somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প : প্রেম ও বিপ্লব

০৩ রা মে, ২০১৫ বিকাল ৩:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ঘণ্টাপাঁচেক পরেই আমি বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছি । সাজিদের সাথে আমার বিয়ে । কম নয়, সাড়ে চার বছরের প্রেম সাজিদের সাথে । এত্ত লং লাস্টিং প্রেম এই যুগে খুবি দুর্লভ ব্যাপার । আমার সামনে অজস্র স্বপ্নপাখির ওড়াউড়ি । কিন্তু একে একে সব স্বপ্নপাখিকে দৃশ্যহীন করে দিয়ে বার বার স্মৃতিতে ভেসে উঠছে দুঃস্বপ্নের একটা বীভৎস ক্ষত !
স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আমাকে একদিন এভাবে আনন্দ-গাঁথার পাশে বসে বিসর্জন-গাঁথা রচনা করতে হবে কে জানত । না, আমি তো বিসর্জন দিতে চাই নি । আমি কাছে পেতে চেয়েছি । একান্ত নিজের করে কাছে পেতে চেয়েছি । কিন্তু আমার চাওয়া আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছে ! প্রত্যাখ্যানের গ্লানিতে জর্জরিত অনেক দিনরাত্রি পেরিয়ে আজ ওকে আমি বিসর্জন দিলাম । রূপক, আর তোমাকে বেঁধে রাখব না এই মিথ্যে বাঁধনে । যাও, উড়ে যাও । যেখানে খুশি সেখানে ।
হ্যাঁ, ওর নাম রূপক । রূপকের সাথে আমার মাত্র ২৩ দিনের পরিচয় । পরিচয়ের শুরুটা হয়েছিল ফেসবুকের মাধ্যমে । আকস্মিক ঝড়ের মত রূপক এল, আবার চলেও গেল । সাজিদের সাথে সাড়ে চার বছরের সম্পর্কের চেয়ে রূপকের সাথে মাত্র ২৩ দিনের পরিচয়ের ভিতর দিয়ে আমি আরো অনেক বড় কিছু আবিষ্কার করেছিলাম । তা শুধু প্রেম নয়, তার চেয়েও মহৎ কিছু । সেই মহৎ কিছুকেই আজ আমি বিসর্জন দিতে যাচ্ছি ।
বাস্তব রূপককে আমি কখনো স্বচক্ষে দেখে নি । তবে ফেসবুকের ওয়ালে তার ফটো দেখেছি, সেই ফটো এখনো আমার মস্তিষ্কে নিখুঁতভাবে খোদাই করা আছে । সবুজ ঘাসের উপর রূপক চিৎ হয়ে শুয়ে আছে । গায়ে ফুলহাতা বাদামী শার্ট । মাথায় ঝাঁকড়া চুল, শ্যামবর্ণ মুখখানা জুড়ে খোচা খোচা দাঁড়ি । মুখে একটা অদ্ভুত হাসি । সেই হাসিতে দুঃখ-সুখ-ক্রোধ তিনটেই মিশে আছে ।
রূপক আমাকে কখনো ‘ভালোবাসি’ বলে নি । সে বলেছে বিপ্লবের কথা । সে আমাকে শুনিয়েছে রাশিয়ায় লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক বিপ্লবের গল্প, চীনে মাও সে তুংয়ের লং মার্চের গল্প , বলিভিয়ার জঙ্গলে ১২জন সঙ্গী নিয়ে চে গুয়েভারার দুঃসাহসিক লড়াইয়ের গল্প । লেনিন, মাও সে তুং, চে— আমি কাউকে চিনতাম না । আমি চিনতাম রূপককে । তখন আমার কাছে সব গল্পের নায়কই ছিল রূপক ।
‘রূপক, তুমি এমন কেন ? তোমার হৃৎপিণ্ডে কি একটুও রক্ত-মাংস নেই ? ওটা কি পাথর দিয়ে গড়া ?’
‘না না লুবনা— পাথর কেন বলছ ? যাদের হৃৎপিণ্ড পাথর দিয়ে গড়া তাদের বিরুদ্ধেই তো আমাদের লড়াই । এই নগরের আকাশচুম্বী অট্টালিকাগুলোর দিকে তোমার কি কখনো চোখে পড়ে না ? কাদের শ্রমে ওসব গড়ে উঠে ? আর কারা ওসব ভোগ করছে ? ফুটপাথে খদ্দরের আশায় দাঁড়িয়ে থাকা পতিতার দিকে কি তোমার কখনো চোখ পড়ে না ? তুমি কি জানো কোন অভিশাপ তাকে এখানে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে ? সিস্টেম । যাদের হৃৎপিণ্ড পাথর দিয়ে গড়া সেই পাষণ্ডরাই এই সিস্টেম তৈরী করেছে । এই বিদ্যমান সিস্টেমটাকে ভেঙে ফেলার জন্যই তো আমাদের লড়াই ।’ রূপক বলে যায় ।
আমি মনোযোগ দিয়ে নিঃশব্দে শুনে যাই । আমার ভিতরে কেউ একজন চিৎকার করে বলতে থাকে— ‘রূপক তুমিই ঠিক, তুমিই ঠিক । অসংখ্য পোশাকি মানুষের ভিড়ে তুমিই প্রকৃত রক্ত-মাংস দিয়ে গড়া পূর্ণাঙ্গ মানুষ । আমিও তোমার মত হতে চাই ।’
কোনো রোমান্টিক গানের অডিও ক্লিপ নয়, রূপক আমাকে নজরুল-সুকান্ত-রুদ্রের কবিতা স্বকন্ঠে আবৃত্তি করে হোয়াটস-অ্যাপে, ম্যাসেঞ্জারে পাঠাত । আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত সেসব শুনতাম । বার বার শুনতাম । সেসব কবিতার প্রতিটা পঙক্তিতে ছিল এমন এক শেকল ভাঙার শপথ । যে শেকলে আমি নিজেই বন্দি ছিলাম । আজো বন্দি । রূপক, তুমি আমাকে মুক্ত করে যেতে পারো নি । তুমি ব্যর্থ বিপ্লবী, রূপক তুমি ব্যর্থ বিপ্লবী !

জীবনের সব কিছুই ঠিকঠাক মত চলছিল । সাজিদের সাথে সাড়ে চার বছরের অ্যাফেয়ারের শুভ পরিণতির কথা উঠতেই কেন জানি সেদিন আমি ভেঙে পড়ি । আর কেউ নয়, সেদিন ভেঙে পড়ার একমাত্র কারণ ছিল রূপক । সাজিদ নয়, আমার সমগ্র অস্তিত্বই তখন দখল করে আছে রূপক । যদিও আমার সাথে প্রেম-ভালোবাসার টপিক নিয়ে বিন্দুমাত্র কথা বলার আগ্রহ রূপকের ছিল না; তবুও আমি রূপককে ভালোবেসেছিলাম । সমগ্র হৃদয় দিয়ে ভালোবেসেছিলাম । রাজনীতি, মার্ক্সবাদ, নারীবাদ, পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, বিপ্লব— যে টপিক নিয়েই রূপক কথা বলত । সবকিছুতেই আমি ধীরে ধীরে প্রেম অনুভব করতে থাকি । রূপকের ঠোঁট দিয়ে উচ্চারিত প্রতিটা বাক্যই ছিল প্রেমের একেকটি অমর পঙক্তি ।
উভয়পক্ষের অভিভাবকবৃন্দ রীতিমত উঠে পড়ে লেগেছেন আমার সাথে সাজিদের বিয়ে ঘটিয়ে দিতে । কারণ, সাজিদ এখন অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত । ৫ মাস আগেই একটা ভালো জব পেয়ে গেছে । আর আমি ? মাস দুয়েকও হল না ইউনিভার্সিটিতে অ্যাডমিশন নিয়েছি । আমার অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠা ? সেটার গুরুত্ব যে এই সমাজের কাছে কতটুকু তা আপনারা খুব ভালোভাবেই জানেন । কিন্তু এই সমাজের দাসত্ব মুখ বুঝে সহ্য করে চুপচাপ বেঁচে থাকার জন্যই কি আমার জন্ম ? না না— এই দাসত্ব নিঃশব্দে মেনে নেওয়ার জন্য আমি জন্মে নি, আমার জন্ম এই বৈষম্যবাদী সমাজকে আপদমস্তক পাল্টানোর যে লড়াই, সেই লড়াইয়ে সামিল হয়ে সাম্যকে ছিনিয়ে আনার জন্য । এইরকম বৈপ্লবিক চেতনাই সেদিন আমার ভিতরে মাথা ছাড়া দিয়ে উঠেছিল । রূপকের কাছ থেকে বিপ্লবের দীক্ষা নিয়ে আমিও হয়ে উঠতে লাগলাম এক আপদমস্তক বিপ্লবী ।

ওই রাতে আমার একফোঁটাও ঘুম হয় নি । রূপকের ফোন অফ । ফেসবুকে গিয়ে দেখি, সন্ধ্যা ৭.২৩ টার পরে রূপক আর আক্টিভ হয় নি ।
ভোর ৭টা । সারারাতের নিদ্রাহীন ক্লান্ত শরীরে ঘুম নেমে আসতেই আকস্মিক জেগে উঠি । বাবার কাছ থেকেই প্রথম শুনি । তারপর টিভি স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি— ব্রেকিং নিউজ : চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে র‍্যাবের ক্রসফায়ারে গুলিতে চরমপন্থি ছাত্রনেতা রূপক চৌধুরি খুন !
রূপকের বুকে নাকি ৬টা বুলেট বিঁধেছিল ! ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল রূপকের রক্ত-মাংসের হৃৎপিণ্ড ! যাদের হৃৎপিণ্ড পাথরের, সভ্যতার দোহাই দিয়ে ওরাই শেষ পর্যন্ত জিতে গেল । আমার হৃৎপিণ্ডটাও হয়ত পাথরের । রূপককে বিসর্জন দিয়ে একটু পরে হাসতে হাসতে বসে যাব বিয়ের পিঁড়িতে ।
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৩১



এবছর দেশে আমড়ার ফলন ভালো হয়েছে।
আমড়ায় আছে প্রচুর ফাইবার যা দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। এক কেজি আমড়া মাত্র ৫০ টাকা। এক কেজি আপেল ৩৫০ টাকা। মালটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×