হঠাৎ করেই চারদিক থেকে ভেসে আসা একটা বিষয় খুব যন্ত্রণা দিচ্ছে, “বইমেলা এবং সর্বাধিক বিক্রিত বই”। খুব একটা বই না পড়া অথবা বই পড়তে গেলে দেহের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া লোকজনের সমালোচনা যদিও বেশী কিন্তু সাধারনভাবে দেখতে গেলে এই অভিযোগ একেবাড়ে উড়িয়েও দেয়া যায় না। একটা Spoken English এর বই যদি তাবৎ বইমেলা দাপিয়ে বেড়ায় তবে দেশের সাহিত্য এবং সাহিত্য সঞ্চালকদের বিষয়ে একটু কটু চোখে তাকানো যায় বই কি! তবে গণ তথা সাধারণ মানুষের ভূমিকা কি করে যে এই সাহিত্যকে একটু একটু করে অনেক দূরে সরিয়ে দিচ্ছে তাও একটা চমৎকার ব্যাপার।
প্রথমেই দেখা যাক “দেশের সাহিত্য”
প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের স্ম্রাটদের রাজসভায় কবি, তথাপি সাহিত্য চর্চা করে এমন লোকদের একটা বিশেষ কদর ছিল। ব্রিটিশদের শাসনকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সহ এমন অতি অসংখ্য সাহিত্যিকের কথাতো আমরা জানি। তো দেশের সাহিত্যের উৎকর্ষতার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো পরিবেশ এবং সমাজের উৎসাহের। তো সাহিত্যের আবার পরিবেশ কী? সাহিত্যের পরিবেশ বলতে দেশের মানুষের অবসরে সাহিত্যের অবস্থানকে বলা যায়। একটু গভীরভাবে যদি দেখি, তবে দেখা যাবে বই পড়া প্রিয় অবসরের তালিকাতে নামেমাত্র। সামাজিক মাধ্যম এবং নেটফ্লিক্সের তথাপি ইন্টারনেটের দৌড়াত্ম্যে আমরা অনেক কম সময়ে অনেক বেশী জানতে পারি, সেই জানার মান যদিও প্রশ্নবিদ্ধ! তবুও আমাদের জ্ঞানের ক্ষিধে মেটাতে আমরা ওইখানটাতে যাচ্ছি আর অল্প কিছু জানতে গিয়ে অনেকটা সময় দিচ্ছি। রবীন্দ্র রচনাবলী সদ্য শেষ করে আসা ছেলেটা বন্ধুমহলে অতটা সমাদ্রিত নয় যতটা ইউটিউবে প্রচুর সাবস্ক্রাইবার পাওয়া ছেলেটি(তা সে যে কন্টেন্ট ই হোক)!! বাসায় বাসায় রাজনীতির চর্চা তা সে দেশ অথবা পারিবারিক! যদিও ওই রাজনৈতিক চর্চাও যে আমাদের প্রাচীন গ্রিসের কাতারে নিয়ে যাবে না তা বুঝতে আর কারোর বাকি নেই। মা বাবারা সন্তানদের বই উপহার দেয়া ওরাংওটাং এর মতই বিলুপ্তপ্রায়!! স্কুলের বই, পরীক্ষা আর চারিদিকে এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে থাকা সমাজের মানুষগুলো সন্তানদের হাতে আউটনলেজের বই দেখলে সন্তানের সময় অপচয়ের হিসাব চাইতে বসে অথচ “আমার প্রিয় লেখক” রচনা মুখস্ত করার পর সন্তানকে মোবাইলে গেম খেলতে দেয় হাসিমুখে!! দেশে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হতে গেলে হাততালি আর লেখক হতে গেলে পকেটখালি!!! পূর্ণিমার ওই চাঁদকে ঝলসানো রুটি ভাবতে ভাবতে একসময় সাহিত্য নিজের পেটে নিজেই যে হজম হয়ে যায়!!! তো দেশের সাহিত্যের যখন এই বাপে খেদানো মায়ে তাড়ানো অবস্থা তখন তার ক্যান্সার হয়ে সে যে তিলে তিলে নিঃশেষ হবে তা তো কেবল সময়ের ব্যাপার! হঠাৎ করে হুজুগে পড়ে মায়াকান্না দেখানোর অতিআবশ্যকতা নিষ্প্রয়োজন। হুমায়ুন আহমেদ পরবর্তি বইমেলাগুলোর দিকে তাকালে হয়তো ব্যাপারটা একদম পরিষ্কারভাবে লক্ষ্য করা যায়। আর ওই যে সমাজের উৎসাহের কথা বললাম না? গত দশ বছরে কয়জন বর্ষসেরা উদীয়মান লেখকের স্বীকৃতি দেশ দিয়েছে আর কয়জনই বা আপনি, আমি চিনি? মনে করি আগামীকাল বর্ষসেরা অভিনেতা ও ক্রিকেটার এর পাশাপাশি যদি বর্ষসেরা উদীয়মান সাহিত্যিকের নাম আমরা জানি তবে ১০০ জনে অন্তত ১০ জন মানুষ তার লেখা পড়ার আগ্রহ অথবা উৎসাহ পেতে পারতো, কিন্তু না আমাদের এন্টারটেইনমেন্টের জন্য এখন আর সাহিত্য লাগে না। আমাদের মনের যে ক্ষিধে আর নেই!! তবে কি আমাদের মনটাই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে?? মন না থাকলে আমরা মানুষ থাকবো তো??
এবার আশা যাক সাহিত্য সঞ্চালনার ক্ষেত্রে,
একজন সাহিত্যিকের সাহিত্যকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌছে দেয়ার মত পবিত্র কাজ করে থাকেন সাহিত্য সঞ্চালকেরা। তারা ব্যবসা করবেন গৌনভাবে তবে মূলত তারা হবেন সাহিত্যের ফেরীওয়ালা, নতুন নতুন সাহিত্যিককে তাদের লেখনী দিয়ে মানুষের কাছে পৌছে দিবেন এইতো হবে একজন সফল সঞ্চালকের কাজ। কিন্তু এমন পবিত্র কাজেও দূষণ আমরা এড়াতে পারলাম কই!! এখন সাহিত্যের ফেরীওয়ালাদের সাহিত্যের মানের চেয়ে ব্যবসা গুরুত্বপূর্ণ! একজন নব্য লেখকের বিনামুল্যে সাহিত্য সম্পাদনা করবে এমন সঞ্চালক পাওয়া যাবে কী? যাবে না। তার কারণ অর্থনৈতিক ভাবছেন? ভুল। এটাও একটা সামাজিক সমস্যা। একটু লক্ষ্য করি, দেশ প্রকাশনী কিন্তু নেহাত কম নয়। প্রতিটি প্রকাশনী যদি বছরে দুইজন নতুন লেখককে স্পন্সর করতে চায় তবে তাতে এমন কোনো তারল্য সঙ্কট হতো না! তদুপরি ওই সাহিত্যের মান ভালো হলে দিনশেষে সঞ্চালকেরই লাভ। কিন্তু এই যে কারো জন্য সুযোগ তৈরী করা, এতো মানবিক গুন। এই মানবিক গুন তৈরি হবে সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা থেকে। আর সেই পরিমাণ ভালোবাসাই বলি অথবা সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ- কোনটাই যে অধিকাংশের মধ্যে খুব একটা নেই তা তো দিনের আলোর চেয়েও উজ্জ্বল, তাই না?
এবার আসা যাক গণ তথা সাধারণ মানুষের কথায়,
সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখা অথবা গলাটিপে হত্যা করা এই দুটি কাজ অনবদ্যভাবে করতে পারে গণ অথবা সাধারণ মানুষেরা। এই গণ সবসময় কিছু একটার পেছনে ছুটবে, তাদের ছুটতে হবেই। তো আমাদের দেশের গণ এখন কিসের পেছনে? খুব সহজ উত্তর… যা দিবেন তা’র পেছনে, এক কথায় “যা তা” ের পেছনে। সর্বাধিক আলোচিত বিষয়- “কোন সেলিব্রিটি কি করলো”, “দেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী কেনো এলো” ব্লা ব্লা ব্লা… এই বিষয়ে আলোচনা অথবা তথ্য দুটোই আবার ফেসবুকেই সর্বাধিক।। ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা আমাদের জন্য কেমন অভিশাপ হয়ে এলো তাড় আর এক দৃষ্টান্ত! তো এই গণ এখন জানেই না কি নিয়ে ভাববে আর কেনই বা ভাববে! ভ্রান্তধর্ম, আধিপত্যের রাজনীতি আর পরচর্চা এসবের পর দিনশেষে ওই ফেসবুকে একটু উগড়ে দেয়া- এই নিয়ে যে জীবন সেখানে সাহিত্যচর্চার সময় ই বা কই!? তা ও যদি সাহিত্য পড়তেই হয় তবে পাঠ্যপুস্তকে তো রয়েছেই! এই নিয়ে গণ পরম তৃপ্তি নিয়ে চরমভাবে একটু একটু করে সাহিত্যকে হত্যা করছে। সমসাময়িক সময়ে চা এর টেবিল অথবা বন্ধুদের আড্ডায় গ্ণ এর আলোচনার বিষয়ের দিকে তাকালে দেখা যায় ওখানে সাহিত্য বেচারার স্থান নেই। এই সাহিত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া অবিবেচক গণ এর মতকে প্রধান্য দিয়ে যদি মেনে নিতে হয় সাহিত্যেকে তবে সেই সাহিত্য হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা!!!
তো এতসব সমস্যার ভীড়ে হারিয়ে যাওয়া সাহিত্যকে দয়া করে বছরে একবার বইমেলায় খুঁজতে যাবো কেনো? তিলে তিলে যাকে শেষ করে দিচ্ছি অবহেলায় তাকে নিয়ে আবার লোক দেখানো মায়াকান্নার বিশেষত্বই বা কি?
দিনশেষে একটাই অনুরোধ, নিজের পড়তে ভালো না লাগলেও নিজের সন্তানকে প্রতিমাসে একটা ভালো বই পড়তে উৎসাহ দিন, অন্যের কথা আলোচনা না করে একটা ভালো বই নিয়েই না হয় কথা বলি! একটু একটু করে লিখতে লিখতে বছর শেষে একটা বই হয়তো লিখেও ফেলতে পারি, স্বপ্নের সমান বড় হতে হলে স্বপ্নতো দেখতে হবে।। এই সাহিত্য আমাদের স্বপ্ন দেখতে শেখায়। একটু স্বপ্ন দেখি আর অনেক বেশী বাঁচি।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুন, ২০২১ বিকাল ৩:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



