর্বশেষ ইসরায়েল রাফায় অভিযান চালালে দেশটিতে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো স্থগিত করা হবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ঘোষণা দিয়েছেন। পরে ইসরায়েলকে সতর্ক করে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা পরিকল্পনামতো গাজার রাফায় সর্বাত্মক অভিযান চালালে তা হামাসের জন্য কৌশলগত বিজয় এনে দিতে পারে। হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা মুখপাত্র জন কারবি এই সতর্ক বার্তা দেন। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ইসরাইল হামাসকে হারাতে পারবেনা।
আসলে কী তাই! ইসরাইল কী হামাসকে হারাতে পারবেনা! বাস্তবে মোটেও তা নয়। হামাসকে একটি অজেয় শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করার কারণ রয়েছে। এটি বেশি শক্তি প্রয়োগের যৌক্তিকতা প্রমাণের প্রচেষ্টা ছাড়া কিছু নয়। এছাড়াও প্রাণঘাতি অস্ত্র ব্যবহার জায়েজ করতে বিশ্ববাসীকে নয়ছয় বোঝানো হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ইসরাইলকে মৃদু বকাঝকা করছে। অন্যদিকে ইসরাইল গণহত্যার কাজটি সারছে। হামাসকে নিশ্চিহ্ন করা ইসরাইলের উদ্দেশ্য নয়। হামাস ইসরাইলের তৈরি। তারা চায় হামাস থাকুক। হামাস থাকলে তারা চকলেট রকেট মারবে। ওই অঞ্চলে যুদ্ধাবস্থা থাকবে। ফিলিস্তিনের বৈধ কর্তৃপক্ষ ফাতাহ আড়ালে থাকবে। আলোচনার টেবিলে যুক্তিতে হারতে হবেনা। সেই সুযোগে আরবদের হত্যা করা যাবে।
আর জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও কুটনীতির আরেকটি নীতির প্রয়োগ। পরবর্তিতে এ বিষয় নিয়ে লেখা যাবে। বাস্তবতা হলো জাতিসংঘে ফিলিস্তনের পক্ষে কোন প্রস্তাব উঠলে যুক্তরাষ্ট্র তাতে ভেটো দিয়ে থামিয়ে দিচ্ছে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে ওঠা কোনো প্রস্তাবেরও একই পরিণতি হচ্ছে। জাতিসংঘে যা করছে সেটাই আমেরিকানদের আসল চেহারা। তাহলে ইসরাইলকে নিয়ে এত বকাঝকা কেন!
তবে আরব দেশগুলো আমেরিকানদের এই ধোকা বুঝতে পারলেও কিছু করার নেই৷ যুক্তরাষ্ট্রের মুখের ওপরে সোজা সাপটা কিছু বলারও সাহস কারো নেই৷ সেই সুযোগে বেহায়ার মতো যুক্তরাষ্ট্র ভালো মানুষের চেহারা প্রকাশ করতে পারছে৷
আধুনিক কালে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ব্যাড গাই ও গুড গাইয়ের এর চেয়ে বড় উদাহরণ আর হতে পারেনা৷ এটি এই কৌশলের টেক্সড বুক এক্সামপল হয়ে থাকবে৷
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই মে, ২০২৪ বিকাল ৫:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




